Main Menu

অসহযােগ আন্দোলন ভারতীয় জমিদারশ্রেণির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আন্দোলন

ভারতের জাতিয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াশীল নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ১৯২০-২২ সালে পরিচালিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় জমিদারশ্রেণির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আন্দোলন হচ্ছে অসহযােগ আন্দোলন (Non co-operation Movement)। এই আন্দোলনে জনগণের বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভারতের জমিদারশ্রেণি নিজেদেরকে সারা ভারতে কৃষকশ্রমিকদের উপর ক্ষমতার ছড়ি ঘোরানোর দক্ষতা অর্জন করে।

অসহযােগ শব্দটি গান্ধী বস্তুত খিলাফত আন্দোলনসূত্রে উদ্ভাবন করেছিলেন। পরে জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনের দাবিসমূহ যুক্ত হয়। অসহযােগ আন্দোলন ২ অগস্ট ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সূচিত হয়। কার্যত এই আন্দোলনকে পূর্ববর্তী ১৯১৯ খ্রি রাউলাট অ্যাকটের বিরুদ্ধে পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি বলা যায়। রাউলাট আইনের সাহায্যে সরকারের দমননীতির প্রতিবাদ, জালিয়ানওয়ালাবাগে সরকারি ফৌজের নৃশংস গণহতার প্রতিকার এবং খিলাফতের বিষয়ে ইংরেজদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা সমেত ১৯১৯ খ্রি ভারত শাসন আইনের ত্রুটি সমুহের ফলে যে অসন্তোষ দেখা দেয়, সে সব মিলিয়ে অসহযােগ আন্দোলনের পশ্চাৎপট রচিত হয়েছিল।

অসহযোগ আন্দোলনে হিংসার প্রয়ােগ ছিল নীতিবিরুদ্ধ। অসহযােগের সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক সংকল্পে অবিচল থেকে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাই ছিল লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন মূলত গঠনপ্রয়াসী হলেও সংগ্রামের প্রয়ােজনকে অস্বীকার করা হয়নি। তৃতীয়ত, অহিংস অসহযােগ আন্দোলনে ব্যক্তিগতভাবে এবং সমবেতভাবে জনগণ নিষ্কলুষ বিদ্রোহের পথে এগােবে, সংযুক্ত প্রয়াসের মাধ্যমে মানুষ শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হয়ে স্বরাজের অভিমুখে অগ্রসর হবে।

ভারতীয় জনগণের শত্রু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন জনগণের বিপ্লবী শক্তির বিরোধী। জনগণের বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য গণশত্রু গান্ধী খিলাফত সম্মেলনে (নভেম্বর, ১৯১৯) সরকারের বিরুদ্ধে অসহযােগের আদর্শ ব্যক্ত করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের অসহযােগ নামাঙ্কিত এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তীব্র কংগ্রেসের ভেতরে উদ্দীপনা দেখা দেয় এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কংগ্রেস একটি বৃহৎ আকার ধারণ করে জনগণের উপর চেপে বসে। এই ঘটনার পরেই জনগণ কংগ্রেসের নিপিড়নের কাছে হেরে যায়।

১৯২০ খ্রি ১৭ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে চতুর্মুখী কর্মসূচি গৃহীত হয়েছিল : ১. সরকারি খেতাব ও কাউন্সিলের সদস্যপদ ত্যাগ, ২. সরকারি পদ থেকে ইস্তফা, ৩. পুলিশ ও সামরিক বিভাগ থেকে পদত্যাগ এবং ৪. খাজনা প্রদান বন্ধ । খিলাফতি ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলার বিরােধিতা করেন কংগ্রেসের অনেক নেতা ও কয়েকটি প্রাদেশিক কমিটি। কিন্তু গণশত্রু গান্ধী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং ধর্মের সাথে রাজনীতিকে জড়িয়ে একজন পাকা ধুরন্ধর হিসেবে নিজের শক্তি কুক্ষিগত করেন।

সেপ্টেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সম্মেলনে বিরােধীদের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং কর্মসূচিতে আরও পাঁচটি বিষয় যুক্ত হয় : ১. যাবতীয় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বয়কট এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ২. ইংরেজদের আদালত বয়কট ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রবর্তন, ৩. মেসােপটেমিয়াতে সামরিক ও করণিক কর্মচারী এবং শ্রমিকদের কাজে যােগ দিতে অস্বীকার করা, ৪. কাউন্সিল নির্বাচন বয়কট এবং ৫. বিদেশি পণ্যের শ্রমিক বয়কট।

ডিসেম্বরে নাগপুরে অনুষ্ঠিত বার্ষিক অধিবেশনে অতিরিক্ত স্বরাজ দাবি যুক্ত হয়ে অসহযােগ প্রস্তাব বিপুল ভােটাধিক্যে গৃহীত হয়। এক বছরে স্বরাজ পাওয়া যাবে বলে গান্ধী ঘােষণা করেন। বিপুল উদ্দীপনায় কংগ্রেস যথার্থই একটি জমিদারদের সর্বাত্মক দলে পরিণত হয়। কৃষকদের সাথে প্রতারণার উদ্দেশে ভড়ং ধরার জন্য সব ভণ্ডরা কংগ্রেসের গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদি বস্ত্র, গান্ধী টুপি পরিধান বাধ্যতামূলক করে। চরকা-খদ্দর, মাদকতা বর্জন, অস্পৃশ্যতা পরিহার, কথায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্য কর্মসূচি অঙ্গীভূত হয়। কিন্তু ভেতরে হিন্দু মুসলিম অনৈক্য  চালু থাকে।

যেহেতু এসব বদমায়েশি কাজ চালানোর জন্য টাকা দরকার, তাই কথিত গঠনকর্মের নাম করে টিলক স্বরাজ্য-ভাণ্ডারে এক কোটি টাকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। অতঃপর সারা দেশে বিক্ষিপ্ত আকারে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে মালাবারে সশস্ত্র মােপলা বিদ্রোহ (অগস্ট ১৯২১), ও বােম্বাইতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (নভেম্বর ১৯২১) ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। শাসনতান্ত্রিক নতুন আইন (১৯১৯) অনুযায়ী ১৯২০ খ্রি ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন কংগ্রেস বয়কট করে। আন্দোলনের অনুষঙ্গী হিসেবে মেদিনীপুরে ইউনিয়ন বাের্ড বর্জন এবং পঞ্জাবে অকালি বিক্ষোভ দেখা দেয়। ১৯২১ খ্রি নভেম্বরে প্রিন্স অব ওয়েলসের (পরে অষ্টম এডওয়ার্ড) ভারত ভ্রমণের সময়ে সর্বত্র তাঁর সভাসমাবেশকে বয়কট করা হয়। প্রিন্স বােম্বাইতে যেদিন পৌঁছান সেদিন হরতাল পালিত হয়। সেদিন এক জনসভার শেষে গান্ধী বিদেশি বস্ত্রের বহ্ন্যুৎসব করেন। পরে পুলিশের গুলি চলে, ৫৩ জন নিহত ও দাঙ্গায় ৪০০ ব্যক্তি আহত হন। আত্মশুদ্ধিকল্পে গান্ধী পাঁচ দিন অনশন করেন।

দেশব্যাপী জনবিক্ষোভে দিশেহারা সরকার খিলাফতি ও অসহযােগী স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনকে বেআইনি ঘােষণা করে। তাতে আন্দোলন উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পায়, সেইসঙ্গে সরকারি দমন ব্যবস্থাও কঠোর হয়ে দাঁড়ায়। ৩০,০০০ নরনারী গ্রেপ্তার হন। অনেক নেতা কারারুদ্ধ হন। সংবাদপত্রের উপরও বিধিনিষেধ জারি হয়।

৮ জুলাই ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে করাচিতে নিখিল ভারত খিলাফত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে কংগ্রেসের আসন্ন আহমদাবাদ অধিবেশেনের পূর্বে দাবিসমুহ সরকার মেনে না নিলে স্বাধীন ভারত প্রজাতন্ত্র ঘােষিত হবে। ইতিপূর্বে সৈন্যবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলাভঙ্গের সৃষ্টির প্রচেষ্টার দরুন আলি ভ্রাতৃদ্বয় ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। চিত্তরঞ্জন কারারুদ্ধ হওয়ায় হাকিম আজমল খাঁর সভাপতিত্বে কংগ্রেসের আহমদাবাদ অধিবেশন বসে। গান্ধী ওই অধিবেশনে অন্যান্য নেতাদের অনুপস্থিতিতে যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার জন্য একটি প্রস্তাবে নিজেকে স্বৈরতন্ত্রী হিসেবে অনুমােদন করিয়ে নেন। এইভাবে গান্ধী যে ভারতের জনগণের শত্রু তা প্রমাণিত হয়।

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারিতে গান্ধী ভাইসরয় লর্ড রেডিংকে একটি চরমপত্রে জানিয়ে দেন যে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের মনােভঙ্গি পরিবর্তিত না হলে তিনি গুজরাতের বড়দৌলি তালুকে কর বন্ধ আন্দোলন শুরু করবেন। কিন্তু ৪ ফেব্রুয়ারি গােরখপুর জেলার চৌরিচেরায় তিন হাজার লােকের এক ক্রুদ্ধ জনতা পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে থানায় অগ্নিসংযােগ করে; তাতে ২১ জন পুলিশ ও ১ জন সাব-ইন্সপেক্টর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। এই হিংসাত্মক ঘটনায় গান্ধী বিচলিত হয়ে অসহযােগ আন্দোলন স্থগিত রাখেন এবং ইংরেজ সরকারের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যান এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের শত্রুতা করেন। শুধু ব্যক্তিগতভাবে ও সীমিত ক্ষেত্রে আইন অমান্যের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকে। স্বাধীনতা ও জনগণের শত্রু মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ষড়যন্ত্রে ১৯২১ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ধ্বংস হয়ে যায়।

এদিকে তুরস্কে কেমাল আতাতুর্ক ক্ষমতাসীন হয়ে ১৯২৩ খ্রি ২৯ অক্টোবর দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে এবং তুরস্কে খলিফার ক্ষমতাসহ খিলাফতের অবসান ঘােষণা করেন। তখন থেকে অসহযােগ ও খিলাফত আন্দোলন স্তিমিত হয়ে ১৯২৪ খ্রি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রদেশে বিচ্ছিন্নভাবে চলার পর গান্ধীর ষড়যন্ত্রে স্থগিত রাখা হয়।

দ্রষ্টব্য: আইন অমান্য আন্দোলন

চিত্রের ইতিহাস: জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ, ৯ আগস্ট, ২০১৬ নেপালি আলোকচিত্রী Bijay chaurasia-র (विजय चौरसिया) তোলা আলোকচিত্র। CC-BY-SA-4.0

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৪-২৫।

আরো পড়ুন

অনুপ সাদির প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১০টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ।

জন্ম ১৬ জুন, ১৯৭৭। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *