ভাইটাসি (Vitaceae) পরিবারের লতানো উদ্ভিদ: উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় ও বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ সম্পদ

উদ্ভিদ জগতের পুষ্পক উদ্ভিদের (Angiosperms) মধ্যে দ্বিবীজপত্রী ইউডিকোটস (Eudicots) উপদলের ভাইটালেস (Vitales) বর্গের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাণিজ্যিকভাবে সমাদৃত পরিবার হলো ভাইটাসি (Vitaceae)। সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘ভল্লী-লতা’ বা ‘আঙুর পরিবার’ নামে পরিচিত। লতানো স্বভাব, আকর্ষীর সাহায্যে আরোহন এবং গুচ্ছাকৃতির বেরী জাতীয় ফলের জন্য এই পরিবারের সদস্যরা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। কেবল সুস্বাদু ফলের উৎস হিসেবেই নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞান, লোকজ ভেষজ জ্ঞান এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এই পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বজুড়ে ভাইটাসি পরিবারের প্রায় ১৭টি গণ এবং প্রায় ১০০০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা ভাইটাসি পরিবারের সামগ্রিক উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, এর অন্তর্গত সকল গণের পরিচয় এবং বাংলাদেশে প্রাপ্ত ভেষজ গুণসম্পন্ন লতানো প্রজাতিসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

🌿 ভাইটাসি পরিবারের উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

ভাইটাসি বা ভল্লী-লতা পরিবারের উদ্ভিদগুলোকে তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রাকৃতিক, গাঠনিক ও অঙ্গসংস্থানিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে খুব সহজে শনাক্ত করা যায়। নিচে এদের বিস্তারিত উদ্ভিদতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো:

  • বৃদ্ধির স্বভাব ও বিস্তৃতি: এই গোত্রের উদ্ভিদগুলো মূলত বৃহৎ আরোহী কাষ্ঠল লতা (Lianas) বা আরোহী গুল্ম প্রকৃতির হয়ে থাকে, তবে কিছু প্রজাতি সোজা গুল্মও হতে পারে। ভাইটাসি গোত্র প্রধানত পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলীয় (Tropical) এবং উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় (Sub-tropical) অঞ্চলে বিস্তৃত। বাংলাদেশে এই গোত্রের অধীনে ৮টি গণ (Genus) এবং ২৬টি প্রজাতি (Species) প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেখা যায়।
  • আকর্ষী (Tendrils): এদের আরোহন পদ্ধতি অত্যন্ত অনন্য ও আকর্ষণীয়। কান্ডের পর্ব বা নোড থেকে পাতার বিপরীত দিকে (Leaf-opposed / পত্র-প্রতিমুখ) বিশেষ আকর্ষী তৈরি হয়। এই আকর্ষী মূলত রূপান্তরিত পুষ্পবিন্যাস বা কান্ড, যা কখনো কখনো মঞ্জরীদণ্ডের ওপর অবস্থান করে। আকর্ষীগুলো সরল কিংবা দ্ব্যাগ্র (দুই ভাগে) শাখান্বিত হতে পারে, যার সাহায্যে লতাটি যেকোনো অবলম্বনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে ওপরে ওঠে।
  • পত্রবিন্যাস ও আকৃতি: এদের পাতা সাধারণত একান্তর (Alternate) বিন্যাসে সাজানো থাকে এবং এর সাথে ক্ষুদ্র ও ক্ষণস্থায়ী উপপত্র থাকে। পাতা সরল (যেমন: আঙুর)—যা করতলাকার শিরাযুক্ত এবং আংশিক খণ্ডিত হতে পারে; অথবা যৌগিক প্রকৃতির হতে পারে। যৌগিক পাতার ক্ষেত্রে এগুলো ত্রিপত্রক (Trifoliate) কিংবা পদাঙ্গুলাকারে ৪ থেকে ৭টি পত্রকে (যেমন: গোয়ালী লতা) বিভক্ত থাকে। পাতার কিনারা বা প্রান্ত সাধারণত করাতাকার বা খাঁজকাটা হয়।
  • পুষ্পবিন্যাস ও ফুল: এদের ফুলগুলো আকারে বেশ ছোট, সবুজাভ বা সাদাটে রঙের হয়। পুষ্পবিন্যাস সাধারণত পত্র-প্রতিমুখ বা অপ্রকৃত-কাক্ষিক সাইম (Cyme), করিম্ব (Corymb) কিংবা শীর্ষক প্যানিকল (Panicle) প্রকৃতির হয়ে থাকে। ফুলগুলো নিয়মিত, বহুপ্রতিসম এবং উভলিঙ্গ বা একলিঙ্গ হতে পারে। এরা সাধারণত ৪ থেকে ৫-অংশক বিশিষ্ট (Tetramerous or Pentamerous) হয়।
  • পুষ্পদলের গঠন:
    • বৃতি (Calyx): এদের বৃতি পেয়ালা আকৃতির (Cup-shaped) হয়ে থাকে, যা ৪-৫টি খণ্ডকে বিভক্ত বা একটি সন্ধিতে সংক্ষিপ্ত আকারে থাকে।
    • দলমণ্ডল (Corolla): পাপড়ি বা দলমণ্ডল খণ্ডক ৪-৫টি, যা প্রান্তস্পর্শী (Valvate) বিন্যাসে থাকে। এগুলো সাধারণত মুক্ত অবস্থায় থাকে, তবে কখনো কখনো শীর্ষে যুক্ত এবং আশুপাতী (খুব দ্রুত ঝরে পড়ে) প্রকৃতির হয়।
  • পুংকেশর ও গর্ভাশয়: পুংকেশর সংখ্যায় ৪-৫টি এবং এগুলো পাপড়ির ঠিক বিপরীত দিকে (পাপড়ির প্রতিমুখ) অবস্থান করে। পরাগধানী মুক্ত বা যুক্ত অবস্থায় থাকতে পারে। এদের ফুলের কেন্দ্রস্থলে একটি মধুগ্রন্থি চাকতি (Nectariferous disc) থাকে, যাতে ৪ বা ৫টি গ্রন্থি মুক্ত বা বিবিধভাবে যুক্ত থাকে। এদের গর্ভাশয় অধিগর্ভ (Superior ovary) এবং সাধারণত ২-প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট হয়; প্রতিটি প্রকোষ্ঠে ২টি করে অধোমুখী ডিম্বক থাকে। এর গর্ভদণ্ড খাটো এবং গর্ভমুণ্ড দেখতে চাকতি সদৃশ বা খণ্ডিত হয়।
  • ফল ও বীজ: এদের ফল হলো রসালো বেরী (Berry) জাতীয়। ফলের অভ্যন্তরে সাধারণত ১ থেকে ৪টি (অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১ বা ২ প্রকোষ্ঠী বীজ) বীজ থাকে, যা অত্যন্ত শক্ত বহিস্তরে আবৃত থাকে।

ভাইটাসি পরিবারের গণের শ্রেণীবিন্যাস (Genera of Vitaceae)

উদ্ভিদবিজ্ঞানের আধুনিক ট্যাক্সোনমিক গবেষণা অনুযায়ী, ভাইটাসি পরিবারকে বেশ কয়েকটি গণে (Genus) ভাগ করা হয়েছে। এই পরিবারের মোট ১৭টি গণের নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  1. Vitis (ভাইটিস): এটি এই পরিবারের সবচেয়ে প্রধান ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গণ। আঙুর বা গ্রেপ ভাইন এই গণের অন্তর্গত।
  2. Ampelocissus (অ্যাম্পেলোসিসাস): বন্য আঙুর জাতীয় উদ্ভিদ, যাদের পাতা আঙুরের মতো কিন্তু বুনো প্রকৃতির।
  3. Ampelopsis (অ্যাম্পেলোপসিস): এরা দেখতে আঙুর লতার মতো হলেও এদের পাপড়িগুলো মুক্ত অবস্থায় ঝরে পড়ে।
  4. Cissus (সিসাস): মাংসল কন্দযুক্ত এবং চতুষ্কোণ কান্ডবিশিষ্ট লতানো উদ্ভিদের গণ (যেমন: হাড়জোড়া)।
  5. Cayratia (ক্যারাসিয়া): পদাঙ্গুলাকার যৌগিক পত্রযুক্ত লতা, যার মধ্যে গোয়ালী লতা অন্যতম।
  6. Causonis (কসনিস): পূর্বে এটি ক্যারাসিয়া গণের অংশ ছিল, বর্তমানে একে পৃথক গণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
  7. Tetrastigma (টেট্রাস্টিগমা): চার-অংশক বিশিষ্ট গর্ভমুণ্ডযুক্ত বিশাল কাষ্ঠল লতা। এদের মূল ও কান্ড ভেষজ গুণসম্পন্ন।
  8. Parthenocissus (পার্থেনোসিসাস): প্রাচীর বা পাথরে বেয়ে ওঠার জন্য এদের আকর্ষীর মাথায় বিশেষ আঠালো ডিস্ক বা চোষক থাকে (যেমন: ভার্জিনিয়া ক্রিপার)।
  9. Rhoicissus (রয়সিসাস): মূলত আফ্রিকা মহাদেশে পাওয়া যায় এমন লতানো গুল্ম।
  10. Leea (লিয়া): পূর্বে একে পৃথক পরিবার ‘Leeaceae’ তে রাখা হতো, তবে আধুনিক APG শ্রেণীবিন্যাসে একে ভাইটাসি পরিবারের উপ-পরিবার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরা সোজা গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ প্রকৃতির।
  11. Clematicissus (ক্লেমেটিসিসাস): অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় ও সীমিত অঞ্চলের একটি গণ।
  12. Cyphostemma (সাইফোস্টেমা): মাংসল বা সাকুলেন্ট প্রকৃতির কান্ডযুক্ত অদ্ভুত গঠনের উদ্ভিদ, যা মূলত আফ্রিকা ও মাদাগাস্কারে জন্মায়।
  13. Nothocissus (নথোসিসাস): এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি দুর্লভ লতানো গণ।
  14. Pterisanthes (টেরিসান্থেস): এদের পুষ্পবিন্যাস চ্যাপ্টা ও ফিতার মতো আকৃতির হয়, যা উদ্ভিদবিজ্ঞানে বেশ অনন্য।
  15. Pterocissus (টেরোসিসাস): বিশেষ ধরনের ডানাযুক্ত বীজ বা কান্ডবিশিষ্ট ক্রান্তীয় লতা।
  16. Yua (ইউয়া): প্রধানত পূর্ব এশিয়া এবং চীনের পাহাড়ি বনাঞ্চলে প্রাপ্ত লতানো উদ্ভিদ।
  17. Pseudocayratia (সিউডোক্যারাসিয়া): সাম্প্রতিক গবেষণায় আবিষ্কৃত এশিয়ার একটি নতুন গণ।

বাংলাদেশে প্রাপ্ত ভাইটাসি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ লতা

বাংলাদেশের ভৌগোলিক আবহাওয়া, বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের ঝোপঝাড় ভাইটাসি পরিবারের উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। বাংলাদেশে এই পরিবারের বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায়, যা লোকজ চিকিৎসায় অত্যন্ত সমাদৃত। নিচে বৈজ্ঞানিক নামসহ গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ প্রজাতিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. হাড়জোড়া লতা (Cissus quadrangularis L.)

  • পরিচিতি: ভাইটাসি পরিবারের অন্যতম সুপরিচিত এবং চমৎকার ঔষধি উদ্ভিদ হলো হাড়জোড়া। এর কান্ড মাংসল, সবুজ এবং স্পষ্ট চতুষ্কোণ (চার কোণা)। প্রতি পর্বে একটি করে পাতা এবং বিপরীত দিকে আকর্ষী থাকে।
  • ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহার: এর নাম থেকেই বোঝা যায় এটি হাড় ভাঙা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কান্ড ও পাতা বেটে ভাঙা হাড়ের স্থানে প্রলেপ দিলে হাড় দ্রুত জোড়া লাগে। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এতে প্রচুর ক্যালসিয়াম এবং ফাইটোস্ট্রোজেনিক উপাদান থাকে, যা অস্থি কোষের (Osteoblasts) বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়া এটি গ্যাস্ট্রিক ও বদহজমের সমস্যায় দারুণ কার্যকরী।

২. গোয়ালী লতা বা গোয়ালী কাটা (Cayratia pedata (Lamk.) Juss. ex Gagnep.)

  • পরিচিতি: এটি একটি বহুবর্ষজীবী কাষ্ঠল আরোহী লতা। এর পাতাগুলো পদাঙ্গুলাকার অর্থাৎ হাতের আঙুলের মতো ৫ থেকে ৭টি পত্রকে বিভক্ত থাকে। এর ফুলগুলো সবুজাভ-সাদা এবং ফলগুলো ছোট বেরী জাতীয়।
  • ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহার: প্রথাগত চিকিৎসায় এর মূল এবং পাতা নানা রোগে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নারীদের জরায়ুর অতিরিক্ত সংকোচন বা ইউটেরাইন রিফ্লেক্স নিয়ন্ত্রণে এর পাতার সিদ্ধ ক্বাথ অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়া এর পাতা বাটা তীব্র রক্তপাত বন্ধ করতে, এবং মূলের নির্যাস গরুর দুধ ও ঘিয়ের সাথে মিশিয়ে সেবন করলে প্রস্রাবের অবরুদ্ধতা বা মূত্রনালীর জ্বালাপোড়া দূর হয়।

৩. অমল লতা বা পান লতা (Cissus repens Lam.)

  • পরিচিতি: এটি একটি নরম, চকচকে সবুজ পাতাযুক্ত লতা যা দেখতে অনেকটা পান পাতার মতো। এর কান্ড ও পাতা বেশ রসালো প্রকৃতির হয়।
  • ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহার: লোকজ চিকিৎসায় অমল লতার পাতার রস রক্ত আমাশয় এবং সাধারণ ডায়রিয়া নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। এর পাতার প্রলেপ শরীরের ফোড়া পাকাতে সাহায্য করে এবং সাপে কামড়ানো স্থানে বিষের তীব্রতা কমাতে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে এর মূলের রস খাওয়ানোর লোকজ প্রচলন রয়েছে।

৪. বুনো আঙুর বা পানিয়াল লতা (Ampelocissus latifolia (Roxb.) Planch.)

  • পরিচিতি: এই লতাটির পাতা দেখতে অনেকটা আসল আঙুর পাতার মতো এবং কান্ড বেশ বলিষ্ঠ ও দীর্ঘ। বর্ষাকালে এতে ছোট ছোট লালচে ফুল ফোটে এবং পরে কালো রঙের গুচ্ছাকার বন্য আঙুর ফল হয়।
  • ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহার: এর মূল অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ভেষজ গুণসম্পন্ন। বুনো আঙুরের মূলের ক্বাথ দীর্ঘস্থায়ী ক্রনিক জন্ডিস এবং লিভারের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়। এর ফলের রস অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর, যা শরীরের দুর্বলতা দূর করতে এবং রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূরীকরণে সাহায্য করে।

৫. তিনপত্রী লতা বা আমরুল লতা (Causonis trifolia (L.) Mabb. / পূর্বে Cayratia trifolia)

  • পরিচিতি: বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, রাস্তার পাশে এই লতাটি প্রচুর দেখা যায়। এর পাতা তিনটি পত্রকে বিভক্ত থাকে (Trifoliate), তাই একে তিনপত্রী লতা বলা হয়। ফলগুলো পাকলে গাঢ় বেগুনি বা কালো রঙ ধারণ করে।
  • ভেষজ গুণাগুণ ও ব্যবহার: এর পাতা ও মূল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বা প্রদাহনাশক উপাদানে সমৃদ্ধ। শরীরের কোথাও আঘাত পেয়ে ফুলে গেলে বা গেঁটে বাতের তীব্র ব্যথা হলে এর পাতা হালকা গরম করে বেটে প্রলেপ দিলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। এছাড়াও এর মূলের রস ঠাণ্ডাজনিত তীব্র জ্বর ও কাশি উপশমে ব্যবহৃত হয়।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব

ভাইটাসি পরিবার কেবল ভেষজ চিকিৎসায় নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এক বিশাল স্থান দখল করে আছে। এই পরিবারের Vitis vinifera বা সাধারণ আঙুর লতা থেকে উৎপাদিত আঙুর পৃথিবীর অন্যতম প্রধান ফল। এটি সরাসরি খাওয়া ছাড়াও কিসমিস, জুস এবং বিশ্ববিখ্যাত ওয়াইন বা মদ তৈরিতে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পরিবেশগত দিক থেকে, এই আরোহী লতাগুলো বনের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) ভারসাম্য রক্ষা করে। বনের বড় বড় বৃক্ষকে জড়িয়ে ধরে এরা ঘন ক্যানোপি বা ছাউনি তৈরি করে, যা বন্য পশুপাখির আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এদের রসালো বেরী ফল বনের পাখি, কাঠবিড়ালি এবং বিভিন্ন কীট-পতঙ্গের প্রধান খাদ্য উৎস।

বাংলাদেশে ভাইটাসি পরিবারের বর্তমান স্থিতি ও সংরক্ষণ

আধুনিক নগরায়ন, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং গ্রামীণ ঝোপঝাড় নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে বাংলাদেশে ভাইটাসি পরিবারের বেশ কিছু বন্য ও ভেষজ প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির হুমকির মুখে রয়েছে। যেমন, পূর্বে আলোচিত ‘গোয়ালী লতা’ প্রজাতিটি আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে আশঙ্কামুক্ত নয় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এই মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদগুলোকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

  • সংরক্ষণাগার ও বোটানিক্যাল গার্ডেন: দেশের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ভেষজ উদ্যানে এই লতাগুলোর জিন ব্যাংক তৈরি ও এক্স-সিটু সংরক্ষণ করা।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: লোকজ কবিরাজি বা আয়ুর্বেদিক ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে এদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে প্রাকৃতিকভাবে গাছটি পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে যায়।
  • গবেষণা: এই লতাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ফাইটোকেমিক্যাল (Phytochemicals) নিয়ে আধুনিক ল্যাবরেটরিতে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা, যা ভবিষ্যতে ক্যানসার বা জটিল হৃদরোগের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভাইটাসি (Vitaceae) পরিবারটি উদ্ভিদবিজ্ঞানের এক অনন্য বিস্ময়। আঙুরের মতো সুস্বাদু ফল থেকে শুরু করে হাড়জোড়া বা গোয়ালী লতার মতো জীবনরক্ষাকারী ভেষজ উপাদান—সবই মানবজাতিকে উপহার দিয়েছে এই পরিবার। বাংলাদেশের প্রাকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং লোকজ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই পরিবারের লতানো উদ্ভিদগুলোর অবদান অপরিসীম। প্রকৃতির এই সবুজ সম্পদকে চেনা, এর সঠিক ব্যবহার জানা এবং বিপন্ন প্রজাতিগুলোকে সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. এম আতিকুর রহমান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১০ম (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৫০১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!