পরিবেশের পরম বন্ধু এবং প্রকৃতির ঝাড়ুদার হিসেবে পরিচিত পাখি হলো শকুন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যাভাব এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে এই মহাবিপন্ন পাখিটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বিশেষ করে শীতকালে সীমান্ত পেরিয়ে হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা পরিযায়ী শকুনেরা বাংলাদেশে এসে নানা বিপত্তিতে পড়ছে। বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল—পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও এবং তাড়াশ থেকে বিরল প্রজাতির হিমালয়ী গৃধিনী শকুন উদ্ধারের তিনটি চাঞ্চল্যকর ও বাস্তব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
২০১০ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড
২০১০ সালটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিদদের জন্য শকুনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। এই বছরের শেষভাগে, বিশেষ করে ডিসেম্বর ২০১০-এ তীব্র শীতের প্রকোপে হিমালয় অঞ্চল থেকে একঝাঁক পরিযায়ী গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী (Eurasian Griffon Vulture) বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রচণ্ড ক্লান্ত ও তীব্র খাদ্যাভাবে ভোগা এই বিরল শকুনের দলটি বাংলাদেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দণ্ডাপাল ইউনিয়নের রাজারহাট, সুন্দরদীঘি, ফুলবাড়ী ও খকেরহাটে এসে মাটিতে আশ্রয় নেয়। উড়তে না পেরে লোকালয়ে পড়ে যাওয়া এই অসহায় ও অতিশয় দুর্বল পাখিদের মধ্যে অন্তত ৮টি শকুনকে স্থানীয় কিছু অসচেতন মানুষ খাঁচায় বা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। দুঃখজনকভাবে বন্যপ্রাণী আইনের যথাযথ প্রয়োগের শিথীলতার কারণে কোথাও কোথাও এগুলোকে পিটিয়ে আহত করা হয় এবং কয়েকটি শকুন মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়, যা তৎকালীন প্রকৃতিপ্রেমীদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।
পরবর্তীতে এই চরম সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন ও বন বিভাগ দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে। পঞ্চগড়ের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়দের হাত থেকে আটক শকুনগুলো উদ্ধার এবং সেগুলোকে কোনোপ্রকার আঘাত না করার কঠোর নির্দেশ দেন। তবে সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা না পাওয়ায় এবং প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতার কারণে দেবীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া শকুনের মধ্যে একটি আহত এবং ১১ মার্চ, ২০১১ তারিখে আরেকটি অসুস্থ শকুন মারা যায়। এই ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে তৎকালীন বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে স্বশরীরে পঞ্চগড় সফর করেন। তিনি অবশিষ্ট বিরল গ্রিফন শকুনগুলোকে নিবিড় পরিচর্যা, উন্নত চিকিৎসা ও সুরক্ষার জন্য চকরিয়ায় অবস্থিত শেখ মুজিব সাফারি পার্কের শকুন কেন্দ্রে পাঠানোর জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে তখন আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, এই পরিযায়ী শকুনগুলো পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা লাভ করলেই বন্যপ্রাণী আইনের চেতনা মেনে আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।
২০১১ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড (Year: 2011 Records)
২০১১ সালটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ইতিহাসে শকুনের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী এবং স্মরণীয় বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই বছরের মার্চ মাসে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে পরিযায়ী শকুনের আগমন এবং সেগুলোকে উদ্ধারের বেশ কিছু ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পূর্ববর্তী বছরের (২০১০) ডিসেম্বর মাসে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়া এবং পরবর্তীতে উদ্ধার হওয়া বিরল গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী (Eurasian Griffon Vulture) গুলোর চূড়ান্ত উদ্ধার ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া এই বছরের মার্চ মাসেই সম্পন্ন হয়। ১১ মার্চ, ২০১১ তারিখে পঞ্চগড়ে একটি অত্যন্ত অসুস্থ শকুন মারা যাওয়ার পর বন্যপ্রাণী গবেষক ও প্রশাসনের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। একই দিন তৎকালীন বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে স্বশরীরে পঞ্চগড়ে গিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং অবশিষ্ট বিরল পরিযায়ী শকুনগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের শকুন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পরিবেশবিদদের প্রবল দাবির মুখে প্রশাসন তখন স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যে, এই বিপন্ন পাখিদের কোনো বাণিজ্যিক প্রদর্শন বা চিড়িয়াখানায় না পাঠিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ করে আবার মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করা হবে।
একই বছর বাংলাদেশের পাখি গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শকুনের ভয়াবহ প্রজনন ও বাসস্থান সংকটের চিত্রটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামনে আসে। প্রখ্যাত পাখি গবেষক সীমান্ত দীপু-এর মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের দিকে সিলেট বিভাগের কালাছড়ার গভীর জঙ্গলে বাংলা শকুনের (White-rumped Vulture) সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ৭টিতে এসে দাঁড়িয়েছিল, যা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতেও ছিল ৪৭টি। ডাইক্লোফেনাকের মারাত্মক বিষক্রিয়া এবং নির্বিচারে বড় বড় গাছ কাটার ফলে শকুনের আবাসস্থল ধ্বংস হওয়াই ছিল এই তীব্র হ্রাসের মূল কারণ। তবে এই চরম সংকটের বিপরীতে ২০১১ সালেই বাংলাদেশ সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই বছরই দেশজুড়ে গবাদি পশুর চিকিৎসায় শকুনের জন্য মরণঘাতী ব্যথানাশক ওষুধ ‘ডাইক্লোফেনাক’ (Diclofenac) সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং এর নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ‘মেলোক্সিক্যাম’ ব্যবহারের নীতিমালা জোরদার করা হয়। সরকারের এই কঠোর আইনি পদক্ষেপের ফলেই পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশে শকুনের বিলুপ্তি ঠেকাতে এবং নতুন রেসকিউ সেন্টার বা নিরাপদ অঞ্চল (Vulture Safe Zone) গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপিত হয়।
২০১২ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড (Year: 2012 Records)
২০১২ সালটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিদদের জন্য শকুনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এবং তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে একটি অত্যন্ত স্মরণীয় বছর ছিল। এই বছরের শেষভাগে, বিশেষ করে ৭ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখ (বৃহস্পতিবার) বিকেলে বাংলাদেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের বিএডিসি (BADC) ফার্মের পার্শ্ববর্তী আকচা গ্রাম থেকে একটি বিশাল আকৃতির মহাবিপন্ন হিমালয়ী গৃধিনী (Himalayan Griffon Vulture, বৈজ্ঞানিক নাম: Gyps himalayensis) উদ্ধার করা হয়। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে হিমালয় অঞ্চল থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা এই পরিযায়ী পাখিটি প্রচণ্ড ক্লান্ত ও উড়ার ক্ষমতা হারিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সময়োপযোগী তৎপরতায় বিষয়টি দ্রুত জানাজানি হয় এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগকে খবর দেন। খবর পেয়ে জেলা বন বিভাগের একটি বিশেষ দল সেই দিনই সন্ধ্যায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শকুনটিকে অক্ষত অবস্থায় নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে আসে। তবে উদ্ধারের পর বন বিভাগের পক্ষ থেকে যখন ঘোষণা দেওয়া হয় যে, শকুনটিকে উন্নত পরিচর্যার জন্য দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যান কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পর কোনো একটি চিড়িয়াখানায় পাঠানো হতে পারে, তখন দেশের পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
পরিযায়ী ও মুক্ত আকাশের পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখার এই সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দেশের বন্যপ্রাণী প্রেমীরা একযোগে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। পাখি রক্ষায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও পাখিপ্রেমী আহমদ উল্লাহ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি ৮ ডিসেম্বর সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের তৎকালীন এডিসি (ADC) জনাব আবুল ওয়াহেদ-এর সাথে টেলিফোনে সরাসরি যোগাযোগ করে পাখিটিকে চিড়িয়াখানার মতো বন্দি দশায় না পাঠানোর অনুরোধ জানান এবং এডিসিও বন্যপ্রাণী আইনের চেতনা মেনে সেটিকে মুক্ত করার আশ্বাস দেন। একই সাথে দেশের প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ও লেখক শরীফ খান বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে জানান যে—কীটনাশকের বিষক্রিয়া, বিদ্যুতের তারে আঘাত, কাক-চিলের আক্রমণ বা তীব্র খাদ্যাভাবে অসুস্থ হওয়া এই পরিযায়ী পাখিদের রামসাগরের মতো প্রাকৃতিক ও খোলা জায়গায় নিবিড় পরিচর্যা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সুস্থ করার পরেই আবার মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করা উচিত। অবশেষে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে জেলা বন বিভাগীয় কর্মকর্তা আলী কবীর স্পষ্ট আশ্বাস দেন যে, পৌনে ৩ ফুট লম্বা, আড়াই ফুট উচ্চতা এবং প্রায় ২০ কেজি ওজনের এই বিশালাকার পুর্ণাঙ্গ শকুনটিকে রামসাগরে সম্পূর্ণ সুস্থ করার পরেই মুক্ত করা হবে। এই আন্দোলনের ফলেই পরবর্তীতে পরিযায়ী বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও দূরদর্শী প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।[১]
২০১২ সালের অতিরিক্ত শকুন উদ্ধার ও আঞ্চলিক উদ্যোগ (Year: 2012 Additional Records)
২০১২ সালটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে শকুনের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য একটি মাইলফলক বছর ছিল। গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক ব্যবহারের কারণে ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশে শকুনের জনসংখ্যা যেভাবে ধস নেমেছিল, তা ঠেকাতে ২০১২ সালেই একটি আঞ্চলিক স্টিয়ারিং কমিটি (Regional Steering Committee) গঠন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে আন্তর্জাতিকভাবে শকুন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে গঠিত এই কমিটির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বন বিভাগ যুক্ত হয়। এই বছর থেকেই মূলত হিমালয় অঞ্চল (যেমন ভারত, নেপাল, ভুটান ও তিব্বত) থেকে তীব্র শীতে উড়ে আসা পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী বা গ্রিফন শকুনের (Himalayan Griffon Vulture) গতিবিধি ট্র্যাক করার জন্য আইইউসিএন (IUCN) এবং বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের সমন্বয় জোরদার করা হয়। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২ সালে শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, বরং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন চরাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে খাবারের তীব্র সংকটে ও বিষক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিযায়ী শকুন লোকালয়ে অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
এছাড়াও ২০১২ সালের শেষভাগে এসে বন্যপ্রাণী গবেষক এবং আইইউসিএন-এর যৌথ গবেষণায় দেশের একমাত্র আবাসিক প্রজাতি বাংলা শকুনের (White-rumped Vulture) প্রজনন সফলতার ওপর একটি বিশেষ জরিপ চালানো হয়। জরিপের তথ্যে দেখা যায়, পরিবেশ দূষণ এবং কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিকভাবে শকুনের ডিমের খোলস পাতলা হয়ে ডিম নষ্ট হওয়ার হার ২০১২ সালে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই বছরই প্রথম পরিবেশবিদরা দাবি তোলেন যে, শুধু ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে এর গোপন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং অসুস্থ পাখিদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ‘শকুন পুনর্বাসন কেন্দ্র’ ও প্রজনন সুরক্ষায় ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone) তৈরি করতে হবে। ২০১২ সালের এই বৈজ্ঞানিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক কমিটির সিদ্ধান্তগুলোর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ২০১৩ সালে সরকার ‘বাংলাদেশ জাতীয় শকুন পুনরুদ্ধার কমিটি’ (BNVRC) গঠন করতে সক্ষম হয়।
২০১৩ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড (Year: 2013 Records)
২০১৩ সালটি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শকুন সুরক্ষার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নীতিনির্ধারণী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে (২০১০-২০১২) দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, বিশেষ করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী বা গ্রিফন শকুনের (Himalayan Griffon Vulture) উপর্যুপরি লোকালয়ে আছড়ে পড়া এবং উদ্ধার হওয়ার ঘটনাগুলো বন্যপ্রাণী বিভাগকে একটি স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় রূপরেখা তৈরিতে বাধ্য করে। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৩ সালের শীতকালেও উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলগুলোতে খাদ্যের চরম সংকট এবং তীব্র ঠাণ্ডাজনিত ক্লান্তির কারণে বেশ কয়েকটি পরিযায়ী শকুন লোকালয়ে এসে অসুস্থ অবস্থায় আটকা পড়ে। স্থানীয় পরিবেশবাদী নেটওয়ার্ক এবং বন বিভাগের দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে এ বছর উদ্ধার হওয়া অসুস্থ পরিযায়ী পাখিদের সাময়িকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপদ প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার ধারা অব্যাহত রাখা হয়। তবে মাঠপর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চললেও, গবেষকরা তীব্রভাবে অনুভব করছিলেন যে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কমিটি ছাড়া এই মহাবিপন্ন পাখিদের রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করেই ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে। এই বছরই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রথমবারের মতো গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ জাতীয় শকুন পুনরুদ্ধার কমিটি’ (Bangladesh National Vulture Recovery Committee – BNVRC)। এই জাতীয় কমিটি গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মাঠপর্যায়ে শকুনের উদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা এবং গবাদি পশুর চিকিৎসায় নিষিদ্ধ ওষুধের চোরাচালান কঠোরভাবে তদারকি করা। একই সাথে ২০১৩ সালেই আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) এবং বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা’ (Bangladesh Vulture Conservation Action Plan) খসড়া তৈরির কাজ চূড়ান্ত করা হয়। এই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০১৪ সালে দেশের দুটি বিশাল অঞ্চলকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone) হিসেবে ঘোষণা করার পথ সুগম হয়েছিল।
২০১৪ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড (Year: 2014 Records)
বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এক চরম অবহেলা এবং স্থানীয় কিছু মানুষের অমানবিক আচরণের চিত্র ফুটে উঠেছে এই ঘটনায়। ২০১৪ সালের শেষভাগে একদিনেই সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় একঝাঁক বিপন্ন শকুন।
- ঘটনার পটভূমি ও উদ্ধার: ২২ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখে পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে একে একে ১১টি হিমালয়ী গৃধিনী (Himalayan Griffon Vulture) বা হিমালয়ী গ্রিফন শকুন উদ্ধার করা হয়। সবগুলো শকুনকে উদ্ধারের পর স্থানীয় বন বিভাগের অফিসে নেওয়া হয়।
- মূল উদ্ধারকারীর ভূমিকা: এই উদ্ধার কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেন আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমী ফিরোজ আল-সাবাহ। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি সারাদিনে বিচিত্র রকমের লোকের সাথে কথা বলেন এবং মানুষগুলোকে বুঝিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই বিষয়ে তিনি তীব্র দুঃখ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘দায়িত্ববান ব্যক্তিদের উদাসীনতা চরম’।
- জনতার নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা: উদ্ধারকৃত শকুনগুলো মূলত স্থানীয় জনতার লোভ আর হিংসার শিকার হয়ে আহত এবং দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফিরোজ আল-সাবাহ-এর বিবরণ অনুযায়ী—কোথাও তাদের বেঁধে রাখা হয়েছিল, কোথাও পিটিয়ে মারা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, মানুষের রসনা বিলাসের শিকারও হয়েছে এক দুর্ভাগ্য শকুন। শকুন খেতেও মানুষের বাধে না আজকাল! কিছু মানুষ আবার তাদের বিক্রি করার ধান্দাও করতে ছাড়েনি। এই সকল অমানুষ ও মানুষরূপী পশুদের সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে ১১টি গ্রিফন শকুন উদ্ধার করা গেছে এবং তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া গেছে। এই কঠিন কাজে ফিরোজ আল-সাবাহকে সরাসরি সহযোগিতা করেন মেহেদী হাসান ও মির্জা মিকাইল আব্রার।
- শকুনের আগমন ও প্রশাসনের ভূমিকা: প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২২ ডিসেম্বর সকালে পঞ্চগড়ের মীরগড় এলাকায় ৪০ থেকে ৫০টি শকুনের একটি বড় দল দেখা যায়। তারা একে একে যেখানে-সেখানে নামতে থাকে আর মানুষের হাতে ধরা পড়তে থাকে। পাশের দেশে শীত বেড়ে যাওয়ায় তারা আমাদের দেশে আসতে শুরু করেছে বাঁচার জন্য। কিন্তু উত্তরবঙ্গে পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে তারা অসুস্থ হয়ে নিচে নামছে। উদ্ধারকৃত শকুনগুলো ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানোর কথা ছিল। উদ্ধারকাজ চলাকালীন ফিরোজ আল-সাবাহ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্যা রেজাউল করিম-এর প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন।
প্রকৃতিপ্রেমীদের আহ্বান: শকুনরা আমাদের অতিথি এবং পরিবেশের বন্ধু; আমাদের নৈতিক দায়িত্ব তাদের রক্ষা করা ও আশ্রয় দেওয়া। অথচ বেশিরভাগ মানুষের প্রবণতা তাদের দেখলেই মারতে হবে! বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনটির বাস্তবায়নে শিথিলতায় জনতার শাস্তি না হওয়ায় বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীরা এখনো নিরাপদ নয়। সচেতন ব্যক্তিরা শকুন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের হয়ে মাঠে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে পঞ্চগড়ের বন্ধুদের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে—কোথাও অসুস্থ শকুন দেখতে পেলে বা কোনো খোঁজ পেলে তাৎক্ষণিক থানা বা বন বিভাগে জানান।[২]
মাঠপর্যায়ের এই তীব্র সংকটের বিপরীতে ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব বন্যপ্রাণী ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন মাইলফলক স্পর্শ করে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর ধারা ২০(১) এর অধীনে ২০১৪ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশের দুটি বিশাল অঞ্চলকে বিশ্বের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone – VSZ) হিসেবে ঘোষণা করে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) বাংলাদেশ এবং বন বিভাগের যৌথ বৈজ্ঞানিক সুপারিশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল-১’ হিসেবে সিলেট বিভাগ, ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশ মিলিয়ে মোট ১৯,৬৬৩.১৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নির্ধারণ করা হয়, যার কেন্দ্র ছিল রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের শকুনের প্রধান প্রজনন কলোনি। অন্যদিকে, ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল-২’ হিসেবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকার কিছু অংশ মিলিয়ে মোট ২৭,৭১৭.২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা ঘোষণা করা হয়, যা সুন্দরবনের বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই দুটি জোনে শকুনের জন্য মরণঘাতী ওষুধ ডাইক্লোফেনাক ও কিটোপ্রোফেনমুক্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়। ২০১৪ সালের এই যুগান্তকারী সরকারি সিদ্ধান্তের ফলেই বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শকুনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত এবং সুরক্ষিত ‘সেফ জোন’ বা অভয়াশ্রম গড়ে তোলার আইনি গৌরব অর্জন করে।
শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যা কেন্দ্র, সিংড়া জাতীয় উদ্যান
২০১৪ সালটি মূলত বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শকুন উদ্ধারের আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার বছর হিসেবে চিহ্নিত। এই বছরই প্রথম আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন (IUCN) বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ যৌথভাবে একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল শীতকালে উত্তরবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা অসুস্থ পরিযায়ী শকুনের উদ্ধার ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা। এই প্রকল্পের অধীনেই ২০১৪ সালে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ‘সিংড়া শালবন’ বা সিংড়া জাতীয় উদ্যানে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী ‘শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যা কেন্দ্র’ (Vulture Rescue and Care Center) স্থাপন করা হয়। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পঞ্চগড়ের ওই বড় ঘটনাটি ছাড়াও নীলফামারী, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধার বিভিন্ন চরাঞ্চলে তীব্র ঠাণ্ডা, ক্লান্তি ও খাদ্যাভাবে আরও বেশ কয়েকটি পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী (Himalayan Griffon Vulture) লোকালয়ে আছড়ে পড়েছিল। বন বিভাগের মোবাইল রেসকিউ টিম এবং স্থানীয় পরিবেশবাদী তরুণদের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া এই বিচ্ছিন্ন শকুনগুলোকে প্রথমবারের মতো সিংড়া শালবনের ওই নতুন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয় এবং সফলভাবে চিকিৎসা প্রদান শুরু হয়।
একই বছর দেশের একমাত্র স্থায়ী আবাসিক প্রজাতি বাংলা শকুনের (White-rumped Vulture) সংখ্যা শুমারি নিয়ে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালের সেই অফিশিয়াল জাতীয় শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে টিকে থাকা বাংলা শকুনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ২৬০টিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই ভয়াবহ শুমারির রিপোর্টের পরপরই মাঠপর্যায়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে শকুনের প্রধান প্রজনন কলোনিগুলোর চারপাশে পশুর মৃতদেহে কীটনাশক ও বিষ প্রয়োগ বন্ধের দাবি জানান। শুমারির এই চরম সংকটের খবর এবং সিংড়া কেন্দ্রে পরিযায়ী শকুনের উপচে পড়া ভিড়—উভয় ঘটনাই সে বছর সরকারকে দ্রুত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এর ফলেই ২০১৪ সালের শেষভাগে বিশ্বের প্রথম দুটি বিশালাকার ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone) আইনি গেজেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে, যা বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হয়ে থাকবে।
২০১৫ সালের শকুন উদ্ধার ও সংরক্ষণ রেকর্ড (Year: 2015 Records)
২০১৫ সালটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ইতিহাসে মাঠপর্যায়ের তীব্র সংকট এবং একই সাথে শকুন সংরক্ষণে যুগান্তকারী ব্যবহারিক পদক্ষেপের এক অনন্য বছর হিসেবে চিহ্নিত। এই বছরের শুরুর দিকে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় একটি অত্যন্ত বিরল ও মহাবিপন্ন আবাসিক প্রজাতি বাংলা শকুন (White-rumped Vulture) উড়তে না পেরে লোকালয়ে আছড়ে পড়ে। তীব্র খাদ্যাভাব এবং অসচেতন কৃষকদের ছিটানো কীটনাশকের পরোক্ষ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাখিটি প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছিল। খবর পেয়ে স্থানীয় বন্যপ্রাণী প্রেমী তরুণদের একটি দল তাৎক্ষণিকভাবে শকুনটিকে উদ্ধার করে এবং স্থানীয় ভেটেরিনারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় নিবিড় চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। অন্যদিকে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যপ্রাণীর প্রধান হটস্পট মৌলভীবাজার জেলা থেকেও এই বছর বেশ কয়েকটি পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী বা গ্রিফন শকুন (Himalayan Griffon Vulture) উদ্ধার করা হয়। বিশেষ করে শীতকালীন স্থানান্তরের সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও ক্লান্তিতে মৌলভীবাজারের পাহাড়ী চরাঞ্চলে আছড়ে পড়া এই বিপন্ন পরিযায়ী পাখিদের উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’ এবং লাউয়াছড়া রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হওয়া পাখিদের প্রাকৃতিকভাবে অবমুক্ত করার মাধ্যমে ২০১৫ সালের মাঠপর্যায়ের উদ্ধার অভিযানগুলো সফল রূপ লাভ করে।
মাঠপর্যায়ের এই উদ্ধার রেকর্ডের পাশাপাশি ২০১৫ সালেই বন্যপ্রাণী বিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (IUCN) বাংলাদেশের শকুনের তীব্র পুষ্টিহীনতা ও খাদ্যাভাব দূর করতে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পূর্ববর্তী বছর (২০১৪) ঘোষিত দুটি ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone)-এর ভেতরে শকুনের নিরাপদ প্রজনন ও বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালেই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এবং সুন্দরবনের বনাঞ্চলে দুটি স্থায়ী ‘শকুনের রেস্তোরাঁ’ বা ফিডিং স্টেশন (Vulture Feeding Station) স্থাপন করা হয়। এই ফিডিং স্টেশনগুলোতে প্রতি মাসে সরকারিভাবে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও নিরাপদ গবাদি পশুর মাংস সরবরাহ করা শুরু হয়, যেন আবাসিক বাংলা শকুনের দল বিষাক্ত মাংসের মরণথাবা থেকে রক্ষা পায়। একই বছর দেশব্যাপী পরিচালিত সর্বশেষ শুমারিতে বাংলাদেশে টিকে থাকা শকুনের সংখ্যা মাত্র ২৬০টিতে এসে ঠেকেছে বলে অফিশিয়াল রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয়। এই আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান এবং রেমা-কালেঙ্গার ফিডিং স্টেশনের সফল বাস্তবায়ন—উভয় ঘটনাই ২০১৫ সালকে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ইতিহাসে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে অমর করে রেখেছে।
আরো পড়ুন
- মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা | Grey Francolin
- বাংলাদেশে শকুন উদ্ধারের ইতিহাস ও জাতীয় ডেটাবেস (২০১০-২০১৫)
- প্রকৃতির বন্ধু শকুন কেন বিলুপ্তির পথে? কারণ ও প্রতিকার
- বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি: হারিয়ে যাওয়ার পর আবার প্রত্যাবর্তন!
- ছোট মদনটাক পাখি: সুন্দরবনের বিরল বাসিন্দা ও এর জীবনবৃত্তান্ত
- বড় মদনটাক বা হাড়গিলা পাখি: বিলুপ্তির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
- এশীয় শামখোল বা শামুকখোল পাখি: বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও প্রজনন কলোনি
- বাংলাদেশের তিতির পাখি: তিন প্রজাতির তিতিরের বিস্তারিত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
- চামচঠুঁটো বাটান বিশ্বে মহাবিপন্ন ও বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি
- বাদা তিতির: বাংলাদেশের জলার তিতির ও এর জীবন বৈশিষ্ট্য | Swamp Francolin
- কালা তিতির বা শেখ ফরিদ: বাংলাদেশের এক মহাবিপন্ন পাখি | Black Francolin
- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টার তিন বছরের অভিজ্ঞতা
তথ্যসূত্র / References:
১. অনুপ সাদি, ৮ ডিসেম্বর ২০১২, “বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁয়ে হিমালয়ী গৃধিনী উদ্ধার, ঠাঁই হলো রামসাগর জাতীয় উদ্যানে”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/vulture-rescue-at-thakurgaon/
২. অনুপ সাদি, ২২ ডিসেম্বর ২০১৪; “এক দিনে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ে এগারটি হিমালয়ী শকুন উদ্ধার”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/rescue-himalayan-vulture/
৩. আইইউসিএন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ (২০১৪-২০১৫): বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর অধীনে বাংলাদেশের প্রথম দুটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘শকুন নিরাপদ অঞ্চল’ (Vulture Safe Zone – VSZ) এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গায় ‘শকুনের রেস্তোরাঁ’ (Vulture Feeding Station) স্থাপন সংক্রান্ত অফিশিয়াল গেজেট ও শুমারি প্রতিবেদন।
৪. Oaks, J. L., Gilbert, M., Virani, M. Z., Watson, R. T., & Meteyer, C. U. (2004):“Diclofenac residues as the cause of vulture population decline in Pakistan and South Asia.” (পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাকের মারাত্মক বিষক্রিয়া এবং শকুনের কিডনি অচল হয়ে যাওয়ার ওপর ড. লিন্ডসে ওক ও গবেষক দলের মূল বৈজ্ঞানিক জার্নাল, যা ২০১৩ সালে বাংলাদেশে BNVRC গঠনে ভূমিকা রাখে)।
৫. মাঠপর্যায়ের সংবাদ ও কেস স্টাডিজ (২০১২-২০১৪): দৈনিক আমার দেশ (২০১১), ডেইলি স্টার ও ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সংবাদকর্মীদের প্রতিবেদন (২০১২) এবং পঞ্চগড়ে আলোকচিত্রী ফিরোজ আল-সাবাহ ও বন বিভাগের যৌথ শকুন উদ্ধার অভিযানের নথি।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।