বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে পাখির তালিকায় ‘তিতির’ এক পরিচিত নাম। সাধারণত Francolinus গণের অন্তর্গত মোট তিন প্রজাতির তিতির আমাদের দেশে দেখা যায়। এই প্রজাতিগুলো হলো— কালা তিতির (Black Francolin), বাদা তিতির (Swamp Francolin) এবং মেটে তিতির (Grey Francolin)। প্রতিটি পাখির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকলেও, আজ আমরা এই ব্লগে অত্যন্ত সুন্দর এবং নজরকাড়া পাখি কালা তিতির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কালা তিতিরের শারীরিক গঠন ও বর্ণনা
কালা তিতির (Black Francolin) মূলত ফাসিয়ানিডি (Phasianidae) পরিবার বা গোত্রের একটি অত্যন্ত সুন্দর পাখি। মজার বিষয় হলো, এটি আমাদের গৃহপালিত মুরগির পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এদের ইংরেজি নাম ‘Francolin’ এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘খুদে মুরগি’।
শারীরিক মাপের দিক থেকে একটি পূর্ণবয়স্ক কালা তিতির ঠোঁটের ডগা থেকে লেজ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এদের পাখার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন সাধারণত আধা কেজির কিছুটা কম হয়ে থাকে।
ছেলে ও মেয়ে পাখির পার্থক্য
কালা তিতিরের ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী পাখির চেহারায় বেশ পার্থক্য দেখা যায়:
- ছেলে কালা তিতির: ছেলে পাখিটি দেখতে অনেক বেশি উজ্জ্বল ও নজরকাড়া। এর পিঠের দিকটা কাজল কালোর ওপর সাদা ও লালচে ফোঁটাযুক্ত। এদের ঠোঁট ও মুখ কালো হলেও গাল ধবধবে সাদা এবং গলায় একটি সুন্দর লাল বলয় বা দাগ থাকে। এদের পেট ও পাখা কালো রঙের, যার ওপর হালকা বাদামি ও সাদা ফুটকি দেখা যায়।
- মেয়ে কালা তিতির: মেয়ে পাখির গায়ের রং তুলনামূলক হালকা বাদামি। এদের ঘাড়ের পেছনের অংশ লালচে এবং কান ও চোখের ওপরের অংশ লালাভ হয়ে থাকে। গাল ও গলার পালক ঘিয়ে রঙের এবং দেহের নিচের অংশে সাদা-কালো দাগ দেখা যায়।
মেয়ে ও ছেলে নির্বিশেষে উভয়ের চোখের রঙ বাদামি এবং ঠোঁট কালো। তবে প্রজনন মৌসুমে (মার্চ থেকে অক্টোবর) এদের পা ও আঙুলের রঙ পরিবর্তন হয়ে উজ্জ্বল সিঁদুরে লাল ধারণ করে।
খাদ্যতালিকা
খাবারের সন্ধানে এরা মূলত ভোরবেলা এবং গোধূলিতে (সায়াহ্নে) বেশি সক্রিয় থাকে। কালা তিতিরের প্রধান খাবার হলো বিভিন্ন ধরনের ঘাসের বীজ, শস্যকণা, ঘাসের মোথা, খৈল এবং ছোট ছোট পোকা। এরা মূলত সমতল ভূমির ঝোপঝাড় বা ঘাসবনে খাবার খুঁটে খেতে পছন্দ করে।
কালা তিতিরের স্বভাব ও বিচরণ
কালা তিতির মূলত ভূচর পাখি, অর্থাৎ এরা বেশির ভাগ সময় মাটিতেই কাটায়। এদের সাধারণত উঁচু ঘাসবন, ঝোপঝাড়, চা বাগান কিংবা গ্রামীণ কৃষিখামারের আশেপাশে একাকী বিচরণ করতে দেখা যায়। এই পাখিগুলো বেশ লাজুক প্রকৃতির এবং বিপদের আভাস পেলে দ্রুত ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।
ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারায় স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ছেলে পাখির পিঠের অংশ ঘন-কালো এবং তাতে আকর্ষণীয় সাদা তিল বা ফোঁটা থাকে। অন্যদিকে, মেয়ে পাখির গায়ের রঙ কিছুটা ফিকে ও বাদামি প্রকৃতির হয়, যা তাদের ঝোপঝাড়ের মধ্যে মিশে থাকতে বা আত্মরক্ষা করতে সাহায্য করে।
প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি
কালা তিতিরের প্রজননকাল সাধারণত মার্চ থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ে এরা বংশবিস্তারের জন্য নিরাপদ স্থান বেছে নেয়। সাধারণত লম্বা ঘাসের গোড়ায় অথবা ঘন ঝোপের নিচে মাটির ছোট গর্ত বা খোদলে শুকনো ঘাস দিয়ে এরা বাসা তৈরি করে।
- ডিমের বৈশিষ্ট্য: এদের ডিমের রঙ হলদে-জলপাই থেকে শুরু করে উষ্ণ জলপাই-বাদামি পর্যন্ত হতে পারে।
- ডিমের সংখ্যা: এরা একবারে সাধারণত ৬ থেকে ৯টি ডিম পাড়ে।
- ডিমের আকার: প্রতিটি ডিমের গড় পরিমাপ প্রায় ৩.৮ × ৩.১ সেন্টিমিটার।
- ইনকিউবেশন পিরিয়ড: ডিম পাড়ার পর মা পাখি তাতে তা দেয় এবং প্রায় ১৮-১৯ দিনের মাথায় ছানা ফোটে।
কালা তিতিরের বিস্তৃতি ও বর্তমান অবস্থা
কালা তিতির বাংলাদেশের একটি বিরল আবাসিক পাখি। একসময় আমাদের দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের পাতাঝরা বনগুলোতে (বিশেষ করে শাল ও গজারি বনে) এদের নিয়মিত দেখা মিলত। তবে আবাসস্থল ধ্বংস এবং শিকারের কারণে বর্তমানে এদের সংখ্যা অনেকটাই কমে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কেবল উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে (বিশেষ করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও এলাকায়) কালেভদ্রে এই পাখির দেখা পাওয়া যায়।
বৈশ্বিক বিচরণস্থল
বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বজুড়ে কালা তিতিরের একটি বিস্তীর্ণ বিচরণক্ষেত্র রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ভারত ও পাকিস্তান
- আফগানিস্তান
- তুরস্ক
- ইরান ও নেপাল
সাধারণত শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চল যেখানে ঝোপঝাড় এবং চাষাবাদের জমি রয়েছে, সেখানেই এরা থাকতে পছন্দ করে।
🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ
কালা তিতির বর্তমানে বাংলাদেশে অস্তিত্ব সংকটের মুখে রয়েছে। ২০০৯ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’ (Encyclopedia of Flora and Fauna of Bangladesh) অনুযায়ী, কালা তিতিরকে বাংলাদেশে ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) পাখি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইইউসিএন (IUCN) এর লাল তালিকায় একে এখনো ‘বিপদমুক্ত’ (Least Concern) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অর্থ হলো, বিশ্বে এদের সংখ্যা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও আমাদের দেশে উপযুক্ত আবাসস্থলের অভাব এবং শিকারের কারণে এরা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। তাই এই সুন্দর পাখিটিকে রক্ষায় আমাদের বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
কালা তিতির সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য
কালা তিতির নিয়ে আরও কিছু চমকপ্রদ তথ্য রয়েছে যা একে অন্য পাখিদের থেকে আলাদা করেছে:
- প্রজাতির বৈচিত্র্য: সারাবিশ্বে Francolinus গণের অধীনে মোট ৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। তবে গর্বের বিষয় হলো, এর মধ্যে ৩টি প্রজাতিই আমাদের বাংলাদেশে দেখা যায়। আমাদের আজকের আলোচ্য কালা তিতির ছাড়াও বাকি দুটি হলো বাদা তিতির (Swamp Francolin) এবং মেটে তিতির (Grey Francolin)।
- স্থানীয় নাম: বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই পাখিটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। বিশেষভাবে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় জেলায় স্থানীয় মানুষজন কালা তিতিরকে ভালোবেসে ‘শেখ ফরিদ’ নামে ডেকে থাকে।
তথ্যসূত্র
১. ইনাম আল হক ও এম শাহরিয়ার মাহমুদ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, ২৬তম খণ্ড “পাখি”, ১ম প্রকাশ, আগস্ট ২০০৯; ইনাম আল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা; পৃষ্ঠা – ১-২। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
২. বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, জুলাই ১০, ২০১২, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা-১১৮৪৪৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।