বাংলাদেশে ক্ষতিকর বিদেশি গাছ: বনায়নের নামে পরিবেশের চরম বিপর্যয়!

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণ করা হচ্ছে, যা আমাদের সামগ্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই আগ্রাসী ও ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতিগুলো দেশের জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনছে। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, আগামী দশকের মধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক প্রাকৃতিক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, খোদ বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে সামাজিক বনায়নের নামে পাহাড় ও সমভূমিতে এসব পরিবেশবিধ্বংসী গাছ লাগানো হচ্ছে। এছাড়া, বহুল সমালোচিত এমএলএম কোম্পানি ‘ডেসটিনি গ্রুপ’ ২০১২ সাল থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সারাদেশে প্রায় এক কোটি ক্ষতিকর ‘পাউলোনিয়া’ গাছ লাগানোর এক বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরেই উদ্ভিদবিদ, প্রাণীবিদ ও কৃষিবিদরা সতর্ক করে আসছেন যে, এসব বিদেশি আগ্রাসী গাছের কারণে আমাদের স্থানীয় উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী এবং কৃষিব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিমভাবে কিছু গাছ লাগিয়ে কখনোই একটি প্রকৃত ‘বন’ তৈরি করা সম্ভব নয়; কারণ বনভূমি হলো প্রকৃতির এক দীর্ঘমেয়াদি সৃষ্টি। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কৃত্রিম বনায়নের চেয়ে প্রাকৃতিক বন রক্ষা করা এবং তা স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেওয়া বেশি জরুরি।

ইউক্যালিপ্টাস ও আকাশমনি নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত

পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারও এখন এই ক্ষতিকর বিদেশি গাছের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত ১৫ মে, ২০২৫ তারিখে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশব্যাপী যেকোনো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আগ্রাসী প্রজাতির ইউক্যালিপ্টাস এবং আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশের এই চরম বিপর্যয় রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে এখন এই ক্ষতিকর বিদেশি গাছগুলোর পরিবর্তে দেশিয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে বনায়ন করার জোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, আমাদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে এখন দেশীয় গাছের চারা রোপণের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছগুলো যে কেবল পরিবেশেরই ক্ষতি করছে তা নয়, এগুলো মানুষের জীবননাশেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালের ১৫ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’-এর সময় বাংলাদেশে ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে ৭ জনই মারা যান গাছের নিচে চাপা পড়ে বা ডাল ভেঙে। পরিবেশবিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য এসব বিদেশি গাছ মোটেও উপযুক্ত ছিল না। ঝড়ের তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা না থাকায় এগুলো সহজেই ভেঙে পড়ে মানুষের এই মর্মান্তিক মৃত্যু ডেকে আনে।[১]

বর্তমানে আমাদের দেশের সামাজিক বনায়নগুলোতে রেইনট্রি, একাশিয়া এবং ইউক্যালিপটাসের মতো বিদেশি গাছের আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই গাছগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষ করে এগুলোর পরাগরেণু ও উপাদান হাপানি (Asthma) এবং অ্যালার্জির মতো জটিল রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়।

অনেকে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে এই ধরনের ক্ষতিকর ও বহিরাগত প্রজাতির গাছ রোপণের পেছনে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং কিছু এনজিওর বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ঔষধি ও রাসায়নিক ব্যবসার প্রসার ঘটাতে তারা এক প্রকার কৌশলে একাশিয়া, সেগুন, মেহগনি ও আকাশমণির মতো পরিবেশের জন্য অনুপযোগী গাছ রোপণকে উৎসাহিত করেছে। এমনকি সত্তর বা আশির দশকে দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে বা বনাঞ্চলে ক্ষতিকর কীটনাশক বা রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে জীববৈচিত্র্য ও পাখির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনও আমাদের প্রকৃতি বহন করছে।

বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের ওপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চাপের একটি বড় উদাহরণ দেখা যায় আশির দশকের শেষের দিকে। তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার পরামর্শ বা নীতিমালার কারণে দেশ থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ব্যাঙ রপ্তানি করা শুরু হয়। ফলে ফসলের ক্ষেত থেকে কোটি কোটি ব্যাঙ উজাড় হয়ে যায়। এর কিছুকাল পরেই দেশের কৃষি খাতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিকভাবে পোকা দমনের প্রধান উৎস ব্যাঙ বিলুপ্ত হওয়ায়, ধানক্ষেতগুলোতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পায় এবং হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।

এই কৃত্রিম সংকট নিরসনের উপায় হিসেবে পরবর্তীতে জমিতে রাসায়নিক সার ও অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর ফলে দেশের কৃষি খাত অনেকাংশে আমদানিকৃত রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে ঋণ চুক্তিও সম্পাদিত হয়। পরিবেশের এই চরম বিপর্যয় প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলে হস্তক্ষেপ করলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিব্যবস্থা ও অর্থনীতি কতটা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।[২]

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে এত চমৎকার জলবায়ু-উপযোগী ও বৈচিত্র্যময় গাছ থাকতে কেন এই দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি গাছের বনায়ন করা হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে প্রকৃতিবিষয়ক বিশিষ্ট লেখক মোকারম হোসেনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন:

“প্রাকৃতিক বনের ধ্বংসাবশেষের ওপর ভিনদেশি বৃক্ষের ক্ষতিকর আচ্ছাদন চরম আত্মঘাতী একটি কাজ। অথচ আমাদের প্রাকৃতিক বনভূমিগুলোয় এই দৃশ্য এখন সবচেয়ে পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। এখন প্রতিযোগিতা—কত দ্রুত প্রাকৃতিক বন পরিষ্কার করে সেখানে সামাজিক বৃক্ষের নামে কতগুলো বিষবৃক্ষ রোপণ করা যায়। আসলে এর কোনো প্রয়োজনই নেই। বিরক্ত না করা হলে বনগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃত রূপে আবার ফিরে আসতে পারে। তাই আমাদের উচিত বনকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে না দেখে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ, বনভূমিগুলোই মূলত আমাদের পরোক্ষভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে।”[৩]

লেখকের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বনকে স্রেফ অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার মানসিকতাই আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে বাধাগ্রস্ত না করে তাকে তার নিজের মতো বিকশিত হতে দেওয়াটাই এখন সময়ের দাবি।

আমাদের দেশের অমূল্য পাহাড় ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মীদের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানদান করা জরুরি। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো বনাঞ্চলে কেবল এক প্রজাতির গাছ লাগানো (Monoculture) পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই বিদ্যমান এক প্রজাতির কৃত্রিম বনগুলোকে অনতিবিলম্বে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছগাছালিতে সমৃদ্ধ ‘বহুপ্রজাতির বনে’ রূপান্তরিত করতে হবে।

আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মাঝে ‘গাছ লাগানো’ বলতে সাধারণত শুধু বড় বড় বৃক্ষ রোপণ করাকে বোঝানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু বৃক্ষ রোপণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ বনের পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। একটি সুস্থ ও কার্যকর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বৃক্ষ, লতা এবং গুল্ম জাতীয় নানা উদ্ভিদের সঠিক অনুপাত ও সমন্বয় প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যতে গাছ লাগানোর যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি মহাপরিকল্পনায় এই ত্রিমাত্রিক উদ্ভিদের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, বনভূমি সৃজনকে স্রেফ কোনো ব্যবসায়িক বা লাভজনক খাত হিসেবে না দেখে, এটিকে একটি প্রাকৃতিক ও টেকসই সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদি মুনাফা ও লোভ সাময়িক কিছু আর্থিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়ংকর। আজ বাংলাদেশের অসংখ্য দেশীয় উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী প্রজাতি যে বিলুপ্তির সম্মুখীন, তার জন্য অতীতে নেওয়া বন বিভাগের কিছু ভুল ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপই প্রধানত দায়ী। তবে এখনো সময় আছে এই বড় ভুলটি শুধরে নেওয়ার। আমরা যদি বন বা গাছকে শুধু কাঠ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করি, তবে কখনোই পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কাঠের বাণিজ্যিক চাহিদার চেয়ে আমাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে পরিবেশ, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণীদের খাদ্য ও আবাসস্থল নিশ্চিত করতে পারে—এমন নানা প্রজাতির দেশীয় গাছ রোপণ করা।

স্রেফ যেকোনো গাছ লাগালেই পরিবেশ বাঁচবে না, বরং সঠিক ও দেশি গাছ লাগাতে হবে। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের নতুন স্লোগান হওয়া উচিত: “দেশি গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান”

বাংলাদেশে রোপণকৃত ক্ষতিকর ও আগ্রাসী গাছের পূর্ণাঙ্গ তালিকা

পরিবেশগত প্রভাব এবং বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এই ক্ষতিকর উদ্ভিদগুলোকে নিচে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হলো:

১. তীব্র ক্ষতিকর ও উচ্চ আগ্রাসী উদ্ভিদ (High Alert Species)

এই উদ্ভিদগুলো আমাদের মাটির আর্দ্রতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং মানুষের স্বাস্থ্যের সরাসরি ক্ষতি করে:

  • ইউক্যালিপটাস (Eucalyptus camaldulensis): এটি অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি শোষণ করে চারপাশের মাটিকে শুষ্ক ও অনুর্বর করে ফেলে।
  • আকাশমণি বা একাশিয়া (Acacia auriculiformis): এর পরাগরেণু তীব্র ফুসফুসীয় অ্যালার্জি ও হাঁপানির (Asthma) সমস্যা তৈরি করে।
  • একাশিয়া হাইব্রিড (Acacia hybrid): ল্যাব-তৈরি এই হাইব্রিড জাতটি দেশীয় বনের বাস্তুসংস্থান খুব দ্রুত ধ্বংস করতে পারে।
  • পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus): এটি অত্যন্ত বিষাক্ত একটি আগাছা। এর স্পর্শে মানুষ ও গবাদি পশুর চর্মরোগ (Dermatitis) এবং শ্বাসকষ্ট হয়।
  • কচুরিপানা (Eichhornia crassipes): জলাশয়ের অক্সিজেন (Dissolved Oxygen) শুষে নিয়ে মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয় এবং নৌ-চলাচলে বাধা দেয়।

২. বনায়নে ব্যবহৃত ক্ষতিকর বিদেশি কাঠুরে বৃক্ষ (Invasive Timber Trees)

বাংলাদেশের ক্ষতিকর গাছের তালিকা

সামাজিক বনায়ন ও কাঠের চাহিদার নামে রোপণ করা হলেও এই গাছগুলো আমাদের স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের প্রধান শত্রু:

  • মেহগনি (Swietenia macrophylla): এর পাতা ও ফল বিষাক্ত হওয়ায় কোনো দেশীয় পাখি বা কীটপতঙ্গ এর ওপর নির্ভর করতে পারে না।
  • সেগুন (Tectona grandis): এই গাছের পাতা বিশাল হওয়ায় নিচে রোদ পড়ে না, ফলে বনের স্বাভাবিক লতাগুল্ম বা ঘাস জন্মাতে পারে না।
  • রেইনট্রি (Albizia saman / Samanea saman): এর নিচে অন্য কোনো ছোট উদ্ভিদ সহজে বাঁচে না এবং এর ডালপালা ঝড়ে খুব সহজে ভেঙে পড়ে।
  • শিশু গাছ (Dalbergia sissoo): অতিমাত্রায় একাকী চাষের (Monoculture) ফলে এটি মাটির পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে।
  • ইপিলইপিল (Leucaena leucocephala): এর অতিরিক্ত বীজ উৎপাদন ক্ষমতার কারণে এটি দেশীয় গাছকে হটিয়ে দ্রুত পুরো এলাকা দখল করে নেয়।
  • লম্বু গাছ (Khaya anthotheca): এটি খুব দ্রুত মাটির রস শুষে বড় হয়, যা চারপাশের অন্য গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
  • পাউলোনিয়া (Paulownia tomentosa): চড়া বাণিজ্যিক প্রচারণার এই গাছটি স্থানীয় মাটির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।

৩. পরিবেশগত ক্ষতিকর বাণিজ্যিক ও পাহাড়ি উদ্ভিদ (Commercial & Exotic Cultivations)

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পাহাড় কেটে বা বনাঞ্চল ধ্বংস করে চাষ করা এই গাছগুলো মাটির ক্ষয় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে:

  • তেল পাম (Elaeis guineensis): এর চাষে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয় এবং এটি মাটির নিচে গভীর জৈব স্তর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
  • রাবার গাছ (Hevea brasiliensis): রাবার বাগানগুলোতে কোনো প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম বা বন্যপ্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে উঠতে পারে না।
  • চা গাছ (Camellia sinensis): শুধু বাণিজ্যিক চাষের জন্য যখন প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও পাহাড় কেটে মাইলের পর মাইল মনোকালচার (একক চাষ) করা হয়, তখন তা মাটির চরম অবক্ষয় ঘটায়।
  • পাইন গাছ (Pinus spp.): এর ঝরে পড়া পাতা (Pine needles) মাটিকে অতিরিক্ত অম্লীয় (Acidic) করে তোলে, ফলে নিচে অন্য কোনো উদ্ভিদ জন্মায় না।
  • ম্যালালুকা (Melaleuca spp.): জলাভূমি বা নিচু এলাকার প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা জলজ পরিবেশকে এটি দ্রুত শুকিয়ে ফেলে।
  • স্যাফিয়ান (Sapium spp.): এটিও একটি বহিরাগত প্রজাতি যা দেশীয় উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে।

চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ বনের ক্ষতিকর গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ

প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানী ড. মো. আলী রেজা খান তার বিখ্যাত ‘বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ চিরসবুজ বনের বাস্তুসংস্থান ধ্বংসকারী কিছু অপকারী লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের তালিকা দিয়েছেন।[৪] এগুলো বনের স্বাভাবিক উদ্ভিদের বৃদ্ধি রুখে দিয়ে কৃত্রিম জঙ্গল তৈরি করছে:

  • চোতরা / ল্যান্টানা (Lantana camara): এটি অত্যন্ত আগ্রাসী একটি গুল্ম। এর ডালপালা এত ঘনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে দেশীয় উদ্ভিদের চারা আলো-বাতাস পায় না। এছাড়া এর পাতা গবাদি পশুর জন্য বিষাক্ত।
  • আসাম লতা / জার্মান লতা (Eupatorium odoratum / Chromolaena odorata): এটি খুব দ্রুত যেকোনো খোলা জায়গা বা বনের কাটা অংশ দখল করে নেয়। এর তীব্র আগ্রাসনের কারণে স্থানীয় ঔষধি ও ছোট গাছপালা সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে মারা যায়।
  • ভাঁট বা ঘেঁটু গাছ (Clerodendrum infortunatum): প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও অতিরিক্ত মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে এটি বনের নিচের স্তরের (Undergrowth) অন্যান্য বৈচিত্র্যময় লতাগুল্মের স্থান দখল করে নেয়।
  • দাঁতরাঙা / ফুটকি (Melastama প্রজাতিসমূহ): এই প্রজাতির গুল্মগুলো মাটির পুষ্টি দ্রুত শোষণ করে একচেটিয়া বংশবৃদ্ধি করে, যা বনের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলকে ব্যাহত করে।
  • ওসবেকিয়া (Osbeckia প্রজাতিসমূহ): চিরসবুজ বনের আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত স্থানে এই ভিনদেশি বা আগ্রাসী প্রজাতিগুলো ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় উদ্ভিদের চারা গজানোর পথ বন্ধ করে দেয়।

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও আগ্রাসী গাছের এই তালিকাটি একটি সংক্ষিপ্ত বা অসম্পূর্ণ রূপ মাত্র। গত চারশত বছরে এ দেশে আরও অসংখ্য প্রজাতির বহিরাগত ও ক্ষতিকর উদ্ভিদ প্রবেশ করেছে এবং প্রাকৃতিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে কচুরিপানা। দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের জলবায়ুর সাথে এটি কিছুটা মানিয়ে নিলেও, আমাদের নদী-নালা ও বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য এটি এখনো একটি বড় হুমকি। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি বছরই আমাদের অজান্তে এমন অনেক ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতি এ দেশের উদ্ভিদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। তাই এখন সময় এসেছে সচেতন হওয়ার; যেকোনো নতুন ভিনদেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বা বীজ এ দেশে আনার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।[৫]

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা (References)

১. ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের ক্ষয়ক্ষতি: ইত্তেফাক রিপোর্ট, “মহাসেনের আঘাতে নিহত ১৪, আশ্রয়হীন বহু মানুষ”, ১৭ মে, ২০১৩; দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা। আর্কাইভ লিংক: http://archive.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDVfMTdfMTNfMV8xXzFfNDEyNTM=
২. পরিবেশ ও রাজনীতি বিষয়ক তথ্য: ড. মাহবুবা নাসরীন, পরিবেশের রাজনীতি, ঢাকা।
৩. প্রকৃতি বিষয়ক লেখকের উক্তি: মোকারম হোসেন, “পরিবেশ: সামাজিক বৃক্ষের মৃত্যুপরোয়ানা”, দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ এপ্রিল ২০১৩। আর্কাইভ লিংক: http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2013-04-24/news/347203
৪. চিরসবুজ বনের ক্ষতিকর উদ্ভিদ তালিকা: ড. মো. আলী রেজা খান, বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী, ৩য় খণ্ড; বাংলা একাডেমি, ঢাকা, জানুয়ারি, ১৯৮৭; পৃষ্ঠা- ৭।
৫. নিবন্ধের উৎস ও আপডেট তথ্য: এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১ মে ২০১২ তারিখে ‘প্রাণকাকলি’ ব্লগে। পরবর্তীতে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পুনঃপ্রকাশ করা হয় এবং সর্বশেষ প্রয়োজনীয় তথ্যসহ এটি ০৫ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!