বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখি বলতে মূলত সেই সমস্ত পাখিদের তালিকা বোঝায়, যা একসময় এদেশের প্রকৃতিতে নিয়মিত দেখা যেত কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষকদের মতে, এই তালিকায় প্রায় ৩৯ প্রজাতির পাখি রয়েছে। কালের বিবর্তনে, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাখির অনেক প্রজাতিই আজ বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বিখ্যাত উদ্ভিদ ও প্রাণি জ্ঞানকোষ-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০ প্রজাতির পাখিকে বিলুপ্ত পাখির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এদেশে অতীতে যত পাখির প্রজাতি ছিল, তার মধ্যে একটি বিশেষ প্রজাতি—অর্থাৎ গোলাপি হাঁস (Pink-headed duck)—আজ সমগ্র পৃথিবী থেকেই চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া আরও ২৯ প্রজাতির পাখি অতীতে নিয়মিত বাংলাদেশে দেখা গেলেও, এখন আর এদেশের বুকে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই; যদিও তারা বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি এবং পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এখনও কোনোমতে টিকে আছে। তবে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, এই বিলুপ্ত ৩০ প্রজাতির পাখির সুনির্দিষ্ট কোনো নামের তালিকা উদ্ভিদ ও প্রাণি জ্ঞানকোষ-এ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করা খুবই সংগত হবে যে, আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (IUCN) রেড লিস্ট তথা দ্য আইইউসিএন রেড লিস্ট অব থ্রেটেনড স্পিসিস ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে যে গবেষণা প্রতিবেদন বা বই প্রকাশ করে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।[১]
বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এদেশের বুক থেকে প্রায় ৩০ প্রজাতির পাখি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে। তবে এর বাইরেও আরও কিছু পাখির প্রজাতি রয়েছে, যারা অতীতে এদেশের আকাশে ডানা মেললেও আজ আর তাদের দেখা মেলে না। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে অতীতে রেকর্ডকৃত পাখিদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে ৩০ প্রজাতির মূল তালিকার সাথে আরও ৯ প্রজাতির পাখিকে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে মোট ৩৯ প্রজাতির পাখিকে লেখক ও গবেষক অনুপ সাদি বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখির তালিকা হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত ও উল্লেখ করেছেন।
প্রকৃতি ও জলবায়ুর অনবরত পরিবর্তনের কারণে বন্যপ্রাণীদের এই পরিসংখ্যান সবসময় একরকম থাকে না। তাই পাঠকদের সুবিধার্থে এবং গবেষকদের রেফারেন্সের জন্য বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখির এই তালিকাটি নিচে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো। তবে বন্যপ্রাণী বিষয়ক নতুন নতুন গবেষণা, মাঠপর্যায়ের জরিপ এবং আধুনিক তথ্য-উপাত্ত প্রাপ্তির ওপর ভিত্তি করে এই তালিকাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি ভবিষ্যতে আরও বহুবার সংশোধন ও পরিমার্জনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের বিলুপ্ত ৩৯টি পাখির চূড়ান্ত তালিকা
নিচে গবেষক অনুপ সাদি কর্তৃক সংকলিত বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়া ৩৯টি পাখির বাংলা নাম, ইংরেজি নাম এবং বৈজ্ঞানিক নামসহ একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | পাখির বাংলা নাম | ইংরেজি নাম (English Name) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) |
|---|---|---|---|
| ০১ | বাদা তিতির | Swamp Francolin | Francolinus gularis |
| ০২ | মেটে তিতির | Grey Francolin | Francolinus pondicerianus |
| ০৩ | দেশি ময়ূর | Indian Peafowl | Pavo cristatus |
| ০৪ | সবুজ ময়ূর | Green Peafowl | Pavo muticus |
| ০৫ | বাদি হাঁস | White-winged Duck | Asarcornis scutulata |
| ০৬ | গোলাপি হাঁস | Pink-headed Duck | Rhodonessa caryophyllacea |
| ০৭ | ছোট নাটাবটের | Kurrichane Buttonquail | Turnix sylvaticus |
| ০৮ | দেশি মেটেধনেশ | Indian Grey Hornbill | Ocyceros birostris |
| ০৯ | মেটে মালকোআ | Sirkeer Malkoha | Taccocua leschenaultii |
| ১০ | মেটেমাথা টিয়া | Grey-headed Parakeet | Psittacula finchii |
| ১১ | বাংলা ডাহর | Bengal Florican | Houbaropsis bengalensis |
| ১২ | পাতি ডাহর | Lesser Florican | Sypheotides indicus |
| ১৩ | দেশি সারস | Sarus Crane | Antigone antigone |
| ১৪ | পাতি সারস | Common Crane | Grus grus |
| ১৫ | ডেমোজিল সারস | Demoiselle Crane | Grus virgo |
| ১৬ | খয়রা ঝিল্লি | Brown Bush-hen | Amaurornis akool |
| ১৭ | ধলা শকুন | Egyptian Vulture | Neophron percnopterus |
| ১৮ | হিমালয়ী গৃধিনী | Himalayan Vulture | Gyps himalayensis |
| ১৯ | সরুঠুঁটি শকুন | Slender-billed Vulture | Gyps tenuirostris |
| ২০ | কালা শকুন | Cinereous Vulture | Aegypius monachus |
| ২১ | রাজ শকুন | Red-headed Vulture | Sarcogyps calvus |
| ২২ | ধলাপেট বক | White-bellied Heron | Ardea insignis |
| ২৩ | কালা কাস্তেচরা | Red-naped Ibis | Pseudibis papillosa |
| ২৪ | বড়ধলা গগণবেড় | Great White Pelican | Pelecanus onocrotalus |
| ২৫ | চিতিঠুঁটি গগণবেড় | Spot-billed Pelican | Pelecanus philippensis |
| ২৬ | কালাগলা মানিকজোড় | Black-necked Stork | Ephippiorhynchus asiaticus |
| ২৭ | বড় মদনটাক | Greater Adjutant | Leptoptilos dubius |
| ২৮ | ল্যাঞ্জা মোটাঠুঁটি | Long-tailed Broadbill | Psarisomus dalhousiae |
| ২৯ | তামাপিঠ লাটোরা | Bay-backed Shrike | Lanius vittatus |
| ৩০ | দাগিলেজ গাছআঁচড়া | Bar-tailed Treecreeper | Certhia himalayana |
| ৩১ | লালতলা প্রিনা | Rufous-vented Prinia | Laticilla burnesii |
| ৩২ | শতদাগি ঘাসপাখি | Bristled Grassbird | Chaetornis striata |
| ৩৩ | বাদা ছাতারে | Marsh Babbler | Pellorneum palustre |
| ৩৪ | লালমুখ দাগিডানা | Rusty-fronted Barwing | Actinodura egertoni |
| ৩৫ | কালাবুক টিয়াঠুঁটি | Black-breasted Parrotbill | Paradoxornis flavirostris |
| ৩৬ | তিলাবুক টিয়াঠুঁটি | Spot-breasted Parrotbill | Paradoxornis guttaticollis |
| ৩৭ | লাললেজ মৌটুসি | Fire-tailed Sunbird | Aethopyga ignicauda |
| ৩৮ | লম্বাঠোঁট তুলিকা | Long-billed Pipit | Anthus similis |
| ৩৯ | গেছো তুলিকা | Tree Pipit | Anthus trivialis |
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে ৩৯ প্রজাতির পাখির এই অন্তর্ধান কেবল জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য একটি বড় ধরনের সংকেত। বন্যপ্রাণী ও পাখিদের এই বিলুপ্তির পেছনে নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস, জলাশয় ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চোরাশিকারের মতো মানবসৃষ্ট কারণগুলোই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। অতীতের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আজ কেবল খাতা-কলমে বা তালিকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সমস্ত বিপন্ন বা সংকটাপন্ন বন্যপ্রাণী ও পাখির প্রজাতি এখনও টিকে রয়েছে, তাদের সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদদের রক্ষায় বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী নিধন রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা আমাদের পরিবেশকে আরও একবার সুন্দর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারি।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখির তালিকা: ৩৯টি হারিয়ে যাওয়া পাখির ইতিহাস
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের সম্পূর্ণ তালিকা
- বাংলাদেশে ক্ষতিকর বিদেশি গাছ: বনায়নের নামে পরিবেশের চরম বিপর্যয়!
- বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা: ১৪৭টি প্রজাতির সম্পূর্ণ গাইড
- বাংলাদেশের পাখির তালিকা: ৭০০+ প্রজাতির বিস্তারিত নাম
- বাংলাদেশের দেড় শতাধিক আন্তঃসীমান্ত নদীর তালিকা
- বাংলাদেশের সবগুলো নদনদী হচ্ছে ১২০০-এর অধিক নদ নদীর নামের তালিকা
- বাংলাদেশের স্বাদুপানির মাছের তালিকা
- বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর তালিকা
- বাংলাদেশের সাপের তালিকা হচ্ছে ৭টি পরিবারে ৪৬টি গণে মোট ৯৪টি প্রজাতি
- বাংলাদেশের গিরগিটি, টিকটিকি, তক্ষক, অঞ্জন, আচিল ও গুইয়ের তালিকা
- বাংলাদেশের ব্যাঙ বা ব্যাঙের তালিকা হচ্ছে ৬টি পরিবারে অন্তর্ভুক্ত ৪০ প্রজাতির ব্যাঙ
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ১৯৯ প্রজাতির উভচর ও সরীসৃপের তালিকা
- বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদ বা ভেষজ উদ্ভিদের ৭০০ প্রজাতির একটি পরিপূর্ণ তালিকা
- A full Checklist of the Medicinal Plants of Bangladesh
- Diversity of the Medicinal Plants of Bangladesh.
- Diversity of the numerous Fruit Plants of Bangladesh
- বাংলাদেশের রক্ষিত উদ্ভিদ হচ্ছে আইনানুসারে সংরক্ষিত ৫৪টি প্রজাতি
- A Full Checklist of the Butterflies of Bangladesh
- বাংলাদেশের বিলুপ্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা
- A full checklist of the 795 species of Birds of Bangladesh
- The protected fishes of Bangladesh
- বাংলাদেশের সংরক্ষিত মাছ-এর তালিকা
- বাংলাদেশের পাউবো নির্ধারিত ৪০৫টি নদনদীর নামের তালিকা
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. আইইউসিএন রেড লিস্ট (IUCN Red List): এই নিবন্ধে উল্লিখিত বাংলাদেশ থেকে পাখির বিলুপ্তির পরিসংখ্যানটি মূলত ২০১৫ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (International Union for Conservation of Nature), বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস কর্তৃক প্রণীত গবেষণা গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য দেখুন— এনাম উল হক (প্রধান মূল্যায়নকারী), রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৩: বার্ডস, আইইউসিএন বাংলাদেশ, ২০১৫, পৃষ্ঠা নং- ৩২।
২. প্রকাশের ইতিহাস ও সংস্করণ: পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিলুপ্ত পাখির এই বিশেষ তালিকাটি সর্বপ্রথম ২ এপ্রিল ২০১২ তারিখে ‘প্রাণকাকলি ব্লগে’ অনলাইনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ২২ জুন ২০১৮ তারিখে একটি বর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ হিসেবে এটি ‘রোদ্দুরে.কম’ (Roddure.com) ওয়েবসাইটে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর, বন্যপ্রাণী বিষয়ক নতুন তথ্য-উপাত্তের আলোকে আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তালিকাটি পুনরায় নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা, সংস্করণ ও আধুনিকায়ন করা হলো।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।