দেশি আমড়ার বৈজ্ঞানিক নাম, বৈশিষ্ট্য ও নানা অজানা তথ্য

দেশি আমড়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Spondias pinnata) অ্যানাকার্ডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের স্পনডিয়াস গণের একটি চমৎকার ফলদ বৃক্ষ। বাংলাদেশে পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলদায়ী গাছটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। টক-মিষ্টি স্বাদের দেশি আমড়া শুধু কাঁচা খাওয়ার জন্যই নয়, বরং মুখরোচক আচার, চাটনি এবং বিভিন্ন রান্নায় তরকারি হিসেবেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ দেশি আমড়া গাছ সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে দেখা যায়। এর পাতার গঠন বেশ চমৎকার। একটি প্রধান ডাঁটায় সমান্তরালভাবে কয়েক জোড়া পাতা থাকে এবং ডাঁটার ঠিক মাথায় একটি একক পাতা থাকে। অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিক থেকেই এই গাছের পাতা ঝরতে শুরু করে এবং শীতকালে গাছটি সম্পূর্ণ পত্রহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মাঘ ও ফাল্গুন মাসে ন্যাড়া গাছে নতুন মুকুল বা ফুল আসে এবং এরপর ফল ধরে। কচি অবস্থায় আমড়া ফলের ভেতরের বীজ বা আঁটি বেশ নরম থাকে। তবে ফলটি যত পুষ্ট হতে থাকে, এর ভেতরের আঁটি তত বেশি শক্ত হয়ে যায়। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের মধ্যেই ফল সম্পূর্ণ পেকে যায়। পাকা আমড়া থেকে একটি মিষ্টি ও চমৎকার সুগন্ধ বের হয়।

দেশি আমড়ার জীববৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও শ্রেণীবিন্যাস

  • বাংলা নাম: দেশি আমড়া, আমড়া, পিয়াল পিয়ালা।
  • আঞ্চলিক ও উপজাতি নাম: থুরা (মগ), আম্বি-থং (গারো)।
  • প্রতিবেশী দেশ ভারতের উড়িষ্যায় অঞ্চলভেদে এই ফলটি ‘আমজ’ নামে সুপরিচিত।
  • সাধারণ নাম (English Name): Hog Plum.
  • বৈজ্ঞানিক নাম: Spondias pinnata (L. f.) Kurz.
  • সমনাম (Synonyms): Mangifera pinnata L. f., Spondias mangifera Willd.

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস

ধাপ (Rank)শ্রেণিবিন্যাস (Classification)
জগৎ/রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ)
বিভাগ (Division)Angiosperms (গুপ্তজীবী)
শ্রেণী (Unranked)Eudicots
উপশ্রেণী (Unranked)Rosids
বর্গ (Order)Sapindales
পরিবার (Family)Anacardiaceae
গণ (Genus)Spondias
প্রজাতি (Species)Spondias pinnata

বাংলাদেশে প্রাপ্ত আমড়ার প্রজাতিসমূহ

আমাদের বাংলাদেশে মূলত তিন ধরনের আমড়া প্রজাতি দেখতে পাওয়া যায়:
১. দেশি আমড়া
২. বিলাতি আমড়া
৩. লাল আমড়া (যার বৈজ্ঞানিক নাম: Spondias purpurea)

নামকরণের ইতিহাস ও ব্যুৎপত্তি (Etymology)

  • আমড়া শব্দের উৎপত্তি: অমরকোষের টীকা অনুযায়ী, ‘আম্র = আ + অতীত’। অর্থাৎ, এই ফলটি আম বা আম্ররসের ঈষৎ (সামান্য) স্বাদ ও গন্ধ অনুসরণ করে বলেই এর নাম হয়েছে আমড়া।
  • চরকীয় সম্প্রদায়ের দেওয়া নাম ‘কপীতন’: প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রের চরকীয় সম্প্রদায় এই ফলটির আরেকটি নাম রেখেছেন ‘কপীতন’। সংস্কৃত ব্যাখ্যা অনুযায়ী—“কপীনাং ইং লক্ষ্মীং তনোতি”, যার অর্থ এটি কপিকুল বা বানরদের লক্ষ্মী (কল্যাণ) বৃদ্ধি করে।
  • বানর ও আমড়া গাছের সম্পর্ক: প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, বানরেরা শিশু প্রসবের জন্য আমড়া গাছকে সবচেয়ে নিরাপদ বা শ্রেষ্ঠ আঁতুড়ঘর মনে করে ছুটে যায়। এছাড়া আমড়া গাছের পাতা বানরদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য এবং ভেষজ পথ্য হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ ভূমিকার কারণেই প্রাচীন ঋষিরা এর নাম রেখেছিলেন ‘কপীতন’।

আমড়া গাছ ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত উচু হতে দেখা যায়। একটি ডাঁটায় সমান্তরালভাবে কয়েক জোড়া পাতা ও ডাঁটার আগায় ১টি পাতা থাকে। অগ্রহায়ণের শেষ থেকেই পাতা ঝরতে শুরু করে, তারপর মাঘ-ফাল্গুনে গাছে মুকুল হয়, তারপর ফল; কচি অবস্থায় ফলের বীজ নরম থাকে, পরে পুষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁটি শক্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রায় সব স্থানে এটি পাওয়া যায়, অনেকে বেড়ার ধারে এটাকে লাগিয়ে রাখেন। কার্তিক-অগ্রহায়ণেই ফল পেকে যায়, পাকা আমড়ার একটি চমৎকার গন্ধ আছে। উড়িষ্যায় অঞ্চল বিশেষে আমজ নামে প্রচলিত। বাংলাদেশে প্রাপ্ত তিন প্রজাতির আমড়া হচ্ছে দেশি আমড়া (বোটানিকাল নাম: Spondias pinnata (L. f.) Kurz),  বিলাতি আমড়ালাল আমড়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Spondias purpurea).

ব্যুৎপত্তি: আম্র=আ+অতীত অর্থাৎ আম্ররসের ঈষৎ অনুসরণ করে (অমরকোষ টীকা)। এই চরকীয় সম্প্রদায় এই ফলটির আর একটি নাম রেখেছেন ‘কপীতন’। কপীনাং ইং লক্ষ্মীং তনোতি অর্থাৎ কপিকুলের লক্ষ্মী বৃদ্ধি করে; নিকটে আমড়া গাছ পেলে কপিগৃহিণী অর্থাৎ বানরী ছুটে যায় শিশুপ্রসবের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অতুর ঘর করতে, এর পাতা বানরের খুব প্রিয় খাদ্য কিংবা পথ্য; তাঁর এই ভূমিকা দেখে এই ভেষজটির উপরিউক্ত নামটি রেখেছেন।

দেশি আমড়া গাছের বিস্তারিত উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিবরণ

দেশি আমড়া মূলত একটি সুগন্ধযুক্ত পর্ণমোচী (বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পাতা ঝরে যাওয়া) উদ্ভিদ। এর পাতা, ডালপালা এবং পল্লব থেকে এক ধরনের চমৎকার সুবাস বের হয়। এটি সাধারণত মসৃণ ত্বকের মাঝারি থেকে বৃহৎ আকৃতির একটি ফলদ বৃক্ষ। নিচে এর বিভিন্ন অংশের বিস্তারিত ও নিখুঁত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. কাণ্ড, বাকল ও ব্লেজ

  • বাহ্যিক গঠন: আমড়া গাছের প্রধান কাণ্ডটি বেশ শক্ত ও মজবুত হয়। এর বাকল বা চামড়া সাধারণত ধূসর এবং মসৃণ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • ফাটল ও কুঞ্চন: বয়স্ক গাছের বাকলে সমান্তরাল কুঞ্চন এবং লম্বালম্বি সরু ফাটল লক্ষ্য করা যায়।
  • ব্লেজ: বাকল কাটলে বা এর ভেতরের স্তরে (Blaze) আকর্ষণীয় লালচে বাদামি রঙ দেখা যায়।

২. পাতা ও ডালপালার বৈশিষ্ট্য

  • পাতার বিন্যাস: এর পাতাগুলো বিষমপক্ষল (Imparipinnate) এবং প্রশাখার শেষ প্রান্তে গুচ্ছ আকারে বা সাজানো অবস্থায় থাকে। সম্পূর্ণ পাতাটি লম্বায় প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
  • পত্রকের গঠন ও আকার: প্রতিটি পাতায় সাধারণত ৯ থেকে ১৩ জোড়া পত্রক থাকে। এই পত্রকগুলো ৫-২৫ সেমি লম্বা এবং ২.৫-১০.০ সেমি চওড়া হয়।
  • দৃশ্যমানতা: পত্রকগুলো উপবৃত্তাকার-আয়তাকার, দীর্ঘাগ্র (আগা সুচালো) এবং অখণ্ড প্রকৃতির হয়। এগুলো ঝিল্লিময় এবং উপরিভাগ উজ্জ্বল চকচকে দেখায়। পাতার ভেতরের ইন্ট্রা-মার্জিনাল জালিকা (Veins) খুব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে।
  • রং পরিবর্তন: শরৎ বা শীতকালে পাতা ঝরে যাওয়ার ঠিক আগে এগুলো গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে, যা দেখতে বেশ চমৎকার লাগে।

৩. পুষ্পবিন্যাস ও ফুলের গঠন

  • পুষ্পবিন্যাস: ডালের প্রান্তভাগে বা পাতার কাক্ষিক অংশ থেকে ১৪-২৮ সেন্টিমিটার দীর্ঘ যৌগিক মঞ্জরীর মাধ্যমে ফুল ফোটে।
  • ফুলের ধরন ও সুবাস: ফুলগুলো উভলিঙ্গ ও মিশ্রবাসী হয়ে থাকে। প্রতিটি ফুল আড়াআড়িভাবে প্রায় ৫ মিলিমিটার আকৃতির, অর্ধবৃন্তক (ছোট বোঁটাযুক্ত) এবং হলুদাভ-সবুজ রঙের হয়। ফুল ফোটার সময় চারপাশে মিষ্টি সুবাস ছড়ায়।
  • অভ্যন্তরীণ অংশ: ফুলের বৃতি অংশটি হালকা রোমশ। দলসমূহ ২.০ × ১.০ মিলিমিটার আকারের এবং মসৃণ হয়। পুংকেশর ১.৫-২.০ মিলিমিটার দীর্ঘ এবং এর ফলকের ব্যাস ১ মিলিমিটার, যা গভীরভাবে ৫-খণ্ডে বিভক্ত, স্থুলাকৃতি ও সরস প্রকৃতির হয়।
  • গর্ভাশয়: গর্ভাশয়টি অবৃন্তক, যার ব্যাস ২.০-২.৫ মিলিমিটার। এটি বি-শাঙ্কব ও গোলাকার আকৃতির হয়। এর গর্ভদণ্ড খর্ব (ছোট) এবং গর্ভমুণ্ড মুণ্ডাকার হয়ে থাকে।

৪. ফল ও পরিপক্কতা

  • আকার ও আকৃতি: আমড়া ফল সাধারণত ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়। এটি ডুপ (Drupe) জাতীয় এবং দেখতে ডিম্বাকার বা ওভাল শেপের হয়ে থাকে।
  • রঙের পরিবর্তন: কাঁচা অবস্থায় ফলটি গাঢ় সবুজ থাকলেও পরিপক্ক ও পাকার সময়ে এটি আকর্ষণীয় সবুজাভ-হলুদ রঙ ধারণ করে। এর ভেতরের অংশটি টক-মিষ্টি ও রসালো হয়।

৫. ফুল ও ফল ধারণের সময়কাল

  • আমাদের দেশে আবহাওয়ার ভিত্তিতে দেশি আমড়া গাছে সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ফুল ফোটে এবং ফল পরিপক্ক হয়। মূলত বর্ষাকালে এই ফল বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

দেশি আমড়ার কোষতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও ক্রোমোসোম সংখ্যা

গবেষক কুমার এবং সুব্রামনিয়াম (১৯৮৬)-এর উদ্ভিদবৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুসারে, দেশি আমড়ার সাইটোলজিক্যাল বা কোষতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিচে দেওয়া হলো:

  • ক্রোমোসোম সংখ্যা (Chromosome Number): (2n = 32)[১]

দেশি আমড়ার চাষাবাদ, আবাসস্থল ও বংশবিস্তার

দেশি আমড়া বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ফলদ গাছ। এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও বাস্তু এলাকা

দেশি আমড়া গাছ মূলত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। আমাদের দেশে প্রধানত তিন ধরনের এলাকায় এই গাছ বেশি দেখা যায়:

  • বসতবাড়ির চারপাশ (বাস্তু এলাকা): গ্রামীণ এলাকার বাড়িঘরের আশেপাশে বা পতিত জমিতে এই গাছ প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে এবং চাষ করা হয়।
  • পাহাড়ী বনভূমি: পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী বনাঞ্চলে দেশি আমড়ার প্রাকৃতিক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
  • শাল বনভূমি: গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের শাল বনের শুষ্ক ও পর্ণমোচী পরিবেশেও এই গাছ সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।

২. বংশবিস্তার পদ্ধতি

  • বীজ দ্বারা বংশবিস্তার: দেশি আমড়ার প্রধান ও অন্যতম প্রাকৃতিক বংশবিস্তার মাধ্যম হলো এর বীজ। পরিপক্ক ও পাকা আমড়ার আঁটি বা বীজ মাটিতে রোপণ করে সহজেই নতুন চারা তৈরি করা যায়। (তবে বর্তমানে দ্রুত ফলন পাওয়ার জন্য অনেকে কাটিং বা গ্রাফটিং পদ্ধতিও ব্যবহার করছেন)।

দেশি আমড়ার ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও প্রাপ্তিস্থান

দেশি আমড়া মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আদি ফলদ বৃক্ষ। নিচে এর বৈশ্বিক এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিস্তৃতির বিবরণ দেওয়া হলো:

১. আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক বিস্তৃতি

  • মূল আবাসস্থল: প্রাকৃতিকভাবে এই গাছটি প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং মিয়ানমারে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।

২. বাংলাদেশে প্রাপ্তিস্থান ও বিস্তৃতি

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি আমড়া চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশের নির্দিষ্ট কিছু বনাঞ্চল এবং সর্বত্রই এই গাছটি কম-বেশি দেখা যায়:

  • প্রধান অঞ্চলসমূহ: আমাদের দেশে প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং দিনাজপুর জেলায় এই গাছ প্রাকৃতিকভাবে ও বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর পরিমাণে জন্মে।
  • গ্রামীণ পরিবেশ: নির্দিষ্ট জেলা ছাড়াও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলার গ্রামীণ এলাকার ঝোপঝাড় (গুল্মঝোপ) এবং পুরনো আমবাগানের (আম্রকুঞ্জ) আশেপাশে প্রাকৃতিকভাবেই দেশি আমড়া গাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়।

দেশি আমড়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও নানাবিধ ব্যবহার

দেশি আমড়া কেবল একটি সুস্বাদু ফলই নয়, এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ব্যবহার অত্যন্ত বহুমুখী। ফল থেকে শুরু করে এর কাঠ পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্পে অবদান রাখে। নিচে এর মূল ব্যবহারগুলো তুলে ধরা হলো:

১. খাদ্য ও পুষ্টি হিসেবে ব্যবহার

  • স্বাদ ও সুগন্ধ: পাকা আমড়া মূলত টক-মিষ্টি (অম্লীয়) ও হালকা কষযুক্ত স্বাদের হয়। এর চমৎকার সুগন্ধ মানুষের মুখে রুচি বাড়াতে সাহায্য করে।
  • রান্না ও আচার: কাঁচা ও পাকা দেশি আমড়া দিয়ে অত্যন্ত মুখরোচক আচার ও চাটনি তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন তরকারিতে টক বা বিশেষ সুগন্ধি যুক্ত করতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

২. বন্যপ্রাণীর খাদ্য উৎস

  • প্রাণীজগতে গুরুত্ব: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও এই গাছের ভূমিকা রয়েছে। বনের বারকিং ডিয়ার (Barking Deer) বা মায়া হরিণ এই ফল খেতে অত্যন্ত পছন্দ করে। তাই বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই গাছ গুরুত্বপূর্ণ।

৩. কাঠ শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

দেশি আমড়া গাছের কাঠ বাণিজ্যিকভাবে বেশ কিছু হালকা শিল্পে ব্যবহৃত হয়:

  • কাঠের ধরন: এর কাঠ সাধারণত সাদাটে রঙের, বেশ হালকা এবং নরম প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • প্যাকিং কেস: হালকা ও নরম হওয়ার কারণে বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের জন্য ‘লাইট প্যাকিং কেস’ বা কাঠের বাক্স তৈরিতে এটি বেশ উপযোগী।
  • দিয়াশলাই শিল্প: এই কাঠ দিয়াশলাইয়ের কাঠি (স্প্লিন্ট) এবং দিয়াশলাইয়ের বাক্স (Matchbox) তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

দেশি আমড়ার বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ষ্ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) দেশি আমড়া প্রজাতির বর্তমান অবস্থা, হুমকি এবং সংরক্ষণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. হুমকির মাত্রা ও বর্তমান অবস্থা

  • হুমকির বিবরণ: বিশ্বব্যাপী বা প্রাকৃতিকভাবে এই প্রজাতিটির বিলুপ্তির হুমকির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি।
  • আইইউসিএন (IUCN) স্ট্যাটাস: বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে দেশি আমড়াকে আশঙ্কামুক্ত (Least Concern – LC) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

২. বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি ও সংরক্ষণ উদ্যোগ

  • ধীরে ধীরে বিলুপ্তি: যদিও এটি আশঙ্কামুক্ত ক্যাটাগরিতে রয়েছে, তবুও গ্রামীণ বন উজাড় হওয়ার কারণে বাংলাদেশে এই গাছটি আগের তুলনায় ধীরে ধীরে হ্রাস বা বিলুপ্ত পাচ্ছে।
  • প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ: এই ফলের জিনপ্লাজম বা প্রজাতিটি ধরে রাখতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (BAU) তাদের নিজস্ব চত্বরে ও জার্মপ্লাজম সেন্টারে এই গাছ সংরক্ষণ করছে।

৩. ভবিষ্যৎ সুপারিশ

  • জ্ঞানকোষের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি যেহেতু এখনো প্রকৃতিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে, তাই এটি টিকিয়ে রাখার জন্য এই মুহূর্তে জরুরি বা আশু কোনো কঠোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন নেই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলো এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।[২]

উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, দেশি আমড়া কেবল আমাদের মুখের রুচি ও পুষ্টির জোগান দেয় না, বরং এর কাঠ ও ভেষজ গুণাগুণ দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই প্রজাতিটি আশঙ্কামুক্ত, তবুও এর ক্রমহ্রাসমান অবস্থা রোধে আমাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মুখরোচক আচারের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে বসতবাড়ির আশেপাশে বেশি করে দেশি আমড়া গাছ রোপণ করা এখন সময়ের দাবি।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: দেশি আমড়ার বৈজ্ঞানিক নাম কী?

উত্তর: দেশি আমড়ার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Spondias pinnata। এটি অ্যানাকার্ডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি ফলদ বৃক্ষ।
প্রশ্ন ২: বাংলাদেশে সাধারণত কত প্রজাতির আমড়া পাওয়া যায়?
উত্তর: বাংলাদেশে মূলত তিন প্রজাতির আমড়া দেখা যায়; এগুলো হলো—দেশি আমড়া, বিলাতি আমড়া এবং লাল আমড়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Spondias purpurea)।
প্রশ্ন ৩: আমড়া গাছকে প্রাচীন শাস্ত্রে ‘কপীতন’ বলা হতো কেন?
উত্তর: চরকীয় সম্প্রদায়ের মতে, আমড়া গাছের পাতা বানর বা কপিকুলের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য ও ভেষজ পথ্য। এছাড়া বানরীরা শিশু প্রসবের জন্য এই গাছকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে বলে একে ‘কপীতন’ বা বানরদের লক্ষ্মী বলা হতো।
প্রশ্ন ৪: দেশি আমড়া গাছের কাঠ কোন কোন শিল্পে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: দেশি আমড়ার কাঠ হালকা, নরম ও সাদাটে হওয়ায় এটি মূলত পণ্য পরিবহনের হালকা প্যাকিং কেস (কাঠের বাক্স), দিয়াশলাইয়ের কাঠি (স্প্লিন্ট) এবং ম্যাচবক্স তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. Kumar, V. and Subramaniam, B. (1986).Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol. 1: Dicotyledons. Calcutta: Botanical Survey of India. p. 464.
২. হোসেন, মোহাম্মদ কামাল (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”। আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান (সম্পাদনা)। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ম সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ১২৭-১২৮। আইএসবিএন 984-30000-0286-0।
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০৫ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!