বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে তিতির এক অত্যন্ত পরিচিত ও সুন্দর পাখি। এরা মূলত ফাসিয়ানিডি (Phasianidae) পরিবার বা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে একসময় প্রাকৃতিকভাবে Francolinus গণের ৩ প্রজাতির তিতির দেখা যেত। যদিও বর্তমানে আবসস্থল ধ্বংস ও শিকারের কারণে এদের অধিকাংশই অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।
আজকের এই ব্লগে আমরা বাংলাদেশের সেই তিন প্রজাতির তিতির— কালা তিতির, মেটে তিতির এবং বাদা তিতির সম্পর্কে সংক্ষেপে জানব।
কালা তিতির (Black Francolin)
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের, বিশেষ করে পঞ্চগড় এলাকার মানুষের কাছে এটি ‘শেখ ফরিদ’ নামে পরিচিত। পুরুষ কালা তিতির দেখতে অত্যন্ত নজরকাড়া; এর কুচকুচে কালো গায়ের ওপর ধবধবে সাদা ফুটকি এবং গলায় তামাটে রঙের বলয় থাকে।
- বৈজ্ঞানিক নাম: Francolinus francolinus
- বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশে এটি বর্তমানে মহাবিপন্ন।
- প্রধান বিচরণস্থল: উত্তরবঙ্গের ঝোপঝাড় ও ঘাসবন।
👉 বিস্তারিত পড়ুন: কালা তিতির বা শেখ ফরিদ: বাংলাদেশের এক মহাবিপন্ন পাখি
মেটে তিতির (Grey Francolin)
মেটে তিতির মূলত ধূসর বাদামি রঙের একটি চঞ্চল পাখি। এদের গলার চারপাশে একটি সূক্ষ্ম কালো রেখা থাকে যা দেখতে মালার মতো মনে হয়। একসময় ঢাকা বিভাগের তৃণভূমিতে এদের প্রচুর দেখা মিললেও এখন এটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে।
- বৈজ্ঞানিক নাম: Ortygornis pondicerianus
- বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশে এটি অপ্রতুল-তথ্য (Data Deficient) শ্রেণিতে রয়েছে।
- প্রধান বিচরণস্থল: শুষ্ক তৃণভূমি এবং ঝোপঝাড়।
👉 বিস্তারিত পড়ুন: মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা
বাদা তিতির (Swamp Francolin)
বাদা তিতির বা জলার তিতির মূলত জলাভূমি সংলগ্ন এলাকার পাখি। অন্যান্য তিতিরের তুলনায় এরা আকারে কিছুটা বড় ও হৃষ্টপুষ্ট হয়। এদের গলার উজ্জ্বল কমলা রঙ এদেরকে সহজেই আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে।
- বৈজ্ঞানিক নাম: Ortygornis gularis
- বর্তমান অবস্থা: বিশ্বে সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপন্ন।
- প্রধান বিচরণস্থল: জলাশয়ের ধারের নলবন ও লম্বা ঘাসবন।
👉 বিস্তারিত পড়ুন: বাদা তিতির: বাংলাদেশের জলার তিতির ও এর জীবন বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে তিতির পাখির বর্তমান অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মেটে তিতির এবং বাদা তিতির এখন বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিলুপ্ত। কেবল কালা তিতিরকে উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় টিকে থাকতে দেখা যায়। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী এই তিনটি প্রজাতিই সংরক্ষিত। এই পাখিগুলো শিকার করা বা এদের আবাসস্থল নষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এই সুন্দর পাখিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
বোনাস তথ্য: পাহাড়ি বাঁশবনের তিতির
উপরের তিন প্রজাতির বাইরেও বাংলাদেশে আরও এক ধরণের তিতির সাদৃশ্য পাখি দেখা যায়, যা মূলত কোয়েল গোত্রের। এর নাম পাহাড়ি বাঁশবনের তিতির।
👉 বিস্তারিত জানুন: পাহাড়ি বাঁশবনের তিতির: লাজুক এই পাখির জীবনচক্র ও বৈশিষ্ট্য
আরো পড়ুন
🌿 বোনাস: বাংলাদেশের সব পাখির নাম জানতে আমাদের এই ৭০০+ পাখির তালিকাটি ঘুরে দেখুন! 🦜
- ছোট মদনটাক পাখি: সুন্দরবনের বিরল বাসিন্দা ও এর জীবনবৃত্তান্ত
- বড় মদনটাক বা হাড়গিলা পাখি: বিলুপ্তির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
- এশীয় শামখোল বা শামুকখোল পাখি: বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও প্রজনন কলোনি
- বাংলাদেশের তিতির পাখি: তিন প্রজাতির তিতিরের বিস্তারিত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
- বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁয়ের মদনটাক কলোনিতে পাখিরা আর আসে না
- চামচঠুঁটো বাটান বিশ্বে মহাবিপন্ন ও বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি
- মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা | Grey Francolin
- বাদা তিতির: বাংলাদেশের জলার তিতির ও এর জীবন বৈশিষ্ট্য | Swamp Francolin
- কালা তিতির বা শেখ ফরিদ: বাংলাদেশের এক মহাবিপন্ন পাখি | Black Francolin
- এক দিনে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ে এগারটি হিমালয়ী শকুন উদ্ধার
- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টার তিন বছরের অভিজ্ঞতা
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।