ভূমিকা: গোয়ালিয়া লতা (বৈজ্ঞানিক নাম: Ampelocissus latifolia) বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় জন্মে। এর পাতা, মূলে নানা ভেষজ গুণ আছে। এছাড়াও এর ফল অনেকে খায়।
| বিষয়ের নাম | বিবরণ ও তথ্য |
|---|---|
| অফিসিয়াল বৈজ্ঞানিক নাম | Ampelocissus latifolia (Roxb.) Planch. |
| প্রথম প্রকাশ ও সাইটেশন | J. Vigne. Amer.: 374 (১৮৮৪ সাল) |
| উদ্ভিদের সমনাম (Synonyms) | • Vitis latifolia Roxb. (১৮৩২) • Vitis montana Lawson (১৮৭৫) |
| আন্তর্জাতিক ইংরেজি নাম | Jungle grape vine (জঙ্গল গ্রেপ ভাইন) |
| স্থানীয় বা প্রচলিত নাম | গোয়ালিয়া লতা, গোভিলা, পেরিবেল |
গোয়ালিয়া লতা-এর বর্ণনা:
গোয়ালিয়া লতা মূলত একটি বৃহৎ ও আরোহী প্রকৃতির লতানো বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এটি একটি বহুবর্ষজীবী গাছ, যা শক্তিশালী মৌল কাণ্ডের ওপর ভর করে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে।
- কাণ্ডের রূপ: এই লতাটির ভেতরের কাণ্ডটি ফাঁপা এবং এর গায়ে স্পষ্ট রেখা লক্ষ্য করা যায়। তবে কাণ্ডের উপরিভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ ও রোমহীন প্রকৃতির হয়।
- আকর্ষী বা আঁকড়ে ধরার অঙ্গ: এর মঞ্জরীদণ্ড থেকে দুটি শাখান্বিত সরু আকর্ষী (Tendrils) বের হয়, যা গাছটিকে অন্য কোনো অবলম্বনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে ওপরের দিকে আরোহণ করতে সাহায্য করে।
পাতার আকার ও গঠন
গাছটির পাতাগুলোর গঠন বেশ চওড়া এবং আকর্ষণীয় হয়ে থাকে:
- আকৃতি ও সাইজ: পাতাগুলো দেখতে প্রশস্ত বর্তুলাকার থেকে হৃৎপিণ্ডাকার এবং অগভীরভাবে খণ্ডিত হয়। পরিমাপের দিক থেকে এগুলো প্রায় ৬-২০ সেমি লম্বা এবং ৪-১৫ সেমি চওড়া হতে পারে।
- প্রান্ত ও শিরা: পাতার চারপাশের প্রান্তভাগ করাতের দাঁতের মতো (করাতদস্তুর) খাঁজকাটা থাকে। পাতাগুলো পাতলা ঝিল্লিময় ও সম্পূর্ণ রোমহীন হয় এবং এতে ৫ থেকে ৭টি প্রধান শিরা স্পষ্ট দেখা যায়।
- পত্রবৃন্ত বা বোঁটা: পাতা ধরে রাখার বোঁটাটি বেশ লম্বা হয়, যা সর্বোচ্চ ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। এই বৃন্তটি দেখতে বেলনাকার বা নলাকার এবং সম্পূর্ণ মসৃণ বা রোমহীন।
পুষ্পবিন্যাস ও ফুলের বৈশিষ্ট্য
গোয়ালিয়া লতার পুষ্পবিন্যাসটি সাইম প্যানিকল (Cyme Panicle) পদ্ধতিতে বেশ ঘন বা ঠাসা অবস্থায় সাজানো থাকে। এর মঞ্জরীদণ্ডটি সাধারণত ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।
- ফুলের রূপ: এর ফুলগুলো আকারে বেশ ক্ষুদ্র এবং ৫-অংশক (৫টি পাপড়ি বা অংশযুক্ত) বিশিষ্ট হয়। ফুলগুলো মূলত মিশ্রবাসী প্রকৃতির।
- রঙ ও পাপড়ি: ফুলগুলোর রঙ চমৎকার লালাভ-বাদামী হয়ে থাকে। এর বৃতি অংশটি কর্তিত বা কিছুটা কাটা থাকে এবং দলমণ্ডলের খণ্ডক বা পাপড়িগুলো প্রায় ২ মিলিমিটার লম্বা ও আয়তাকার আকৃতির হয়।
ফল, বীজ ও জিনগত তথ্য
ফুল ঝরে যাওয়ার পর লতাটিতে ছোট ছোট গুচ্ছ আকারে ফল ধরে।
- ফলের আকৃতি ও রঙ: এর ফলগুলো দেখতে বেরী (Berry) আকারের এবং উপবৃত্তীয় হয়ে থাকে। আকারে এগুলো প্রায় ৫-৬ মিমি লম্বা এবং ৬-৯ মিমি চওড়া হয়। পরিপক্ব বা পাকা অবস্থায় ফলগুলো আকর্ষণীয় কালো রঙ ধারণ করে।
- বীজ ও ক্রোমোসোম: প্রতিটি বেরী ফলের ভেতরে সাধারণত ২টি করে বীজ থাকে। জিনগত বা সাইটোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো 2n = ৪০ অথবা ৬০।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
গোয়ালিয়া লতার বংশবৃদ্ধি বা নতুন চারা তৈরি করার প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ ও কার্যকর। প্রাকৃতিকভাবে এবং কৃত্রিম উপায়ে মূলত দুটি প্রধান মাধ্যমে এই উদ্ভিদের প্রজনন ও বংশ বিস্তার ঘটে:
- বীজের মাধ্যমে: ফল পরিপক্ব হওয়ার পর তার ভেতরে থাকা সুস্থ বীজ সংগ্রহ করে মাটিতে রোপণ করলে নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।
- মৌল কাণ্ডের মাধ্যমে: এই উদ্ভিদের শক্তিশালী মৌল কাণ্ড বা শিকড়ের অংশ আলাদা করে রোপণ করার মাধ্যমেও অত্যন্ত সফলভাবে এর বংশবৃদ্ধি করা সম্ভব।
গোয়ালিয়া লতা-এর বিস্তৃতি:
আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশের নির্দিষ্ট কিছু জেলার বনাঞ্চলে এর অবাধ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়:
উপযোগী পরিবেশ: এই অঞ্চলগুলোর আর্দ্র আবহাওয়া, ঘন জঙ্গল এবং পাহাড়ী ঢাল গোয়ালিয়া লতার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক।
প্রধান জেলাসমূহ: এটি মূলত দেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি এবং সিলেট জেলার গহীন ও চিরসবুজ বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়।
ঔষধি গুরুত্ব
স্থানীয় লোকজ জীবন এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসায় গোয়ালিয়া লতা একটি অত্যন্ত উপকারী উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এর প্রধান ব্যবহারগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে:
এই লতাটির পরিপক্ব বা পাকা ফলগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ অত্যন্ত আগ্রহের সাথে খাদ্য বা ফল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এটি বন্য পুষ্টির একটি অন্যতম চমৎকার উৎস। - ক্ষত নিরাময় ও ঔষধি ব্যবহার:
ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় বা লোকজ ভেষজ চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের শিকড় বা মূল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গোয়ালিয়া লতার মাটির নিচের তাজা মূল পিষে তৈরি করা লেই বা পেস্ট (Paste) শরীরের যেকোনো ধরণের ক্ষত ও ঘা স্থানে সরাসরি প্রয়োগ করা হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতস্থান দ্রুত শুকাতে ও ইনফেকশন দূর করতে দারুণ সাহায্য করে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১০ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) গোয়ালিয়া লতা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত।বাংলাদেশে গোয়ালিয়া লতা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
- গাছের কাণ্ডে ধরে ফল! জানুন বড় ডুমুর বা সাপাই গাছের ওষুধি গুণ ও পরিচয়
- লতা ডুমুর বা লতা বট (Ficus pumila) গাছের পরিচিতি, শ্রেণীবিন্যাস এবং নান্দনিক ব্যবহার
- ডোরা বট দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো উদ্ভিদ
- প্যারাবোহা অরণ্যে জন্মানো উপকারী বৃক্ষ
- পাকুড় বাংলাদেশে জন্মানো উপকারী বৃক্ষ
- খুসকা ডুমুর দক্ষিণ এশিয়ার অরণ্যে জন্মানো বৃক্ষ
- বুটি ডুমুর বাংলাদেশে জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- পরকাঠ ডুমুর দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো গুল্ম
- শ্বেত বট পাহাড়িঞ্চলে জন্মানো শোভাবর্ধক বৃক্ষ
- কাকডুমুর ফল, ছালের নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ
- কাভ্রী গাছের নানাবিধ ভেষজ গুণাগুণ
- ডেউয়া গাছ-এর পাঁচটি ভেষজ গুণাগুণ ও বিবিধ ব্যবহার
- কাকডুমুর এশিয়ার পরিচিত উপকারি গাছ
- জগডুমুর ঔষধি ফল হিসাবে খাওয়া নানাবিধ উপকারিতা
তথ্যসূত্র:
১. এম আতিকুর রহমান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১০ম, পৃষ্ঠা ১০০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।