ঘোড়া দুব্বা (কার্পেট ঘাস) এর উপকারিতা, বৈশিষ্ট্য ও হাড় ভাঙার লোকজ চিকিৎসা

ভূমিকা: ঘোড়া দুবো হর (বৈজ্ঞানিক নাম: Axonopus compressus) হচ্ছে উষ্ণাঞ্চল দেশের ভেষজ উদ্ভিদ। বাংলাদেশের সর্বত্রে এই ঘাস জন্মে। লন ও পশুর চারণভূমি তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়।

ট্যাক্সোনমি স্তর (Rank)বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name)
জগৎ / রাজ্য (Kingdom)Plantae (উদ্ভিদ জগৎ)
বিভাগ (Division)Tracheophytes (ভাস্কুলার উদ্ভিদ)
ক্লেড / অবিন্যাসিত (Clade)Angiosperms (পুষ্পক উদ্ভিদ)
ক্লেড / অবিন্যাসিত (Clade)Monocots (একবীজপত্রী)
বর্গ (Order)Poales
পরিবার (Family)Poaceae (ঘাস পরিবার)
গণ (Genus)Axonopus
প্রজাতি (Species)A. compressus

ঘোড়া দুবো হর-এর বর্ণনা:

ই নির্দিষ্ট বহুবর্ষজীবী বীরুৎ উদ্ভিদটির কান্ড, পাতা, পুষ্পবিন্যাস এবং প্রজনন অঙ্গের গঠন অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও অনন্য। নিচে এর প্রতিটি অংশের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:

১. কাণ্ড ও পাতার গঠন (Stem and Leaf Structure)

  • প্রকৃতি ও আকার: এটি একটি গ্রন্থিকযুক্ত বহুবর্ষজীবী বীরুৎ। এর কাণ্ড সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। কাণ্ডটি লতানো বা বক্রধাবক সদৃশ হলেও ফুল ফোটার সময় (পুষ্পেদগম কালে) ঋজু বা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এটি অনেকটা রোজেটের মতো এবং মাটির ওপর মাদুরের ন্যায় প্রসারিত থাকে।
  • পর্ব ও শিরা: কাণ্ডের পর্বগুলো থেকে মূল জন্মায়। কাণ্ডের শিরাগুলো সুস্পষ্ট এবং এটি রোমশবিহীন ও মসৃণ হলেও এর পর্ব বা নোডগুলো রোমশ বা শ্মশ্রুধারী (Hairy) হয়ে থাকে।
  • পত্রফলক: পাতা বা পত্রফলকগুলো রৈখিক-আয়তাকার, বিভল্লাকার কিংবা ভল্লাকার আকৃতির হয়। এর পরিমাপ সাধারণত ২-২৫ x ০.৮-১.৫ সেমি। পাতাগুলো দেখতে চ্যাপ্টা বা কদাচিৎ ভাঁজকৃত হয়, যার শীর্ষভাগ স্থূলাগ্র থেকে সূক্ষ্মাগ্র হতে পারে। পাতার ওপর ও নিচের পৃষ্ঠ সাধারণত মসৃণ ও রোমশবিহীন হয়।
  • পত্রকোষ (Sheath): এর পাতার আবরণ বা শিথ (Sheath) বেশ শিথিল, কাগজবৎ এবং প্রান্তভাগ স্বচ্ছ হয়। পত্রফলকের সাথে যুক্ত স্থানের প্রান্ত সিলিয়াযুক্ত হলেও অন্য অংশ মসৃণ থাকে।

২. পুষ্পবিন্যাস ও স্পাইকলেট (Inflorescence and Spikelet)

  • পুষ্পবিন্যাস: এর পুষ্পবিন্যাস মূলত ২ থেকে ৬টি রেসিমের (Raceme) সমষ্টি, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৯ সেমি লম্বা হয়। এটি আঙ্গুলাকৃতি বা মঞ্জরীদণ্ডের ওপর একান্তরভাবে সাজানো থাকে। মঞ্জরীদণ্ডটি সূত্রাকার, ছড়ানো ও রোমশ প্রকৃতির হয়ে থাকে।
  • স্পাইকলেট: স্পাইকলেটগুলো উপবৃত্তাকার-আয়তাকার বা উপবৃত্তাকার-ভল্লাকার আকৃতির এবং পরিমাপে ২.০-২.৫ x ০.৫-১.০ মিমি হয়। এগুলো সূক্ষ্মাগ্র এবং অবৃন্তক বা খাটো বৃন্তযুক্ত হয়ে থাকে। এর রঙ সাধারণত সবুজ বা বেগুনি-লাল হয়।

৩. গ্লুম, লেমা ও পেলিয়ার গঠন (Glume, Lemma and Palea)

  • গ্লুম (Glume): এই উদ্ভিদের নিচের গ্লুমটি অনুপস্থিত থাকে। তবে ওপরের গ্লুমটি ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার (২.০-২.৫ x ০.৮-১.২ মিমি), কাগজবৎ এবং ৫ থেকে ৭টি শিরাযুক্ত হয়।
  • লেমা ও পেলিয়া: নিচের লেমাটি ডিম্বাকৃতি-সূক্ষ্মাগ্র এবং অস্পষ্ট ৫-শিরাল, যার শিরাগুলো কোমল রোমযুক্ত। ওপরের লেমাটি শক্ত ৩-৫ শিরাল এবং এর শীর্ষভাগ শুশ্রুধারী। নিচের পুষ্পিকায় পেলিয়া অনুপস্থিত থাকলেও ওপরের পুষ্পিকায় পেলিয়াটি শক্ত এবং এর প্রান্ত অন্তর্মুখী ভাজকৃত থাকে।

৪. প্রজনন অঙ্গ ও ক্রোমোসোম সংখ্যা (Reproduction & Chromosomes)

  • পুংকেশর ও গর্ভাশয়: উদ্ভিদে ৩টি পুংকেশর থাকে। এর পরাগধানী ০.৫ মিমি লম্বা, যা দেখতে সাদা কিন্তু প্রান্তভাগ বেগুনি রঙের হয়। গর্ভাশয়টি আয়তাকার বা উপবৃত্তাকার এবং এর গর্ভমুণ্ড ০.৫-০.৬ মিমি লম্বা ও সাদা বর্ণের হয়ে থাকে।
  • ক্রোমোসোম সংখ্যা: কোষতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য অনুযায়ী এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে: ২n = ৪০, ৬০।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

ঘোড়া দুব্বা (Axonopus compressus) মূলত একটি অত্যন্ত সহনশীল উষ্ণাঞ্চলীয় ভেষজ ঘাস, যা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশেও খুব সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। নিচে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং প্রজনন প্রক্রিয়া বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা (Natural Habitat)

  • উচ্চতা ও ভূখণ্ড: এই ঘাস প্রজাতিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে প্রায় ১৯০০ মিটার পর্যন্ত উঁচু পাহাড়ি ও সমতল ভূখণ্ডে অনায়াসে জন্মাতে এবং বেঁচে থাকতে পারে।
  • আগাছা হিসেবে অভিযোজন: এটি প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও সহনশীল। ফলে বন-জঙ্গল, ফসলের খেত, রাস্তার ধার, খেলার মাঠ কিংবা পরিত্যক্ত স্থানসহ বিভিন্ন ধরনের আবাসে এটি সাধারণ ক্ষতিকর বা অহেতুক আগাছারূপে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

২. ফুল ও ফল ধারণের সময়কাল (Flowering and Fruiting)

ঘোড়া দুব্বা ঘাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বারোমাসি উর্বরতা। কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে সীমাবদ্ধ না থেকে, অনুকূল আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা পেলে এর ফুল ও ফল ধারণ প্রক্রিয়া সারা বছর অর্থাৎ বর্ষব্যাপী চলতে থাকে।

৩. বংশবিস্তার ও প্রজনন কৌশল (Reproduction Methods)

নতুন চারা উৎপাদন এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধির জন্য এই উদ্ভিদটি দুটি প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহার করে থাকে:
১. বীজের মাধ্যমে (Seed Propagation): বর্ষব্যাপী উৎপন্ন ফল থেকে পরিপক্ক বীজ মাটিতে পড়ে খুব সহজেই নতুন চারার জন্ম দেয়।
২. মূলায়িত পার্শ্ব বিটপ দ্বারা (Vegetative Propagation): এর লতানো বক্রধাবক কাণ্ড বা পার্শ্ব বিটপের পর্বগুলো (Nodes) মাটির সংস্পর্শে এলে সেখানে নতুন মূল বা শিকড় গজায়। এই মূলায়িত বিটপগুলো মূল গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন উদ্ভিদ হিসেবে দ্রুত মাদুরের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিস্তৃতি:

ঘোড়া দুব্বা ঘাসের আদিনিবাস বা আদি উৎপত্তিস্থল মূলত আমেরিকার উষ্ণাঞ্চলীয় বা ক্রান্তীয় (Tropical America) এলাকায়। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রবর্তন ও দেশীয়করণ (Introduction & Naturalization): আমেরিকার উষ্ণাঞ্চল থেকে অন্যান্য দেশে প্রবর্তিত হওয়ার পর, এটি বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুর সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে নেয়। কালক্রমে এটি ভারতীয় উপমহাদেশ তথা আমাদের স্থানীয় প্রকৃতির সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, এটি এখন পুরোপুরি দেশীভূত (Naturalized) উদ্ভিদে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক উপস্থিতি: আমাদের দেশের আবহাওয়া ও আর্দ্র মাটি এই ঘাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বত্র অর্থাৎ প্রতিটি জেলাতেই এই ঘাস প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেখা যায়। সাধারণ ঘাস বা আগাছা হিসেবে এটি দেশের আনাচে-কানাচে বিস্তৃত রয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

ঘোড়া দুব্বা বা কার্পেট ঘাস কেবল বন্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আগাছা নয়, বরং এর রয়েছে অসাধারণ কিছু ব্যবহারিক ও অর্থনৈতিক গুণাগুণ। নিচে এর প্রধান ব্যবহারগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. চমৎকার লন ও চারণভূমির ঘাস (Lawn and Pasture Grass)

  • লন গ্রাস: ঘন এবং মাদুরের মতো ছড়িয়ে পড়ার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি পার্ক, বাগান বা বাড়ির উঠানে চমৎকার লন গ্রাস (Lawn Grass) রূপে ব্যবহৃত হয়। এটি মাটির ওপর সবুজ গালিচার মতো আস্তরণ তৈরি করে।
  • সহনশীল চারণভূমি: এই ঘাস পশুপালনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি গবাদিপশুর জন্য একটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও রুচিকর খাবার। এর পুনরুৎপাদন ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, বর্ষাকালে চারণভূমিতে গবাদিপশু দিয়ে অতিরিক্ত ঘাস খাওয়ানো (Overgrazing) হলেও চারণভূমির কোনো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হয় না।

২. মাটি ক্ষয় রোধে আবরণী উদ্ভিদ (Cover Crop for Soil Erosion)

এই ঘাসের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক ব্যবহার হলো এর ছায়াসহিষ্ণুতা। আমাদের দেশে বাণিজ্যিক তেল ও রাবার উৎপাদনকারী বড় বড় বৃক্ষ চাষাবাদের ছায়াযুক্ত জমিতে এই ঘাসটিকে মাটি ক্ষয় রোধের আবরণী রূপ বা কাভার ক্রপ (Cover Crop) হিসেবে জন্মানো হয়। এটি গাছের গোড়ার মাটিকে বৃষ্টির পানি বা ধসের হাত থেকে রক্ষা করে আর্দ্রতা ধরে রাখে।

৩. ক্ষতিকর আগাছা হিসেবে সতর্কতা

এর দ্রুত বংশবৃদ্ধির ক্ষমতার কারণে ফসলের মাঠ বা নার্সারিতে মাঝে মাঝে এটি একটি বিরক্তিকর আগাছা হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে, যা চাষাবাদের মূল উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।

৪. লোকজ চিকিৎসা ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত ব্যবহার (Ethnomedicinal Uses)

অর্থনৈতিক ব্যবহারের পাশাপাশি ঘোড়া দুব্বা ঘাসের রয়েছে বিশেষ কিছু ঔষধি গুণাগুণ। বিশেষ করে আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু আদিবাসী সম্প্রদায় অস্থিভঙ্গ (Bone Fracture) বা হাড় ভাঙা রোগে এই উদ্ভিদ ব্যবহার করে থাকে।

  • ব্যবহারের নিয়ম: প্রথাগত চিকিৎসায় এই ঘাসের পাতা বেটে একটি ঘন পেস্ট বা প্রলেপ তৈরি করা হয়। এরপর ভাঙা হাড়ের স্থানে সেই পাতার প্রলেপটি লাগিয়ে ওপরে বাঁশের কঞ্চি বা কাপড় দিয়ে চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যান্ডেজ বা প্লাস্টার তৈরি করা হয়, যা হাড় দ্রুত জোড়া লাগতে সাহায্য করে বলে স্থানীয় আদিবাসী চিকিৎসকদের বিশ্বাস।
  • অন্যান্য ভেষজ গুণ: এছাড়া বিভিন্ন দেশের লোকজ চিকিৎসায় এর পাতার তাজা রস ম্যালেরিয়ার জ্বর, বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস এবং স্তনের প্রদাহ বা ফুসকুড়ি দূর করতেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১২ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) ঘোড়া দুবো হর প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে ঘোড়া দুবো হর সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. এস নাসির উদ্দিন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ২০৩-২০৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২ এপ্রিল ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Forest & Kim Starr

Leave a Comment

error: Content is protected !!