তিনটা ব্যাপকতর গণতন্ত্র

সভাপতি মাও সে-তুঙের উদ্ধৃতি

১৫. তিনটা ব্যাপকতর গণতন্ত্র

*** একটা নির্দিষ্ট মাত্রার গণতন্ত্র সৈন্যবাহিনীতে কার্যকরী করতে হবে, প্রধানত সামন্ততান্ত্রিক মারধোর, গালাগালের ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া এবং অফিসার ও সৈনিকদের এক সঙ্গে সুখদুঃখের ভাগ নেওয়া। এটা করলেই, অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে ঐক্য অর্জিত হবে, সৈন্যবাহিনীর সংগ্রামী শক্তি প্রভূত পরিমাণে বেড়ে যাবে এবং দীর্ঘ ও কঠোর যুদ্ধে আমরা যে টিকতে পারবো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। “দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ সম্পর্কে” (মে, ১৯৩৮)

*** এত শোচনীয় বৈষয়িক অবস্থা ও ঘনঘন যুদ্ধ সত্ত্বেও যে লাল ফৌজ দৃঢ়ভাবে টিকতে সক্ষম, তার কারণ, পার্টির ভূমিকা ছাড়াও সৈন্যবাহিনীর ভেতরে পালন করা হচ্ছে গণতান্ত্রিক নীতি। অফিসাররা সৈনিকদের মারধোর করেন না, অফিসার ও সৈনিকদের প্রতি সমান ব্যবহার করা হয়, সভা করার ও কথা বলার স্বাধীনতা সৈনিকদের আছে, অপ্রয়োজনীয় জটিল গতানুগতিক রীতি নীতিকে বাতিল করা হয়েছে এবং টাকা পয়সার হিসেব সকলের সামনে খোলা আছে।… চীনে জনগণের যেমন গণতন্ত্র দরকার তেমনি সৈন্যবাহিনীরও গণতন্ত্রের দরকার। সৈন্যবাহিনীর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে সামন্ততান্ত্রিক ভাড়াটে সৈন্যবাহিনীকে ভেঙ্গে দেবার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। “চিংকাং পাহাড়ে সংগ্রাম” (২৫ নভেম্বর, ১৯২৮)

*** আমাদের সৈন্যবাহিনীর ভেতরে রাজনৈতিক কাজ করার নীতি হচ্ছে সৈনিকসাধারণ, কমান্ডার ও সমস্ত কর্মীকে সাহসের সঙ্গে জাগ্রত করা, কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বাধীন একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনটা প্রধান লক্ষ্য—উচ্চ মাত্রার রাজনৈতিক ঐক্য, উন্নততর জীবনযাত্রার এবং সামরিক ক্ষেত্রে উন্নততর টেকনিক ও যুদ্ধকৌশল অর্জন করা। আমাদের সৈন্যবাহিনীর ইউনিটগুলোতে বর্তমানে যে ‘তিনটা যাচাই’ ও ‘তিনটা শুদ্ধি’ উৎসাহের সঙ্গে সম্পাদন করা হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে উপরোক্ত এই তিনটা প্রধান লক্ষ্যের প্রথম দুটিকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্জন করা।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ব্যাপারে, কোম্পানির সরবরাহ ও খাবার ব্যবস্থা পরিচালনার বাজে কোম্পানির পরিচালকদেরকে সাহায্য করার জন্য (কিন্তু তাঁদের ছাড়িয়ে যেতে নয়) সৈনিকদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিকারটা অবশ্যই সুনিশ্চিত করতে হবে।

আরো পড়ুন:  জনসাধারণের লাইন

সামরিক গণতন্ত্রের ব্যাপারে, সৈন্যদের ট্রেনিংয়ের সময়ে অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে এবং সৈনিকদের নিজেদের অবশ্যই পরস্পরকে শেখাতে হবে; আবার যুদ্ধের সময়ে ফ্রন্টে অবস্থিত কোম্পানিগুলো বিভিন্ন ধরনের ছোট বড় সভা করবে। কি করে আক্রমণ করে শত্রুর অবস্থান দখল করে নেওয়া যায় এবং কি করে যুদ্ধের কর্তব্য পালন করা যায়, সেই আলোচনার জন্য কোম্পানির পরিচালকদের নেতৃত্বে সৈনিকসাধারণকে উৎসাহিত করে তুলতে হবে। যুদ্ধ একটানা কয়েক দিন ধরে চললে, এ ধরনের কয়েকটি সভা করতে হবে। উত্তর সেনসীর ফানলুং যুদ্ধে এবং শানসী-ছাহার-হোপে এলাকার শিচাচুয়াংয়ের যুদ্ধে, এ ধরনের সামরিক গণতন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং বিরাট সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। এতে প্রমাণ হয়েছে, সামরিক গণতন্ত্র শুধু উপকারই করে, কোনো ক্ষতি করে না। “সৈন্যবাহিনীর ভেতরকার গণতান্ত্রিক আন্দোলন” (৩০ জানুয়ারি, ১৯৪৮)

*** বর্তমানের মহান সংগ্রামের সম্মুখীন হয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি দাবি করে যে, গোটা পার্টির নেতৃস্থানীয় সংস্থাগুলো, পার্টি সদস্য ও কেডারদের তাঁদের সক্রিয়তাকে পরিপূর্ণভাবে স্ফুরণ করা উচিত, শুধু এমনি করেই বিজয় লাভ করা যায়। এই সক্রিয়তার স্ফুরণ অবশ্যই বাস্তবভাবে প্রদর্শন করা উচিত। নেতৃস্থানীয় সংস্থা, কেডার ও পার্টি সদস্যদের সৃজনশীল ক্ষমতায়, দায়িত্বশীল মনোভাবে, কর্মে তাঁরা যে উচ্ছসিত উৎসাহ দেখান তাতে এবং প্রশ্ন উত্থাপন, মত প্রকাশ ও ত্রুটি সমালোচনায় তাদের সাহসে ও নৈপুণ্যে এবং নেতৃস্থানীয় সংস্থা ও নেতৃস্থানীয় কেডারদের প্রতি সস্নেহ তত্ত্বাবধানে। অন্যথায় তথাকথিত ‘সক্রিয়তা’ হয়ে পড়বে একটা ফাঁকা বুলি। কিন্তু এইরূপ সক্রিয়তার স্ফুরণ নির্ভর করে পার্টির অভ্যন্তরীণ জীবনের গণতান্ত্রিকীকরণের উপর। পার্টির ভেতরকার গণতান্ত্রিক জীবনের অভাবে এইরূপ সক্রিয়তার স্ফুরণ অসম্ভব। কেবলমাত্র গণতান্ত্রিক জীবনের মাধ্যমেই বিপুলসংখ্যক সক্ষম মানুষ সৃষ্টি করা সম্ভব। “জাতীয় যুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির স্থান” (অক্টোবর, ১৯৩৮)

*** সে যে কেউ হোক না কেন, শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তি না হলে, কু-উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ না চালালে, তাকে বলার অনুমতি দিতে হবে, ভুল বললেও কিছু আসে যায় না। সর্বস্তরের নেতৃস্থানীয় কর্মীদেরই অন্যদের কথা শোনার দায়িত্ব রয়েছে। দুটি নীতি অনুসরণ করতে হবে; (১) যা জানেন বলুন, যদি বলেন, সবটাই বলুন; (২) বক্তাকে দোষ দেবেন না, তারা কথাকে সতর্কবাণী হিসেবে গ্রহণ করুন। বক্তাকে দোষ দেবেন না এই নীতিটাকে বাদ দিলে এবং সত্যিকারভাবে ও অকৃত্রিমভাবে একে অনুসরণ না করলে, যা জানেন বলুন, যদি বলেন, সবটাই বলুন’— এতে ফল হবে না। “১৯৪৫ সালের কর্তব্য” (১৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৪)

আরো পড়ুন:  সাম্রাজ্যবাদ ও সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীলরা কাগুজে বাঘ

*** পার্টির ভেতরে গণতান্ত্রিক জীবন সম্পর্কে শিক্ষার কাজ অবশ্যই চালাতে হবে, যাতে করে পার্টি-সদস্যরা বুঝতে পারেন, গণতান্ত্রিক জীবনের অর্থ কি, গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতার মধ্যকার সম্পর্ক কি এবং কি ভাবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে কাজে লাগানো যায়। শুধুমাত্র এই উপায়েই, একদিকে পার্টির ভেতরে গণতান্ত্রিক জীবনকে সত্যি সত্যি প্রসারিত করা সম্ভব; অন্য দিকে উগ্র-গণতন্ত্র, শৃঙ্খলা লঙ্ঘনকারী উদারনৈতিক স্বেচ্ছাচারীতাকে এড়ানো সম্ভব। ‘জাতীয় যুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির স্থান’ (অক্টোবর, ১৯৩৮)

*** সৈন্যবাহিনী ও স্থানীয় সংস্থাগুলো— উভয় ক্ষেত্রেই পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে চালু রাখা উচিত শৃঙ্খলা দৃঢ়তর করা এবং সংগ্রামী শক্তিকে বাড়িয়ে তোলার জন্য, তাদের দুর্বল করার জন্য নয়। ঐ

*** তত্ত্বের ক্ষেত্রে উগ্র গণতন্ত্রের মূলোচ্ছেদ করুন। প্রথম, এটা দেখিয়ে দেওয়া দরকার যে, উগ্র গণতন্ত্রের বিপদ হচ্ছে, পার্টি সংগঠনের ক্ষতি করা, এমনকি তার পুরোপুরি সর্বনাশ করা এবং পার্টির সংগ্রামী শক্তিকে দুর্বল করা, এমনকি তার পুরোপুরি ধ্বংস সাধন করা, পার্টিকে তার সংগ্রামের দায়িত্ব বহন করতেও অক্ষম করে তোলা, এর ফলে, বিপ্লবের পরাজয় ডেকে আনা হয়। দ্বিতীয়, এটা দেখিয়ে দেওয়া উচিত যে, উগ্র গণতন্ত্রের উৎস রয়েছে ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণীর উদারনৈতিক উচ্ছলতায়। এটাকে পার্টির ভেতরে টানলেই, তা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রে উগ্র গণতান্ত্রিক ভাবধারায় রূপলাভ করে। সর্বহারা শ্রেণীর সংগ্রামী কর্তব্যের সঙ্গে এই ভাবধারা একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ। “পার্টির ভেতরকার ভুল চিন্তাধারা সংশোধন করা সম্পর্কে” (ডিসেম্বর, ১৯২৯)

Leave a Comment

error: Content is protected !!