ভূমিকা: বন ঢেকিয়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Asplenium unilaterale) হচ্ছে এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের উদ্ভিদ। বাংলাদেশে এই প্রজাতির তথ্য অপ্রতুল।
| ট্যাক্সোনমি স্তর (Rank) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) |
|---|---|
| জগৎ / রাজ্য (Kingdom) | Plantae (উদ্ভিদ জগৎ) |
| বিভাগ (Division) | Tracheophytes (ভাস্কুলার উদ্ভিদ) |
| ক্লেড/অবিন্যাসিত (Clade) | Pteridophytes (ফার্ন ও সমগোত্রীয়) |
| বর্গ (Order) | Polypodiales |
| পরিবার (Family) | Aspleniaceae |
| গণ (Genus) | Asplenium |
| প্রজাতি (Species) | A. unilaterale |
বর্ণনা:
এই নির্দিষ্ট উদ্ভিদটির বাহ্যিক গঠন, পাতার বিন্যাস এবং প্রজননগত বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত চমৎকার এবং সুনির্দিষ্ট। নিচে এর প্রতিটি অংশের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. কাণ্ড ও পত্রদণ্ড (Stem and Petiole)
- গ্রন্থিকন্দ ও লতা: এর গ্রন্থিকন্দ মূলত পাতলা, সরু এবং প্রকৃতিগতভাবে লতানো হয়ে থাকে।
- পত্রদণ্ড: পত্রদণ্ডটি গাঢ় বেগুনি-বাদামী বর্ণের, যা দেখতে বেশ মসৃণ ও চকচকে। এটি সাধারণত ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়।
- পত্রক অক্ষ: অক্ষটিও পত্রদণ্ডের মতোই একই বর্ণের এবং এর প্রতি পার্শ্বে সরু ডানা বা উইংস (Wings) সহ ওপরের অংশ গভীরভাবে খন্ডিত থাকে।
২. পত্রফলক ও পাতার বিন্যাস (Leaf Blade and Pinnae)
- আকার ও পরিমাপ: পত্রফলক বিভিন্ন আকারের হতে পারে। তবে এটি সাধারণত ২৫ সেমি লম্বা এবং ৬ সেমি চওড়া হয়ে থাকে। সবচাইতে নিচের পত্রকটি তার ঠিক উপরেরটির সমান অথবা সামান্য ছোট হয়।
- পত্রকের সংখ্যা ও বিন্যাস: এই উদ্ভিদে সাধারণত প্রায় ২৫ জোড়া পত্রক থাকে। এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র বৃন্ত (Stalk) যুক্ত এবং কাছাকাছি বিন্যস্ত থাকে, তবে একটির ওপর আরেকটি উপরিপন্ন (Overlap) হয় না।
- গঠন ও শিরাবিন্যাস: এর বড় পত্রকগুলো প্রায় ৩.৫ সেমি লম্বা এবং গোড়ার দিকে চওড়া হয়। এর টেক্সচার বা বয়ণ বেশ পাতলা এবং পাতার উভয় পৃষ্ঠেই শিরাগুলো সুস্পষ্টভাবে উত্তোলিত বা উঁচু হয়ে থাকে, যেখানে মধ্যশিরাটি অন্য শিরার চেয়ে বেশি পুরু।
৩. সোরাস ও রেণুর বৈশিষ্ট্য (Sorus and Spores)
- সোরাস: উদ্ভিদের পাতায় সাধারণত অসংখ্য সোরাস (Sorus) দেখা যায়, যা শিরার মধ্যাংশে অবস্থিত। এর সোরাসছত্র বা ইন্দুসিয়াম (Indusium) বেশ পাতলা হয়।
- রেণু (Spores): এর রেণুগুলো গাঢ় বর্ণের, চওড়া এবং মচমচে প্রকৃতির। এর সূক্ষ্ম দপ্তর বা পেরিস্পোর স্বচ্ছ ডানা বিশিষ্ট হয়ে থাকে।
৪. ক্রোমোসোম সংখ্যা (Chromosome Number)
- কোষতাত্ত্বিক বা সাইটোলজিক্যাল দিক থেকে এই উদ্ভিদের হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে: n = ৪০।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
প্রাকৃতিক বাসস্থান ও জন্মানোর স্থান
এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে সাধারণত নিচের স্থানগুলোতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:
- ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে স্থান: যেখানে বাতাসের আর্দ্রতা বেশি এবং সরাসরি তীব্র সূর্যালোক পৌঁছায় না।
- পাহাড়ের শিলা ও চুনাপাথর: বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলের ভেজা শিলাখণ্ড, পাথরের খাঁজ এবং বিশেষ করে চুনাপাথরের (Limestone) ওপর এরা খুব সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে।
- নদীর তীরবর্তী অঞ্চল: নদী, ঝর্ণা বা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া জলাশয়ের আর্দ্র ও ভেজা তীরবর্তী স্থান এই উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত আদর্শ বাসস্থান।
বংশবিস্তার ও প্রজনন কৌশল
বন ঢেঁকিয়া একটি অপুষ্পক ও বীজহীন উদ্ভিদ হওয়ায় এর বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি সাধারণ সপুষ্পক উদ্ভিদের চেয়ে ভিন্ন। এটি মূলত দুটি প্রধান উপায়ে বংশবিস্তার করে থাকে:
১. গ্রন্থিকন্দের মাধ্যমে (Vegetative Reproduction): এর মাটির সমান্তরালে থাকা পাতলা ও সরু লতানো গ্রন্থিকন্দ (Rhizome) বা কাণ্ড মাটির সাথে ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন উদ্ভিদের জন্ম দেয়।
২. রেণুর মাধ্যমে (Spore Reproduction): পাতার নিচে অবস্থিত অসংখ্য সোরাসের মধ্যে থাকা গাঢ় বর্ণের রেণু বা স্পোর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে এদের প্রজনন সম্পন্ন হয়।
বন ঢেকিয়া-এর বিস্তৃতি:
বন ঢেঁকিয়া (Asplenium unilaterale) বা এই নির্দিষ্ট ফার্ন প্রজাতির বৈশ্বিক বিস্তৃতি বেশ সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিকভাবে এটি মূলত পূর্ব আফ্রিকা থেকে শুরু করে প্যাসিফিক অঞ্চল, উত্তর ভারত, চীন, জাপান, ভুটান এবং নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন পাহাড়ি ও আর্দ্র বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে।
বাংলাদেশে আবিষ্কারের ইতিহাস: বাংলাদেশী উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রজাতিটির একটি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে:
- প্রথম সংগ্রহ: বাংলাদেশে এই প্রজাতিটি প্রথম শনাক্ত ও সংগ্রহ করা হয় আজ থেকে প্রায় দেড়শত বছর আগে, ১৮৮০ সালে ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম জেলা থেকে।
- আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ: চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত এই উদ্ভিদের ঐতিহাসিক ও অনন্য নমুনাটি (Specimen) বর্তমানে অত্যন্ত যত্নের সাথে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিখ্যাত কিউ রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনসের (Royal Botanic Gardens, Kew) উদ্ভিদ সংরক্ষণাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ গবেষণায় বাংলাদেশের এই নমুনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৫ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বন ঢেকিয়া প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আবাসস্থল ধ্বংসের জন্য এই প্রজাতিটি বাংলাদেশে সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বন ঢেকিয়া সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে অবস্থান নির্ধারণ করে যথাস্থানে সংরক্ষণ প্রয়োজন।
আরো পড়ুন
- সুপারি গাছের ভেষজ গুণ ও ওষুধি ব্যবহার: এর কাঁচা ফলের বিষাক্ত দিকটি জানেন কি?
- সুপারি গাছ চাষ, পরিচর্যার এবং সংগ্রহ পদ্ধতি
- সুপারি গাছের ফল, পাতা ও শেকড়ের নানাবিধ ঔষধি প্রয়োগ
- তালিপট পাম পৃথিবীর বৃহত্তম পামের অন্যতম
- দেশি খেজুর বাংলাদেশের প্রচলিত জনপ্রিয় ফল
- নারকেল উষ্ণমন্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের জনপ্রিয় ফল
- তাল এশিয়া ও আফ্রিকার গ্রীষ্মকালের জনপ্রিয় ফল
- হলদে পাম বাগানের শোভাবর্ধক গাছ
- নারকেলের সতেরোটি ভেষজ গুণ, ব্যবহার ও উপকারিতা
- জোড়া নারকেল বা কোকো ডুম বা সমুদ্রফল সেশেলজ্ দ্বীপের বিপন্ন নারকেল গাছ
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. মমতাজ মহল মির্জা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৫ম, পৃষ্ঠা ৩৫৮-৩৫৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১ এপ্রিল ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি liberianfaunaflora.org থেকে নেওয়া হয়েছে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।