ভুমিকা: শতমূলী বা শতবরী লিলিয়াসি পরিবারের অ্যাসপারাগাস গণের একটি লতা জাতীয় উদ্ভিদ।
| ট্যাক্সোনমি স্তর (Rank) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) |
|---|---|
| জগৎ / রাজ্য (Kingdom) | Plantae (উদ্ভিদ জগৎ) |
| বিভাগ (Division) | Angiosperms (পুষ্পক উদ্ভিদ) |
| অবিন্যাসিত শ্রেণী (Clade) | Monocots (একবীজপত্রী) |
| বর্গ (Order) | Asparagales |
| পরিবার (Family) | Asparagaceae |
| গণ (Genus) | Asparagus |
| প্রজাতি (Species) | A. racemosus |
শতমূলী বা শতবরী-এর বিবরণ:
শতমূলী (Shatavari) মূলত একটি স্বাভাবিক প্রকৃতির লতানো এবং বৃক্ষাশ্রয়ী ঔষধি উদ্ভিদ। এর লতা ও শাখাপ্রশাখা চারদিকে ছড়িয়ে ল্যান্ডস্কেপের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে। শতমূলী পাতার চমৎকার গঠনশৈলীর কারণে একে দেখতে ঠিক যেন সবুজ সুতোর ঝিলিমিলি মালার মতো মনে হয়। আর এই অনন্য সৌন্দর্যের জন্যই বহু সৌখীন মানুষ বাড়ির বাগান বা উদ্যানের শোভাবর্ধন করতে শতমূলী গাছ রোপণ করেন।
শতমূলী নামকরণের কারণ ও মূলের গঠন
এই উদ্ভিদের প্রধান আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর মাটির নিচের মূলে। এর শিকড়গুলো গুচ্ছবদ্ধ অবস্থায় থাকে, যা দেখতে অনেকটা সরু মুলো বা গাজরের মতো। মাটির নিচে শত শত মূলের এই গুচ্ছ তৈরি হওয়ার কারণেই এর নাম হয়েছে শতাবরী বা শতমূলী। এছাড়া এই গাছের লতায় ছোট ও বাঁকা কাঁটা দেখতে পাওয়া যায়।
ফুল, ফল ও মাটির প্রকৃতি
- ফুল ও ফল ফোটার সময়: শরৎকালে শতমূলী গাছে ১ থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা সরু মঞ্জরীতে ফুল ও ফল ধরে।
- ফল পাকার সময়: মাঘ ও ফাল্গুন মাসে এর ফল পাকে। পাকা ফলগুলো দেখতে ছোট মটরের মতো লাল রঙের হয় এবং এ থেকে সুন্দর সুগন্ধ ছড়ায়।
- উপযুক্ত মাটি: শতমূলী গাছ বহুদিন বাঁচে। তবে বেলে বা দোআঁশ মাটিতে এর মূল সবচেয়ে বেশি পুষ্ট ও বড় হয়। একটি পুরনো শতমূলী গাছ থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত মূল পাওয়া সম্ভব।
শতমূলীর বোটানিক্যাল নাম ও পরিবার
উদ্ভিদ বিজ্ঞান অনুযায়ী শতমূলীর বৈজ্ঞানিক বা বোটানিকাল নাম হলো Asparagus racemosus Willd. এবং এটি Liliaceae পরিবারের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ। [১]
ব্যবহৃত অংশ:
ভেষজ চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদে শতমূলী (Shatavari) একটি অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম। সাধারণত রোগ নিরাময় এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই গাছের মূল ও পাতা ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে গুণগত মান ও বৈচিত্র্যভেদে শতমূলীর মূলত দুটি প্রকারভেদের উল্লেখ পাওয়া যায়— শতাবরী ও মহাশতাবরী।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, প্রচলিত শতাবরীর বৈজ্ঞানিক নাম Asparagus racemosus হলেও মহাশতাবরীর বৈজ্ঞানিক নাম হিসেবে Asparagus sarmentosus Linn.-কে চিহ্নিত করা হয়। মানবদেহের বিভিন্ন জটিল রোগ সারাতে এই ভেষজ উদ্ভিদের রয়েছে জাদুকরী কার্যকারিতা।
শতমূলী গাছের প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতা
- শারীরিক ও যৌন উদ্দীপনা বৃদ্ধি: প্রাকৃতিক কামোদ্দীপক (Aphrodisiac) হিসেবে শতমূলীর মূল অত্যন্ত কার্যকর। এটি শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রেখে স্বাভাবিক যৌন উত্তেজনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নত করতে দারুণ সাহায্য করে।
- আলসার বা ঘা নিরাময়: পাকস্থলীর আলসার (Stomach Ulcer) এবং জিহ্বার দীর্ঘদিনের ঘা বা ক্ষত দূর করতে শতমূলীর নির্যাস ভালো কাজ করে।
- ফুসফুসের পানি রোগ প্রতিরোধ: ফুসফুসে পানি জমার মতো জটিল সমস্যা বা বিভিন্ন বক্ষব্যাধির চিকিৎসায় শতমূলীর ব্যবহার বেশ প্রাচীন ও ফলদায়ক।
- রাতকানা রোগ দূরীকরণ: ভিটামিন ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ শতমূলীর নিয়মিত সেবন চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এবং বিশেষ করে রাতকানা (Night Blindness) রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত উপকারি।
- স্বরভঙ্গ বা গলা বসা ঠিক করা: অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগা বা কথা বলার কারণে স্বরভঙ্গ হলে বা গলা বসে গেলে শতমূলীর রস প্রাকৃতিক আরাম প্রদান করে
বিস্তৃতি:
শতমূলী এবং মহাশতাবরীর আদিনিবাস মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে। বাংলাদেশ এবং ভারতের আবহাওয়া ও মাটি এই ঔষধি উদ্ভিদ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। যদিও এই মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই এটি কম-বেশি জন্মে, তবে উচ্চ গুণসম্পন্ন মহাশতাবরীর জন্ম ও বিস্তৃতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দক্ষিণ ভারতে। দক্ষিণ ভারতের ভৌগোলিক পরিবেশ এই গাছের দ্রুত ও পুষ্ট বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে সহায়ক।
গাছের আকার ও বৃদ্ধি
শতমূলী বা মহাশতাবরী জাতের লতাগুলো প্রকৃতির দিক থেকে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং শক্তিশালী হয়ে থাকে। এর লতা এতটাই বিশাল ও দীর্ঘ আকার ধারণ করতে পারে যে, এটি যে বৃক্ষকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, প্রায় সেই বড় গাছের উচ্চতা সমান উচ্চতা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে এটি খুব সহজেই বনের বড় বড় গাছের চূড়া পর্যন্ত নিজের শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতে সক্ষম হয়। [২]
চাষ পদ্ধতি:
শতমূলী বা শতাবরী গাছের বংশবৃদ্ধি মূলত বীজের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক চাষ বা বাগানের শোভাবর্ধন— উভয় ক্ষেত্রেই বীজ থেকে চারা তৈরি করা সবচেয়ে সহজ এবং জনপ্রিয় মাধ্যম।
অনুকূল আবহাওয়া ও মাটির প্রকৃতি
- আবহাওয়া: শতমূলী গাছ সাধারণত উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে সবচেয়ে ভালো সাড়া দেয়।
- মাটি নির্বাচন: এই গাছের জন্য পানি নিষ্কাশন সুবিধাযুক্ত দো-আঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। বালুযুক্ত মাটিতেও শতমূলীর শিকড় বা মূল খুব দ্রুত এবং পুষ্টভাবে বৃদ্ধি পায়।
বীজ বপন ও চারা তৈরির নিয়ম
১. বীজ ভিজিয়ে রাখা: শতমূলীর বীজ সরাসরি মাটিতে বপন না করে, বীজ বপনের আগে অবশ্যই ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এতে বীজের শক্ত আবরণ নরম হয়।
২. অঙ্কুরোদগমের সময়: পানিতে ভেজানোর পর বীজ মাটিতে রোপণ করলে তা থেকে অঙ্কুরোদগম হতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে।
৩. চারা রোপণের সঠিক বয়স: বীজের অঙ্কুরোদ্গম হওয়ার পর চারাগুলো যখন একটু বড় হবে, তখন মূল মাটিতে বা টবে স্থানান্তর করতে হবে। সাধারণত চারার বয়স ২ থেকে ৩ মাস হলেই তা চূড়ান্তভাবে বপনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যায়।[৩]
আরো পড়ুন
- সুপারি গাছের ভেষজ গুণ ও ওষুধি ব্যবহার: এর কাঁচা ফলের বিষাক্ত দিকটি জানেন কি?
- সুপারি গাছ চাষ, পরিচর্যার এবং সংগ্রহ পদ্ধতি
- সুপারি গাছের ফল, পাতা ও শেকড়ের নানাবিধ ঔষধি প্রয়োগ
- তালিপট পাম পৃথিবীর বৃহত্তম পামের অন্যতম
- দেশি খেজুর বাংলাদেশের প্রচলিত জনপ্রিয় ফল
- নারকেল উষ্ণমন্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের জনপ্রিয় ফল
- তাল এশিয়া ও আফ্রিকার গ্রীষ্মকালের জনপ্রিয় ফল
- হলদে পাম বাগানের শোভাবর্ধক গাছ
- নারকেলের সতেরোটি ভেষজ গুণ, ব্যবহার ও উপকারিতা
- জোড়া নারকেল বা কোকো ডুম বা সমুদ্রফল সেশেলজ্ দ্বীপের বিপন্ন নারকেল গাছ
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. আয়ূর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্রচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা, ১৬৬।
২. শেখ সাদী; উদ্ভিদকোষ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা, ৩৫০।
৩. এ বি এম জাওয়ায়ের হোসেন, ওষুধি গাছগাছড়া, গ্রন্থনা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৪১১, পৃষ্ঠা, ৭১।
৪. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৬ মার্চ ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: RaffiKojian
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।