শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির সাধারণ নিয়মাবলি

যেহেতু,

শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই জয় করে নিতে হবে; শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম, তার অর্থ শ্রেণিগত সুবিধা ও একচেটিয়া অধিকারের জন্য সংগ্রাম নয়, সমান অধিকার ও কর্তব্যের জন্য এবং সমস্ত শ্রেণি আধিপত্যের উচ্ছেদের জন্য সংগ্রাম।

শ্রম করে যে মানুষ, শ্রম উপায়ের অর্থাৎ জীবনধারণের বিভিন্ন উৎসের একচেটিয়া মালিকের কাছে সেই মানুষের অর্থনৈতিক অধিনতাই সকল রকম দাসত্বের, সব ধরনের সামাজিক দুর্গতি, মানসিক অধঃপতন ও রাজনৈতিক পরাধীনতার মূলে। সুতরাং, শ্রমিক শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তিই হচ্ছে সেই মহান লক্ষ্য, যা সাধনের উপায় হিসেবে প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনকেই তার অধীনস্থ হতে হবে।

সেই মহান লক্ষ্য সাধনের উদ্দেশ্যে আজ পর্যন্ত যত প্রচেষ্টা হয়েছে তা সবই ব্যর্থ হয়েছে–প্রত্যেক দেশের শ্রমিকদের মধ্যকার বহুবিধ শাখার মধ্যে সংহতির অভাবে এবং বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ভ্রাতৃত্বসূচক ঐক্যবন্ধন না থাকায়।

শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সমস্যাটি কোনো স্থানীয় বা জাতীয় সমস্যা নয়, এ সমস্যা হচ্ছে একটি সামাজিক সমস্যা, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাধীন সমস্ত দেশকে নিয়ে, আর এ সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে সবচেয়ে অগ্রণী দেশগুলির ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক সহযোগের উপর।

ইউরোপের সর্বাধিক শিল্পোন্নত দেশসমূহে শ্রমিক শ্রেণির বর্তমান পুনরুজ্জীবন যেমন এক নতুন আশার সঞ্চার করছে, তেমনি এক গুরুত্বপূর্ণ সাবধান বাণীও জানিয়ে দিচ্ছে। যেন পুরোনো ভুল আর না করা হয় এবং আহ্বান জানাচ্ছে আজ পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত আন্দোলনগুলির আশু একত্রীকরণের।

তাই এইসব কারণের জন্য শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হলো। এই সংস্থা ঘোষণা করছে যে- যে সমস্ত সঙ্ঘ ও ব্যক্তি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তাঁরা বর্ণ, ধর্মবিশ্বাস ও জাতীয়তা নির্বিশেষে পরস্পরের প্রতি এবং সমস্ত মানুষের প্রতি তাঁদের আচরণের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করবেন সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতা।

কর্তব্য ব্যতিরেকে অধিকার এবং অধিকার ব্যতিরেকে কর্তব্য এই সমিতি স্বীকার করে না। এই মনোভাব নিয়েই নিম্নলিখিত নিয়মাবলি রচনা করা হলো:

১. শ্রমিক শ্রেণির রক্ষা, অগ্রগতি ও পূর্ণমুক্তি– এই এক লক্ষ্য নিয়ে গঠিত বিভিন্ন দেশে যে সমস্ত শ্রমজীবী মানুষের সঙ্ঘ আছে, সেগুলির মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার একটি কেন্দ্রীয় মাধ্যম সৃষ্টি করার জন্যই এই সমিতি প্রতিষ্ঠিত হল।

২. এই সমিতির নাম হবে ‘শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি’।

আরো পড়ুন:  ভারতে বৃটিশ শাসন

৩. সমিতির শাখাগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতি বৎসর শ্রমজীবী মানুষের একটি সাধারণ কংগ্রেসের অধিবেশন হবে। কংগ্রেস শ্রমিক শ্রেণির সাধারণ আশা-আকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করবে, আন্তর্জাতিক সমিতির কাজকে সফলভাবে চালাবার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং সংস্থার সাধারণ পরিষদ নিয়োগ করবে।

৪. প্রত্যেক কংগ্রেস পরবর্তী কংগ্রেসের সময় ও স্থান নির্ধারণ করবে। নির্ধারিত সময়ে ও স্থানে প্রতিনিধিরা সমবেত হবেন এবং এর জন্য তাদের কোনো বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হবে না। প্রয়োজন হলে, সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের স্থান পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু অধিবেশনের সময় স্থগিত রাখার ক্ষমতা এই পরিষদের নেই। প্রতি বৎসর কংগ্রেস সাধারণ পরিষদের কর্মকেন্দ্র স্থির করে দেবে ও সভ্যদের নির্বাচিত করবে। এইভাবে নির্বাচিত সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা থাকবে নিজেদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার। সাধারণ কংগ্রেসের বাৎসরিক সভায় সাধারণ পরিষদের বার্ষিক কাজকর্মের একটি প্রকাশ্য হিসাব উপস্থিত করা হবে। জরুরি অবস্থায় সাধারণ পরিষদ নিয়মিত বাৎসরিক অধিবেশনের আগেও সাধারণ কংগ্রেস আহ্বান করতে পারবে।

৫. আন্তর্জাতিক সমিতিতে যেসব দেশের প্রতিনিধিত্ব আছে তাদেরই শ্রমিক সদস্য নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত হবে। কাজকর্ম চালাবার জন্য সাধারণ পরিষদ তার সদস্যদের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা নির্বাচিত করবে। যেমন, একজন কোষাধ্যক্ষ, একজন সাধারণ সম্পাদক, বিভিন্ন দেশের জন্য এক একজন করেসপন্ডিং সম্পাদক ইত্যাদি।

৬. যাতে এক দেশের শ্রমজীবী মানুষ অন্য প্রত্যেকটি দেশের স্বশ্রেণির আন্দোলনের খবরাখবর সদা সর্বদাই পেতে পারে; যাতে একই সঙ্গে একই সাধারণ পরিচালনায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুসন্ধান চলতে পারে; একটি সঙ্ঘের মধ্যে সাধারণ স্বার্থের যে প্রশ্নগুলি উত্থাপিত হয়েছে সেগুলি যাতে সমস্ত সঙ্ঘ দ্বারাই আলোচিত হতে পারে; এবং যখন কোনো আশু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়– উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে তখন যাতে সংযুক্ত সঙ্ঘগুলির কার্যক্রম একযোগে একইরকম হতে পারে, তার জন্য সমিতির বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় শাখাগুলির পক্ষে সাধারণ পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক এজেন্সি হিসেবে কাজ করবে। যখনই প্রয়োজন হবে তখনই বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সঙ্ঘগুলির সামনে প্রস্তাব উপস্থিত করার উদ্যোগ সাধারণ পরিষদ গ্রহণ করবে। যোগাযোগের সুবিধার জন্য সাধারণ পরিষদ কিছুকাল পর পর বিবরণী প্রকাশ করবে।

আরো পড়ুন:  ভূমি থেকে কৃষিজীবী জনগণের উচ্ছেদ

৭. যেহেতু ঐক্য ও সংহতির শক্তি ছাড়া কোনো দেশের শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনে সফলতা আনা সম্ভব না, এবং যেহেতু অন্যদিকে, শ্রমজীবী মানুষের সঙ্ঘের অল্প কয়েকটি জাতীয় কেন্দ্রকে নিয়ে, নাকি অনেকগুলি ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সঙ্ঘ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তার উপরই আন্তর্জাতিক সাধারণ পরিষদের উপযোগিতা নির্ভর করছে, সেইজন্য আন্তর্জাতিক সমিতির সদস্যদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে নিজ নিজ দেশের শ্রমজীবী মানুষের বিচ্ছিন্ন সঙ্ঘগুলিকে যুক্ত করে এক একটি জাতীয় সংগঠনে পরিণত করতে পারা যায়, যার প্রতিনিধিত্ব করবে এক একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় সংস্থা। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, এই নিয়মের প্রয়োগ নির্ভর করবে প্রত্যেক দেশের বিশেষ বিশেষ আইনের উপর এবং আইনগত প্রতিবন্ধকতার কথা বাদ দিলে কোনো স্বাধীন স্থানীয় সঙ্ঘের পক্ষে সরাসরি সাধারণ পরিষদের সঙ্গে পত্রালাপ করারও কোনো বাধা থাকবে না।

৭ (ক). মালিক শ্রেণির যৌথ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রলেতারিয়েত শ্রেণি হিসাবে সক্রিয় হতে পারে শুধুমাত্র তখনই, যখন তারা নিজেদের এমন একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পার্টিতে গঠিত করে, যে পার্টি মালিক শ্রেণি দ্বারা গঠিত সমস্ত পুরনো পার্টির বিরোধী। সামাজিক বিপ্লব ও তার শেষ লক্ষ্য– শ্রেণির বিলোপ সাধনকে জয়যুক্ত করতে হলে একটি রাজনৈতিক পার্টিতে প্রলেতারিয়েতের এই সংগঠন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির শক্তিগুলির যে জোট ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে, তাকে এই শ্রেণি তাদের শোষণকারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামেও হাতল হিসাবে অবশ্য ব্যবহার করবে। ভূমি ও পুঁজির মালিকেরা যেহেতু তাদের অর্থনৈতিক একচেটিয়া রক্ষা ও চিরস্থায়ী করার জন্য ও শ্রমকে দাস করে রাখার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলিকে সর্বদাই কাজে লাগায়, সেইহেতু রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় করে নেওয়ার কাজটি প্রলেতারিয়েতের একটি বিরাট কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়।

[৭। ক. ধারাটি হচ্ছে ১৮৭১-এর লন্ডন সম্মেলনের প্রস্তাবের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। প্রথম আন্তর্জাতিকের হেগ কংগ্রেসে (সেপ্টেম্বর, ১৮৭২-এর) গৃহীত সংশোধন দ্বারা এই ধারাটি সাধারণ নিয়মাবলির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ধারাটি ফরাসি ভাষা থেকে অনূদিত ইংরেজি ভাষার ভাষান্তর]

৮. সাধারণ পরিষদের সঙ্গে পত্রালাপের জন্য সমিতির প্রত্যেক শাখার নিজ নিজ করেসপন্ডিং সম্পাদক নিয়োগ করার অধিকার থাকবে।

৯. যারাই শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির নীতিসমূহ স্বীকার ও সমর্থন করে তাদের প্রত্যেকেই এর সদস্য হবার যোগ্য। প্রত্যেক শাখা সেই শাখা কর্তৃক গৃহীত সদস্যেদের সততার জন্য দায়ী থাকবে।

আরো পড়ুন:  কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার --- বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত

১০. আন্তর্জাতিক সমিতির কোনো সদস্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে তাঁর বাসস্থান পরিবর্তন করলে, তিনি সংস্থাভুক্ত শ্রমজীবী মানুষদের ভ্রাতৃত্বসূলভ সাহায্য পাবেন।

১১. শ্রমজীবী মানুষের যে সঙ্ঘগুলি আন্তর্জাতিক সমিতিতে যোগ দিচ্ছে সেগুলি ভ্রাতৃসূচক সহযোগিতার চিরস্থায়ী বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হলেও, তাদের বর্তমান সংগঠনকে অক্ষুণ্ন রাখবে।

১২. প্রত্যেক কংগ্রেসে এই নিয়মাবলি সংশোধন করা যেতে পারে, তবে সেরূপ সংশোধনের পক্ষে উপস্থিত প্রতিনিধিদের তিনভাগের সমর্থন থাকা চাই।

১৩. বর্তমান নিয়মাবলিতে সন্নিবিষ্ট হয়নি এরূপ প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য বিশেষ বিধান করা যাবে, সেগুলি হবে প্রত্যেক কংগ্রেসের সংশোধন সাপেক্ষ।

অন্তঃটীকা:

১. ১৮৭১ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতির লন্ডন সম্মেলনে গৃহীত নিয়মাবলি ছাপা হলো। ১৮৬৪ সালে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয় সেই সময় মার্কস যে ‘সাময়িক নিয়মাবলি’ রচনা করেছিলেন এদের ভিত্তি তার উপরেই। এই নিয়মাবলির মূলপাঠ মার্কস কর্তৃক ১৮৬৪ সালে ২১ থেকে ২৭ অক্টোবর তারিখের মধ্যে রচিত হয়। শেষ পাঠটি একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রূপে ১৮৭১-এ লন্ডনে প্রকাশিত। ইংরেজি ভাষায় লিখিত ১৮৭১-এর পুস্তিকা অনুযায়ী অনূদিত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!