মান্দার বা পারিজাত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রক্ত রাঙা আলংকারিক দৃষ্টিনন্দন ফুল

ভূমিকা:  মান্দার, পারিজাত (বৈজ্ঞানিক নাম: Erythrina variegata  ইংরেজি: Indian Coral Tree) এটি ফেবাসি পরিবারের ইরিথ্রিনা  গণের কাঁটাযুক্ত লাল ফুলবিশিষ্ট বৃক্ষ। একে বাংলায় বলে পালতে বা পালধে মাদার, গ্রামাঞ্চলে বলে তে-পালতে, হিন্দিভাষী অঞ্চলে বলে ‘মান্দার ফরহদ, আবার মেদিনীপুর অঞ্চলেও ‘ফরৎ’ বলে, উড়িষ্যার অঞ্চলবিশেষে এর নাম পালধুয়া। প্রতিষ্ঠান, উদ্যান বা বাগানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য লাগানো হয়।

বৈজ্ঞানিক নাম: Erythrina Variegata. সাধারণ নাম: সমনাম: Erythrina picta L. (1753), Erythrina indica Lamk. (1786), Erythrina indica Lamk. var. alba Blatter & Mill. (1929). ইংরেজি নাম: Tiger’s claw, Indian coral tree and Sunshine tree. বাংলা নাম: মান্দার, মাদার, পাতিমাদার, পারিজাত।

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জগৎ/রাজ্য: Plantae; বিভাগ: Angiosperms; অবিন্যাসিত: Edicots; অবিন্যাসিত: Rosids; বর্গ: Fabales; পরিবার: Fabaceae; গণ: Erythrina; প্রজাতি: E. variegate.

মান্দার বা পারিজাত গাছের বর্ণনা

মান্দার বা পারিজাত ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির কাটায় ভরা, এটি পত্রমোচী বৃক্ষ। এদের বাকল পাতলা, মসৃণ ও ধূসর রঙের। গায়ে ক্ষুদ্র মোচাকার, কালো কাঁটা আছে। পাতা যৌগ, ৩ পত্রিক থাকে, পত্রিকা আকার ১০ থেকে ১৫ সেমি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৮ থেকে ১২ সেমি। প্রান্তীয় পত্রক দুটি বৃহৎ। পাতার উপরের ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল আর নিচের অংশ শিরা বরাবর চকচকে এবং সূক্ষ্মভাবে ক্ষুদ্র নরম রোমযুক্ত। পার্শ্বশিরা ৬-৮ জোড়া, গোড়া প্রশস্তভাবে কীলকাকার, সাধারণ পত্রবৃন্ত ১৫-২০ সেমি লম্বা, কণ্টকবিহীন, উপপত্র কাস্তে-আকার, উপপত্রিক গ্রন্থি গোলাকার ও বৃহৎ।

ফুল ঘন রেসিমে সন্নিবেশিত, উপশাখার শীর্ষে জন্মায়। ফুলের মঞ্জরীপত্র ছোট, ত্রিকোণাকার, ঘন ক্ষুদ্র কোমল রোমযুক্ত, পর্ণমোচী, মঞ্জরীপত্রিকা ছোট, তুরপুন আকার, ঘনক্ষুদ্র কোমল রোমযুক্ত। বৃতি নলাকার, শীর্ষে ৫-দন্তক, পর্ণমোচী রোম দ্বারা আবৃত, মুখ অত্যন্ত তির্যক, গোড়ার নিকট পেছন বরাবর ফেটে যায় এবং তা মঞ্জরী আবরণীর ন্যায় পরিদৃষ্ট।

দলমণ্ডল উজ্জ্বল লাল, ধ্বজকীয় পাপড়ি প্রশস্ত, তরীদল এবং পক্ষদল প্রায় সমান। পুংকেশর বাইরের দিকে অধিক প্রসারিত। ফল পড (শিমের মতো), ফল ১৫ থেকে ২৫ সেমি লম্বা হয়, বৃন্তক, সংকোচন সহ উপবেলনাকার, গভীরভাবে সূচ্যগ্র, বাইরের গাত্র মসৃণ, ভেতরের গাত্র রেশমি। দেখতে গাঁটগাঁট, আগা চোখা ও বাদামি রঙের।  একটি ফলে বীজ ১৮টি, গাঢ় লাল, বৃক্কাকৃতি। বীজ ১.৫ থেকে ২ সেমি লম্বা।[১][২]

আরো পড়ুন:  ছোট জারুল পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চলের বাগানের শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ

এই গাছ যেমন বেশি উচুও হয় না, আবার তেমনি ঝোপ-ঝাড়ও হয় না। ডাল থেকে ৭ থেকে ৮ ইঞ্চি লম্বা পাতার ডাঁটা হয়, তাইতে দু’পাশে দুটি ও মাঝখানে একটি এই তিনটি পাতা হয়। আকারে ও বিন্যাসে অনেকটা পলাশের (বৈজ্ঞানিক নাম: Butea monosperma) ছোট পাতার গড়নের; তবে তার থেকে পাতলা।

মান্দার বা পারিজাত গাছের চাষাবাদ ও বংশ বিস্তার

গ্রামের জলাভূমি এলাকা, আবাদী জমির কিনারা, পাহাড়ী বনের বাহিরের দিক এবং গ্রামের ঝোপঝাড় মান্দার গাছ দেখা যায়। গ্রাম-বাংলায় এ গাছকে বাগানের বেড়ার খুঁটির কাজের জন্য লাগানো হয়। এই গাছের বা ডালের গায়ে অল্প উঁচু ঘন ঘন কাঁটা আছে বলেই এর ডালগুলি বা শাখা সরল। এই গাছের ডাল ফাল্গুন ও চৈত্রে কেটে মাটিতে পুঁতে বা বসালেই পুনরায় গাছে পরিণত হয়। এইভাবেই সে যেন বেড়ার জীবন্ত খুঁটি হয়ে থাকে। তাই গ্রাম বাংলায় এর কদর বেশি, তবে ভারত বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই এ গাছ দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু এক এক অঞ্চলে এক একটি প্রজাতির গাছ বেশি দেখা যায়। সাধারণত বেড়ার কাজে যে প্রজাতিকে লাগানো হয়, সেইটাই ঔষধি কাজে ব্যবহার করা হয়। এটিও একটি ভ্যারাইটি (E. variegata var picta) আরেকটি বুনো মাদার E. ovalifolia বাংলাদেশে জন্মে : পত্রিকা ডিম্বাকার, ফুল আকারে ছোট।

বীজ ও শাখা কলমের মাধ্যমে নতুন চারা জন্মে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে চারা তৈরি করা হয়। বসন্তে ডালের আগায় খাড়া ডাঁটায় সিদুরে লাল বড় বড় ফুল ফোটে, নিচ থেকে উপরের দিকে ফুল ফোটে। ফুলের গড়ন শিম ফুলের মতো।[৩]

ক্রোমোসোম সংখ্যা: ২n = ৪২, ৪৪ (Kumar and Subramaniam, 1986)

বিস্তৃতি: ভারত, শ্রীলংকা, মায়ানমার, মালয়েশিয়া এবং পলিনেশিয়া। বাংলাদেশে ইহা সর্বত্র বিরাজমান।

ভেষজ গুণ ও অন্যান্য ব্যবহার

মূল মাসিক প্রবাহ সহজতর করে। পাতায় অ্যালকালয়েড বিদ্যমান যা মাংশপেশীকে শিথিল করে। গাছের বাকল সংকোচক, কৃমিনাশক, পাকস্থলীর উপকার সাধক, ক্ষুধা ত্বরান্বিত করে এবং মূত্রসংক্রান্ত প্রদাহ ও মূত্র নির্গমনের সমস্যা দূরীভূত করে । তাজা পাতা কানের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়, পাতার ক্বাথ প্রদাহ ও গিরার ব্যথা দূরীকরণার্থে বহির্গতভাবে প্রয়োগ করা হয় (Bhattacharya, 1996)।

আরো পড়ুন:  শীত মৌসুমে বাহারি রঙের কারনেশন ফুলের বাণিজ্যিক চাষ ও পরিচর্যা পদ্ধতি

আরো পড়ুন: পারিজাত বা মান্দার গাছের ভেষজ ব্যবহার

আবাদী জমিতে বেড়া দেবার জন্য সাধারণত ইহা লাগানো হয়। কাষ্ঠ খুব নরম এবং ইহা নিম্নমানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। (Das and Alam, 2001)।

অন্যান্য তথ্য

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৮ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০)  মান্দার, পারিজাত প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে মান্দার, পারিজাত সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।[১]  

তথ্যসূত্র:

১. এ টি এম নাদেরুজ্জামান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৮ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২ দ্বিজেন শর্মা; ফুলগুলি যেন কথা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ মে ১৯৮৮, প্রথম পুনর্মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০০৩ পৃষ্ঠা, ৩৪।

৩. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ১, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ১০৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!