উদারতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুন

আমরা সক্রিয় মতাদর্শগত সংগ্রামের পক্ষে, কারণ এটাই হচ্ছে আমাদের সংগ্রামের স্বার্থে পার্টির মধ্যে ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্যকে সুনিশ্চিত করার হাতিয়ার। প্রত্যেক কমিউনিস্ট ও বিপ্লবীর এই হাতিয়ার গ্রহণ করা উচিত।

কিন্তু উদারতাবাদ মতাদর্শগত সংগ্রামকে বাতিল করে দেয় এবং নীতিহীন শান্তির পক্ষ নেয়, এর ফলে ক্ষয়িষ্ণু ও অশিষ্ট মনোভাবের সৃষ্টি হয় এবং পার্টি ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর কোনো কোনো ব্যক্তির মধ্যে রাজনৈতিক অধঃপতন ঘটে।

উদারতাবাদের প্রকাশ  বিভিন্নভাবে হয়ে থাকে।

যখন স্পষ্টতই দেখা যায় যে, কোনো লোক ভুল পথে যাচ্ছেন, অথচ সে লোক একজন পুরোনো পরিচিত লোক, একই জায়গার অধিবাসী, সহপাঠী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রিয়জন, পুরোনো সহকর্মী বা পুরানো অধীন লোক বলে তাঁর সঙ্গে নীতিগতভাবে যুক্তিতর্ক না করা, তখন শান্তি ও সখ্য বজায় রাখার জন্য তাকে অবাধে চলতে দেয়া। অথবা তাঁর সঙ্গে সম্ভাব বজায় রাখার জন্য চূড়ান্তভাবে মীমাংসার চেষ্টা না করে ওপর ওপরভাবে কিছু বলা। ফলে সংগঠন ও ব্যক্তি-বিশেষ উভয়েরই ক্ষতি হয়। এটা হচ্ছে এক ধরনের উদারতাবাদ।

নিজের প্রস্তাব সংগঠনের সামনে সক্রিয়ভাবে উত্থাপন না করে, আড়ালে দায়িত্বজ্ঞানহীন সমালোচনা করা। সামনাসামনি কিছু না বলে পেছনে বাজে গুজব রটনা করা; সভায় কিছু না বলে পরে আজেবাজে কথা বলা। যৌথ জীবনযাত্রার নীতির প্রতি আদৌ কোনোরকম মর্যাদা না দেখিয়ে নিজের ঝোঁকে চলা। এটা হচ্ছে দ্বিতীয় ধরনের উদারতাবাদ।

নিজের ব্যক্তিস্বার্থে ঘা না লাগলে সব যেমনি চলছে তেমনি চলতে দেওয়া; কোনো বিষয়কে স্পষ্টতই ভুল জেনেও সে বিষয় সম্পর্কে যথাসম্ভব মুখ বুজে থাকা; গা বাঁচানোর জন্য দোষ এড়িয়ে নির্বিবাদে ভালো মানুষ সেজে থাকা। এটা হচ্ছে তৃতীয় ধরনের উদারতাবাদ।

নির্দেশ অমান্য করে ব্যক্তিগত মতামতকে সবার উপরে স্থান দেওয়া। সংগঠনের কাছ থেকে শুধু বিশেষ সুবিধা দাবি করা, কিন্তু সংগঠনের শৃংখলা অস্বীকার করা। এটা হচ্ছে চুর্তথ ধরেনর উদারতাবাদ।

ঐক্য, অগ্রগতি অথবা সুষ্ঠুভাবে কর্ম সম্পাদনের জন্য ভুল মতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও যুক্তিতর্ক না করা, বরং ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো, ঝগড়া বাধানো, ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ করা বা প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করা। এটা হচ্ছে পঞ্চম ধরনের উদারতাবাদ।

আরো পড়ুন:  সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ঊনবিংশ কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণ

বিনা প্রতিবাদে ভুল মতামত শুনে যাওয়া এমন কি প্রতিবিপ্লবী মন্তব্য শুনেও সে সম্বন্ধে কোনো রিপোর্ট না করা, বরং যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখিয়ে নিঃশব্দে সেগুলো হজম করে যাওয়া। এটা হচ্ছে ষষ্ঠ ধরনের উদারতাবাদ।

জনসাধারণের মধ্যে থেকেও তাঁদের মধ্যে প্রচার বা বিক্ষোভ সৃষ্টি না করা, বক্তৃতা না দেওয়া, তদন্ত ও অনুসন্ধান না করা, তাঁদের সুখদুঃখে মনোযোগ না দেওয়া, তাঁদের সম্বন্ধে উদাসীন থাকা এবং নিজে যে একজন কমিউনিস্ট সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে একজন সাধারণ অ-কমিউনিস্ট লোকের মতো আচরণ করা। এটা হচ্ছে সপ্তম ধরনের উদারতাবাদ।

কাউকে জনসাধারণের স্বার্থের ক্ষতি করতে দেখেও মনে মনে বিক্ষুব্ধ না হওয়া, অথবা তাকে বারণ বা নিরস্ত না করা, যুক্তি দিয়ে তাকে না বুঝানো, বরং জেনে শুনেও তাকে সে কাজ করে যেতে দেওয়া। এটা হচ্ছে অষ্টম ধরনের উদারতাবাদ।

কাজকর্মে মনোযোগ না দেওয়া, কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা লক্ষ্য ছাড়াই উৎসাহহীনভাবে কাজ করা, তাচ্ছিল্যভরে কাজ করা এবং কোনোমতে চালিয়ে যাওয়া — ‘যতদিন মঠের সন্ন্যাসী থাকবো ততদিন ঘন্টা বাজিয়ে গেলেই চলবে’। এটা হচ্ছে নবম ধরনের উদারতাবাদ।

বিপ্লবের জন্য নিজে বিরাট অবদান রেখেছি বলে মনে করা, প্রবীণ ও অভিজ্ঞ বলে নিজেকে জাহির করা, বড় কাজে অক্ষম হওয়া সত্বেও ছোট কাজ করতে না চাওয়া, কাজে অমনোযোগী হওয়া এবং অধ্যয়নে ঢিলে দেওয়া। এটা হচ্ছে দশম ধরনের উদারতাবাদ।

নিজের ভুল জেনেও তা সংশোধনের চেষ্টা না করা, নিজের প্রতি উদারতাবাদ অবলম্বন করা। এটা হচ্ছে একাদশ রকমের উদারতাবাদ।  

আরো অনেক ধরনের কথা বলা যায়। কিন্তু এই এগারোটিই হচ্ছে প্রধান।

এর সবগুলিই হচ্ছে উদারতাবাদের অভিব্যক্তি।

উদারতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুন — মাও সেতুং

বিপ্লবী যৌথ সংগঠনের ভেতরে উদারতাবাদ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটা হচ্ছে একটা ক্ষয়কারক বস্তু যা ঐক্য বিঘ্নিত করে, সংহতি নষ্ট করে, কাজে নিস্ক্রিয়তা আনে এবং বিভেদ সৃষ্টি করে। এটা বিপ্লবী বাহিনীকে সুসংবদ্ধ সংগঠন ও শৃংখলা থেকে সরিয়ে আনে, কর্মনীতিগুলোকে পুরোপুরি কার্যকরী করা অসম্ভব করে তুলে এবং যে জনগণকে পার্টি পরিচালিত করে তাদের থেকে পার্টি সংগঠনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটা একটা অত্যন্ত জঘন্য ঝোঁক।

আরো পড়ুন:  জন্মনিয়ন্ত্রণ

উদারতাবাদ জন্ম নেয় পেটি-বুর্জোয়া স্বার্থপরতা থেকে, এটা ব্যক্তিস্বার্থকে প্রথম স্থান দেয় এবং বিপ্লবের স্বার্থকে দেয় দ্বিতীয় স্থান। এর ফলেই জন্ম নেয় মতার্দশগত, রাজনীতিগত ও সংগঠনগত উদারতাবাদ।

উদারতাবাদীরা মার্কসবাদের নীতিগুলোকে বিমূর্ত মতবাদ হিসেবে দেখেন। মার্কসবাদকে তাঁরা স্বীকার করেন কিন্তু তাকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে বা পুরোপুরি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত নন; নিজেদের উদারতাবাদের পরিবর্তে মার্কসবাদকে স্থান দিতেও রাজি নন। এই সব লোকের মার্কসবাদ আছে, আবার একই সংগে আছে উদারতাবাদ — মুখে তাঁরা মার্কসবাদের কথা বলেন, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁরা প্রয়োগ করেন উদারতাবাদ; অন্যদের প্রতি তাঁরা প্রয়োগ করেন মার্কসবাদ, কিন্তু নিজেদের বেলায় উদারতাবাদ; দুই ধরনের জিনিসই তাঁরা হাতে রাখেন, এবং প্রয়োজনমতো সেগুলিকে কাজে লাগান। এই হচ্ছে কিছু লোকের চিন্তাধারার পদ্ধতি।

উদারতাবাদ হচ্ছে সুবিধাবাদের অন্যতম প্রকাশ এবং মার্কসবাদের সঙ্গে এর মৌলিক বিরোধ আছে। এটা নেতিবাচক এবং বাস্তব ক্ষেত্রে এটা শত্রুকে সাহায্য করার ভূমিকা গ্রহণ করে। তাই, শত্রুরা আমাদের মধ্যে এর সংরক্ষণকে স্বাগত জানায়। উদারতাবাদের প্রকৃতি যখন এইরূপ তখন বিপ্লবীদের মধ্যে তার কোন স্থান থাকতে পারে না।

মার্কসবাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নেতিবাচক উদারতাবাদকে আমাদের দূর করতে হবে। একজন কমিউনিস্টকে মুক্ত মন হতে হবে, হতে হবে একনিষ্ঠ ও সক্রিয়, বিপ্লবের স্বার্থকে নিজের প্রাণের সমার্থক হিসেবে দেখতে হবে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিপ্লবের স্বার্থের অধীন করে রাখতে হবে; তাঁকে সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রেই সঠিক নীতিতে দৃঢ় থাকতে হবে এবং সমস্ত ভুল চিন্তাধারা ও আচরণের বিরুদ্ধে অক্লান্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, যাতে করে পার্টির যৌথ জীবনকে সুসংবদ্ধ এবং পার্টি ও জনসাধারণের মধ্যকার সংযোগকে সুদৃঢ় করা যায়; ব্যক্তি বিশেষের চাইতে পার্টির ও জনসাধারণের সম্বন্ধে এবং নিজের চেয়ে অপরের সম্বন্ধে তাঁকে বেশি যত্নশীল হতে হবে। এবং তখনই কেবল তাঁকে একজন কমিউনিস্ট বলে ধরা যেতে পারে।

আরো পড়ুন:  ব্যক্তিবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বলতে কি বুঝায়

অনুগত, সৎ, সক্রিয় এবং ন্যায়পরায়ণ সমস্ত কমিউনিস্টকে অবশ্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কিছু সংখ্যক লোকের মধ্যে উদারতাবাদের যে ঝোঁক রয়েছে তার বিরোধিতা করতে হবে এবং তাঁদেরকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে হবে। এটাই হচ্ছে আমাদের মতাদর্শগত ফ্রন্টের অন্যতম কর্তব্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রবন্ধটি লেখা হয় ৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৭। মাও সেতুঙ-এর নির্বাচিত রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, নবজাতক প্রকাশন, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, ১ মে ১৯৬০; পৃষ্ঠা ৩৮-৪১ থেকে এখানে সংকলিত এবং রোদ্দুরের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!