ভূমিকা: রাজ ঢেকিয়া (বৈজ্ঞানিক নাম: Angiopteris evecta) হচ্ছে এশিয়ার ভেষজ উদ্ভিদ। এর পাতা, মূলে নানা ভেষজ গুণ আছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে অনায়াসে জন্মাতে পারে।
| বিষয়ের নাম | বিবরণ |
|---|---|
| বাংলা নাম | রাজ ঢেঁকিয়া বা ঢেকিয়া শাক |
| ইংরেজি নাম | কিং ফার্ন (King Fern) |
| বৈজ্ঞানিক নাম | Angiopteris evecta (Forst) Hoffm. |
| সমনাম (Synonym) | Polypodium evectum Forst |
রাজ ঢেকিয়া-এর বর্ণনা:
বনের স্যাঁতসেঁতে এবং ছায়াময় মাটিতে জন্মানো একটি অত্যন্ত পরিচিত ও সহজলভ্য উদ্ভিদের নাম স্থলজ ফার্ন। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এই ফার্নটির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
- আকার ও কাণ্ড: এই উদ্ভিদের কাণ্ড বা গ্রন্থিক সাধারণত মাটির ওপর খাড়া অবস্থায় থাকে এবং এটি প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত পুরু বা মোটা হতে পারে।
- পত্রদণ্ড ও পাতা: এর পত্রদণ্ড বেশ লম্বা হয়, যা সাধারণত ১০০ থেকে ১৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। কখনো কখনো এটি আরও বেশি লম্বা হয়। এর মসৃণ ও সবুজ রঙের ডাঁটায় চমৎকার সাদাটে আঁকাবাঁকা ডোরাকাটা দাগ দেখা যায়।
- পাতার গঠন: ফার্নটির পাতাগুলো দ্বিপক্ষল (Bipinnate) প্রকৃতির। সাধারণত পাতাগুলো ২০-৪০ সেমি লম্বা এবং ২-৪ সেমি চওড়া হয়ে থাকে। এর সবুজ পত্রাক্ষ বা মাঝখানের ডাঁটার নিচের অংশে হালকা আঁশ বা রোম থাকে।
- পত্রকের বৈশিষ্ট্য: পাতার পত্রকগুলো ১২-১৮ সেমি লম্বা এবং ২-৪ সেমি চওড়া হয়। এগুলো ২-৩ সেমি দূরত্বে চমৎকারভাবে সাজানো থাকে। এর চামড়ার মতো মসৃণ ও চকচকে পাতার ওপরের অংশ বেশ কোমল ও আকর্ষণীয় দেখায়। পাতার প্রান্ত বা কিনারাগুলো খাঁজকাটা বা করাত আকৃতির হয়ে থাকে।
প্রজনন ও বৈজ্ঞানিক তথ্য (সোরাস ও রেণু)
এই ফার্ন উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি বেশ চমৎকার। পাতার নিচের দিকে প্রান্ত থেকে প্রায় ১ মিলিমিটার দূরে গোল করে সাজানো সোরাস (Sorus) বা রেণুথলি দেখা যায়। প্রতিটি থলিতে সাধারণত ৭ থেকে ১৪টি রেণুস্থলী থাকে। মাইক্রোস্কোপিক গঠনে এর রেণুগুলো ডিম্বাকার বা গোলাকার এবং রঙে হলুদ থেকে বাদামী হয়ে থাকে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই ফার্নের ক্রোমোসোম সংখ্যা (Chromosome number) সাধারণত ২n = ৮০ অথবা ১৬০ হয়ে থাকে।
আবাসস্থল:
এই স্থলজ ফার্নটি সাধারণত স্যাঁতসেঁতে, আর্দ্র এবং শীতল পরিবেশে সবচেয়ে ভালো জন্মে। প্রকৃতির এই সুন্দর উদ্ভিদটিকে মূলত বনের ভেতরের ছায়াময় নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে অথবা পাহাড়ি অঞ্চলের চড়াই-উতরাই ও ঢালু মাটিতে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। সরাসরি কড়া সূর্যালোকের চেয়ে ছায়াঘেরা এবং আর্দ্র মাটিই এদের বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
রাজ ঢেকিয়া-এর বিস্তৃতি:
এই ফার্ন প্রজাতিটি বিশ্বজুড়ে একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। বৈশ্বিক জলবায়ুর নিরিখে এদের মূলত মাদাগাস্কার এবং সমগ্র গ্রীষ্মমন্ডলীয় এশিয়ায় দেখা যায়। এ ছাড়া, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পলিনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জের বনাঞ্চলেও এই উদ্ভিদের সুষম উপস্থিতি রয়েছে।
বাংলাদেশে এই প্রজাতির অবস্থান:
আমাদের দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ু এই ফার্নের বেঁচে থাকার জন্য বেশ উপযোগী। বাংলাদেশে মূলত পাহাড়ি ও চিরহরিৎ বনাঞ্চল সমৃদ্ধ জেলাগুলোতে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। দেশের যেসব অঞ্চলে এটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, সেগুলো হলো—
- চট্টগ্রাম: পার্বত্য ও পাহাড়ি ছায়াময় অঞ্চলের বনাঞ্চলে।
- কক্সবাজার: সমুদ্র উপকূলবর্তী আর্দ্র এবং বনের ভেতরের ঢালু মাটিতে।
- সিলেট: চিরসবুজ বন, চা-বাগানের আশপাশের ছায়াযুক্ত এলাকা এবং নদীর তীরে।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
রাজ ঢেঁকিয়া বা রাজ ঢেকিয়া (Angiopteris evecta) শুধু একটি বন্য উদ্ভিদই নয়, বরং এর কিছু বিশেষ ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। এই প্রজাতির ফার্নের প্রধান কিছু ব্যবহার নিচে তুলে ধরা হলো:
- জরুরি খাদ্য উৎস হিসেবে: এই উদ্ভিদের গোড়ার দিকের উপপত্র বা বিশেষ অংশে প্রচুর পরিমাণে শর্করা (Carbohydrates) সঞ্চিত থাকে। সাধারণ সময়ে এটি নিয়মিত না খাওয়া হলেও, তীব্র খাদ্যাভাব বা দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ জীবনধারণের জন্য এটি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
- অ্যালকোহল তৈরিতে: রাজ ঢেঁকিয়ার উপপত্রে থাকা শর্করা বা স্টার্চের কারণে এটি স্থানীয়ভাবে অ্যালকোহল বা মদ চোলাই করার প্রক্রিয়ায় অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার:
ঐতিহ্যগত চিকিৎসা বা লোকজ চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের গ্রন্থিকন্দ (Rhizome) এবং পাতার বৈচিত্র্যময় ব্যবহার রয়েছে। বিভিন্ন দেশে রোগ নিরাময়ে এটি যেভাবে ব্যবহৃত হয়:
- রক্তক্ষরণ বন্ধে: প্রসব বা গর্ভপাতের পর নারীদের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এই উদ্ভিদের গ্রন্থিকন্দ থেকে তৈরি ক্বাথ (Decoction) ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া, বিশেষ করে কোনো বিষক্রিয়ার কারণে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হলে, রোগীর চিকিৎসায় এই গ্রন্থিকন্দ পানের পাতা ও আদার সাথে চিবিয়ে খাওয়ানো হয়ে থাকে।
- বেরিবেরি রোগের চিকিৎসায়: ভিটামিনের অভাবজনিত বেরিবেরি রোগ নিরাময়ে এর বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। এই উদ্ভিদের গ্রন্থিক বা কন্দ সবুজ শিমের সাথে একসাথে সিদ্ধ করে বেরিবেরি রোগীর পথ্য হিসেবে দেওয়া হয়।
- উত্তেজক পানীয় তৈরিতে: ঔষধি ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো দেশের স্থানীয় সংস্কৃতিতে এর পাতা এবং গ্রন্থিকন্দ এক ধরণের বিশেষ মাদক বা উত্তেজক পানীয় তৈরিতে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
রাজ ঢেকিয়া-এর বংশবিস্তার:
এই ফার্ন উদ্ভিদের প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার প্রক্রিয়া কিছুটা ধীরগতির হলেও কৃত্রিম বা অঙ্গজ উপায়ে এটিকে খুব সহজেই নতুন উদ্ভিদে রূপান্তর করা সম্ভব। এর প্রধান বংশবিস্তার পদ্ধতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- প্রাকৃতিক বংশবিস্তার (রেণু ও গ্রন্থিক): প্রজাতিটি মূলত এর গ্রন্থিক এবং রেণুর (Spores) মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে। তবে রেণুর মাধ্যমে নতুন চারা গজানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়।
- অঙ্গজ বংশবিস্তার ও উপপত্রের ব্যবহার: এই ফার্নের ক্ষেত্রে রেণুর চেয়ে অঙ্গজ বংশবিস্তার বেশি কার্যকর। এর উপপত্রের (Stipule) ওপর জন্মানো অস্থানিক মুকুলের মাধ্যমে দ্রুত নতুন চারা তৈরি করা যায়। নতুন চারা গজানোর জন্য উপপত্রের কাটা অংশ ব্যবহার করা হয়।
- মাটি প্রস্তুত ও চারা রোপণ: এর স্ফীত বা মোটা গোড়া থেকে গজানো কচি চারা কেটে উর্বর দো-আঁশ মাটিতে রোপণ করা যায়, যেখানে প্রচুর জৈববস্তু বা হিউমাস রয়েছে। এ ছাড়া, উপপত্রের কাটা অংশটি সরাসরি মিশ্র জৈব সারযুক্ত মাটিতে অথবা আর্দ্র ও ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে রোপণ করলেও দ্রুত নতুন উদ্ভিদ জন্মায়।
অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৫ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) রাজ ঢেকিয়া প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে রাজ ঢেকিয়া সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
আরো পড়ুন
- মহিচরণ শাকের জাদুকরী ঔষধি গুণাগুণ: ক্ষত নিরাময় ও স্কার্ভি রোগে এই ভেষজের ঘরোয়া ব্যবহার
- গাদাবানি বা লাবুনী শাকের পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা
- ঢেকিয়া শাক বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো জনপ্রিয় শাক
- বথুয়া শাক বাংলাদেশে জন্মানো সহজলভ্য ও ভেষজ প্রজাতি
- বাংলাদেশের শাক-বৈচিত্র্য: ৫৫টি পরিচিত ও বুনো শাকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
- পাট শাক বা পাট পাতা বহুবিধ পুষ্টিগুণ, খাদ্যমান ও চাষ পদ্ধতি
- চালকুমড়া এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি জনপ্রিয় শাক ও সবজি
- ধনে বা ধনিয়া এশিয়ার একটি সুগন্ধি ঔষধি উদ্ভিদ
- পানি কর্পূর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বর্ষজীবী উদ্ভিদ
- ধনিয়া বা ধনে পাতার দশটি কার্যকরী ঔষধি ব্যবহার
তথ্যসূত্র:
১. মমতাজ মহল মির্জা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৫ম, পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Krzysztof Ziarnek, Kenraiz
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।