গিরিশোভন শাকের পরিচিতি, ঔষধি গুণ ও ভেষজ ব্যবহার: বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের এক বিরল উদ্ভিদের সন্ধান

ভূমিকা: গিরিশোভন শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Ampelygonum salarkhanii) হচ্ছে এশিয়ার ভেষজ উদ্ভিদ। এর পাতা, মূলে নানা ভেষজ গুণ আছে। এছাড়াও শাক হিসাবে খাওয়া হয়।

বিষয়ের নামবিবরণ ও তথ্য
অফিসিয়াল বৈজ্ঞানিক নামAmpelygonum salarkhanii Hassan
প্রথম প্রকাশ ও সাইটেশনBangladesh J. Bot. 20 (2): 245 (১৯৯১ সাল)
আন্তর্জাতিক ইংরেজি নামHilly Smartweed (হিলি স্মার্টউইড)
স্থানীয় বা প্রচলিত নামগিরিশোভন শাক, গুল্মগিরিশোভন শাক

গিরিশোভন শাক-এর বর্ণনা:

এই উদ্ভিদটি মূলত একটি বর্ষজীবী এবং ঝোপালো প্রকৃতির ছোট আকারের গুল্ম জাতীয় গাছ। এর মূল কাণ্ডটি বেশ মজবুত ও খাড়া হয়ে থাকে।

  • কাডের আকার ও রঙ: এর প্রধান কাণ্ডটি লম্বায় সাধারণত ২ মিটার বা তার চেয়েও বেশি দীর্ঘ হতে পারে। কাণ্ডের একদম গোড়ার বা পাদদেশের অংশটি ২ সেন্টিমিটার বা তার চেয়েও বেশি মোটা হয়ে থাকে। এটি দেখতে সুন্দর সবুজ এবং মসৃণ প্রকৃতির হয়।
  • শাখা-প্রশাখা: প্রধান কাণ্ড থেকে যে সব গৌণ বা উপ-শাখা বের হয়, সেগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সরু বা চিকন হয়ে থাকে।

পাতার চমৎকার গঠন ও রূপ

এই গুল্ম জাতীয় গাছের পাতাগুলো সুবিন্যস্ত এবং বেশ স্পষ্ট আকৃতির হয়ে থাকে:

  • বৃন্ত ও সাইজ: পাতাগুলোতে স্পষ্ট বোঁটা বা পত্রবৃন্ত থাকে, যা প্রায় ১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা ও মসৃণ হয়। পাতার গোড়ার দিকে কখনো কখনো সমান বা অসমান দুটি জোড় বা সন্ধি লক্ষ্য করা যায়। এর মূল পাতার ফলকটি লম্বায় ও চওড়ায় সর্বোচ্চ ১৪ X ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
  • রঙ ও আকৃতি: পাতাগুলোর ওপরের পিঠ গাঢ় সবুজ রঙের এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থিযুক্ত হয়। তবে পাতার নিচের পিঠটি বেশ চকচকে দেখায়। পাতার আকৃতি দীর্ঘায়ত থেকে দীর্ঘায়ত-ভল্লাকার হয়ে থাকে, যার গোড়ার দিকটা কিছুটা হৃৎপিণ্ডাকার, খাতাগ্র বা কদাচিৎ গোলাকার হয় এবং এর শেষ প্রান্ত বা শীর্ষভাগ বেশ সুচালো (তীক্ষ্ণ থেকে দীর্ঘাগ্র) প্রকৃতির হয়। পাতার চারপাশের কিনারা সম্পূর্ণ অখণ্ড বা সামান্য কুঞ্চিত থাকে।
  • Ocrea বা উপপত্র: পাতার গোড়ায় ঝিল্লিময় ও কর্তিত আকৃতির উপপত্র (Ocrea) থাকে, যা ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা ও মসৃণ হতে পারে। এটি ক্ষুদ্র গ্রন্থিযুক্ত এবং সিলিয়াবর্জিত (সূক্ষ্ম রোমহীন) হয়। গাছটি যখন পূর্ণ বয়সে পৌঁছায়, তখন এই উপপত্রের প্রান্তভাগ কিছুটা ছিন্ন বা ছেঁড়া দেখায়।

পুষ্পমঞ্জরী ও ফুলের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস

গাছটির ফুল ফোটার বিন্যাস বা পুষ্পমঞ্জরীটি দেখতে মুণ্ডাকার হয়ে থাকে।

  • মঞ্জরীদণ্ড: এর মঞ্জরীদণ্ডটি শাখান্বিত এবং খর্বাকার প্রকৃতির হয়। এর গায়ে বহুকোষী নরম সাদা রোম অথবা বিশেষ বৃন্তক গ্রন্থি স্পষ্ট দেখা যায়। ফুলটিকে ঘিরে থাকা রক্ষাকারী আবরণ বা Ocreolae-গুলো ভল্লাকার ও মসৃণ হয়, যার পরিমাপ প্রায় ৪.২ X ১.১ মিলিমিটার।
  • ফুলের রূপ ও পুংকেশর: ফুলগুলো স্পষ্ট বোঁটাযুক্ত (বৃন্তক) হয় এবং এর বোঁটা প্রায় ৪ মিলিমিটারের মতো লম্বা ও কিছুটা বাইরের দিকে বের হওয়া থাকে। ফুলে ৫টি পুষ্পপুট থাকে, যা লম্বায় ৩.৫ থেকে ৪.০ মিলিমিটার এবং ধবধবে সাদা রঙের হয়।
  • জনন অঙ্গ: ফুলটিতে মোট ৮টি পুংকেশর থাকে। লম্বা ও খাটো গর্ভদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে পুংকেশর ও গর্ভকেশরগুলোর দৈর্ঘ্য ও অবস্থান (অন্তর্গত বা বহির্গামী) ভিন্ন ভিন্ন হয়। এর পরাগধানীটি দেখতে আকর্ষণীয় বেগুনি থেকে গোলাপী রঙের মিশ্রণে তৈরি হয়। এর ৩টি তলবিশিষ্ট গর্ভাশয়ের গর্ভকেশরগুলো বেশ স্পষ্ট।

ফল, বীজ ও জিনগত তথ্য

ফুল ঝরে যাওয়ার পর এই গুল্মে চমৎকার এক ধরনের বেরি বা ব্যাক্কেটের মতো রসাল ফল ধরে।

  • ফলের রূপ ও রঙ: এর ফলগুলো আকারে প্রায় ৪ X ৪ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফলের সাথে যুক্ত থাকা পুষ্পপুটটি প্রায় ১ মিলিমিটার পুরু এবং সম্পূর্ণ পরিপক্ব বা পাকা অবস্থায় এটি দেখতে চমৎকার পিচ ফলের মতো কালো রঙ ধারণ করে।
  • বীজ (Nut): ফলের ভেতরের নাট বা বীজটি ৩ X ২ মিলিমিটার আকারের এবং ৩টি তলবিশিষ্ট হয়। এটি কুচকুচে কালো রঙের ও জালিকাময় আকৃতির হয়ে থাকে। রসাল পুষ্পপুটের সাথে এটি অত্যন্ত ক্ষীন একটি আবরণ দিয়ে যুক্ত থাকে।
  • ক্রোমোসোম সংখ্যা: জিনগত বা সাইটোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা সাধারণত 2n = ২৪ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

এই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদটি মূলত উচ্চ ও ঢালু অঞ্চলে জন্মাতে পছন্দ করে। প্রাকৃতিকভাবে এটি প্রধানত পার্বত্য বা পাহাড়ী এলাকা এবং পাহাড়ের আর্দ্র ও ছায়াময় বনাঞ্চলে সবচেয়ে ভালো জন্মায় ও স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।

ফুল ও ফল ধারণের সময়কাল

বছরের একটি নির্দিষ্ট শীতল ঋতুতে এই উদ্ভিদের জীবনচক্রে ফুল ও ফল উৎপাদনের ধুম পড়ে। সাধারণত শরৎকাল থেকে শুরু করে শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত, অর্থাৎ অক্টোবর মাস থেকে শুরু করে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এই গাছে ফুল ফোটার এবং ফল পরিপক্ব হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

সহজ বংশবিস্তার ও প্রজনন পদ্ধতি

এই পাহাড়ি উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি বা নতুন চারা তৈরি করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও কার্যকর। মূলত দুটি প্রধান উপায়ের মাধ্যমে এই গাছের সফল প্রজনন ও বংশ বিস্তার ঘটানো সম্ভব:

  • বীজের মাধ্যমে: ফলের ভেতর থাকা সুস্থ, পরিপক্ব ও কালো রঙের বীজ সংগ্রহ করে মাটিতে রোপণ করলে সহজেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।
  • কর্তিত কাণ্ডের মাধ্যমে: এছাড়া গাছের পরিপক্ব ডাল বা কাণ্ড কেটে (Stem Cuttings) মাটিতে রোপণ করার মাধ্যমেও অত্যন্ত দ্রুত চারা তৈরি করা যায়।

গিরিশোভন শাক-এর বিস্তৃতি:

আন্তর্জাতিক মানচিত্রের দিক থেকে বিচার করলে, এই পাহাড়ি গুল্ম উদ্ভিদটি মূলত এশিয়ার তিনটি প্রধান দেশে প্রাকৃতিকভাবে বিস্তৃত। এটি প্রাকৃতিকভাবেই ভারত, চীন এবং মায়ানমারের চিরসবুজ পাহাড়ি বনাঞ্চল ও উপ-ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে স্বাচ্ছন্দ্যে জন্মে ও টিকে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও নির্দিষ্ট বাসস্থান

আমাদের বাংলাদেশে এই প্রজাতিটির উপস্থিতি অত্যন্ত অনন্য এবং এটি নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ:

  • প্রধান অঞ্চল: বাংলাদেশে এই উদ্ভিদটি মূলত দেশের অন্যতম দুর্গম পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের বিভিন্ন বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়।
  • বিশেষ আকর্ষণ চিম্বুক পাহাড়: বান্দরবানের বিখ্যাত ও অন্যতম উঁচু পাহাড় চিম্বুক পাহাড়ের (Chimbuk Hill) ঢাল এবং এর চারপাশের ছায়াময় আর্দ্র পরিবেশ এই বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য প্রধান আশ্রয়স্থল।

জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

বান্দরবানের পাহাড়ি বনাঞ্চলে বসবাসকারী স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সাথে এই গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তারা তাদের দৈনন্দিন ও পারিবারিক প্রয়োজনে এই গাছটিকে মূলত দুটি প্রধান উপায়ে ব্যবহার করে থাকেন:

  • পুষ্টিকর খাদ্য বা শাক হিসেবে:
    পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা এই উদ্ভিদের একদম কচি ও তাজা পাতাগুলো সংগ্রহ করে অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবুজ শাক হিসেবে রান্না করে খেয়ে থাকেন। এটি তাদের ঐতিহ্যগত খাদ্যতালিকার একটি অন্যতম উপাদান।
  • জ্বালানি বা গৃহস্থালি কাজে:
    গাছটির প্রধান কাণ্ড ও ডালপালাগুলো বেশ শক্ত হওয়ায়, এগুলো শুকিয়ে যাওয়ার পর আদিবাসীরা তাদের দৈনন্দিন রান্নাবান্নার কাজে অত্যন্ত কার্যকরী প্রাকৃতিক জ্বালানি (Firewood) হিসেবে ব্যবহার করেন। গ্রামীণ ও পাহাড়ি অর্থনীতিতে এই সহজলভ্য জ্বালানি কাঠ বেশ সাশ্রয়ী ভূমিকা পালন করে।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) গিরিশোভন শাক প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে গিরিশোভন শাক সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র:

১. এম এ হাসান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ৪১৯-৪২০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

Leave a Comment

error: Content is protected !!