ব্যাকটেরিয়া নাশক ও বাতের চিকিৎসায় অনন্য এক উদ্ভিদ: জেনে নিন এর চমৎকার ওষুধি গুণ

ভূমিকা: বন জাম (বৈজ্ঞানিক নাম: Ardisia solanacea) হচ্ছে এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের ভেষজ উদ্ভিদ। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই গাছ জন্মে। শোভাবর্ধনের জন্যও লাগানো হয়।

স্তর (Rank)বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name)বাংলা নাম / পরিচয়
জগৎ / রাজ্যPlantaeউদ্ভিদ জগৎ
বিভাগTracheophytesভাস্কুলার উদ্ভিদ (নালিকাযুক্ত)
অবিন্যাসিতAngiospermsসপুষ্পক উদ্ভিদ
অবিন্যাসিতEudicotsপ্রকৃত দ্বি-বীজপত্রী
বর্গEricalesএরিকেলস
পরিবারPrimulaceaeপ্রিমুলেসি (নাউ নুয়ার বা বন জাম গোত্রীয়)
গণArdisiaআরডিসিয়া
প্রজাতিA. solanaceaআরডিসিয়া সোলানেসিয়া

বন জাম-এর বর্ণনা:

গাছের গঠন ও পাতার বৈশিষ্ট্য: এই উদ্ভিদটি মূলত একটি বৃহদাকার চিরহরিৎ (Evergreen) গুল্ম শ্রেণীর প্রজাতি। অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে এই গাছটি উচ্চতায় প্রায় ৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।

গাছের পাতাগুলোর গঠন ও বিন্যাস বেশ সুনির্দিষ্ট। এক একটি পাতার দৈর্ঘ্য সাধারণত ৮ থেকে ২০ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাতাগুলো দেখতে বি-ডিম্বাকার (Obovate), দীর্ঘায়িত (Oblong) বা উপবৃত্তাকার (Elliptic) আকৃতির হয়ে থাকে। পাতার অগ্রভাগ বা শীর্ষ বেশ তীক্ষ্ণ বা দীর্ঘ সুঁচালো (দীর্ঘাগ্র) প্রকৃতির হয় এবং এর পাদদেশ বা গোড়ার অংশটি ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে আসে। পাতাগুলো অখণ্ড (মসৃণ কিনারাবিশিষ্ট) এবং এর টেক্সচার স্পর্শে চার্মবৎ (Coriaceous) বা চামড়ার মতো হয়ে থাকে। এর পাতার বোঁটা বা বৃন্ত লম্বায় ১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

পুষ্পবিন্যাস ও ফুলের অভ্যন্তরীণ গঠন: এই উদ্ভিদের ফুল ফোটার বিন্যাস ও এর ভেতরের প্রজনন অঙ্গের গঠন বেশ আকর্ষণীয় ও জটিল। এর বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • পুষ্পবিন্যাস ও মঞ্জরীদণ্ড: এর পুষ্পমঞ্জরীটি দূরবর্তী কাক্ষিক (Distant axillary) ছত্রমঞ্জরীবৎ অনিয়তাকার বা সাধারণ ছত্রমঞ্জরী (Umbel) বিন্যাসে সজ্জিত থাকে। এর মূল মঞ্জরীদণ্ডটি (Peduncle) বেশ লম্বা—১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর মঞ্জরীপত্র বা ব্র্যাক্টগুলো অবতল ও আশুপাতী (ঝরে পড়ে) প্রকৃতির হয়।
  • ফুলের রঙ ও মাপ: এর ফুলগুলো আকারে আড়াআড়িভাবে ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফুলগুলোর রঙ চমৎকার গোলাপী বা গোলাপী-সাদা মিশ্রিত হয় এবং এর পুষ্পবৃন্তিকা বা ফুলের বোঁটা ১.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
  • বৃতি ও দলমন্ডল: ফুলের বৃতিটি ৫টি খণ্ডে খণ্ডিত, অবতল এবং সচরাচর গোলাকৃতির হয়। বৃতিখণ্ডগুলো আকারে ৩ × ২.৫ মিলিমিটার, চর্মবৎ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিলিয়াযুক্ত (ক্ষুদ্র রোমশ কিনারাবিশিষ্ট) ও স্থায়ী (Persistent) প্রকৃতির হয়। এর দলমন্ডল বা পাপড়ির খণ্ডকও ৫টি থাকে, যা আকারে ১০ × ৭ মিলিমিটার হয়। পাপড়িগুলো ডিম্বাকার, তীক্ষ্ণ, চর্মবৎ এবং এর পাদদেশে বা গোড়ার দিকে কিছুটা যুক্ত থাকে। পাপড়ির মূল আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর গায়ে কালো বিন্দু বিন্দু দাগ স্পষ্ট দেখা যায়।
  • পুংকেশর ও গর্ভাশয়: ফুলে মোট ৫টি পুংকেশর থাকে, যা গর্ভদণ্ডের চারপাশ ঘিরে (চতুর্পালগ্ন) অবস্থান করে এবং এর বাইরের দিকটা উন্মুক্ত থাকে। এর পুংদণ্ডগুলো প্রায় ১ মিলিমিটার লম্বা এবং পরাগধানীটি প্রায় ৭ মিলিমিটার লম্বা, স্থূল ও সরু বাণাকার (Sagittate) আকৃতির হয়। উদ্ভিদের গর্ভাশয়টি গোলকাকার, আকারে ৩ × ২ মিলিমিটার এবং এর ভেতরে ডিম্বকের সংখ্যা অনেক থাকে। এর গর্ভদণ্ডটি একদম খাড়া এবং প্রায় ৭ মিলিমিটার লম্বা হয়ে থাকে।

ফলের আকৃতি ও ক্রোমোজোম সংখ্যা: এই উদ্ভিদের ফলটি মূলত একটি বেরী (Berry) জাতীয় ফল। ফলগুলো আকারে ৭ থেকে ১০ মিলিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট এবং অবনত গোলকাকার (Depressed globose) প্রকৃতির হয়। ফলগুলো কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকলেও, পরিপক্ব বা পাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ কালো বর্ণ ধারণ করে। ফলের অগ্রভাগে বা মাথায় গর্ভদণ্ডের অবশিষ্টাংশ এবং পাদদেশে বা বোঁটার গোড়ায় স্থায়ী বৃতিটি চমৎকারভাবে সংযুক্ত থাকে। ফলের ভেতরে থাকা বীজটি গোলকাকার এবং এর ভেতরের সস্য বা এন্ডোস্পার্ম বেশ চর্বনযোগ্য (Ruminate) প্রকৃতির হয়ে থাকে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের গবেষণামতে, এর ক্রোমোজোম সংখ্যা হলো ২n = ৪৬।

আবাসস্থল:

অনুকূল পরিবেশ ও অরণ্যের প্রকৃতি: এই বন্য ও চিরহরিৎ গুল্ম প্রজাতিটি শুষ্ক বা অতিরিক্ত রোদযুক্ত পরিবেশের চেয়ে আর্দ্র ও শীতল আবহাওয়া বেশি পছন্দ করে। এটি প্রধানত প্রাকৃতিক অরণ্যের মধ্যে ছায়াযুক্ত এবং স্যাঁতসেঁতে স্থানে প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। বনের ভেজা মাটি, ঘন গাছের পাতার ছায়া এবং আর্দ্র জলবায়ু এই উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

ফুল ও ফল ধারণের মৌসুম: এই উদ্ভিদের প্রজনন ও ফলন চক্রটি বছরের প্রথমার্ধে আবর্তিত হয়। গাছটিতে সাধারণত জানুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল ধারণ প্রক্রিয়া চলে। এই নির্দিষ্ট সময়ে গাছে দূরবর্তী কাক্ষিক ছত্রমঞ্জরীতে গোলাপী বা গোলাপী-সাদা রঙের ফুল ফোটে এবং পরবর্তী সময়ে তা পরিপক্ব হয়ে ৭-১০ মিলিমিটার ব্যাসের কালো রঙের গোলাকার বেরী ফলের রূপ ধারণ করে।

বিস্তৃতি:

বৈশ্বিক ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা: এই বন্য গুল্ম প্রজাতিটি আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এটি প্রধানত শ্রীলংকা, সমগ্র ভারত থেকে শুরু করে গ্রীষ্মপ্রধান হিমালয়ের পাদদেশ, পাকিস্তান, মায়ানমার, চীন এবং মালয়েশিয়ার আর্দ্র ও পাহাড়ি বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। বিশেষ করে হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চলের শীতল ও স্যাঁতসেঁতে জলবায়ু এবং মালয়েশিয়ার ঘন চিরহরিৎ অরণ্য এই উদ্ভিদের প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত অনুকূল।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সুনির্দিষ্ট অঞ্চল: আমাদের বাংলাদেশে এই উদ্ভিদটি সমতল ভূমিতে সচরাচর দেখা যায় না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট চিরসবুজ পাহাড়ি বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক রেকর্ড অনুযায়ী, ইহা বাংলাদেশে সুনির্দিষ্টভাবে সিলেট জেলা থেকে রিপোর্ট বা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সিলেটের চিরহরিৎ ও মিশ্র পাহাড়ি অরণ্যের ভেতরের ছায়াযুক্ত ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এই বন্য প্রজাতিটির টিকে থাকার প্রধান আশ্রয়স্থল।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

ফার্মাকোলজিক্যাল ও বায়বীয় অংশের গুণাগুণ: আধুনিক উদ্ভিদতাত্ত্বিক ও ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণায় এই উদ্ভিদের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। এই উদ্ভিদটির বায়বীয় অংশের ইথানল নির্যাসে এসিটাইলকোলাইন (Acetylcholine) এর প্রভাব প্রতিরোধী গুণাবলী বর্তমান [EEAT]। এছাড়া ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এটি শরীরে প্রাকৃতিকভাবে শক্তি জোগাতে চমৎকার বলবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং পরিপাকতন্ত্রের রোগ উপশমে পাকস্থলীর বায়ুনাশক (Carminative) গুণাবলী সম্পন্ন।

শিকড় ও পাতার প্রথাগত ওষুধি ব্যবহার: রোগ নিরাময়ে এই উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশের বহুল ব্যবহার রয়েছে:

  • শিকড়ের ভেষজ গুণ: লোকজ চিকিৎসায় কালো বেরী ফলযুক্ত এই উদ্ভিদের শিকড় মূলত তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া এবং বাতের ব্যথা (Rheumatism) নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।
  • পাতার ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ক্ষমতা: ল্যাবরেটরি গবেষণায় দেখা গেছে, ষ্টেরল (Sterol) ব্যতিত এই উদ্ভিদের পাতার অন্যান্য উপাদানসমূহ অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া প্রতিষেধক (Antibacterial) কার্যাবলী প্রদর্শন করে [EEAT]। ফলে এটি বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ রোধে বেশ কার্যকর।

অর্থনৈতিক, রঞ্জক ও শোভাবর্ধনকারী গুরুত্ব: প্রাকৃতিক রঙ তৈরি: এই উদ্ভিদের পরিপক্ব ফলগুলো কেবল পাখির খাদ্যই নয়, বরং হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পে প্রাকৃতিক হলুদ রং প্রস্তুত করতে ইহার ফল ব্যবহার করা হয়।

  • বাগানের সৌন্দর্যবর্ধন: এর চমৎকার আকর্ষণীয় চিরসবুজ পাতা, গোলাপী-সাদা ফুল এবং থোকা থোকা কালো ফলের সৌন্দর্যের কারণে বর্তমানে এই প্রজাতিটি বাগানে শোভাবর্ধনকারী (Ornamental Plant) উদ্ভিদ হিসেবেও লাগানো হয়।

⚠️ জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা (Disclaimer):
যদিও বিভিন্ন লোকজ সংস্কৃতি, ফার্মাকোলজিক্যাল নির্যাস ও প্রথাগত চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের মূল, পাতা ও বায়বীয় অংশের নানাবিধ ওষুধি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তবুও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর কোনো অংশ সরাসরি গ্রহণ করা মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা বাতের মতো জটিল সমস্যায় কোনো ভেষজ টোটকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে সর্বদা একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের (Registered Physician) পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বন জাম প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আবাসস্থল ধ্বংসের জন্য এই প্রজাতিটি বাংলাদেশে সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বন জাম সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে অবস্থান নির্ধারণ করে যথাস্থানে সংরক্ষণ প্রয়োজন।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র ও টীকা:

১. এ বি এম রবিউল ইসলাম ও এ বি এম এনায়েত হোসেন (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৯ম, পৃষ্ঠা ২৬৮-২৬৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৩০ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dinesh Valke

Leave a Comment

error: Content is protected !!