ভূমিকা: বড়কুচ ( বৈজ্ঞানিক নাম: Micromelum minutum) হচ্ছে এশিয়ার ভেষজ প্রজাতি। এই প্রজাতিটি বাংলাদেশের ঝোপে জঙ্গলে দেখা যায়।
বড়কুচ-এর বর্ণনা :
ছোট থেকে মধ্যম আকৃতির, কন্টকহীন বৃক্ষ, ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু, ছোট শাখা এবং কুঁড়ি ঘনভাবে খাটো- রোমশ। পত্র একান্তর, সচূড়পক্ষল, ৩০ সেমি পর্যন্ত লম্বা, পত্রক ৯-১৫টি, একান্তর, ডিম্বাকার-বল্লমাকার থেকে ডিম্বাকার, ৩-১২ × ১.৫-৬.০ সেমি, গোড়া স্থূলাগ্র এবং অসম, শীর্ষ সরু-দীর্ঘাগ্র, প্রান্ত অখন্ডিত থেকে অনিয়মিতভাবে তরঙ্গায়িত-দপ্তর। পুষ্পবিন্যাস শীর্ষক, সাইম সদৃশ-প্যানিকল। পুষ্প উভলিঙ্গ, ৫-অংশক। বৃতি পেয়ালাকার, অগভীরভাবে ৫-দন্তর। পাপড়ি ৫টি, প্রান্তস্পর্শীয়, রেখাকার-আয়তাকার, ৭.০ × ১.৫ মিমি, বহির্ভাগ ঘনভাবে চাপা রোমাবৃত, ফিকে সবুজ থেকে হলুদাভ-সাদা। পুংকেশর ১০টি, পুংদন্ড রেখাকার, ৪-৬ মিমি লম্বা, পরাগধানী উপবৃত্তীয়, প্রায় ২ x ১ মিমি, অস্পষ্টভাবে এবং অনুদৈর্ঘ্য খাঁজযুক্ত, প্রায় রোমশ, ৫- প্রকোষ্ঠী। গর্ভদন্ড বেলনাকার, রোমহীন, গর্ভমুন্ড প্রায় ১ × ১ মিমি, মুন্ডাকার, কোষ একটি ঝুলন্ত ডিম্বকযুক্ত। ফল উপবৃত্তীয়, আয়তাকার বেরী, প্রায় ১৫ × ৭ মিমি, পাকলে কমলা বা লালাভ, অন্ত: ত্বক রসালো, শ্লেষ্মাসদৃশ, সাদা, ২- ৩ বীজী। বীজ রোমহীন, পাকলে হলুদ থেকে লাল, বীজপত্র চ্যাপ্টা এবং পাকানো। ক্রোমোসোম সংখ্যা: জানা নেই।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
প্রাথমিক এবং গৌণ বনাঞ্চল, সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০০ মিটার। ফুল ও ফল ধারণ সারা বর্ষব্যাপী। বংশ বিস্তার হয় বীজ দ্বারা।
বিস্তৃতি :
ভারত, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং প্যাসিফিক। বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর এবং শেরপুর জেলার বনে পাওয়া যায়।
বড়কুচ-এর ব্যবহার:
পাতা এবং মূল জ্বরের ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূলের থেতলানো বা সিদ্ধ কাথ শিশুর ডায়রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, এবং পাকস্থলীয় বায়ুনাশক। দক্ষিণ সুমাত্রায় মূলের টুকরা কাশির জন্য পানের সাথে চিবিয়ে খাওয়া হয়। জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার হলো পেনিনসুলার মালয়েশিয়ায় পত্রের চূর্ণ চামড়ার চুলকানিত প্রলেপ দেয়া হয় এবং মূল সিদ্ধ পালাজ্বরে প্রলেপ দেয়া হয়। ফিলিপাইনে অপরিণত বিটপ তেলের সাথে গরম করে শিশুদের স্নায়ুবিক আক্ষেপের ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইন্দো-চীনে স্ক্যাবিস-এর কারণে উত্তেজনা নির্মূলে চামড়ায় পত্রের প্রলেপ দেয়া হয়। ফিজিতে পাতা বা ছোট শাখার অভ্যন্তরীণ বাকল বিভিন্নভাবে মাথা ব্যথা এবং পাকস্থলী-ব্যথায়, কাশি নিমূলে এবং জিহ্বার ক্ষতে, অতিরিক্ত রক্ত:স্রাব নিয়ন্ত্রনে, গনোরিয়া চিকিৎসায় এবং শিশুদের গলার রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১০মখণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বড়কুচ প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অধিক মাত্রায় উদ্ভিদ ব্যবহার এবং আবাসস্থল ধ্বংসের কারনে বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বড়কুচ সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির ইন-সিটু পদ্ধতিতে সংরক্ষণ প্রয়োজন।
আরো পড়ুন
- শিয়াল বুকা: চিরহরিৎ অরণ্যের এক অনন্য বন্য ফল ও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়
- খাসিয়া জাম: চিরহরিৎ অরণ্যের এক বিরল বন্য ফল ও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়
- ক্ষুদিজাম বা ব্ল্যাক কারেন্ট ট্রি: নবজাতকের সুরক্ষায় ও আদিবাসী চিকিৎসায় এক অনন্য ভেষজ বৃক্ষ
- পাহাড়ি শিয়াল বুকা অরণ্যে জন্মানো ফলজ ও ভেষজ গুনসম্পন্ন বৃক্ষ
- দেশি গোবুরা (Anisomeles indica) উদ্ভিদের পরিচিতি ও ওষধি গুণাগুণ
- তারাগাছের অবিশ্বাস্য ঔষধি গুণ, বৈশিষ্ট্য ও জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার
- ক্ষেতরাঙ্গা গাছের ঔষধি গুণাগুণ, ভেষজ ব্যবহার ও বিস্তৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাইনজাল গাছ (Bischofia javanica) এর পরিচিতি ও ভেষজ উপকারিতা
- বচ-এর বিস্ময়কর ওষুধি গুণাগুণ: স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও রোগ নিরাময়ে প্রকৃতির এক অনন্য দান
- আকন্দফল লতা (Zanonia indica) এর পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও ঔষধি গুণাগুণ
- আকন্দ গাছের ১৩টি চমৎকার ভেষজ ও ঔষধি গুণাগুণ এবং উপকারিতা
- বিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁট: পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও এর অবিশ্বাস্য ভেষজ গুণাগুণ
- বুইশাকফুল: এক রহস্যময় পরজীবী উদ্ভিদ ও এর অবিশ্বাস্য ভেষজ গুণাগুণ
- উচুন্টি গাছের ভেষজ গুণাগুণ, বৈজ্ঞানিক নাম ও অনন্য বৈশিষ্ট্য
- সাদা কড়ই বা লোহা শিরিষ গাছের বৈশিষ্ট্য ও বহুমুখী ব্যবহার: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
- লাল পাতা চুকাই বা আফ্রিকান চুকাই (Hibiscus acetosella) এর পরিচিতি ও গুণাগুণ
- ওষধি উদ্ভিদ ভোলাটুকি বা ভেলা (Semecarpus anacardium) এর পরিচিতি ও গুণাগুণ
- দেশী ছোট এলাচ চাষ পদ্ধতি এবং এর চমৎকার স্বাস্থ্য উপকারিতা
- খুশি ফুল কি? জানুন বাংলাদেশের এই বিরল পাহাড়ি উদ্ভিদের সবকিছু
- নটে শাকের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও ওষুধি ব্যবহারের বিস্তারিত নির্দেশিকা
- কাঁটানটে উদ্ভিদের পরিচয়, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও ওষুধি ব্যবহার
- শিলারস গাছের পরিচিতি, প্রজাতি এবং মানবদেহে এর অনন্য ঔষধি গুণাগুণ
- শ্বেতফুলি বা সাদা ফুলি উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য – Lepidagathis incurva
- কুতি কালাই-এর বিস্ময়কর উপকারিতা, ঔষধি গুণাগুণ, পরিচিতি ও চাষ পদ্ধতি: একটি পূর্ণাঙ্গ গাইড
- পানি কেশুরী বাংলাদেশের বনাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- চমসা পাথরকুচি এশিয়ায় জন্মানো বাহারী বিরুৎ
- সাতিপাতা উষ্ণাঞ্চলের ভেষজ বিরুৎ
- লজ্জাবতী বাংলাদেশের ঝোপে জন্মানো ভেষজ লতা
- বড় লজ্জাবতী গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় অঞ্চলের লতা
- বড়কুচ পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
তথ্যসূত্র:
১. এম আমান উল্লাহ, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ১০ম (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৮০-১৮১ আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Ethel Aardvark
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।