ভূমিকা: আমাদের চিরচেনা সবুজ প্রকৃতির এক অমূল্য উপহার হলো নটে শাক (বৈজ্ঞানিক নাম: Amaranthus viridis)। এটি মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন উষ্ণমন্ডলীয় (Tropical) ও উপ-উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের একটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সহজে জন্ম নেওয়া বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এশিয়াসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে অত্যন্ত অবহেলায় আনাচে-কানাচে বেড়ে উঠলেও, পুষ্টিগুণ এবং ওষুধি মূল্যের দিক থেকে এই শাকের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল একটি সহজলভ্য গ্রামীণ শাক হিসেবে পরিচিত হলেও, এর রয়েছে এক দীর্ঘ জাতিতাত্ত্বিক ও ভেষজ চিকিৎসার ইতিহাস।
| বিন্যাসের স্তর (Rank) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) | বাংলা অর্থ/পরিচিতি |
|---|---|---|
| জগৎ / রাজ্য (Kingdom) | Plantae | উদ্ভিদ জগৎ |
| বিভাগ (Division) | Tracheophytes | ভাস্কুলার বা সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ |
| অবিন্যাসিত স্তর (Clade) | Angiosperms | আবৃতজীবী বা সপুষ্পক উদ্ভিদ |
| অবিন্যাসিত স্তর (Clade) | Eudicots | প্রকৃত দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ |
| বর্গ (Order) | Caryophyllales | ক্যারিওফিলালেস বর্গ |
| পরিবার (Family) | Amaranthaceae | অ্যামারান্থেসি পরিবার |
| গণ (Genus) | Amaranthus | অ্যামারান্থাস গণ |
| প্রজাতি (Species) | Amaranthus viridis | অ্যামারান্থাস ভিরিডিস |
নটে শাক-এর বর্ণনা:
প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা নানা রকমের উদ্ভিদের মধ্যে একবর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এই ধরনের উদ্ভিদ সাধারণত এক বছরের মধ্যে তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করে। উদ্ভিদের বাহ্যিক গঠন, কান্ড, পাতা, ফুল এবং বীজের গঠন বিশ্লেষণ করলে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক বা বোটানিক্যাল বৈশিষ্ট্যের এক চমৎকার রূপ ফুটে ওঠে। নিচে এই উদ্ভিদের প্রতিটি অংশের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
কান্ড ও দৈহিক গঠন
এই উদ্ভিদটি মূলত একটি ক্ষুদ্র, সরু এবং ঋজু বা সোজা ঊর্ধ্বমুখী বীরুৎ জাতীয় গাছ। সাধারণত অনুকূল পরিবেশে এটি ৭০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। এর কান্ডের গঠন বেশ কৌতূহলদ্দীপক; এটি খুব একটা শাখান্বিত হয় না। তবে কিছু ক্ষেত্রে গাছের একেবারে নিচের অংশের দিকে ধনুকের মতো বাঁকানো বা ধনুকসদৃশ ছোট ছোট শাখা দেখা যেতে পারে। কান্ডটি বেশ সরু প্রকৃতির হয়, যার ব্যাস সর্বোচ্চ ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। কান্ডের ত্বক অত্যন্ত মসৃণ কিংবা খুব সূক্ষ্ম রোম দ্বারা আবৃত থাকে এবং এর রঙ সাধারণত আকর্ষণীয় লালচে সবুজ হয়ে থাকে।
পাতার গঠন ও বিন্যাস
উদ্ভিদটির পাতাগুলো এর সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। পাতাগুলোর আকার ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে, যার দৈর্ঘ্য ১.৫ থেকে ৩.০ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। এই পাতাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো দীর্ঘ সবৃন্তক, অর্থাৎ পাতার বোঁটা বা বৃন্ত বেশ লম্বা হয়, যা সর্বোচ্চ ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। পাতার নিচের অংশটি কিছুটা কাটা বা কর্তিত আকৃতির এবং এর শীর্ষভাগ স্থূলাগ্র অথবা খাঁজকাটা প্রকৃতির হয়ে থাকে। পাতার উপরিভাগ ও নিচের অংশ সম্পূর্ণ মসৃণ, যা গাছটিকে একটি সতেজ ভাব দেয়।
পুষ্পবিন্যাস ও ফুলের বৈশিষ্ট্য
এই উদ্ভিদের পুষ্পবিন্যাস বেশ জটিল এবং দৃষ্টিনন্দন। ফুলগুলো গাছের একদম প্রান্তীয় ভাগে কিংবা উপরের অংশের পাতার কাক্ষিক কোণ থেকে উৎপন্ন হয়। এর অপ্রকৃত স্পাইকগুলো এককভাবে অথবা খুব কম ক্ষেত্রে শাখান্বিত হয়ে একটি যৌগিক মঞ্জরী তৈরি করে। ফুলগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং ঘন গুচ্ছ আকারে বিন্যস্ত থাকে। প্রতিটি ফুলের ব্যাস মাত্র ৭ মিলিমিটারের কাছাকাছি হয়ে থাকে। ফুলগুলোর রঙ সাধারণত সবুজ হয়।
ফুলের মঞ্জরীপত্র এবং মঞ্জরীপত্রিকা দেখতে প্রায় একই রকম এবং এগুলো পুষ্পপুটের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট বা খর্ব হয়। ফুলগুলো স্পষ্ট ডিম্বাকার ও উদগ্রশিখরযুক্ত এবং দেখতে শুষ্ক ঝিল্লির মতো মনে হয়, যার দৈর্ঘ্য ০.৫ থেকে ১.০ মিলিমিটার।
পুষ্পপুট ও পুংকেশরের বিবরণ
ফুলটিতে মূলত ৩টি দৃঢ় এবং প্রান্ত-আচ্ছাদী পুষ্পপুট থাকে। এগুলো সবুজ তরীদল বা নৌকার মতো অংশ দ্বারা ঝিল্লিময় এবং অগ্রভাগ বেশ সূক্ষ্মাগ্র প্রকৃতির হয়, যার দৈর্ঘ্য ১.৩ থেকে ১.৬ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সবুজ রঙের পুষ্পপুটাংশগুলো শুষ্ক ও ঝিল্লিসদৃশ প্রান্তযুক্ত, যা ১.০ থেকে ১.৫ মিলিমিটার লম্বা হয়। ফুলের পুংজনন অংশে ৩টি পুংকেশর থাকে, যার পুংদন্ডগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত না থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় থাকে। এর পরাগধানীগুলো দেখতে আয়তাকার এবং এগুলো দ্বিকোষী হয়ে থাকে।
গর্ভদণ্ড ও ফলের গঠন
স্ত্রীজনন অংশের দিকে তাকালে দেখা যায়, এতে ২ থেকে ৩টি গর্ভদণ্ড থাকে, যা আকারে অত্যন্ত ছোট—মাত্র ০.৩ মিলিমিটার লম্বা। এর গর্ভমুণ্ডও ২-৩টি এবং এগুলো সুতার মতো চিকন বা সুতাগ্র আকৃতির হয়। এই উদ্ভিদের ফলগুলো অবিদারী প্রকৃতির, অর্থাৎ পাকার পর এগুলো নিজে থেকে ফেটে যায় না। ফলগুলো বেশ কুঞ্চিত বা কোঁকড়ানো এবং এগুলো উপবৃত্তীয় অ্যাকিন (Achene) জাতীয় ফল। ফলটি দৃঢ় পুষ্পপুট ও মঞ্জরীপত্রের চেয়ে আকারে কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়, যার দৈর্ঘ্য ১.৩ থেকে ১.৯ মিলিমিটার। পরিপক্ক ফলের রঙ ফ্যাকাশে হলুদাভ-বাদামি হয়ে থাকে।
বীজ ও ক্রোমোসোম তথ্য
ফলটির অভ্যন্তরে যে বীজ থাকে, সেটি দেখতে বেশ চমৎকার। বীজগুলো উত্তল ও চাকতির মতো চাপা প্রকৃতির হয়। এর রঙ গাঢ় বাদামি থেকে কালো রঙের হয়ে থাকে এবং এর একটি উজ্জ্বল আভা বা গ্লস থাকে। বীজের উপরিভাগ সূক্ষ্ম জালিকাকার নকশায় আবৃত থাকে। বীজের পরিমাপ সাধারণত দৈর্ঘ্যে ০.৯ থেকে ১.২ মিলিমিটার এবং প্রস্থে ০.৮ থেকে ১.০ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। জিনগত বা সাইটোলজিক্যাল দিক থেকে বিচার করলে, এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে ২n = ৩৪।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
প্রকৃতির এই অনন্য উদ্ভিদটি তার বেঁচে থাকা এবং বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরনের পরিবেশ পছন্দ করে। তবে এর বিস্তৃতি ও অভিযোজন ক্ষমতা বেশ চমৎকার। সাধারণত যে সমস্ত এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকে বা জল সংবদ্ধতার (Waterlogging) সৃষ্টি হয়, সেই স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটিতে এই উদ্ভিদটি সবচেয়ে ভালো জন্মে।
জলাভূমি ছাড়াও মানুষের অবহেলায় পড়ে থাকা পতিত জমি, অনুন্নত বা অকর্ষিত ভূমি এবং গ্রামীণ ও শহরের রাস্তার আশেপাশের পরিত্যক্ত স্থানগুলোতে এই উদ্ভিদের ব্যাপক উপস্থিতি বা বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়। প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেকে টিকিয়ে রাখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে এই উদ্ভিদের, যার কারণে একে খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাটিতে মানিয়ে নিতে দেখা যায়।
ফুল-ফল ধারণের সময়কাল ও ঋতুচক্র
এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর ফুল ও ফল উৎপাদনের সময়কাল। এটি একটি নির্দিষ্ট ঋতুচক্র মেনে চলে। সাধারণত বর্ষা ঋতুর শেষের দিকে, যখন বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং মাটিতে পর্যাপ্ত পানি থাকে, তখন এই উদ্ভিদে ফুল ফুটতে শুরু করে।
বর্ষার শেষভাগ থেকে শুরু করে শরৎ, হেমন্ত ও শীত পেরিয়ে পরবর্তী বছরের মধ্য গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। দীর্ঘ এই সময় জুড়ে উদ্ভিদটি তার ফুল থেকে ফল এবং ফল থেকে বীজ উৎপাদনের কাজ সম্পন্ন করে, যা এর বংশধারা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
বংশ বিস্তার ও প্রজনন প্রক্রিয়া
উদ্ভিদটির বংশ বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি মূলত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং স্বয়ংক্রিয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে বংশ বিস্তারের জন্য পুরোপুরি বীজের (Seed) ওপর নির্ভরশীল। পরিপক্ক ফল থেকে যখন বীজগুলো মাটিতে ঝরে পড়ে, তখন তা পরবর্তী প্রজন্মের সূচনা করে।
যেহেতু এই উদ্ভিদটি বিপুল পরিমাণে সূক্ষ্ম ও উজ্জ্বল বীজ উৎপাদন করতে পারে, তাই বাতাস, বৃষ্টি বা বিভিন্ন ছোট ছোট পোকামাকড়ের মাধ্যমে এর বীজগুলো সহজে চারপাশের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং মাটির উপযুক্ত আর্দ্রতা পাওয়ার সাথে সাথেই এই বীজগুলো থেকে নতুন চারা গজিয়ে ওঠে এবং খুব দ্রুত তা পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদে রূপ নেয়।
বিস্তৃতি:
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বিচার করলে এই উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তৃতি অত্যন্ত ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। এটি মূলত এশিয়ার একটি সুপরিচিত উদ্ভিদ হলেও বৈশ্বিক জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে এর আদি নিবাস।
সমগ্র ভারত এবং দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকার উর্বর মাটি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে জন্মে থাকে। ভারত ও শ্রীলংকা ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় (Tropical) এবং তুলনামূলক উষ্ণতর জলবায়ুর দেশগুলোতে এই প্রজাতির উদ্ভিদের চমৎকার বিস্তৃতি লক্ষ্য করা গেছে। অনুকূল তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার কারণে এটি এই অঞ্চলগুলোতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সফলভাবে টিকে থাকে।
বাংলাদেশে এই প্রজাতির প্রাচুর্য ও উপস্থিতি
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো সুজলা-সুফলা বাংলাদেশেও এই উদ্ভিদ প্রজাতির জন্য একটি অত্যন্ত আদর্শ আবহাওয়া ও পরিবেশ রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই এই প্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে এবং বংশবৃদ্ধি করতে দেখা যায়।
দেশের প্রতিটি প্রান্তে—তা হোক গ্রামীণ জনপদ, নদীর তীরবর্তী অঞ্চল, অবহেলিত ঝোপঝাড় কিংবা শহরের আনাচ-কানাচ—সবখানেই এই উদ্ভিদের দেখা মেলে। দেশের উর্বর পলিমাটি এবং ছয় ঋতুর বৈচিত্র্যময় জলবায়ু এই প্রজাতির ব্যাপক বিস্তারে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ফলে বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের পতিত জমি বা রাস্তার পাশে একটু লক্ষ্য করলেই এই অতি পরিচিত উদ্ভিদটি সহজেই চোখে পড়ে।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
প্রকৃতির এই অনন্য উদ্ভিদটি কেবল একটি সাধারণ আগাছা বা বীরুৎ নয়, বরং এর রয়েছে বহুমুখী অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত ব্যবহার। এই নির্দিষ্ট গণের (Genus) অন্যান্য উদ্ভিদের মতো এর পাতা অত্যন্ত পুষ্টিকর। আমাদের পরিচিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয় পালং শাকের মতো করেই এর নরম কচি পাতাগুলোকে রান্নায় ব্যবহার করা যায়।
গ্রামীণ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এই সবুজ পুষ্টিকর শাকের একটি বিশেষ চাহিদা রয়েছে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে কোনো প্রকার কীটনাশক ছাড়াই এটি উৎপাদিত হয় বলে পুষ্টির দিক থেকে এটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত। স্বল্প আয়ের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং স্থানীয় বাজারে সবুজ শাক হিসেবে বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্ভিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ওষুধি গুণাগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
ঐতিহ্যগত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং আয়ুর্বেদে এই উদ্ভিদের কার্যকারিতা ও ওষুধি গুণাগুণের কারণে একে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান মানুষের শরীরের নানাবিধ রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। নিচে এর প্রধান কিছু ওষুধি ব্যবহার তুলে ধরা হলো:
- স্নিগ্ধকারক বা প্রশান্তিদায়ক গুণ (Demulcent): এই উদ্ভিদের রস শরীরকে ভেতর থেকে শীতল ও স্নিগ্ধ রাখতে সাহায্য করে। এটি পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া ও শরীরের ভেতরের প্রদাহ দূর করতে দারুণ কার্যকর।
- মূত্রবর্ধক প্রাকৃতিক উপাদান (Diuretic): কিডনি এবং মূত্রনালীর কার্যকারিতা সচল রাখতে এই উদ্ভিদের নির্যাস মূত্রবর্ধক ঔষধ হিসেবে কাজ করে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে।
- সর্প দংশনের প্রতিষেধক (Snakebite Treatment): লোকজ বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে সর্প দংশনের বা সাপে কাটার চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। সাপের বিষের কার্যকারিতা কমাতে বা প্রাথমিক প্রতিষেধক হিসেবে এর পাতা ও কান্ডের রস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার ও লোকজ ঐতিহ্য (Ethnobotanical Uses)
জাতিতাত্ত্বিক বা নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় এই উদ্ভিদের একটি স্থায়ী আসন রয়েছে। লোকজ সংস্কৃতিতে এর কচি বিটপ (নরম ডালপালা) এবং কচি পাতাগুলোকে প্রধানত শাক বা সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
প্রাকৃতিক উৎস থেকে সরাসরি সংগৃহীত এই শাক গ্রামীণ মানুষের প্রতিদিনের পুষ্টির অভাব দূর করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রজাতিটির এই জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার প্রমাণ করে যে, এটি বহু বছর ধরে মানব সভ্যতার পুষ্টি ও চিকিৎসার একটি নির্ভরযোগ্য প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে টিকে রয়েছে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ষ্ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) নটে শাক প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে নটে শাক সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
আরো পড়ুন
- গাদাবানি বা লাবুনী শাকের পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও উপকারিতা
- ঢেকিয়া শাক বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো জনপ্রিয় শাক
- বথুয়া শাক বাংলাদেশে জন্মানো সহজলভ্য ও ভেষজ প্রজাতি
- মহিচরণ শাক দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ শাক
- বাংলাদেশের শাক-বৈচিত্র্য: ৫৫টি পরিচিত ও বুনো শাকের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
- পাট শাক বা পাট পাতা বহুবিধ পুষ্টিগুণ, খাদ্যমান ও চাষ পদ্ধতি
- চালকুমড়া এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি জনপ্রিয় শাক ও সবজি
- ধনে বা ধনিয়া এশিয়ার একটি সুগন্ধি ঔষধি উদ্ভিদ
- পানি কর্পূর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বর্ষজীবী উদ্ভিদ
- ধনিয়া বা ধনে পাতার দশটি কার্যকরী ঔষধি ব্যবহার
তথ্যসূত্র:
১. এ বি এম রবিউল ইসলাম (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৬ষ্ঠ, পৃষ্ঠা ১০০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৪ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১০ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।