গুইয়া বাবলা: পরিচিতি, ঔষধি গুণাগুণ ও ব্যবহারের নিয়ম

গুইয়া বাবলা

বৈজ্ঞানিক নাম: Acacia farnesiana (L.) Willd., Sp. PL -4; 1033 (1306). সমনাম: Mimosa famesiana L. (1753). Vouchellia farnesiana (L.) Wight & Am. (1992). ইংরেজি নাম: Cassie Flower, Farnesiana, Sponge Tree, Sweet Acacia, Stinking Acacia. স্থানীয় নাম: গুইয়া বাবলা, বিলাতি বাবলা।

ভূমিকা: বন-পাহাড় কিংবা গৃহস্থালির বাগানে অযত্নে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদের ভিড়ে গুইয়া বাবলা এক স্বতন্ত্র নাম। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে এটি Acacia farnesiana নামে পরিচিত হলেও, এর রয়েছে একাধিক বৈজ্ঞানিক পরিচিতি। এটি মূলত ফেবিয়াসি (Fabaceae) পরিবারের অন্তর্গত একটি ঝোপালো চিরসবুজ বা আধা-পত্রঝরা বৃক্ষ। মূলত এটি ‘আকাশিয়া’ গোত্রের হলেও সময়ের বিবর্তনে বিজ্ঞানীরা একে Vachellia farnesiana বা Acacia leucophloea হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। মূলত মাইমোসী (Mimosaceae) উপগোত্রের এই গাছটি তার চমৎকার গড়নের জন্য বর্তমানে শৌখিন বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিভিন্ন ভাষায় গুইয়া বাবলার নাম:

এই উদ্ভিদটি শুধুমাত্র নামেই নয়, বরং এর বৈচিত্র্যময় পরিচিতিতেও অনন্য। বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একে নিজেদের ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নামে চেনে: বিশ্বজুড়ে এটি মূলত Cassie FlowerSponge Tree কিংবা Sweet Acacia হিসেবে পরিচিত। ভারতের গুজরাটে এর নাম ‘গন্ধেলো বাবুল’, আবার আসামের মানুষ একে ‘তারা কদম’ বলে ডাকে। বিহারে এটি ‘গ্রাবুর’ এবং হিন্দি বা পাঞ্জাবি ভাষী অঞ্চলে ‘বিলাতি কীকর’ হিসেবে অধিক পরিচিত। এছাড়াও আছে গোকুল, গয়াবাবুল, অরিমেদ, বিটখদির, ইরিমেদ এবং কালস্কন্ধ। উৎপত্তিস্থল আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল হলেও আমাদের দেশের শুষ্ক আবহাওয়া ও ঝুরঝুরে বেলে-পাথুরে মাটিতে এটি চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে। লোকজ বিশ্বাস মতে, এই গাছটি যেন প্রকৃতির এক শক্তির আধার, যা দুর্বলকে শক্তি যোগায় এবং বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তা করে।

বিবরণ

গুইয়া বাবলা মূলত একটি ঝোপালো প্রকৃতির কন্টকাকীর্ণ উদ্ভিদ, যা উচ্চতায় প্রায় ৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই বৃক্ষটি সাধারণত বহু-শাখা বিশিষ্ট এবং এর কাণ্ড ও ডালপালার রঙ গাঢ় বাদামী হয়ে থাকে। কচি গাছের বাকল বেশ মসৃণ থাকলেও বয়সের সাথে সাথে বৃক্ষের গায়ে ফাটল দেখা দেয়। এর ডালপালার গঠন কিছুটা আঁকাবাঁকা এবং ডালগুলোতে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র বা বায়ুরন্ধ্র লক্ষ্য করা যায়। গাছটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ধারালো সোজা কাঁটা, যা উপপত্রীয় অঞ্চল থেকে বের হয় এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই উদ্ভিদের পাতাগুলো দ্বিপক্ষল যৌগিক প্রকৃতির। পাতার মূল অক্ষটি প্রায় ২.৫ থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এবং সামান্য রোমশ হয়ে থাকে। এর ডাঁটার গোড়ায় একটি ক্ষুদ্র উপবৃদ্ধি বা গ্রন্থি দেখা যায়। গাছে সাধারণত ২ থেকে ৮ জোড়া পক্ষ থাকে, যা ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপরের এবং নিচের জোড়া পক্ষের গোড়ায় পেয়ালার মতো ছোট উপবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি পক্ষে ১০ থেকে ২০ জোড়া ছোট ছোট পত্রক থাকে। এই পত্রকগুলো দেখতে লম্বাকৃতি এবং মসৃণ, যাদের মাপ সাধারণত ২-৭ মিমি x ০.৮-১.৮ মিমি হয়ে থাকে। পাতার শীর্ষভাগ কিছুটা তীক্ষ্ণ এবং মধ্যশিরাটি কেন্দ্র থেকে কিছুটা একদিকে সরে থাকে। গুইয়া বাবলার সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে এর চমৎকার পুষ্পবিন্যাসের মাধ্যমে। এর ফুলের মঞ্জরি সাধারণত পাতার কক্ষ থেকে উৎপন্ন হয়। গোলকাকার বা উপ-গোলকাকার এই শিরমঞ্জরিগুলো গুচ্ছাকারে থাকে, যেখানে সাধারণত ৩ থেকে ৫টি মঞ্জরি একত্রে একটি দল গঠন করে। মঞ্জরিদণ্ডগুলো লম্বায় প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফুলগুলো উজ্জ্বল সোনালী-হলুদ বর্ণের হয় এবং এদের শরীর থেকে এক ধরনের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়ে, যা এই উদ্ভিদটিকে বিশেষ পরিচিতি দেয়। প্রতিটি ফুল অবৃন্তক (ডাঁটাহীন) এবং ‘৫-গুণিতক’ বিন্যাসে সাজানো। মাত্র ১ মিলিমিটার লম্বা চামচের মতো আকৃতির একটি ক্ষুদ্র মঞ্জরীপত্র প্রতিটি ফুলকে আবৃত করে রাখে। ফুলের বৃতি অংশটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র (প্রায় ০.৫ মিমি) এবং দেখতে অনেকটা ঘণ্টার মতো। এর ত্রিকোণাকার ও তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো মাত্র ০.২ মিলিমিটার লম্বা হয়। অন্যদিকে, দলমণ্ডল লম্বায় প্রায় ২.৫ মিলিমিটার হয়ে থাকে। এটি নলাকার আকৃতির এবং এর উপবৃত্তাকার খণ্ডগুলো মসৃণ প্রকৃতির হয়। গুইয়া বাবলার প্রজনন অঙ্গ এবং এর ফলের গঠন বেশ আকর্ষণীয়। এর পুংকেশরগুলো সংখ্যায় প্রচুর এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ থেকে ৪ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই পুংকেশরগুলো দলমণ্ডল ছাড়িয়ে অনেকটা বাইরের দিকে প্রসারিত থাকে, যা ফুলটিকে একটি রোমশ বা তুলতুলে ভাব দেয়। অন্যদিকে, এর গর্ভাশয় প্রায় ১.৫ মিলিমিটার লম্বা এবং ঘন রোমশ প্রকৃতির হয়। এই উদ্ভিদের ফলগুলো মূলত ‘পড’ (Pod) জাতীয়, যা দেখতে অনেকটা বেলনাকার ও দীর্ঘায়িত। ফলগুলো লম্বায় ৩.১ থেকে ৭.৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এগুলো সোজা অথবা সামান্য বাঁকানো হতে পারে এবং প্রস্থচ্ছেদে প্রায় গোলাকার বা রসালো দেখায়। ফল যখন শুকিয়ে যায়, তখন এর রঙ গাঢ় বাদামী বা কালচে ধারণ করে। এর উপরিভাগ মসৃণ হলেও তাতে সূক্ষ্ম শিরার মতো দাগ লক্ষ্য করা যায়। ফলের ভেতর বীজের অবস্থান বাইরে থেকে খুব একটা স্পষ্ট বোঝা যায় না। প্রতিটি ফলে সাধারণত ১২ থেকে ২০টি বীজ থাকে। বীজগুলো ফলের ভেতরকার পাল্প বা মজ্জার মধ্যে দুই সারিতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। প্রতিটি বীজ উপবৃত্তাকার, মসৃণ এবং কুচকুচে কালো রঙের হয়। প্রকৃতির এক অদ্ভুত দান এই গুইয়া বাবলা, কারণ এতে প্রায় সারা বছরই ফুল ও ফল দেখা যায়। উদ্ভিদতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, এর ক্রোমোজোম সংখ্যা হলো 2n = ৫২

চাষাবাদ ও আবাসস্থল

গুইয়া বাবলা মূলত কোন ধরনের পরিবেশে ভালো জন্মায়, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত সহনশীল এবং বিভিন্ন ধরণের প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। এর চাষাবাদ ও বেড়ে ওঠার বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • উপযুক্ত মাটি: গুইয়া বাবলা মূলত কালো মাটি, নুড়ি পাথর মিশ্রিত জমি কিংবা বেলে মাটিতে চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে। মাটির গুণাগুণ খুব ভালো না হলেও এটি টিকে থাকতে পারে।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: এটি সাধারণত উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের অরণ্য, গুল্ম জাতীয় বন কিংবা পত্রঝরা বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে।
  • উচ্চতা: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিম্ন উচ্চতা থেকে শুরু করে প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এই গাছের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি ঢাল কিংবা সমতল—উভয় স্থানেই এর সহজ অভিযোজন ঘটে।
  • বংশবিস্তার পদ্ধতি গুইয়া বাবলার বংশবৃদ্ধি মূলত এর বীজের মাধ্যমে ঘটে। এটি অত্যন্ত সহনশীল প্রজাতি হওয়ায় খুব কম যত্নেই এটি প্রাকৃতিকভাবে বংশবিস্তার করতে সক্ষম।

গুইয়া বাবলার ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও আবাসস্থল

গুইয়া বাবলার শেকড় মূলত সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে প্রোথিত। তবে সময়ের সাথে সাথে এই গাছটি নিজের অভিযোজন ক্ষমতার গুনে এখন বিশ্বজনীন বা ‘কসমোপলিটান’ উদ্ভিদে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে মালদ্বীপ, মিয়ানমার এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও এর ব্যাপক বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশে গুইয়া বাবলার অবস্থান:
বাংলাদেশি প্রকৃতিতে এই উদ্ভিদটি মূলত একটি প্রবর্তিত প্রজাতি (Introduced Species), যা এখন পুরোপুরি এদেশীয় পরিবেশে মানিয়ে নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একে দেখা গেলেও বিশেষ কিছু স্থানে এর প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো:

  • রাজশাহী অঞ্চল: বিশেষ করে রাজশাহী জেলার রেলপথের দুই পাশে এই গাছগুলো প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়।
  • গ্রামীণ পরিবেশ: গ্রামের ঝোপঝাড় কিংবা লোকালয়ের আশেপাশে অনাবাদি বা পতিত জমিতে এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্মে থাকে।
  • উন্মুক্ত অঞ্চল: রাস্তার ধার কিংবা বনের প্রান্তসীমায় গুইয়া বাবলা এক পরিচিত দৃশ্য।

🩹 বিশেষ পরামর্শ (Health Tips)

শরীরে দীর্ঘদিনের পুরানো ঘা, চর্মরোগ বা যন্ত্রণাদায়ক নখকুনির সমস্যায় ভুগছেন? বাবলার পাশাপাশি আরও অনেক কার্যকরী ভেষজ সমাধান রয়েছে আমাদের এই বিশেষ গাইডটিতে:
🔗 পড়ুন: শরীরে ঘা, ক্ষত এবং নখকুনির সমস্যায় ২৪টি ঘরোয়া ভেষজ চিকিৎসা 🌿✨
প্রাকৃতিক উপায়ে দ্রুত আরোগ্য লাভের সহজ টিপসগুলো দেখে নিন এখনই! 🩺✅

প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও চরক সংহিতায়:

ভারতীয় প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রে গুইয়া বাবলার (যাকে শাস্ত্রে অরিমেদ বলা হয়েছে) উল্লেখ রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে:

  • চরক সংহিতা: চরক সংহিতার ‘বিমান স্থান’-এর অষ্টম অধ্যায়ে ‘কষায় স্কন্ধ’ হিসেবে অরিমেদের গুণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘সূত্রস্থান’-এর ৪৯তম অধ্যায়ে বিশেষ ধরণের আর্টিকেরিয়া (যা বোলতার হুল ফুটলে চামড়া ফুলে যাওয়ার মতো অবস্থা) নিরাময়ে অরিমেদ বা গুইয়া বাবলার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
    • দোষ প্রশমন: আয়ুর্বেদ মতে, শরীরে কফ ও বায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হলে যে চর্মরোগ বা শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়, তা নিরাময়ে গুইয়া বাবলা অদ্বিতীয়। এটি পিত্তকে উত্তেজিত না করেই বায়ু ও শ্লেষ্মা বা কফকে শান্ত রাখতে সক্ষম।
  • সুশ্রুত সংহিতা: মহর্ষি সুশ্রুত তাঁর সংহিতার ৩৭তম অধ্যায়ে অরিমেদকে ‘সালসারাদিসমূহ’ ভেষজের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁর মতে: এটি কফ ও মেদ জনিত সমস্যা দূর করে। কুষ্ঠ, প্রমেহ (ডায়াবেটিস সংশ্লিষ্ট সমস্যা), পাণ্ডুরোগ বা জন্ডিস নিরাময়ে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
    • মানসিক ও চারিত্রিক প্রভাব: প্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্রে এমনকি অমিতাচারী বা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্য ফেরাতেও এই ওষুধি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ফর্মুলারী(১৯৯২):

এই রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকায় গুইয়া বাবলার ছালকে একটি অত্যন্ত কার্যকর উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিখ্যাত বৃহৎ খদির বটিকা তৈরির প্রধান উপকরণ হলো এই গুইয়া বাবলার ছাল। মুখগহ্বরের বিভিন্ন সমস্যায় এটি মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। যেমন:

  • মুখ, ঠোঁট, জিহ্বা এবং মাড়ির ক্ষত বা ঘা নিরাময়ে।
  • গলা ও তালুর প্রদাহ কমাতে।
  • তীব্র দাঁত ব্যথা বা দন্তশূল উপশমে এই ওষুধি বটিকা দারুণ কার্যকর।

বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানী ফর্মুলারী (১৯৯৩):
ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতিতেও গুইয়া বাবলার বিশেষ স্থান রয়েছে। এখানে একে ক্বাথ সফেদ তৈরির অন্যতম উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষত উপদংশের (Syphilis) মতো কঠিন রোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে স্বীকৃত।

গুইয়া বাবলার বহুমুখী উপযোগিতা:

গুইয়া বাবলা (Acacia farnesiana) শুধুমাত্র একটি সাধারণ কন্টকাকীর্ণ বৃক্ষ নয়, বরং এর প্রতিটি অংশ—ফুল, ফল, বাকল এবং কাঠ—ভিন্ন ভিন্ন শিল্পে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে। নিচে এর বিস্তারিত ব্যবহারসমূহ আলোচনা করা হলো:

১. বৈশ্বিক প্রসাধনী ও সুগন্ধি শিল্পে ক্যাসির অবদান

এই গাছের সবচেয়ে মূল্যবান অংশ হলো এর সুগন্ধি ফুল। এই ফুল থেকে আহরিত নির্যাস ‘Cassie’ নামে পরিচিত, যা বিশ্ববিখ্যাত দামী পারফিউম ও কসমেটিকস তৈরির মূল উপাদান।

  • বাণিজ্যিক চাষ: সুগন্ধি শিল্পের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে এই গাছের বিশেষ চাষাবাদ করা হয়।
  • প্রসাধনী মান: সাবান, লোশন এবং উচ্চবিত্তের প্রসাধনীতে এর প্রাকৃতিক ও সতেজ ঘ্রাণ যোগ করা হয়।

২. ভেষজ ও লোকজ চিকিৎসায় (Medicinal Uses) বৈপ্লবিক কার্যকারিতা

ভেষজ চিকিৎসায় গুইয়া বাবলার প্রতিটি অংশই যেন এক একটি ঔষধ। বিভিন্ন দেশের লোকজ চিকিৎসায় এর বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে:

  • পেটের সমস্যা ও কৃমিনাশক: এটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, কৃমিনাশক হিসেবে এবং দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় প্রতিষেধক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর।
  • মুখ ও দাঁতের যত্ন: দাঁতের ক্ষয়রোগ (Dental Caries) প্রতিরোধ এবং মুখ বা মাড়ির ফোলা ভাব কমাতে এর নির্যাস ব্যবহার করা হয়।
  • জটিল রোগের নিরাময়: ব্রঙ্কাইটিস, শ্বেতপ্রদর (Leucorrhoea), আলসার এবং ত্বকের চুলকানি বা বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ কমাতে এই উদ্ভিদ আশীর্বাদস্বরূপ।
  • আন্তর্জাতিক প্রয়োগ: ফিলিপাইনে এই গাছের কাণ্ডের বাকলের ক্বাথ শ্বেতপ্রদর এবং পায়ুদ্বারের বিশেষ সমস্যায় (প্রলেপসিস) ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩. শিল্প ও রাসায়নিক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক গুরুত্ব

  • চামড়া ও রঙ শিল্প: গুইয়া বাবলার ফল ট্যানিন সমৃদ্ধ, যা কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ‘পাকা’ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া এর ফল থেকে এক ধরণের বিশেষ নির্যাস পাওয়া যায় যা দিয়ে টেকসই কালো কালি তৈরি করা সম্ভব।
  • প্রাকৃতিক আঠা: এই উদ্ভিদের কাণ্ড থেকে প্রচুর পরিমাণে উন্নত মানের সাদা গঁদ (Gum) নির্গত হয়, যা বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য ও আঠা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

৪. জাতিতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত উপযোগিতা

  • জ্বালানি ও খাদ্য: উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এর কাঠ উন্নত মানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশে এর পুষ্টিকর পাতা ও ফল গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • সুরক্ষা বেষ্টনী: বাংলাদেশে বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এটি জমির সীমানা বা ‘বেড়া’ হিসেবে জনপ্রিয়। উপকূলীয় এলাকায় মাটির ক্ষয়রোধে এবং বাঁধের সুরক্ষায় এই গাছ রোপণ করা হয়।
  • সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব: ভারতে রাস্তার পাশে এবং প্রাচীর উদ্ভিদ হিসেবে এটি বেশ পরিচিত। এছাড়া ভারতের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের বিভিন্ন পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গুইয়া বাবলার ফুল ব্যবহার করে থাকেন।

. চর্মরোগ দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত নিরাময়ে গুইয়া বাবলার ভূমিকা:
প্রাকৃতিক পচননিবারক বা অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে গুইয়া বাবলার ক্বাথ অত্যন্ত কার্যকরী, যা নালি-ঘা ও পচনশীল ক্ষত শুকাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আয়ুর্বেদিক বিভিন্ন ওষুধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হওয়ার পাশাপাশি এটি এককভাবে ব্যবহার করেও খোস-পাঁচড়া ও জটিল চর্মরোগে অভাবনীয় সুফল পাওয়া যায়। বিশেষ করে শরীরের কোনো স্থানের ক্ষত যখন সহজে সারতে চায় না, তখন গুইয়া বাবলার নির্যাস সংক্রমণের বিস্তার রোধ করে দ্রুত টিস্যু পুনর্গঠনে সাহায্য করে।

. আমাশয় পেটের পীড়া উপশমে গুইয়া বাবলার ব্যবহার:
অনিয়মিত জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাসের কারণে অনেকেরই পাতলা পায়খানা কিংবা আমযুক্ত চটচটে মলত্যাগের সমস্যা দেখা দেয়। এই ধরণের পেটের গোলযোগ নিরাময়ে গুইয়া বাবলার ছাল অত্যন্ত কার্যকর একটি ঘরোয়া উপাদান। ১০ গ্রাম পরিমাণ গাছের টাটকা ছাল নিয়ে সামান্য থেঁতলে নিয়ে তা ৫-৬ কাপ বিশুদ্ধ পানিতে জ্বাল দিতে হবে। পানি ফুটে যখন প্রায় ২ কাপে নেমে আসবে, তখন তা নামিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। এই প্রস্তুতকৃত ক্বাথটি প্রতি ২-৩ ঘণ্টা অন্তর দিনে ৪-৫ বার সেবন করলে আমাশয় ও মলের আঠালো ভাব দ্রুত দূর হয়। নিয়মিত কয়েকদিন এই নিয়ম মেনে চললে পেটের অস্বস্তি থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

. বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুইয়া বাবলার সারকাঠ
ঐতিহ্যগতভাবে, প্রস্রাবের স্থানে পিঁপড়ের আনাগোনাকে কোনো রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই রক্তে শর্করার আধিক্য বা মধুমেহ (ডায়াবেটিস) শনাক্ত করার একটি লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় [১.১.১, ১.১.৫]। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে গুইয়া বাবলার (Acacia nilotica) সারকাঠের ব্যবহার আয়ুর্বেদিক চর্চায় দেখা যায় [১.১.৩]।

  • প্রস্তুত প্রণালী: গুইয়া বাবলার সারকাঠ চূর্ণ করে পানির সাথে জ্বাল দিয়ে ক্বাথ তৈরি করা হয় [১.১.৩]।
  • ব্যবহারবিধি: প্রস্তুতকৃত নির্যাসটি ছেঁকে নিয়মিত সেবন করলে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মধুমেহজনিত শারীরিক অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করে বলে মনে করা হয় [১.১.৩, ১.১.৪]।

. রক্তক্ষরণ রোধে গুইয়া বাবলার ফুলের ব্যবহার:

শরীরের কোনো অংশ থেকে যদি অস্বাভাবিকভাবে বা ঝলকে ঝলকে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে, তবে তা নিয়ন্ত্রণে গুইয়া বাবলার ফুল ব্যবহার করা যেতে পারে [১.১, ১.২]। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এর ব্যবহারের নিয়ম নিচে দেওয়া হলো:

  • তাজা ফুল: গাছের সতেজ ফুল সামান্য পানিসহ থেঁতলে নিয়ে তার থেকে রস বের করে দুধের সাথে মিশিয়ে সেবন করার প্রথা রয়েছে [১.১]।
  • শুকনো ফুল: শুকনো ফুলের মিহি চূর্ণ বা পাউডার সামান্য মধুর সাথে মিশিয়ে সেবন করা যেতে পারে [১.১]।

৫. স্বরভঙ্গ বা কণ্ঠস্বরের সমস্যা নিরাময়ে গুইয়া বাবলা:

অতিরিক্ত চিৎকার করে কথা বলা, ঋতু পরিবর্তনের কারণে ঠাণ্ডা লাগা কিংবা টনসিলের ব্যথায় কণ্ঠস্বর বসে গেলে গুইয়া বাবলা এক চমৎকার প্রাকৃতিক সমাধান। এই সমস্যার সমাধানে গুইয়া বাবলার ছাল গুঁড়ো করে অথবা এর রস সংগ্রহ করে তা ঘন করে শুকিয়ে ছোট ছোট বড়ি বা ট্যাবলেটের মতো তৈরি করে রাখা যায়। কণ্ঠস্বরের কর্কশতা বা স্বরভঙ্গ হলে এই বড়িটি মুখে নিয়ে চুষে খেলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায় এবং গলার স্বর স্বাভাবিক হয়ে আসে। এটি মূলত গলার প্রদাহ কমিয়ে কণ্ঠনালীকে সতেজ করতে সাহায্য করে।

উপসংহার:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) গুইয়া বাবলা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে গুইয়া বাবলা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে উপকুলীয় অঞ্চলের বাধ সমূহে এবং আশ্রয় দানকারী উদ্ভিদ হিসেবে ব্যাপক পরিসরে বনায়নের আওতায় আনা জরুরী।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্রঃ

১.  বি এম রিজিয়া খাতুন (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ৯ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৪৮-১৪৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dick Culbert

Leave a Comment

error: Content is protected !!