আপাং গাছের ঔষধি গুণাগুণ ও বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এর ব্যবহার

ভূমিকা: প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারে এমন কিছু ঔষধি উদ্ভিদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যা বাহ্যিকভাবে সাধারণ মনে হলেও গুণে অনন্য। এমনই একটি পরিচিত অথচ বিস্ময়কর গুণসম্পন্ন ভেষজ হলো ‘আপাং’। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে বলা হয় Achyranthes aspera। আমাদের চারপাশে রাস্তার ধারে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই উদ্ভিদটি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারের যুগেও এর শিকড়, পাতা, ফুল এবং বীজের কার্যকারিতা ভেষজ চিকিৎসকদের কাছে অপরিসীম। আজকের নিবন্ধে আমরা এই বহুবর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং মানবদেহের বিভিন্ন জটিল রোগ নিরাময়ে এর নানাবিধ ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বিষয়ের নামবিস্তারিত তথ্য
প্রধান স্থানীয় নামআপাং, বিলাইখামচি, উপাত ল্যাংড়া
বৈজ্ঞানিক নামAchyranthes aspera L.
সমনাম (Synonyms)Cyathula geniculata Lour. (1790), Achyranthes aspera L. var. rubro-fusca Wight (1852) (মূল বানানের টাইপো সংশোধন করা হয়েছে)
ইংরেজি নামPrickly Chaff-flower (প্রিকলি চ্যাফ-ফ্লাওয়ার)

বিবরণ

এই উদ্ভিদটি মূলত একটি সোজা বা ঋজু প্রকৃতির বহুবর্ষজীবী বীরুৎ, যা অনেক সময় উপগুল্ম হিসেবেও পরিচিতি পায়। প্রাকৃতিকভাবে গাছটি বেশ শক্ত ও অনমনীয় গড়নের হয়ে থাকে এবং এটি উচ্চতায় সাধারণত ০.৩ থেকে ১.০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়।

কাণ্ড ও ডালপালার বাহ্যিক রূপ

গাছটির কান্ড এবং ডালপালার বিন্যাসে কিছু বিশেষ বৈচিত্র্য দেখা যায়:

  • শাখায় বিভক্ত: এর প্রধান কাণ্ডটি সাধারণত নিচের অংশ থেকেই বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
  • কৌণিক গঠন: কাণ্ডগুলো দেখতে কিছুটা কৌণিক ও সরেখ প্রকৃতির হয়। এর প্রতিটি পর্ব বা গিটের ঠিক ওপরের অংশটি বেশ পুরু বা মোটা হয়ে থাকে।

পাতার চমৎকার বিন্যাস ও বৈশিষ্ট্য

এই উদ্ভিদের পাতাগুলোর আকার ও টেক্সচার বেশ দৃষ্টিনন্দন ও নরম প্রকৃতির হয়ে থাকে:

  • সজ্জিত পদ্ধতি: পাতাগুলো সরল এবং একটির বিপরীতে অন্যটি, অর্থাৎ প্রতিমুখভাবে (Opposite) সুন্দরভাবে সজ্জিত থাকে।
  • পরিমাপ ও আকৃতি: পাতাগুলো সাধারণত ২-১২ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ১.৫-৮.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। এগুলো দেখতে অনেকটা গোলাকার, ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে।
  • বোঁটা ও কিনারা: পাতার নিচের দিকটা কিছুটা সরু এবং এর বোঁটা বা বৃন্ত বেশ ছোট (প্রায় ০.৩-১.৫ সেমি) হয়। পাতার কিনারাগুলো অখণ্ড ও চ্যাপ্টা হলেও কিছুটা ঢেউ খেলানো থাকে এবং এর অগ্রভাগ হঠাৎ করেই ভোঁতা বা সূক্ষ্ম হয়ে যায়।
  • কোমল রোম: এই গাছের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—পাতার উভয় পিঠেই খুব নরম ও কোমল রোম লক্ষ্য করা যায়, যা পুরো পাতা জুড়েই বিস্তৃত থাকে।

পুষ্পবিন্যাস ও উল্টোমুখী ফুল

উদ্ভিদটির ফুল ফোটার অংশ বা পুষ্পবিন্যাস অত্যন্ত অনন্য এবং এটি দেখেই গাছটিকে সহজে চেনা যায়:

  • লম্বা স্পাইক: এর পুষ্পবিন্যাস সাধারণত শাখার অগ্রভাগে বা পার্শ্বীয় দিকে লম্বা স্পাইক (Spike) আকারে দেখা যায়, যা লম্বায় ১০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
  • মঞ্জরীদণ্ড: এর মঞ্জরীদণ্ডটি বেশ শক্ত, অনমনীয় এবং কিছুটা কৌণিক ও বাঁকানো প্রকৃতির হয়ে থাকে, যার গায়ে সূক্ষ্ম অণুরোম লক্ষ্য করা যায়।
  • নিচের দিকে মুখ করা ফুল: এর ফুলগুলো সবুজাভ এবং মসৃণ হয়। ফুলগুলো স্পাইকের ওপর শক্তভাবে নিচের দিকে মুখ করে (উল্টো হয়ে) ঝুলে থাকে। গাছটিতে ফল ধরার সময় এই স্পাইকটি আরও দীর্ঘায়িত হয়।

মঞ্জরীপত্র ও প্রজনন অঙ্গের গঠন

তাত্ত্বিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এর প্রজনন অঙ্গের গঠন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক:

  • মঞ্জরীপত্র: ফুলের মঞ্জরীপত্রগুলো স্পষ্টভাবে ডিম্বাকার এবং প্রায় ৩ মিলিমিটার লম্বা হয়, যার অগ্রভাগ বেশ দীর্ঘ হলেও খুব একটা তীক্ষ্ণ বা সুচালো নয়।
  • পুষ্পপুট: এর পুষ্পপুটের পাঁচটি খণ্ডক থাকে, যা অনেকটা বল্লমাকার বা ডিম্বাকার-আয়তাকার। এর প্রান্তগুলো ঝিল্লিময় এবং অগ্রভাগ বেশ সূক্ষ্মাগ্র প্রকৃতির হয়।
  • পুংকেশর ও ক্রোমোসোম: গাছটিতে ৫টি উজ্জ্বল পুংকেশর থাকে, যেগুলো মূলত অপ্রকৃত বন্ধ্যা এবং এদের পুংদণ্ডগুলো সূক্ষ্মভাবে বিন্যস্ত থাকে। এই উদ্ভিদের কোষের ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ১৪, ৪২।

চাষাবাদ ও বংশ বিস্তার পদ্ধতি:

আপাং উদ্ভিদটি তার চমৎকার অভিযোজন ক্ষমতা এবং সহনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রকৃতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী এক ওষুধি গাছ। মানুষের কোনো কৃত্রিম যত্ন ছাড়াই এটি যেকোনো পতিত পরিবেশে খুব সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

পছন্দসই বাসস্থান ও অনুকূল পরিবেশ

এই উদ্ভিদটি বেঁচে থাকার জন্য মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল ও উন্মুক্ত পরিবেশ বেশি পছন্দ করে। এর প্রধান বিচরণক্ষেত্রগুলো হলো:

  • রাস্তার ধার ও আইল: মেঠো পথ, পাকা রাস্তার দুই পাশে কিংবা ফসলি জমির আইলে।
  • পরিত্যক্ত বা পতিত জমি: অনাবাদী ও মানুষের আনাগোনা কম এমন খালি জায়গায়।
  • আবর্জনার স্তূপ: গৃহস্থালি বা বর্জ্য ফেলার স্তূপ রয়েছে এমন নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ মাটিতে এদের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।

যেখানে সরাসরি পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় এবং মাটির ভেজা ভাব বা স্বাভাবিক আর্দ্রতা থাকে, এমন পতিত স্থানেই এই উদ্ভিদটি সবচেয়ে দ্রুত ও সতেজভাবে বৃদ্ধি পায়।

ফুল ও ফল ধারণের নির্দিষ্ট সময়

আপাং উদ্ভিদের জীবনচক্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ফুল ও ফল ধারণের দীর্ঘ সময়:

  • বারোমাসি বৈশিষ্ট্য: প্রাকৃতিকভাবে সাধারণত প্রায় সারা বছরই এই গাছে ফুল এবং ফল দেখা যায়।
  • মূল ঋতু: তবে বছরের জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ফোটার হার সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়েই উদ্ভিদটি তার বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বীজের সাহায্যে সহজ বংশবিস্তার

এর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার এবং নতুন চারা তৈরি করার পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিকভাবে সম্পন্ন হয়:

  • বীজের ওপর নির্ভরশীলতা: এই প্রজাতিটি বংশবিস্তারের ক্ষেত্রে মূলত সুস্থ ও পরিপক্ক বীজের সাহায্যেই নতুন চারা উৎপন্ন করে।
  • নতুন চারার জন্ম: ফলের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র বীজগুলো যখন পরিপক্ক হয়ে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনুকূল পরিবেশ, সঠিক তাপমাত্রা ও প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা পেয়ে সেখান থেকে খুব সহজেই নতুন আপাং চারা গজিয়ে ওঠে।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও অবস্থান:

আপাং উদ্ভিদটি তার চমৎকার অভিযোজন ক্ষমতা বা যেকোনো পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অদ্ভুত দক্ষতার কারণে শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে এর একটি বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি রয়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আপাং উদ্ভিদের বিস্তৃতি

আন্তর্জাতিকভাবে এই উদ্ভিদটির উপস্থিতি বিশ্বের প্রধান প্রধান মহাদেশ জুড়ে লক্ষ্য করা যায়। এর প্রধান বিচরণক্ষেত্র হলো:

  • গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল: বিশ্বব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় (Tropical) এবং অপেক্ষাকৃত উষ্ণ জলবায়ু সম্পন্ন অঞ্চলগুলোতে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে।
  • সহনশীল স্বভাব: যেকোনো প্রতিকূল আবহাওয়া ও মাটির সাথে সহজে মানিয়ে নেওয়ার গুনেই এটি বিভিন্ন দেশে বন্যভাবে রাজত্ব করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর অবস্থান ও সহজলভ্যতা

আমাদের বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় এই ওষুধি উদ্ভিদটির বিস্তৃতি অত্যন্ত উল্লেখ্যযোগ্য এবং এটি দেশের অন্যতম সহজলভ্য একটি গাছ:

বিনা যত্নে বৃদ্ধি: প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা থাকায় এই গাছটি স্বকীয় নিয়মে বেড়ে ওঠে, যার জন্য আলাদা কোনো যত্ন বা চাষাবাদের প্রয়োজন হয় না।

দেশজুড়ে বিস্তৃতি: বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়, গ্রামে এবং আনাচে-কানাচে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে থাকে।

প্রধান বিচরণক্ষেত্র: সাধারণত গ্রামীণ ঝোপঝাড়, বনাঞ্চল কিংবা লোকালয়ের পরিত্যক্ত ও অনাবাদী স্থানে একে বন্যভাবে বেড়ে উঠতে দেখা যায়।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ঔষধি গুণাগুণ:

মানবদেহের বিভিন্ন জটিল ও সাধারণ রোগ নিরাময়ে আপাং উদ্ভিদের বহুমুখী ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। ১৯৩৫ সালে কীর্তিকার ও অন্যান্য গবেষকদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই উদ্ভিদের চমৎকার ওষুধি গুণের প্রমাণ পাওয়া যায়।

১. সাধারণ ও দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিরাময়

আপাং গাছটি শরীরের বেশ কিছু পরিচিত শারীরিক সমস্যা দূর করতে দারুণ কাজ করে:

  • শোথ ও উদরী রোগ: শরীরে জল জমা বা শোথ (Edema) এবং পেটে জল জমার মতো উদরী রোগে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
  • অর্শ ও বাতের ব্যথা: অর্শরোগের (Piles) অস্বস্তি কমাতে এবং হাড়ের তীব্র বাতের ব্যথা উপশমে এর ব্যবহার সুপ্রসিদ্ধ।
  • ত্বকের যত্ন: ত্বকের বিভিন্ন ধরণের ফুসকুড়ি, অ্যালার্জি বা জেদি ব্রণ দূর করতে এই উদ্ভিদের নির্যাস সাহায্য করে।

২. তীব্র সংক্রমণ ও প্রাকৃতিক প্রতিষেধক

জটিল কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত সংক্রমণে এটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে: [1]

  • ফুসফুস ও পেটের সংক্রমণ: নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং তীব্র উদরাময় বা ডায়রিয়া সারাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • যৌনবাহিত রোগ: প্রাচীন লোকজ চিকিৎসায় গনোরিয়ার মতো জটিল সংক্রমণ নিরাময়ে এর ভূমিকা রয়েছে।
  • বিষাক্ত দংশন: বিষাক্ত সাপে কাটা বা বিছা (বৃশ্চিক) কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে এর ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে।

৩. আপাং মূলের জাদুকরী ওষুধি গুণ

চিকিৎসাবিজ্ঞানে আপাং গাছের মূল বা শিকড়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়:

  • ক্ষত ও ব্যথা নিরাময়: শরীরের যেকোনো পুরনো ক্ষত দ্রুত শুকাতে এবং পাকস্থলীর তীব্র ব্যথা উপশমে এর মূল ওষুধের মতো কাজ করে।
  • টিউমার প্রতিরোধ: পেটের অভ্যন্তরীণ টিউমার প্রতিরোধে এর মূলের বিশেষ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।

৪. আপাং বীজের চমৎকার ব্যবহার

শুধু মূল বা পাতাই নয়, এই উদ্ভিদের ছোট ছোট বীজও ওষুধি গুণে ভরপুর:

পিত্তজনিত সমস্যা: পিত্তের বা লিভারের সমস্যায় মাঠা বা ঘোলের সাথে এর বীজচূর্ণ মিশিয়ে খাওয়ার একটি বিশেষ ও ঐতিহ্যবাহী প্রচলন রয়েছে।

বমনোদ্রেককারী ও জলাতঙ্ক: এর বীজ প্রাকৃতিকভাবে বমি করাতে সাহায্য করে (বমন উদ্রেককারী) এবং জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসায় লোকজ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৬ম খণ্ডে  (আগস্ট ২০১০)  আপাং প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে আপাং সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। [১] 

আপাং গাছের ভেষজ ব্যবহার 

অতিরিক্ত ঋতুস্রাব নিয়ন্ত্রণে: নারীদের অতিরিক্ত ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কমানোর ক্ষেত্রে আপাং গাছের মূল অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রাকৃতিক উপাদান। শারীরিক অবস্থা ও স্রাবের মাত্রা অনুযায়ী ২ থেকে ৪ গ্রাম পরিমাণ আপাং-এর টাটকা মূল সামান্য পানি মিশিয়ে ভালোভাবে বেটে নিয়ে সেবন করলে স্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। যদি একবার সেবনের পর স্রাব স্বাভাবিক অবস্থায় না আসে, তবে রক্তক্ষরণের তীব্রতা বুঝে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পর একই পরিমাণ মূল বাটা দ্বিতীয়বার গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এই ভেষজটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্রাবের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি।

অকালপ্রসব রোধে ব্যবহার: গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অকালপ্রসবের ঝুঁকি বা সম্ভাবনা দেখা দিলে লোকজ চিকিৎসায় আপাং গাছের একটি বিশেষ প্রয়োগ রয়েছে। এক্ষেত্রে এমন একটি কচি আপাং গাছ বেছে নিতে হয় যাতে এখনও ফুল বা মঞ্জরী আসেনি। গাছটিকে মূলসহ উপড়ে নিয়ে গর্ভবতী নারীর কটিদেশে বা কোমরে বেঁধে দিলে অকাল প্রসবের আশঙ্কা দূর হয় বলে লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবেও গণ্য করা হয়।

গ্রহণী বা দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় নিরাময়ে: দুরারোগ্য গ্রহণী রোগের চিকিৎসায় আপাং গাছের মূল ব্যবহারের একটি ভেষজ পদ্ধতি রয়েছে। এই পদ্ধতিতে, রোগের তীব্রতা অনুসারে মূলের পরিমাণ নির্ধারণের কথা বলা হয়। টাটকা আপাং মূল সামান্য ঠান্ডা পানি দিয়ে ৩-৪টি গোলমরিচসহ বেটে আধা গ্লাস ঠান্ডা পানির সাথে মিশিয়ে সেবন করা হয়। এটি সাধারণত দিনে একবার সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ক্ষত নিরাময় ও রক্তক্ষরণ বন্ধে: শরীরের কোনো স্থান কেটে গেলে বা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তপাত শুরু হলে আপাং গাছের পাতা অত্যন্ত কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে আপাং গাছের টাটকা পাতার রস দ্রুত প্রয়োগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। এই ভেষজ রসটি কেবল রক্তপাতই থামায় না, বরং কাটা স্থান দ্রুত জোড়া লাগাতে বা ক্ষত শুকাতে সাহায্য করে। তবে ভালো ফলাফলের জন্য পাতার রসটি একটু বেশি পরিমাণে ক্ষতস্থানে লাগানো প্রয়োজন।

ফোঁড়ার পুঁজ ও দূষিত রক্ত নিরাময়ে: শরীরের কোনো স্থানে ফোঁড়া হলে এবং তা থেকে পুঁজ বের না হয়ে যন্ত্রণা বাড়লে আপাং গাছের পাতা জাদুর মতো কাজ করে। এক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০টি টাটকা আপাং পাতা এবং ৪ গ্রাম আতপ চাল সামান্য ঠান্ডা পানি দিয়ে একত্রে মিহি করে বেটে নিতে হয়। এই মিশ্রণটি বা প্রলেপটি ফোঁড়ার চারপাশ জুড়ে লাগিয়ে রাখলে দ্রুত ভেতর থেকে পুঁজ ও দূষিত রক্ত বের হয়ে আসে। সঠিক ফলাফলের জন্য দিনে অন্তত দুই থেকে তিনবার এই প্রলেপটি ব্যবহার করা প্রয়োজন।

বাগী রোগ নিরাময়ে আপাং-এর ব্যবহার: শরীরের কুঁচকিতে হওয়া যন্ত্রণাদায়ক বাগী বা টিউমার সদৃশ ফোলা কমাতে আপাং গাছের বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। এক্ষেত্রে আপাং গাছের টাটকা ডাল, পাতা এবং মূল সমপরিমাণে নিয়ে হুক্কার পানির সাথে একত্রে মিশিয়ে মিহি করে বাটতে হয়। এই মিশ্রণটি বাগীর ওপর দিনে কয়েকবার প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করলে ফোলা দ্রুত কমে যায় এবং ব্যথা উপশম হয়।

শরীরের কোনো অঙ্গের ফোলা কমাতে: শরীরের কোনো অংশ ফুলে গেলে বা শোথ জাতীয় সমস্যা দেখা দিলে আপাং গাছের ব্যবহার বেশ কার্যকর। এই পদ্ধতিতে আপাং গাছের কচি ডাল, পাতা এবং মূল মিলিয়ে প্রায় ২৫ গ্রাম পরিমাণ টাটকা অংশ সংগ্রহ করতে হয়। সংগৃহীত অংশগুলো ছোট ছোট টুকরো করে একটি মাটির পাত্রে ২০০ মিলি পানিতে ভিজিয়ে মৃদু আঁচে জ্বাল দিতে হবে। ১৫ থেকে ২০ মিনিট সিদ্ধ করার পর মিশ্রণটি নামিয়ে নিতে হয়। এই ক্বাথ থেকে প্রতিদিন সকালে ৩০-৪০ মিলি এবং সন্ধ্যায় সমপরিমাণ অংশ সেবন করলে ফোলা দ্রুত কমে যায়। ভালো ফলাফল পেতে চার থেকে পাঁচ দিন নিয়মিত এটি পান করা জরুরি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিদিনের ঔষধ প্রতিদিন টাটকা তৈরি করে নিতে হবে; বাসি মিশ্রণ সেবন করা একদমই উচিত নয়।

কলেরা বা পাতলা পায়খানা নিরাময়ে: কলেরার মতো জটিল সমস্যায় আপাং গাছের মূল একটি কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। এই রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই প্রায় ৪ গ্রাম পরিমাণ টাটকা আপাং মূল সামান্য পানি দিয়ে মিহি করে বেটে নিতে হবে। এরপর এই বাটা মিশ্রণটি আধা কাপ পানিতে ভালোভাবে গুলিয়ে নিতে হবে। রোগী যেন একবারে বেশি ঔষধ খেয়ে পেটে চাপ অনুভব না করে এবং মলের সাথে ঔষধ বেরিয়ে না যায়, সেজন্য এটি অল্প মাত্রায় বারবার সেবন করা প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী, মিশ্রণটি থেকে প্রতি ৫ থেকে ৬ মিনিট অন্তর ১ থেকে ২ চামচ করে খাওয়ালে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।

অকালে চুল পাকা রোধ ও নতুন চুল গজাতে: চুলের অকাল পক্কতা রোধ এবং নতুন চুল গজাতে আপাং গাছের শিকড় অত্যন্ত কার্যকর একটি প্রাকৃতিক উপাদান। চুলের পরিমাণ অনুযায়ী টাটকা শিকড় মিহি করে বেটে নিয়ে গোসলের অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে পুরো মাথায় ভালোভাবে প্রলেপ দিতে হয়। সাধারণত ছেলেদের ক্ষেত্রে অল্প এবং মেয়েদের লম্বা চুলের জন্য একটু বেশি পরিমাণ শিকড় বাটা প্রয়োজন হতে পারে। দুপুরে গোসলের আগে নিয়মিত এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে চুলের স্বাভাবিক কালো রং ফিরে আসে এবং মাথার ত্বকে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে।

দাদ বা চর্মরোগ নিরাময়ে আপাং-এর ব্যবহার: চামড়ার জেদি দাদ বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন দূর করতে আপাং গাছের ডাঁটা বেশ কার্যকর। এই পদ্ধতিতে প্রথমে আপাং গাছের শুকনো ডাঁটা আগুনে পুড়িয়ে ছাই বা ক্ষার তৈরি করে নিতে হয়। এরপর প্রায় ৮ গ্রাম পরিমাণ এই ক্ষারের সাথে সামান্য জলপাই তেল (Olive Oil) বা তিল তেল মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। এই মিশ্রণটি দাদ আক্রান্ত স্থানে ভালো করে ঘষে ঘষে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। সাধারণত নিয়মিত তিন থেকে চার দিন ব্যবহার করলেই দাদ সেরে যায়।

বিষাক্ত ক্ষত নিরাময়ে: শরীরের কোনো ক্ষতস্থান যদি বিষিয়ে যায় এবং সাধারণ ওষুধে সারতে না চায়, তবে আপাং গাছের পাতা ও কচি ডালের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে। এক্ষেত্রে ১০-১৫ মিলি টাটকা পাতা ও কচি ডাল বাটার রসের সাথে দেড় চামচ খাঁটি গাওয়া ঘি মিশিয়ে হালকা ভেজে নিতে হবে। এই মিশ্রণটি প্রতিদিন সকালে একবার এবং রাতে ঘুমানোর আগে আরও একবার ক্ষতস্থানে প্রলেপ হিসেবে লাগালে বিষাক্ত ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায়। ওষুধের কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং বিছানা পরিষ্কার রাখতে প্রলেপ দেওয়ার পর একটি পরিষ্কার পাতলা কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থানটি হালকাভাবে বেঁধে রাখা ভালো।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)

.ইসলাম, এবিএম রবিউল (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”। in আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৮৮–৮৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. প্রকাশ ও পরিমার্জন সংক্রান্ত নোট: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ২৩ মে ২০১৮ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিকতা বজায় রাখতে আজ ০২ জুলাই ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!