মানকচুর পরিচিতি ও ভেষজ গুণাগুণ: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অবাক করা তথ্য

মানকচু

বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia macrorrhizos (L.) G. Don in Sweet, Hort. Brit. ed. 3: 631(1839). সমনাম: Arum macrorrhizon L. (1753), Arum indicum Lour. (1790). ইংরেজি নাম: জায়েন্ট ট্যারো। স্থানীয় নাম: মানকচু, ফানকচু।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Tracheophytes. অবিন্যাসিত: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Monocots. বর্গ: Alismatales. পরিবার: Araceae. গণ: Alocasia, প্রজাতি: Alocasia macrorrhizos.

ভূমিকা: মানকচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia macrorrhizos)  বাংলাদেশের অতি পরিচিত কচুর প্রজাতি। সবজি হিসাবে এর ব্যবহার যথেষ্ট। এছাড়া এতে রয়েছে নানা ভেষজ গুণাগুণ।

মানকচু-এর বর্ণনা:

প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি হলো এই চিরহরিৎ বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদটি। এটি আকারে বেশ বড় এবং দেখতে বেশ হৃষ্টপুষ্ট। এর কাণ্ডটি বেশ মজবুত, যার পুরুত্ব প্রায় ১৫ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। গাছটির পাতার গঠনও বেশ চমৎকার। লম্বা সবুজ বৃন্তের ওপর ভর করে থাকা এর পাতাগুলো লম্বায় ০.৫ থেকে ০.১ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই পাতাগুলো কেবল কাণ্ডকে বেষ্টন করেই থাকে না, বরং এগুলো বেশ দৃঢ় এবং ডিম্বাকার আকৃতির। এক একটি পাতার আকার প্রায় ৬০-৮০ x ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার, যা দেখতে বেশ বিশাল। পাতার উপরের অংশটি উজ্জ্বল সবুজ হলেও নিচের দিকটি কিছুটা ফ্যাকাশে রঙের হয়, যা একে একটি দ্বৈত রূপ দান করে।

এই উদ্ভিদটির পত্রকক্ষ থেকে দুই বা তার বেশি মঞ্জরী বের হয়। এর মঞ্জরীদণ্ড পাতার বৃন্তের তুলনায় কিছুটা খাটো হয়ে থাকে। এর চমসা বা বিশেষ ধরনের আবরণটি প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, যার উপরের অংশটি দেখতে অনেকটা নৌকার মতো এবং রঙ হলুদাভ-সাদা। উদ্ভিদটির স্পেডিক্স অংশটি সরাসরি যুক্ত থাকে এবং এর প্রজনন অঙ্গগুলো বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত। এতে স্ত্রী পুষ্প এবং পুংকেশর ধারণকারী অংশগুলো আলাদাভাবে অবস্থান করে। এর গর্ভাশয় ডিম্বাকার এবং এক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট, যা উদ্ভিদটির প্রজনন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিণত অবস্থায় এই উদ্ভিদে কমলা রঙের ছোট ছোট উপবৃত্তাকার ফল দেখা যায়। এই বেরি জাতীয় ফলগুলো আকারে প্রায় ৬ মিলিমিটারের মতো হয়। প্রতিটি ফলে খুব অল্প সংখ্যক বীজ বা ডিম্বক থাকে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদটির ক্রোমোসোম সংখ্যা হচ্ছে 2n = ২৮। সব মিলিয়ে এর বিশাল আকৃতি এবং চিরসবুজ প্রকৃতি যেকোনো বাগান বা প্রাকৃতিক পরিবেশে এক বিশেষ সৌন্দর্য যোগ করে।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

এই উদ্ভিদটি সাধারণত আর্দ্র এবং ছায়াযুক্ত পরিবেশে জন্মাতে পছন্দ করে। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জের ঝোপঝাড় এবং ছোট ছোট নদীর তীরে যেখানে পানির প্রবাহ রয়েছে, সেখানে এদের বেশি দেখা যায়। এছাড়া নিচু জলাভূমি বা বড় বড় গাছের নিচে যেখানে সরাসরি কড়া রোদ পৌঁছাতে পারে না, এমন ছায়াঘেরা স্যাঁতস্যাঁতে স্থান এই উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য আদর্শ। প্রাকৃতিক এই পরিবেশগুলোতে এরা কোনো বিশেষ যত্ন ছাড়াই চমৎকারভাবে টিকে থাকতে পারে।

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই উদ্ভিদে ফুল ও ফলের সমারোহ দেখা যায়। সাধারণত জুলাই মাস থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ফোটে এবং ফল ধরতে দেখা যায়। অর্থাৎ বর্ষার মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে শরৎকাল পর্যন্ত এটি সতেজ থাকে।

বংশ বিস্তারের ক্ষেত্রে উদ্ভিদটি বিশেষ এক পদ্ধতি অনুসরণ করে। মূলত ‘শাখা কন্দ’ বা রাইজোমের (Rhizome) মাধ্যমেই এরা নতুন চারা তৈরি করে। কন্দের সাহায্যে বংশ বৃদ্ধি হওয়ার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি তার আশেপাশে নতুন নতুন উদ্ভিদের জন্ম দিয়ে একটি ঘন ঝোপ তৈরি করতে সক্ষম।

বিস্তৃতি:

এই উদ্ভিদটি মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। এর বিস্তৃতি দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই উদ্ভিদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতেও প্রাকৃতিকভাবেই এই উদ্ভিদটি সগৌরবে বেড়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত পরিচিত। দেশের জলবায়ু ও মাটি এর বেড়ে ওঠার জন্য বেশ উপযোগী হওয়ায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই একে জন্মাতে দেখা যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ছায়াঘেরা আর্দ্র স্থানে এটি কোনো প্রকার বাড়তি যত্ন ছাড়াই টিকে থাকে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

মানকচু আমাদের দেশের একটি পরিচিত ও অর্থকরী উদ্ভিদ। এর কন্দ বা নিচের অংশটি সবজি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে পটুয়াখালী, বরিশাল, যশোর এবং খুলনা জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভাবে প্রচুর পরিমাণে মানকচুর চাষ করা হয়। সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি এটি খাদ্য হিসেবে বেশ পুষ্টিকর, যার ফলে এটি স্থানীয় বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি হয়। সবজি হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি এটি চাষ করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর অনন্য ভেষজ গুণাবলি।

ভেষজ ও ঔষধি গুণাগুণ

প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশের লোকজ চিকিৎসায় মানকচুর ব্যবহার হয়ে আসছে। এর বিভিন্ন অংশ নানা ধরনের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

  • সংক্রমণ ও টিউমার: পোকামাকড় কামড়ালে বা শরীরের কোনো স্থানে টিউমারের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে চিকিৎসায় মানকচু ব্যবহার করা হয়।
  • মুখের ক্ষত নিরাময়: জিভ বা মুখের ভেতরের ঘা সারাতে মানকচুর কন্দ পুড়িয়ে সেই ছাই ব্যবহার করার প্রচলন রয়েছে, যা দ্রুত আরাম দিতে সাহায্য করে।
  • আঙুলের সংক্রমণ বা হাজা: মানকচুর একটি চমকপ্রদ জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে। আঙুলের সংক্রমণের চিকিৎসায় বা ইনফেকশন কমাতে রোগীরা আক্রান্ত আঙুলটি মানকচুর বৃন্তের (পাতার বোঁটা) ভেতরে সারাদিন ঢুকিয়ে রাখে। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এতে সংক্রমণের তীব্রতা দ্রুত কমে আসে।
  • হজম ও শারীরিক উপকারিতা
  • এই কচু অত্যন্ত লঘু বা হালকা হওয়ার কারণে খুব দ্রুত হজম হয়। এটি শরীরের ফোলা ভাব বা শোথ রোগ সারাতে এবং স্বাভাবিক প্রস্রাবের মাত্রা বজায় রাখতে কার্যকর সাহায্য করে।
  • পেটের সমস্যায় মানকচুর প্রভাব
  • মানকচু অনেকটা প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে। অল্প মাত্রায় খেলে এটি পেট পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। অনেকের মতে এটি মল রোধক হিসেবেও কাজ করে, যা শরীরের নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।
  • মানকচুর কদর ও স্বাদ
  • সব ধরনের কচু প্রজাতির মধ্যে স্বাদে এবং পুষ্টিতে মানকচুর কদর বা ‘মান’ সবচেয়ে বেশি। এটি কেবল পুষ্টিকরই নয়, সঠিকভাবে রান্না করলে এটি অন্য সব সবজির চেয়ে অনেক বেশি সুস্বাদু হয়।
  • পাতা খাওয়ার সঠিক নিয়ম
  • শুধু কন্দ নয়, মানকচুর পাতাও শাক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। তবে পাতা রান্নার আগে তা ভালো করে সেদ্ধ করে পানি ফেলে দেওয়া জরুরি। এরপর ঘন্ট বা শাক হিসেবে রান্না করলে এর প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়।
  • মুখরোচক খাওয়ার উপায়
  • মানকচু খাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও সুস্বাদু উপায় হলো এর ভাজা। প্রথমে কচু সেদ্ধ করে পাতলা ও চাকা চাকা করে কেটে নিতে হয়। এরপর তেলে মচমচে করে ভাজলে এটি ভাতের সাথে খেতে দারুণ লাগে।
  • রক্তপিত্ত ও শরীরের বল বৃদ্ধি
  • নাক বা মুখ দিয়ে রক্ত পড়ার মতো (রক্তপিত্ত) সমস্যায় মানকচু বেশ ফলদায়ক। এটি খাওয়ার ফলে ক্ষুধা বাড়ে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শারীরিক বল বৃদ্ধি পায়।
  • মায়েদের জন্য উপকারিতা
  • প্রসূতি মায়েদের জন্য মানকচু অত্যন্ত উপকারী একটি পথ্য। এটি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকলে স্তন্যদুগ্ধের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত কচু খেলে শরীরে কফ বা বায়ুর পরিমাণ বাড়তে পারে।

পুষ্টি ও ভেষজ শক্তির সংমিশ্রণ থাকায় এই সবজিটি একদিকে যেমন আমাদের পুষ্টির চাহিদা মেটায়, অন্যদিকে প্রাকৃতিক নিরাময়ক হিসেবেও কাজ করে।

আরো পড়ুন:

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) মানকচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে মানকচু সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।

তথ্যসূত্র:

১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১০৮-১০৯।

Leave a Comment

error: Content is protected !!