লম্বা ফানকচু: বিরল এই উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য, আবাসস্থল ও ভেষজ গুণাগুণ

লম্বা ফানকচু


বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia navicularis C. Koch et Bouché in Ind. Sem. Hort. Berol. App.: 2 (1855). সমনাম: Colocasia navicularis C. Koch et Bouché (1853). ইংরেজি নাম: জানা নেই। স্থানীয় নাম: লম্বা ফানকচু।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Tracheophytes. অবিন্যাসিত: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Monocots. বর্গ: Alismatales. পরিবার: Araceae. গণ: Alocasia, প্রজাতি: Alocasia navicularis.

ভূমিকা: লম্বা ফানকচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia navicularis) বাংলাদের পাহাড়ি অঞ্চলে জন্মানো বিরুৎ। এই কচু সচরাচর পাওয়া যায় না। এই প্রজাতি দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মালেও বাংলাদেশে এর অবস্থান সংকটাপন্ন।

লম্বা ফানকচু-এর বর্ণনা:

প্রকৃতির বিশাল ভাণ্ডারে অসংখ্য উদ্ভিদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যার মধ্যে লম্বা ফানকচু অন্যতম। এটি একটি অশাখ ও দৃঢ় বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি উচ্চতায় বেশ বড় হতে পারে, যা সর্বোচ্চ ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর শারীরিক গঠন এবং পাতার অনন্য বিন্যাস একে অন্য সব কচু জাতীয় উদ্ভিদ থেকে আলাদা করেছে। লম্বা ফানকচুর পাতাগুলো বেশ বড় এবং দর্শনীয়। এর দৈর্ঘ্য সাধারণত ২২ থেকে ৪৩ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ১২ থেকে ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাতাগুলো প্রশস্ত এবং দেখতে অনেকটা দীর্ঘায়ত-তীরাকার। পাতার উপরের অংশ ফ্যাকাশে সবুজ বর্ণের এবং এর শীর্ষভাগ বেশ তীক্ষ্ণ বা সুচালো। এই উদ্ভিদের পাতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর শিরা বিন্যাস। এতে ৩ থেকে ৪ জোড়া পার্শ্বীয় শিরা থাকে। পাতার গোড়ার অংশ বা মূলীয় খণ্ডটি ত্রিকোণাকার এবং এর পত্রখন্ডকীয় খাঁজগুলো ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এছাড়া এর পত্রবৃন্ত বা বোঁটা ২৫ থেকে ৫৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। লম্বা ফানকচুর পুষ্পমঞ্জরী বেশ চমৎকার। এর মঞ্জরীদন্ড পত্রবৃন্তের চেয়ে কিছুটা ছোট হয়। এর ‘চমসা’ বা স্প্যাথ অংশটি বেশ দৃঢ় এবং ১১ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা। চমসাটি দেখতে অনেকটা নৌকার মতো এবং এর রঙ হালকা হলুদ হয়ে থাকে। এর নালি সদৃশ অংশটি সবুজ এবং আকারে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটারের মতো হয়। অন্যদিকে এর স্পেডিক্স অংশটি চমসার তুলনায় কিছুটা ছোট (৯.৫ – ১৩.০ সেমি) এবং উপাঙ্গটি মোচকাকৃতি হয়ে থাকে। উদ্ভিদটির বংশবিস্তার এবং ফলের গঠনও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। লম্বা ফানকচুর ফলগুলো ‘বেরি’ জাতীয় এবং এগুলো বিডিম্বাকার হয়ে থাকে। ফলের আকার সাধারণত ৫ থেকে ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। এর গর্ভাশয় ডিম্বাকৃতি এবং এতে ৪ থেকে ৫টি ডিম্বক থাকে। আপনি যদি এই উদ্ভিদের ফুল দেখতে চান, তবে বর্ষাকাল অর্থাৎ জুলাই মাস হলো উপযুক্ত সময়। গবেষকদের মতে, এই প্রজাতির উদ্ভিদের ক্রোমোজোম সংখ্যা হলো 2n = ২৮

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

এই উদ্ভিদটি মূলত পাহাড়ের পাদদেশে জন্মাতে বেশি পছন্দ করে। পাহাড়ের ঢালে যেখানে সরাসরি কড়া রোদ পড়ে না, এমন ছায়াযুক্ত এবং সেঁতসেঁতে স্থান এই গাছের জন্য সবচেয়ে আদর্শ। মাটির আদ্রতা এবং শীতল পরিবেশ এর দ্রুত বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বনাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকার ছায়াময় আর্দ্র পরিবেশে এদের দলবদ্ধভাবে জন্মাতে দেখা যায়। যারা বাগান বা নির্দিষ্ট স্থানে এটি চাষ করতে চান, তাদের অবশ্যই মাটির আর্দ্রতা এবং পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

লম্বা ফানকচু প্রাকৃতিকভাবে খুব সুন্দরভাবে নিজের বংশবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। এর বংশবিস্তারের প্রধান মাধ্যম হলো গ্রন্থিকন্দ (Rhizome)। মাটির নিচে থাকা এই রূপান্তরিত কন্দ থেকেই নতুন নতুন চারা গজায়। একটি পরিণত গাছের গ্রন্থিকন্দ বিভাজন করে বা সেই কন্দ উপযুক্ত স্থানে রোপণ করে খুব সহজেই নতুন উদ্ভিদ তৈরি করা সম্ভব। এই পদ্ধতিটি বেশ কার্যকর এবং নির্ভরযোগ্য, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট এলাকায় গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

বিস্তৃতি:

প্রাকৃতিকভাবে এই উদ্ভিদটি উত্তর-পূর্ব ভারত এবং থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি এলাকা এবং থাইল্যান্ডের আর্দ্র ক্রান্তীয় বনগুলো এই উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই অঞ্চলগুলোর আবহাওয়া ও মাটি লম্বা ফানকচুর বংশবিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যা একে ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভিদের অবস্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা মৌলভীবাজার থেকে এই প্রজাতিটি সংগ্রহ করা হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলা তার ঘন অরণ্য, পাহাড় আর বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদের জন্য পরিচিত। বিশেষ করে এই জেলার ছায়াযুক্ত ও পাহাড়ি পরিবেশে লম্বা ফানকচুর উপস্থিতি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের জন্য একটি বিশেষ গবেষণার বিষয়। বাংলাদেশের সীমিত কিছু এলাকায় এর দেখা মেলায় উদ্ভিদটি এদেশের বনজ সম্পদের তালিকায় এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে।

ভেষজ গুণাগুণ ও ঔষধি ব্যবহার

লম্বা ফানকচু কেবল একটি বুনো উদ্ভিদই নয়, বরং এর বিভিন্ন অংশে রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। আদিবাসী এবং লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত। তবে মনে রাখতে হবে যে, এই উদ্ভিদের কান্ড বা কিছু অংশ কাঁচা অবস্থায় বিষাক্ত হতে পারে, তাই এর ব্যবহার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা প্রয়োজন।

১. ক্ষত ও চর্মরোগের চিকিৎসায়:
এই উদ্ভিদের অন্যতম প্রধান ভেষজ গুণ হলো এর ক্ষত নিরাময়কারী ক্ষমতা। এর পাতা বা কান্ডের রস বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করলে কেটে যাওয়া স্থান বা চর্মরোগের সংক্রমণে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। বিশেষ করে ত্বকের আলসার বা ঘা সারাতে এর কার্যকারিতা লক্ষ্য করা গেছে।

২. ব্যথা ও প্রদাহ উপশমে:
লোকজ চিকিৎসায় লম্বা ফানকচুকে প্রদাহরোধী (Anti-inflammatory) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হাড়ের সংযোগস্থলের ব্যথা বা শরীরের কোনো অংশ ফুলে গেলে এর নির্যাস মালিশ করলে ব্যথা উপশম হয়। এছাড়া রক্তনালীর প্রদাহ বা ভাসকুলাইটিস (Vasculitis) নিরাময়েও এর ব্যবহার রয়েছে।

৩. বিষাক্ত কামড় ও ইনফেকশন দমনে:
পাহাড়ি এলাকায় সাপে কাটা বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়ের চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের কান্ড ব্যবহার করা হয়। এর নির্যাস বিষের প্রভাব কমাতে এবং সংক্রমণের হাত থেকে ক্ষতস্থান রক্ষা করতে সাহায্য করে।

৪. অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণ:
গবেষণায় দেখা গেছে, ফানকচু বা সমগোত্রীয় উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। [২]

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) লম্বা ফানকচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, অরণ্য ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশে এটি সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে লম্বা ফানকচু সংরক্ষণের জন্য কোন পদক্ষেপ নেই। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে প্রকৃত আবাসস্থল ও তার বাইরে সংরক্ষণ জরুরি।

তথ্যসূত্র:

১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. Plants of the World Online, tuasaude.com ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবিটি নেওয়া হয়েছে Thailand Nature Project ওয়েব সাইট থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!