ভূমিকা: চীনা বিষকচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Alocasia cucullata) অরণ্যে জন্মানো ভেষজ বিরুৎ। বাংলাদেশে এই কচু পাওয়া যায় এবং আদিবাসীরা ভেষজ ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করে।
চীনা বিষকচু-এর বর্ণনা:
প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি হলো এই চিরহরিৎ বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদটি, যা তার ঋজু ও সুস্পষ্ট বায়বীয় কাণ্ডের জন্য সহজেই নজর কাড়ে। সাধারণত এই উদ্ভিদের কাণ্ড ৫০-৮০ সেমি লম্বা এবং ৫-১৫ সেমি পর্যন্ত চওড়া হয়ে থাকে, যা ভূমি বক্রধাবকের মাধ্যমে মাটির সাথে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। এর অন্যতম আকর্ষণ হলো এর প্রচুর পরিমাণে থাকা সবুজ পাতা; যার প্রতিটি বৃন্ত প্রায় ৭৫ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এর প্রায় ৩০ সেমি অংশ কাণ্ডকে বেশ চমৎকারভাবে বেষ্টন করে রাখে। ডিম্ব-তাম্বুলকার আকৃতির এই পত্রফলকগুলোর উপরিভাগ সতেজ সবুজ হলেও নিম্নাংশ কিছুটা ফ্যাকাশে সবুজ বর্ণের হয়, যা উদ্ভিদটিকে একটি ভিন্নধর্মী রূপ দান করে। এর পুষ্পবিন্যাসও বেশ বৈচিত্র্যময়; কাক্ষিক মঞ্জরীদন্ডটি ৩৫ সেমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এর নৌকাকৃতি পুষ্পফলকটি ১২ সেমি দীর্ঘ একটি সাদা স্পেডিক্সকে ধারণ করে। বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় এই উদ্ভিদে ৬-৮ মিমি ব্যাসের অর্ধবর্তুলাকার ‘বেরি’ জাতীয় ফল দেখা যায়, যার প্রতিটিতে একটি করে ডিম্বক থাকে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা ২n=২৮ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, যা উদ্ভিদবিদদের কাছে এর গঠনগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
এই উদ্ভিদটি সাধারণত ছায়াযুক্ত এবং সেঁতসেঁতে পরিবেশ পছন্দ করে। গভীর অরণ্যের ছায়াঘেরা স্থান কিংবা গ্রামের ঝোপঝাড়ে এদের প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠতে দেখা যায়। মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত গাছটিতে ফুল ও ফল ধরার উপযুক্ত সময়। এই উদ্ভিদ মূলত বীজ এবং কন্দের মাধ্যমে বংশবিস্তার বা প্রজনন সম্পন্ন করে থাকে।
বিস্তৃতি:
ভৌগোলিক বিস্তৃতির কথা বলতে গেলে, এই উদ্ভিদটি প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়। বাংলাদেশেও এটি বেশ সুপরিচিত এবং দেশের প্রায় সর্বত্রই একে প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেখা যায়।
জাতিতাত্বিক ব্যবহার:
ঐতিহ্যগত চিকিৎসা এবং জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহারে এই উদ্ভিদটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে এই গাছটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ভেষজ হিসেবে পরিচিত। আদিবাসীরা দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সমাধানে এই গাছটিকে প্রথাগত ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এর ব্যবহারের প্রধান পদ্ধতি হলো উদ্ভিদটিকে সংগ্রহ করে তা ভালোভাবে চূর্ণ করা এবং একটি ঘন মিশ্রণ বা লেই তৈরি করা।
এই তৈরিকৃত ভেষজ লেই মূলত বাহ্যিক চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। লোকজ চিকিৎসায় বিশ্বাস করা হয় যে, বিষধর সাপের কামড়ের স্থানে এই লেই প্রলেপ হিসেবে লাগালে তা বিষের প্রকোপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও শরীরে কোনো স্থানে ফোড়া হলে বা দীর্ঘমেয়াদী বাতের ব্যথা (Rheumatism) এবং হাড়ের সন্ধিবাত (Joint Pain) জনিত সমস্যায় এই প্রলেপ অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে বিবেচিত। এটি কেবল প্রাচীন বিশ্বাস নয়, বরং গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছেও এটি একটি পরীক্ষিত ঘরোয়া নিরাময় পদ্ধতি হিসেবে টিকে আছে।
অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) চীনা বিষকচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে চীনা বিষকচু সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৮-২৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: David J. Stang
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।