বাংলাদেশের সমৃদ্ধ কচ্ছপ ও কাছিম জগতের জীববৈচিত্র্যে পেলোচেলিস (Pelochelys) গণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। বিজ্ঞানী জন এডওয়ার্ড গ্রে ১৮৬৪ সালে প্রথম এই বিশেষ গণের নামকরণ ও বৈজ্ঞানিক বিবরণ দেন। এটি ‘Trionychidae’ বা নরম খোলসযুক্ত তরুণাস্থি কাছিম পরিবারের একটি বিশেষ গণ। এই গণের কাছিমগুলো মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় বড় নদী, মোহনা এবং উপকূলীয় মিষ্টি ও নোনা পানির অববাহিকায় বাস করে।
📊 পেলোচেলিস (Pelochelys) গণের জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
পেলোচেলিস গণের বৈজ্ঞানিক টেক্সোনমি বা শ্রেণীবিন্যাসের বিবরণ নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
| ধাপ (Rank) | নাম (Taxon) |
|---|---|
| জগৎ (Kingdom) | Animalia (প্রাণী) |
| পর্ব (Phylum) | Chordata (মেরুদণ্ডী) |
| শ্রেণি (Class) | Reptilia (সরীসৃপ) |
| বর্গ (Order) | Testudines (কাছিম/কচ্ছপ) |
| পরিবার (Family) | Trionychidae (তরুণাস্থি কাছিম পরিবার) |
| গণ (Genus) | Pelochelys Gray, 1864 |
নিচে এই প্রাচীন ও বিশালাকৃতির কাছিম গণের বাহ্যিক গঠন, কঙ্কালতন্ত্র এবং জীবনযাত্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আলোচনা করা হলো:
🐢 পেলোচেলিস গণের শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য
পেলোচেলিস গণের কাছিমগুলোর মাথার খুলি এবং খোলসের হাড়ের গঠনে কিছু বিশেষ কঙ্কালতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এদের অন্য সাধারণ কচ্ছপ থেকে সহজেই আলাদা করতে সাহায্য করে।
১. প্রশস্ত মাথা ও খুলির গঠন (Cranial Features)
- চ্যাপ্টা মাথা: এই গণের কাছিমদের মাথার খুলি বা করোটি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং পৃষ্ঠীয়ভাবে (উপরের দিক থেকে) বেশ চ্যাপ্টা আকৃতির হয়ে থাকে।
- পোস্ট-অরবিটাল খিলান: এদের চোখের ঠিক পিছনের হাড়ের খিলান বা পোস্ট-অরবিটাল খিলানটি (Post-orbital Arch) চোখের কোটরের (Orbit) ব্যাসের চেয়েও বেশি প্রশস্ত বা চড়া হয়।
- মুক্ত টেরিগয়েড: এদের খুলির ভেতরের অংশে থাকা টেরিগয়েড (Pterygoid) হাড়ের পিছনের কিনারাটি সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে এবং এর কোনো উর্ধ্বমুখী প্রসারণ (Upward Process) থাকে না।
২. খোলস ও কঙ্কালের জটিল বিন্যাস (Shell Anatomy)
- নুকাল শিল্ডের সংযোগ: এদের ঘাড়ের কাছের খোলসের অংশ বা নুকাল শিল্ডের (Nuchal Shield) বাইরের প্রান্তটি কঙ্কালের ২য় পৃষ্ঠীয় পাঁজরের (2nd Dorsal Rib) ওপর সুন্দরভাবে আবৃত বা ওভারল্যাপ করা থাকে।
- মেরুশিল্ডের বিশেষ সিরিজ: এদের খোলসের মাঝবরাবর থাকা ৭ম জোড়া, ৮ম জোড়া বা ৯ম জোড়ার মেরুশিল্ড বা আঁইশগুলো (Vertebral Shields) একত্রে একটি দীর্ঘ সিরিজ বা চেইন তৈরি করে। এর মধ্যে শেষের দিকের এক জোড়া বা দুই জোড়া শিল্ড দেহের একদম মধ্যরেখা বরাবর সুনির্দিষ্টভাবে অবস্থান করে।
- প্রাপ্তবয়স্কদের কড়া: পূর্ণাঙ্গ বা প্রাপ্তবয়স্ক কাছিমের খোলসের ত্বকে ৪টি বিশেষ কড়া বা শক্ত কীলকাকৃতির শিলা (Callosities) দেখা যায়।
৩. বক্ষস্ত্রাণ ও নিচের অংশ (Plastron Features)
- নরম মাংসপিণ্ডহীন ত্বক: এদের নিচের দিকের নরম খোলস বা বক্ষস্ত্রাণের (Plastron) ত্বকে অন্য তরুণাস্থি কাছিমদের মতো অতিরিক্ত কোনো নরম মাংসপিণ্ড থাকে না।
- ভাল্ব ও প্রান্তীয় শিল্ডের অনুপস্থিতি: এদের দেহে কোনো ধরনের কাইটিনাস ফিমোরাল ভাল্ব (Chitinous Femoral Valve) বা সুরক্ষামূলক চামড়ার কপাটিকা থাকে না। এছাড়া এদের খোলসের চারপাশে কোনো প্রান্তীয় শিল্ড (Marginal Shield) বা শক্ত ধারের আঁইশ থাকে না।
- হাড়ের পৃথকীকরণ: এদের মধ্য-বক্ষস্ত্রাণটি (Hyoplastron) নিপুণভাবে অধঃপোবক্ষস্ত্রাণ (Hypoplastron) নামক নিচের হাড়ের অংশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক বা আলাদা থাকে।
৪. পা ও লেজের গঠন
- অনাবৃত পা: এদের পাগুলো কোনো অতিরিক্ত ভারী আঁইশ বা বর্ম ছাড়াই সম্পূর্ণ অনাবৃত বা উন্মুক্ত থাকে এবং পানির নিচে দ্রুত সাতার কাটার জন্য এদের আঙুলগুলো পাতলা চামড়া দ্বারা যুক্ত থাকে।
- ছোট লেজ: এদের লেজ সাধারণত শরীরের তুলনায় বেশ ছোট এবং খাটো প্রকৃতির হয়ে থাকে।
🌍 বিশ্বব্যাপী ও বাংলাদেশে পেলোচেলিস গণের প্রজাতিসমূহ
বিশ্বের বন্যপ্রাণী ও কচ্ছপ গবেষকদের আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী, পেলোচেলিস গণের অধীনে পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ৩টি জীবিত প্রজাতি পাওয়া যায়। প্রজাতিগুলোর নাম এবং তাদের ভৌগোলিক অবস্থান নিচে দেওয়া হলো:
১. এশীয় জাতা তরুণাস্থি কাছিম বা ক্যান্টরের জাতা তরুণাস্থি কাছিম (Pelochelys cantorii)
- পরিচিতি: এটি আন্তর্জাতিকভাবে ‘Cantor’s Giant Softshell Turtle’ বা ক্যান্টরের জায়ান্ট সফটশেল টার্টল নামে পরিচিত।
- বিস্তৃতি: এই তিনটি প্রজাতির মধ্যে কেবল এই একটি প্রজাতিই বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। এরা ওজনে ১০০ কেজিরও বেশি হতে পারে এবং বর্তমানে বাংলাদেশে এটি একটি মারাত্মক বিপন্ন প্রজাতি।
২. নিউ গিনি জাতা তরুণাস্থি কাছিম (Pelochelys bibroni)
- পরিচিতি: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি ‘Southern New Guinea Giant Softshell Turtle’ নামে পরিচিত। এদের পিঠের খোলসে চমৎকার এবং স্পষ্ট ডোরাকাটা বা রেখার নকশা দেখা যায়।
- বিস্তৃতি: এই প্রজাতিটি সম্পূর্ণ আঞ্চলিক। এটি মূলত ওশেনিয়া অঞ্চলের দক্ষিণ নিউ গিনি দ্বীপের মিষ্টি পানির নদী ও জলাশয়ে সীমাবদ্ধ।
৩. দাগি জাতা তরুণাস্থি কাছিম (Pelochelys signifera)
- পরিচিতি: বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এটি ‘Northern New Guinea Giant Softshell Turtle’ নামে সুপরিচিত। বিজ্ঞানী ওয়েব ২০০২ সালে একে সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। এদের বাচ্চাদের খোলসে জালের মতো চমৎকার ফিনফিনে কালো বিন্দুর নকশা থাকে, যা পূর্ণাঙ্গ বয়সে জলপাই-বাদামি রঙে রূপ নেয়।
- বিস্তৃতি: এটি মূলত উত্তর নিউ গিনি অঞ্চলের নদী ও অববাহিকায় প্রাকৃতিকভাবে বসবাস করে।
📝 উপসংহার (Conclusion)
পেলোচেলিস গণের কচ্ছপগুলো তাদের চ্যাপ্টা মাথার খুলি এবং বিশালাকৃতির কারণে কচ্ছপ জগতের এক অনন্য বিস্ময়। নদী ও উপকূলীয় মোহনার গভীর পানির বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই গণের কাছিমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে অতিরিক্ত শিকার, জাল পেতে ধরা এবং নদী দূষণের কারণে এই প্রাচীন প্রাণীগুলো আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আমাদের পরিবেশের ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই বিরল কচ্ছপ গণের প্রজাতিগুলোকে কঠোর আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
আরো পড়ুন
- পেলোচেলিস (Pelochelys) কাছিম গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (Lissemys punctata): পরিচিতি, বাসস্থান ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য
- মুকুটি নদ-কাইট্টা: নদীর কালী কাছিমের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- মেলানোক্লিস (Melanochelys) কচ্ছপ গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- বাণিজ্যিক কচ্ছপ চাষ পদ্ধতি: চীনা নরম খোলস কচ্ছপ চাষের আধুনিক গাইড
- পরিবেশ রক্ষায় কচ্ছপের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে কচ্ছপ বিলুপ্তির কারণ
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের সম্পূর্ণ তালিকা
- বাটাগুড় বা বোদো কাইট্টা: মহাবিপন্ন কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও প্রজননের সফল ইতিহাস
- ৬০টি সুন্দি কাছিম গোপালগঞ্জ জেলার বাঘিয়া নদীতে অবমুক্ত
- নেত্রকোনার জারিয়া জাঞ্জাইলের পার্শ্ববর্তী কংস নদীতে সুন্দি কাছিম অবমুক্ত
- বাংলাদেশের সরীসৃপ হচ্ছে কচ্ছপ ও সাপসহ অন্যান্য প্রজাতির বিস্তারিত আলোচনা
- বাংলাদেশের উভচর জলজ ও স্থলজ উভয় পরিবেশে বসবাসকারী ৪১ প্রজাতির প্রাণী
- পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম বাংলাদেশের মহাবিপন্ন কাছিম
- গঙ্গা তরুণাস্থি কাছিম বাংলাদেশের মহাবিপন্ন কাছিম
- ৯০টি কচ্ছপ গড়াই নদীতে অবমুক্ত
- কচ্ছপ বিক্রির দায়ে রাজধানীতে ৩ জনের ৯ মাসের কারাদণ্ড
- ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা বাংলাদেশের বিপন্ন ও পৃথিবীর সংকটাপন্ন কাইট্টা
- খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে ৪৯৪টি সুন্দি কাছিম উদ্ধার
- বাংলাদেশের মহাবিপন্ন কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম এবং বন বিভাগের উদ্ধার কার্যক্রম
- হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ বাংলাদেশের মহাবিপন্ন কচ্ছপের প্রজাতি
- বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলা থেকে কচ্ছপ উদ্ধার, দুই জনের কারাদণ্ড
- সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে ৭০টি কচ্ছপ উদ্ধার, ৩ জনের কারাদণ্ড
📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)
১. বইয়ের সূত্র: সুপ্রিয় চাকমা, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১১, পৃষ্ঠা: ৭৪।
চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)
উত্তর: এই গণের কচ্ছপদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের মাথার খুলি বা করোটি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং ওপরের দিক থেকে বেশ চ্যাপ্টা আকৃতির হয়ে থাকে। এছাড়া এদের চোখের পিছনের পোস্ট-অরবিটাল খিলানটি চোখের কোটরের ব্যাসের চেয়েও চওড়া হয়।
উত্তর: না, পেলোচেলিস গণের কচ্ছপদের পাগুলো সম্পূর্ণ অনাবৃত বা উন্মুক্ত থাকে। তবে পানিতে দ্রুত সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য এদের পায়ের আঙুলগুলো লিপ্তপাদ বা চামড়া দ্বারা জোড়া থাকে।
উত্তর: বাংলাদেশে এই গণের অধীনে বিখ্যাত এশীয় জাতা তরুণাস্থি কাছিম বা জাতা কাছিম (Pelochelys cantorii) পাওয়া যায়, যা বিশ্বজুড়ে ক্যান্টরের জায়ান্ট সফটশেল টার্টল নামে পরিচিত।
উত্তর: না, এদের নিচের নরম খোলসের ত্বকে কোনো ধরনের কাইটিনাস ফিমোরাল ভাল্ব (চামড়ার সুরক্ষামূলক লতি) থাকে না এবং এদের খোলসের কিনারায় কোনো প্রান্তীয় শিল্ড বা আঁইশও থাকে না।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।