মেলানোক্লিস (Melanochelys) কচ্ছপ গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি

বাংলাদেশের কচ্ছপ ও কাছিম জগতের জীববৈচিত্র্যে মেলানোক্লিস (Melanochelys) একটি সুপরিচিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কচ্ছপ গণ (Genus)। বিজ্ঞানী গ্রে ১৮৬৯ সালে প্রথম এই বিশেষ গণের নামকরণ ও বিবরণ দেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এই গণের কচ্ছপগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। এদের মূলত স্বাদুপানি এবং স্থলজ—উভয় পরিবেশেই দেখতে পাওয়া যায়।

নিচে এই অনন্য কচ্ছপ গণের বাহ্যিক গঠন, কঙ্কালতন্ত্র এবং জীবনযাত্রার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আলোচনা করা হলো:

🐢 মেলানোক্লিস গণের শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য

মেলানোক্লিস গণের কচ্ছপগুলোর কিছু বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এদের অন্য সাধারণ কচ্ছপ থেকে সহজেই আলাদা করতে সাহায্য করে।

১. খোলসের অনন্য গঠন (Shell Structure)

  • ত্রি-খিলা বিশিষ্ট পিঠ: এই গণের কচ্ছপের পিঠের শক্ত খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি তিনটি সুস্পষ্ট শির বা ত্রি-খিলা বিশিষ্ট হয়ে থাকে।
  • চাপা মেরু শিল্ড: এদের খোলসের মাঝবরাবর থাকা মেরু শিল্ড বা আঁইশগুলো (Vertebral Shadows) পিছনের দিকে কিছুটা চাপা বা সংকীর্ণ থাকে।
  • মজবুত বক্ষস্ত্রাণ: এদের নিচের দিকের নরম খোলস বা বক্ষস্ত্রাণটি (Plastron) একটি বিশেষ অস্থিসন্ধি বা সূচারের (Suture) মাধ্যমে পিঠের শক্ত খোলসের সাথে স্থায়ীভাবে ও মজবুতভাবে যুক্ত থাকে।

২. মাথার গঠন ও খুলির বৈশিষ্ট্য (Skull & Cranial Features)

  • অস্থিযুক্ত টেম্পোরাল খিলান: এদের করোটি বা খুলির ভেতরে একটি বিশেষ অস্থিযুক্ত টেম্পোরাল খিলান (Temporal Arch) থাকে, যা এদের চোয়ালের পেশিকে শক্তিশালী করে।
  • স্কোয়ামোসাল অস্থি: এদের মাথার কঙ্কালে বিশেষ স্কোয়ামোসাল (Squamosal) হাড়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
  • নাসারন্ধ্র ও চোখের অবস্থান: এদের অরবিট বা চোখের কোটরের ঠিক সামনের অংশের সমতলে ভেতরের নাসারন্ধ্র বা ‘চোয়ানা’ (Choanae) অবস্থিত। মাথার পিছনের অংশের ত্বকটি চামড়া দিয়ে ঢাকা না থেকে বড় বড় শিল্ড বা আঁইশ আকৃতির খণ্ডে বিভক্ত থাকে।

৩. পা ও সাঁতার কাটার ক্ষমতা (Limbs and Webbing)

  • সামনের পা (লিপ্তপাদ): এদের সামনের পায়ের গঠন সাঁতার কাটার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সামনের পায়ের আঙুলগুলোর অর্ধেক, অর্ধেকের বেশি বা সম্পূর্ণ অংশ লিপ্তপাদ (Webbed) বা পাতলা চামড়া দিয়ে জোড়া থাকে।
  • পিছনের পা: এদের পিছনের পাগুলো কিছুটা চ্যাপ্টা আকৃতির হয়। তবে এদের পিছনের পায়ের আঙুলগুলোর লিপ্তপাদ বা জোড়া অংশটি প্রায় লুপ্ত বা অনুপস্থিত থাকে।
  • লেজ: এই গণের কচ্ছপদের লেজ শরীরের তুলনায় বেশ ছোট হয়ে থাকে।

📊 মেলানোক্লিস (Melanochelys) গণের জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস

মেলানোক্লিস গণের বৈজ্ঞানিক টেক্সোনমি বা শ্রেণীবিন্যাস নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:

ধাপ (Rank)নাম (Taxon)
জগৎ (Kingdom)Animalia (প্রাণী)
পর্ব (Phylum)Chordata (মেরুদণ্ডী)
শ্রেণি (Class)Reptilia (সরীসৃপ)
বর্গ (Order)Testudines (কাছিম/কচ্ছপ)
পরিবার (Family)Geoemydidae (কাইট্টা পরিবার)
গণ (Genus)Melanochelys Gray, 1869

বাংলাদেশে মেলানোক্লিস গণের প্রজাতিসমূহ

বাংলাদেশে মূলত মেলানোক্লিস গণের ২টি প্রধান প্রজাতি পাওয়া যায়:

১. ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা (Melanochelys tricarinata): এরা সম্পূর্ণ স্থলজ কচ্ছপ এবং বনাঞ্চলের বালিয়াড়ি বা শুষ্ক পাতাযুক্ত মাটিতে থাকতে পছন্দ করে।
২. দাগি কালো দীঘি কাইট্টা (Melanochelys trijuga): এরা মূলত জলাশয়, পুকুর ও ধীরগতির নদীতে বাস করে এবং সর্বভুক প্রকৃতির হয়ে থাকে।

📝 উপসংহার (Conclusion)

মেলানোক্লিস গণের কচ্ছপগুলো দক্ষিণ এশিয়ার জলজ ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের অনন্য শারীরিক গঠন ও ত্রি-খিলা বিশিষ্ট খোলসের বৈশিষ্ট্য এদেরকে কচ্ছপ জগতের এক বিশেষ প্রজাতিতে পরিণত করেছে। তবে বর্তমানে বন উজাড়, নদী দূষণ এবং জলাশয় ভরাটের কারণে এই গণের প্রজাতিগুলো চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী এদের শিকার রোধ ও সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)

১. বইয়ের সূত্র: এম আনোয়ারুল ইসলাম, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১১, পৃষ্ঠা: ৬০।

চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)

১. মেলানোক্লিস (Melanochelys) গণের কচ্ছপের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?

উত্তর: এই গণের কচ্ছপের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের পিঠের শক্ত খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি তিনটি সুস্পষ্ট শির বা ত্রি-খিলা বিশিষ্ট হয় এবং এদের সামনের পাগুলো সাঁতার কাটার সুবিধার্থে লিপ্তপাদ হয়ে থাকে।

২. মেলানোক্লিস গণের কচ্ছপদের লিপ্তপাদ বা পায়ের আঙুল কেমন হয়?

উত্তর: এদের সামনের পায়ের আঙুলগুলোর অর্ধেক বা তার বেশি অংশ লিপ্তপাদ (পাতলা চামড়া দিয়ে যুক্ত) থাকে, যা এদের পানিতে সাঁতার কাটতে সাহায্য করে। তবে এদের পিছনের পায়ের আঙুলের লিপ্তপাদ অংশটি প্রায় লুপ্ত থাকে।

৩. বাংলাদেশে মেলানোক্লিস গণের কোন কোন কচ্ছপ পাওয়া যায়?

উত্তর: বাংলাদেশে এই গণের দুটি প্রজাতি পাওয়া যায়: ১. ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা (Melanochelys tricarinata) এবং ২. দাগি কালো দীঘি কাইট্টা (Melanochelys trijuga)।

৪. এই গণের কচ্ছপদের খোলস ও বক্ষস্ত্রাণ কীভাবে যুক্ত থাকে?

উত্তর: মেলানোক্লিস গণের কচ্ছপের নিচের দিকের নরম খোলস বা বক্ষস্ত্রাণটি (Plastron) একটি বিশেষ সূচারের (Suture) মাধ্যমে পিঠের শক্ত খোলসের (Carapace) সাথে অত্যন্ত মজবুতভাবে জোড়া থাকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!