বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে কচ্ছপের তালিকায় মোট ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিম রয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় প্রজাতিগুলোর মধ্যে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ (বৈজ্ঞানিক নাম: Indotestudo elongata) অত্যন্ত অনন্য এবং আকর্ষণীয় একটি প্রজাতি। এটি সম্পূর্ণ স্থলজ একটি কচ্ছপ। বর্তমানে বন উজাড়, আবাসন ধ্বংস এবং অতিরিক্ত শিকারের কারণে এটি আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) কর্তৃক একটি মহাবিপন্ন (Critically Endangered) প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত। পাহাড়ি বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র সচল রাখতে এই কচ্ছপটির ভূমিকা অপরিসীম।
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস ও পরিচিতি
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ি বনাঞ্চলের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সম্পূর্ণ স্থলজ কচ্ছপ প্রজাতি। এর বৈজ্ঞানিক ট্যাক্সোনমি এবং পরিচিতির বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
সাধারণ পরিচিতি
- বাংলা নাম: হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ।
- চাকমা নাম: পারবো ডুর।
- ইংরেজি নাম: Elongated Tortoise।
- বৈজ্ঞানিক নাম: Indotestudo elongata (Blyth, 1853)।
- সমনাম বা প্রতিনাম (Synonyms):
- Testudo elongata Blyth, 1853
- Peltastes elongatus Gray, 1869
- Testudo parallelus Annandale, 1913
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Scientific Classification)
| ধাপ (Rank) | নাম (Taxon) |
|---|---|
| জগৎ (Kingdom) | Animalia (প্রাণী) |
| পর্ব (Phylum) | Chordata (মেরুদণ্ডী) |
| শ্রেণি (Class) | Reptilia (সরীসৃপ) |
| বর্গ (Order) | Testudines (কাছিম/কচ্ছপ) |
| পরিবার (Family) | Testudinidae (স্থলজ কচ্ছপ পরিবার) |
| গণ (Genus) | Indotestudo Lindholm, 1929 |
| প্রজাতি (Species) | I. elongata |
🐢 হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের শারীরিক বর্ণনা ও বৈশিষ্ট্য
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ তার লম্বাটে খোলস এবং সুন্দর গায়ের রঙের জন্য কচ্ছপ জগতে বেশ সুপরিচিত। নিচে এদের শারীরিক কাঠামোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. আকৃতি, ওজন ও লিঙ্গভেদ
- লম্বা কচ্ছপ: এদের পিঠের শক্ত খোলসটি বেশ লম্বাটে ধরনের হওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে এদের ‘লম্বা কচ্ছপ’ নামেও ডাকা হয়।
- গড় পরিমাপ: একটি পূর্ণবয়স্ক হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের খোলসের গড় দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৩.৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
- লিঙ্গভেদ: পুরুষ কচ্ছপের লেজ স্ত্রী কচ্ছপের তুলনায় অনেক বেশি লম্বা হয়। এছাড়া পুরুষ কচ্ছপের পেটের দিকের অংশ (অঙ্কীয়ভাগ) কিছুটা অবতল বা ভেতরের দিকে বাঁকা থাকে, পক্ষান্তরে স্ত্রী কচ্ছপের পেটের অংশ সম্পূর্ণ চ্যাপ্টা হয়।
২. খোলস ও বক্ষস্ত্রাণের গঠন (Shell Anatomy)
- খোলসের রং: এদের কৃত্তিকাবর্ম (পিঠের শক্ত খোলস) হলদে-বাদামি রঙের হয়ে থাকে। তবে এদের নিচের নরম অংশ বা বক্ষস্ত্রাণের (Plastron) উদরীয় স্কুটের কেবল হিউমেরাল, বক্ষ এবং ফিমোরাল (উরু) শিল্ডে স্পষ্ট কালো দাগ দেখা যায়।
- শিল্ড বা আঁইশের বিন্যাস: এদের খোলসে একটি সরু কণ্ঠ (Nuchal) শিল্ড থাকে (যা কখনো কখনো অনুপস্থিতও থাকতে পারে)। এছাড়া ৫টি মেরু শিল্ড, ৪ জোড়া বক্ষদেশীয় শিল্ড, ২২টি প্রান্তীয় শিল্ড এবং ১টি বাঁকা অধিলেজ শিল্ড থাকে।
- নিচের খোলসের গঠন: এদের বক্ষস্ত্রাণের সামনের ভাগটি শঙ্কু আকৃতির এবং পিছনের অংশটি গভীর খাঁজযুক্ত হয়। এটি জোড়া গুলার, হিউমেরাল, অ্যাক্সিলারি, উদরীয়, বক্ষ, ইনগুইনাল, ফিমোরাল এবং পায়ুর শিল্ডের সমন্বয়ে গঠিত।
৩. মাথা, মুখ ও চোয়ালের বৈশিষ্ট্য
- মাথার গঠন: এদের মাথা সাধারণত হলদে রঙের হয়। নাসারন্ধ্র থেকে শুরু করে চোখের মধ্যবর্তী স্থান পর্যন্ত একজোড়া প্রিফন্টাল, ১টি বড় ত্রিকোণাকৃতির ফন্টাল, ১টি ছোট অক্সিপিটাল এবং অনেকগুলো ছোট ছোট শিল্ড বা আঁইশ থাকে।
- চোয়াল ও দাঁত: এদের ওপরের চোয়ালটি ত্রিকোণাকৃতির হয়। এর শিখর এবং কিনারার দিকের অংশে তুলনামূলকভাবে দুর্বল দাঁত থাকে।
৪. পা ও লেজের বিশেষ গঠন
- পায়ের আঁইশ: এদের সামনের পায়ের গোড়ালির আঁইশগুলো বেশ চ্যাপ্টা প্রকৃতির হয় এবং উরুর পিছনের অংশে বড় প্যাঁচানো গঠন থাকে, যা এদের পাহাড়ি মাটিতে হাঁটতে সাহায্য করে।
- লেজের গঠন: এদের লেজের অগ্রভাগে কাঁটাযুক্ত ফুসকুড়ি বা বিশেষ গঠন থাকে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বা বাচ্চার শারীরিক গঠন প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই হয়, তবে তাদের খোলসের কিনারার দিকের সারিতে হালকা দাঁতের মতো খাঁজ দেখা যায়।
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের স্বভাব, খাদ্য ও প্রজনন প্রক্রিয়া
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ সম্পূর্ণরূপে একটি স্থলজ (Terrestrial) বন্যপ্রাণী। এদের প্রজননকালীন শারীরিক পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার পদ্ধতি অন্যান্য কচ্ছপের চেয়ে বেশ আলাদা। নিচে এদের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. আবাসস্থল ও জীবনযাত্রা
- বিচরণ ক্ষেত্র: এরা মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের চিরসবুজ বনাঞ্চলে বসবাস করে। তবে এদের বিস্তৃতির সীমানার মধ্যে কখনো কখনো শুষ্ক ও পর্ণমোচী বনের পরিবেশেও এদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়। এরা পানির চেয়ে ডাঙাতেই বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে।
- সক্রিয়তার সময়: এরা মূলত নিশাচর বা গোধূলি-সন্ধ্যায় সক্রিয় হওয়া প্রাণী। দিনের তীব্র রোদ এড়িয়ে এরা সাধারণত সন্ধ্যার সময়ে বনের ভেতর খাবারের সন্ধানে বের হয়।
২. খাদ্য তালিকা (Diet)
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ মূলত নিরামিষভোজী (Herbivorous) হলেও বন্য পরিবেশে এরা কিছু প্রাণিজ উপাদানও গ্রহণ করে:
- উদ্ভিজ্জ খাবার: বনের বিভিন্ন গাছের পাতা, সবুজ কচি ঘাস, ফুল, বুনো ফল এবং ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম (Fungus) এদের প্রধান প্রিয় খাদ্য।
- প্রাণিজ খাবার: প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এরা মাঝে মাঝে কেঁচো এবং স্থলজ শামুকও ভক্ষণ করে থাকে।
৩. প্রজনন ঋতু ও মুখমণ্ডলের ত্বক গোলাপি হওয়া
- গোলাপি রঙের বিস্ময়: প্রজনন ঋতুতে (সাধারণত গ্রীষ্মকালে) এই কচ্ছপদের মধ্যে এক অসাধারণ রূপান্তর দেখা যায়। এই সময়ে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় কচ্ছপেরই চোখ ও মুখমণ্ডলের চারপাশের ত্বক আকর্ষণীয় গোলাপি বা লালচে-গোলাপি রঙ ধারণ করে।
- প্রজননের বয়স: কচ্ছপের পিঠের খোলসের দৈর্ঘ্য সাধারণত ২৩ সেন্টিমিটার বা তার বেশি হলে এরা প্রজননের জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম হয়ে ওঠে।
৪. প্রজনন আচার ও মিলন প্রক্রিয়া
- পুরুষের উত্তেজনা: যৌনমিলনের সময় পুরুষ কচ্ছপটি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ে। সে সময়ে পুরুষ কচ্ছপটি স্ত্রী কচ্ছপের মাথা, ঘাড় (গ্রীবা) এবং সামনের পায়ে অনবরত কামড়াতে থাকে।
- স্ত্রীর সাড়া দেওয়া: পুরুষ কচ্ছপের সাথে মিলন সম্পন্ন করার জন্য স্ত্রী কচ্ছপটি তার দেহের পিছনের অংশের খোলস উপরের দিকে তুলে ধরে সাহায্য করে।
- উচ্চস্বরে শব্দ: মিলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে পুরুষ কচ্ছপটি মুখ দিয়ে এক ধরনের বিশেষ ও উচ্চস্বরে আওয়াজ বা শব্দ তৈরি করে।
৫. বাসা তৈরি, ডিম ও বাচ্চার পরিস্ফুটনকাল
- গর্ত তৈরি: প্রজনন মৌসুমের শেষে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের দিকে স্ত্রী কচ্ছপটি তার পিছনের শক্তিশালী পায়ের সাহায্যে মাটির নিচে প্রায় ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার গভীর একটি গর্ত বা বাসা তৈরি করে।
- ডিমের সংখ্যা ও পরিমাপ: স্ত্রী কচ্ছপটি প্রতিবারে সাধারণত ১ থেকে ৭টি ধবধবে সাদা ডিম পেড়ে থাকে। এদের ডিমের গড় পরিমাপ সাধারণত ৩.৭ × ৫.০ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
- দীর্ঘ পরিস্ফুটনকাল: এদের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে আবহাওয়াভেদে ৯৬ থেকে ১৬৫ দিন (প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৫ মাস) পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগে।
- সদ্যজাত বাচ্চা: ডিম থেকে বের হওয়া সদ্যজাত পাহাড়ি কচ্ছপের বাচ্চার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন মাত্র ৩৫ গ্রামের কাছাকাছি হয়ে থাকে।
৬. বিলুপ্তির প্রধান কারণ
এই কচ্ছপগুলো পানির চেয়ে ডাঙাতেই বেশি সময় কাটায়। মাটিতে অলস ভঙ্গিতে চলার কারণে এরা খুব সহজেই পাহাড়ি এলাকার মানুষ ও শিকারিদের নজরে পড়ে যায়। বনের আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষরা মাংসের জন্য এদের অবাধে শিকার করার ফলে প্রাকৃতিকভাবে এদের জনসংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের ভৌগোলিক বিস্তৃতি (Geographical Distribution)
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাহাড়ি ও বনাঞ্চল সমৃদ্ধ দেশগুলোর একটি আদি বন্যপ্রাণী। নিচে এদের মূল বিচরণক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:
- বাংলাদেশের বিস্তৃতি: বাংলাদেশে এই সম্পূর্ণ স্থলজ কচ্ছপটি মূলত দেশের পাহাড়ি অঞ্চলের গভীর বনে বাস করে। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) মিশ্র চিরসবুজ ও পর্ণমোচী বনাঞ্চল এদের প্রধান আবাসস্থল। বনের ভেতরের ছায়াযুক্ত সেঁতসেঁতে মাটি ও ঝোপঝাড়ে এরা লুকিয়ে থাকে।
- আন্তর্জাতিক বিস্তার: বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবে এই মহাবিপন্ন প্রজাতিটির এক বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি রয়েছে। এটি প্রাকৃতিকভাবে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, চীন, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার পাহাড়ি বনাঞ্চলে ও চিরসবুজ অরণ্যে জোনের মধ্যে বসবাস করে।
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের অর্থনৈতিক চাহিদা ও অবৈধ শিকারের হুমকি
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ বনের পরিবেশ টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি বন্যপ্রাণী হলেও, মানুষের অতি-আহরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চ চাহিদার কারণে এই প্রজাতিটি আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।
- পোষা প্রাণী হিসেবে ব্যাপক চাহিদা (Pet Trade): আন্তর্জাতিক শৌখিন বাজারে এই কচ্ছপটির বেশ অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ‘পোষা প্রাণী’ (Pet) হিসেবে ঘরে বা অ্যাকোয়ারিয়ামে পালন করা হয়। এই উচ্চ চাহিদার কারণে বনাঞ্চল থেকে এদের দেদারসে পাচার করা হয়।
- মাংসের জন্য নির্বিচারে শিকার: শুধু পোষা প্রাণী হিসেবেই নয়, এই কচ্ছপের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ার কারণে এশিয়ার প্রায় সব দেশের স্থানীয় মানুষ একে প্রধান খাদ্য হিসেবে শিকার করে। আমাদের বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও (সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম) এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। বনের আদিবাসী ও শিকারিরা নজরে পড়া মাত্রই একে মাংসের জন্য ধরে নিয়ে যায়।
- নির্বংশ হওয়ার চরম আশঙ্কা: কচ্ছপটির ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে যেখানে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৫ মাস সময় লাগে, সেখানে বাচ্চা ফোটার আগেই ডিম চুরি এবং পূর্ণাঙ্গ কচ্ছপগুলোকে নির্বিচারে শিকার করার ফলে এদের প্রাকৃতিকভাবে বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ থমকে গেছে। এভাবে অবাধে কচ্ছপ শিকার এবং বন উজাড় হতে থাকলে খুব বেশি দিন সময় লাগবে না যখন বাংলাদেশ থেকে এই সুন্দর হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ চিরতরে নির্বংশ হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপের বর্তমান অবস্থা
হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ প্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই একে অত্যন্ত উচ্চ সুরক্ষার তালিকায় রাখা হয়েছে:
- আইইউসিএন লাল তালিকা (IUCN Red List): আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (IUCN, 2008) বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতির কচ্ছপকে ‘বিপন্ন’ (Endangered) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আমাদের দেশের বনাঞ্চলে এর অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক। আইইউসিএন বাংলাদেশের (IUCN-Bangladesh, 2000) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ ‘চরম বিপন্ন’ বা ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
- আন্তর্জাতিক সাইটস (CITES) চুক্তি: বৈশ্বিক বন্যপ্রাণী পাচার ও অবৈধ বাণিজ্য রোধ করতে এই কচ্ছপটিকে CITES পরিশিষ্ট-২ (Appendix II)-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে এর যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক কেনাবেচা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিষিদ্ধ।
- বাংলাদেশের আইনে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা: দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই স্থলজ কচ্ছপটিকে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধ্যাদেশ আইন, ১৯৭৪ এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের প্রথম তফশিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশে এই কচ্ছপটি সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত এবং একে ধরা, বনের বাইরে আনা, এর ক্ষতি করা বা মাংসের জন্য শিকার করা সম্পূর্ণ আইনত দণ্ডনীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
- প্রধান প্রধান হুমকি: পাহাড়ি বনাঞ্চল কেটে ফেলা বা বন উজাড়ের কারণে সৃষ্ট ‘আবাসস্থল ধ্বংস’ এবং মানুষের মাংসের লোভ ও শৌখিন বাজারে বিক্রির জন্য ‘মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ আহরণ’ই এই প্রজাতির কচ্ছপের অস্তিত্বের প্রধান হুমকি। চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েটনাম ও ভারতে এদের ব্যাপক হারে অবৈধভাবে ‘পোষা প্রাণী’ (Pet) হিসেবে পাচার ও পালন করা হয়ে থাকে।
📝 উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ আমাদের পাহাড়ি চিরসবুজ বনের বাস্তুতন্ত্র সুস্থ রাখতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। বনের বিভিন্ন ফল, কচি পাতা ও মাশরুম খেয়ে এরা প্রাকৃতিকভাবেই বনের গাছের বীজ ছড়াতে সাহায্য করে। তবে মানুষের অতিরিক্ত লোভ, সুস্বাদু মাংসের জন্য নির্বিচারে শিকার এবং আন্তর্জাতিক পোষা প্রাণীর বাজারে পাচারের কারণে এই শান্ত প্রাণীটি আজ বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মহাবিপন্ন কচ্ছপটিকে বাঁচাতে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের বনাঞ্চল রক্ষা করা এবং বন্যপ্রাণী আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আরো পড়ুন
- বাংলাদেশে কচ্ছপ ও কাছিম সংরক্ষণ: বন বিভাগের উদ্ধার অভিযানের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস (২০১০-২০২৬)
- পাহাড়ি তরুণাস্থি কাছিম: বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রজাতির অজানা তথ্য
- গঙ্গা তরুণাস্থি কাছিম: খালুয়া কাছিমের বৈশিষ্ট্য, হিংস্র স্বভাব ও প্রজননচক্র
- ত্রি-খিলা স্থল কাইট্টা (Melanochelys tricarinata) পরিচিতি, প্রজনন ও বিস্তার
- হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ: মহাবিপন্ন লম্বা কচ্ছপের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- ক্যান্টরের জাতা তরুণাস্থি কাছিম: উপমহাদেশের বৃহত্তম কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব
- পেলোচেলিস (Pelochelys) কাছিম গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- সুন্দি তরুণাস্থি কাছিম (Lissemys punctata): পরিচিতি, বাসস্থান ও ডিম পাড়ার অদ্ভুত তথ্য
- মুকুটি নদ-কাইট্টা: নদীর কালী কাছিমের বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও বিস্তৃতি
- মেলানোক্লিস (Melanochelys) কচ্ছপ গণের বৈশিষ্ট্য ও প্রজাতি পরিচিতি
- বাণিজ্যিক কচ্ছপ চাষ পদ্ধতি: চীনা নরম খোলস কচ্ছপ চাষের আধুনিক গাইড
- পরিবেশ রক্ষায় কচ্ছপের ভূমিকা এবং বাংলাদেশে কচ্ছপ বিলুপ্তির কারণ
- বাংলাদেশে প্রাপ্ত ২৯ প্রজাতির কচ্ছপ, কাইট্টা ও কাছিমের সম্পূর্ণ তালিকা
- বাটাগুড় বা বোদো কাইট্টা: মহাবিপন্ন কাছিমের বৈশিষ্ট্য ও প্রজননের সফল ইতিহাস
- বাংলাদেশের সরীসৃপ হচ্ছে কচ্ছপ ও সাপসহ অন্যান্য প্রজাতির বিস্তারিত আলোচনা
- বাংলাদেশের উভচর জলজ ও স্থলজ উভয় পরিবেশে বসবাসকারী ৪১ প্রজাতির প্রাণী
📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References)
১. বইয়ের সূত্র: সুপ্রিয় চাকমা, মোনাওয়ার আহমাদ ও আবু তৈয়ব আবু আহমদ সম্পাদিত; উভচর প্রাণী ও সরীসৃপ, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড ২৫, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: জুন ২০১১, পৃষ্ঠা: ৫০-৫১।
২. সম্পাদনা ও আপডেট বিজ্ঞপ্তি: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৭ জুন ২০১৭ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিক তথ্য বজায় রাখতে আজ ২২ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হয়েছে।
চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)
উত্তর: এই কচ্ছপদের পিঠের শক্ত খোলস বা কৃত্তিকাবর্মটি অন্যান্য কচ্ছপের মতো গোল না হয়ে বেশ লম্বাটে ধরনের হয়ে থাকে। এদের এই বিশেষ শারীরিক গঠনের কারণেই স্থানীয়ভাবে এদের ‘লম্বা কচ্ছপ’ নামে ডাকা হয়।
উত্তর: প্রজনন মৌসুম শুরু হলে (সাধারণত গ্রীষ্মকালে) এই কচ্ছপদের মধ্যে এক অসাধারণ রূপান্তর দেখা যায়। এই সময়ে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় কচ্ছপেরই চোখ ও মুখমণ্ডলের চারপাশের ত্বক আকর্ষণীয় গোলাপি বা লালচে-গোলাপি রঙ ধারণ করে।
উত্তর: এরা মূলত নিরামিষভোজী বা তৃণভোজী প্রাণী। বনের বিভিন্ন গাছের পাতা, সবুজ কচি ঘাস, ফুল, বুনো ফল এবং বিশেষ করে ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম (Fungus) এদের প্রধান প্রিয় খাদ্য। তবে পুষ্টির জন্য এরা মাঝে মাঝে কেঁচো এবং শামুকও খায়।
উত্তর: না, এটি সম্পূর্ণ স্থলজ (Terrestrial) একটি কচ্ছপ। এরা নদী বা পুকুরের পানিতে বাস করে না, বরং বাংলাদেশের সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি চিরসবুজ বনের সেঁতসেঁতে ছায়াযুক্ত মাটিতে ও ঝোপঝাড়ে জীবন কাটায়।
উত্তর: আন্তর্জাতিক বাজারে কচ্ছপ পাচার রোধে এটি CITES পরিশিষ্ট-২ ভুক্ত একটি প্রাণী। এছাড়া বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের প্রথম তফশিলে একে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এই কচ্ছপটি ধরা বা শিকার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।