ভূমিকা: প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি এই সবুজ শ্যামলিমার মাঝে ‘বিদ্যাপাতা’ বা ‘কালীঝাঁট’ এক অনন্য নাম। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ভাষায় একে Adiantum philippense বলা হয়, যা মূলত টেরিডাসি (Pteridaceae) পরিবারের এডিয়ামটাম গণের একটি বিশেষ অপুষ্পক ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ। আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা এই ফার্নটি তার নজরকাড়া সৌন্দর্য এবং চমৎকার গড়নের জন্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। শুধু বুনো পরিবেশেই নয়, বর্তমানে গৃহসজ্জার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টবে এই ফার্ন চাষের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
বিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁটের বর্ণনা:
বিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁট মূলত একটি ছোট আকৃতির, গুচ্ছিত প্রকৃতির স্থলজ ফার্ন। এর গঠনশৈলী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং দৃষ্টি নন্দন। মাটির নিচে থাকা এর গ্রন্থিকাণ্ড বা রাইজোম (Rhizome) বেশ খাটো এবং উপ-খাড়া ধরণের হয়। এই গ্রন্থিকাণ্ডের উপরিভাগ ছোট ছোট শল্ক বা আঁশ দ্বারা আবৃত থাকে। এই শল্কগুলো দেখতে অনেকটা সরু রেখার মতো এবং লম্বায় প্রায় ৩ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর বর্ণ গাঢ় বাদামী থেকে কালো রঙের হয়ে থাকে এবং এগুলো বেশ অস্বচ্ছ। এই ফার্নের পাতাগুলো সরলপক্ষল এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতার শীর্ষভাগ সাধারণত কিছুটা লম্বাটে হয়, যা গাছটিকে একটি বিশেষ আকৃতি দান করে। এর পত্রদণ্ড (Stipe) ৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। পত্রদণ্ডের রঙ বেশ নজরকাড়া—গাঢ় বাদামী থেকে কুচকুচে কালো এবং এর উপরিভাগ বেশ মসৃণ ও উজ্জ্বল। গাছটির পত্রফলকগুলো ১২ থেকে ২৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। প্রতিটি পত্রক বৃন্তযুক্ত এবং নিচের দিকের পত্রকের বৃন্তগুলো উপরের গুলোর তুলনায় বেশ বড় হয়, যা প্রায় ২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর পাতার শিরা বিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সামান্য উঁচু বা উত্তোলিত থাকে। শিরাগুলো অনেকবার দ্বি-বিভক্ত (Dichotomously branched) হয়ে পাতার কিনারে ছড়িয়ে পড়ে। প্রজননের জন্য বিদ্যাপাতার পাতার উপরের প্রান্ত জুড়ে ‘সোরাস’ বা রেণুস্থলী দেখা যায়। এই সোরাসগুলো কখনও অবিচ্ছিন্নভাবে আবার কখনও খণ্ড খণ্ড হয়ে বিন্যস্ত থাকে। এর ছোট রেণুস্থলীগুলোতে প্রায় ১৮টির মতো পুরু কোষযুক্ত ‘অ্যানুলাস’ থাকে। এই ফার্নের রেণুগুলো চতুঃস্তলকীয় (Tetrahedral) আকৃতির, যা একে অন্যান্য ফার্ন থেকে আলাদাভাবে চিনতে সাহায্য করে। ক্রোমোসোম সংখ্যা: ২n = ৬০, ১২০।
আবাসস্থল ও বংশবিস্তার:
এবিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁট মূলত ছায়াপ্রিয় একটি উদ্ভিদ। এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল এবং বংশবিস্তার পদ্ধতি অত্যন্ত চমৎকার, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আবাসস্থল ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ: প্রকৃতিতে এই ফার্নটি সাধারণত স্যাঁতসেঁতে এবং শীতল পরিবেশে জন্মাতে পছন্দ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুরনো ভেজা ইটের দেয়াল, পাহাড়ি ঢাল কিংবা ছায়াযুক্ত আর্দ্র মাটিতে এরা আপন গতিতে বেড়ে ওঠে। প্রখর সূর্যালোকের চেয়ে হালকা ছায়া এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতা এই ফার্নের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। যেহেতু এটি একটি স্থলজ ফার্ন, তাই যেখানে জলের হালকা উপস্থিতি এবং বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে, সেখানেই বিদ্যাপাতার ঘন সবুজ ঝোপ দেখা যায়।
গৃহসজ্জা ও শৌখিন বাগান: এর আকর্ষণীয় গড়ন এবং উজ্জ্বল কালো রঙের বৃন্তের কারণে বর্তমানে শৌখিন বাগানীদের কাছে বিদ্যাপাতা অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকেই বারান্দা বা বসার ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এই ফার্নটিকে বাহারি উদ্ভিদ হিসেবে টবে লাগিয়ে থাকেন। বিশেষ করে বারান্দার রেলিংয়ে ঝুলন্ত বা ‘হ্যাংগিং টবে’ এই ফার্নটি এক অসাধারণ নান্দনিক রূপ দেয়। এর ঝোপালো সবুজ পাতাগুলো যখন টব থেকে নিচের দিকে ঝুলে পড়ে, তখন তা ঘরের পরিবেশে এক স্নিগ্ধ সতেজতা নিয়ে আসে। বিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁটের বংশবিস্তার প্রক্রিয়া মূলত দুই ভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে:
- গ্রন্থিক বা রাইজোমের মাধ্যমে: গাছের গোড়ায় থাকা খাটো এবং শল্কযুক্ত গ্রন্থিকাণ্ড বা রাইজোম বিভাজনের মাধ্যমে সহজেই নতুন চারা তৈরি করা যায়। পুরনো গাছ থেকে এই গ্রন্থিক আলাদা করে নতুন টবে রোপণ করলে তা দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
- রেণুর মাধ্যমে: যেহেতু এটি একটি অপুষ্পক উদ্ভিদ, তাই এর প্রজননের প্রধান মাধ্যম হলো রেণু বা স্পোর। পত্রকের কিনারায় থাকা সোরাস থেকে রেণু বাতাসে বা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনুকূল পরিবেশে নতুন অঙ্কুরোদ্গমের মাধ্যমে নতুন ফার্নের জন্ম দেয়।
বিস্তৃতি:
বিদ্যাপাতা বা কালীঝাঁট মূলত ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি উদ্ভিদ। এর বিস্তৃতি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। নিচে এর বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক অবস্থান তুলে ধরা হলো:
বৈশ্বিক অবস্থান: প্রাকৃতিকভাবে এই ফার্নটি দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সবথেকে বেশি দেখা যায়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং শ্রীলঙ্কায় এর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং ইন্দো-চীন অঞ্চলের দেশগুলোতে এই প্রজাতিটি প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে জন্মে থাকে। এই দেশগুলোর আর্দ্র ও ছায়াযুক্ত পাহাড়ি অঞ্চল বা বনাঞ্চল এই ফার্নের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
বাংলাদেশে প্রাপ্তিস্থান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যাপাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ প্রজাতি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা চট্টগ্রামে এই প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চল, আর্দ্র দেয়াল এবং ছায়াযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে এই ফার্নটি বেড়ে ওঠে। সেখান থেকেই মূলত বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এবং উদ্ভিদ সংগ্রাহকদের মাধ্যমে এই প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে পরিবেশের ভারসাম্য ও উপযুক্ত জলবায়ু পেলে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এটি শৌখিন বাগানে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিতে পারে।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
বিদ্যাপাতা কেবল তার শারীরিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং লোকজ চিকিৎসায় এর অসাধারণ সব গুণের জন্য সমাদৃত। নিচে এর নানাবিধ ব্যবহার তুলে ধরা হলো:
১. শৌখিন গৃহসজ্জায় ব্যবহার: বিদ্যাপাতার সবুজ এবং সতেজ পাতাগুলো যেকোনো ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এর উজ্জ্বল রঙের বৃন্ত এবং সুবিন্যস্ত পত্রকের কারণে এটি গৃহাভ্যন্তরে বা ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা ইনডোর গার্ডেনিং পছন্দ করেন, তাদের কাছে টবে লাগানো এই বাহারি উদ্ভিদটি প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকে।
২. জাতিতাত্ত্বিক ও প্রচলিত চিকিৎসায় গুরুত্ব: বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং স্থানীয় মানুষের কাছে এই উদ্ভিদটি রোগের মহৌষধ হিসেবে পরিচিত। শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি বা গিট যখন ফুলে যায় (Glandular swelling) এবং সাথে জ্বর থাকে, তখন এই উদ্ভিদের গ্রন্থিক বা রাইজোম ব্যবহার করে দ্রুত উপশম পাওয়া যায়।
৩. পাতার রসের ঔষধি ব্যবহার: বিদ্যাপাতার পাতার রস যেন এক প্রাকৃতিক সঞ্জীবনী। এটি প্রধানত নিম্নলিখিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়:
- আমাশয় ও পেটের সমস্যা: দীর্ঘদিনের আমাশয় সারাতে এর রস কার্যকর।
- রক্তের অসুখ: রক্তজনিত বিভিন্ন জটিলতা দূর করতে এর ব্যবহার রয়েছে।
- ক্ষত বা আলসার: শরীরের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক ক্ষত সারাতে পাতার রস সাহায্য করে।
- বাতবিসর্প (Erysipelas): ত্বকের বিশেষ ধরণের লালচে প্রদাহ বা বাতবিসর্প এবং শরীরের জ্বালাভাব কমাতে এই রস সরাসরি প্রয়োগ করা হয়।
৪. আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন চিকিৎসায় ভূমিকা: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বিদ্যাপাতাকে অত্যন্ত সম্মানজনক স্থানে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে মৃগী রোগের (Epilepsy) চিকিৎসায় এই উদ্ভিদ থেকে তৈরি ওষুধ ব্যবহারের জোরালো সুপারিশ রয়েছে। এছাড়া চর্মরোগের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় এই ফার্নের রেণু বা স্পোর অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত।
৫. আঞ্চলিক ও লোকজ ব্যবহার (গুজরাট ও অন্যান্য অঞ্চল): ভারতের গুজরাটে শিশুদের জ্বরজনিত বিভিন্ন সমস্যায় এই উদ্ভিদটি ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সাধারণত এই উদ্ভিদের পাতা পানির সাথে ঘষে, তাতে সামান্য চিনি মিশিয়ে শিশুদের খাওয়ানো হয়, যা জ্বর কমাতে সাহায্য করে। আবার এর বীরুৎ সদৃশ অংশ গিরিমাটির সাথে পিষে পেস্ট তৈরি করে প্রদাহজনিত স্থানে প্রলেপ দেওয়া হয়।
৬. অন্যান্য বিশেষ গুণাগুণ: এই ফার্নের পাতার নির্যাস শরীরের ভেতর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করে। প্রস্রাব পরিষ্কার করতে এবং দ্রুত নিঃসরণের জন্য পাতার তৈরি লেই বা পেস্ট তলপেটে মালিশ করা হয়। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যাপাতার মধ্যে শক্তিশালী জীবাণুনাশক (Antiseptic) গুণ বিদ্যমান, যা ইনফেকশন রোধে সাহায্য করে।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৫ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বিদ্যাপাতা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বিদ্যাপাতা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
তথ্যসূত্র:
১. মোহাম্মদ নূর-ই-আলম সিদ্দিকী (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৫ম, পৃষ্ঠা ২৮৮-২৮৯। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
ছবিটি বৃক্ষকথা গ্রুপ থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Md Ashrafuzzaman
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।