বাংলাদেশ ও ভারতে প্রধানত ছোট পাতা আকন্দ ও বড় আকন্দ প্রজাতি দুটি যথেষ্ট পাওয়া যায়। মাঝারি আকন্দটি কিছুটা কম পাওয়া যায়। বড় আকন্দের দুটি উপপ্রজাতি আছে, সেগুলো হচ্ছে শ্বেত আকন্দ ও রক্ত আকন্দ।
আকন্দ গাছ-এর ব্যবহার
১. হাঁপানি রোগে: ১৪ টি আকন্দ গাছের ফুলের, সাদা হলে ভাল হয়, মাঝখানের চৌকো মন্ডিত অংশটি নিতে হবে, তার সঙ্গে ২১টি গোলমরিচ দিয়ে একসঙ্গে বেটে ২১টি গুলি (বড়ি) করে শুকিয়ে নিতে হবে। প্রতিদিন সকালে একটি করে বড়ি খেতে হবে, খানিকক্ষণ বাদে একটু দুধ খেতে হবে, আর পথ্য হিসেবে এই ২১ দিন শুধু দুধ-ভাত, বা দুধ-রুটি খেয়ে থাকতে হবে, এটাতে অনেকের উপশম হয়ে যায়, তবে এটা কতটা বৈজ্ঞানিক সেটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে; তা ছাড়া হাঁপানি ও তার সঙ্গে হৃদযন্ত্রের দৌর্বল্য এসেছে বা আছে অথবা কার্ডিয়াক এ্যাজমা (Cardiac ashmaaaa) আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা সমীচীন হবে না বলে মনে করি; তবে এটাও ঠিক, শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট হতে থাকলেই যে হাঁপানি হয়েছে, এটা মনে করা ঠিক হবে না; যদি দেখা যায় কফের প্রবণতার সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে শ্বাস প্রশ্বাসের কষ্ট হতেই থাকে, তখনই চিন্তার ক্ষেত্র হয় এটা শ্বাসরোগ কিনা।
২. অজীর্ণ, অগ্নিমান্দ্য ও অম্লরোগ (এ্যাসিডিটি): আকন্দ পাতা অর্ধশুক্ষ করে তার সঙ্গে সমান পরিমাণ সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে, তবে এই মাত্রাটা অনেকটা ঠিক হতে হবে,যদি কাঁচা পাতার ৮ ভাগের ১ ভাগ অর্থাৎ কাঁচা ওজনের ১/৮ ওজন সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে (এটা আসল হওয়া চাই, কারণ এখন প্রায় সব সৈন্ধবই নকল বিক্রি হচ্ছে) হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে মুখটা সারা (মাটির ঢাকনা) দিয়ে বন্ধ করে মাটি লেপে, শুকিয়ে, ঘুটের আগুনে পোড়া দিতে হবে, তারপর ঐ কালো দ্রব্যটি বের করে একসঙ্গে গুড়ো করে নিতে হবে (একেই বলে অন্তর্ধূমে পোড়ানো)। এই চূর্ণ আধ গ্রাম মাত্রায় খাবারের পরে পানি দিয়ে খেতে হবে।
৩. হাঁপানি: আকন্দ গাছের মূলের ছাল শুকিয়ে চূর্ণ করে আকন্দের আঠা দিয়ে মেড়ে শুকিয়ে নিয়ে এটাকে বিড়ির পাতায় মুড়ে বিড়ি তৈরী করে সেটাকে ধরিয়ে তার ধোঁয়া টানলে হাঁপের টানের লাঘব হবে।
৪. অর্শের বলি: যাঁদের অর্শের বলি বাইরে বেরিয়ে রয়েছে, তাঁরা আকন্দ গাছের পাতার চূর্ণে আগুনে দিয়ে সেই ধূম লাগালে কয়েকদিনের মধ্যেই চুপসে যায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসেও যায়। এ ব্যবস্থাটা আছে চরক সংহিতায়।
৫. ব্রণ ফাটাতে: আকন্দ গাছের পাতা দিয়ে ব্রণ চেপে বেধে রাখার উপদেশ, এ কথাটার উল্লেখ কিন্তু অথর্ববেদেই আছে।
৬. বিছা কামড়ের জ্বালায়: দষ্টস্থানে এর আঠা লাগালে যন্ত্রণার উপশম হয়, এমন কি পাতা বেটে লাগালেও কমে যায়।
৭. ঊরুস্তম্ভ রোগে: জলে অল্প তেল মিশিয়ে একটি পাতা সিদ্ধ করে, সেই জল ছেকে নিয়ে সেই ক্বাথ ২/৩ বারে একটু একটু করে খেলে ঊরুস্তম্ভ ধীরে ধীরে চুপসে যায়, আর ফোলে না বা পাকে না।
৮. দূষিত ক্ষতে: একটি আকন্দ পাতা জলে সিদ্ধ করে ঐ ক্বাথ দিয়ে ধুতে হবে , এটাতে পুঁজ তৈরি হওয়ার উৎস বন্ধ হবে।
৯. কুষ্ঠের প্রথমাবস্থায়: আকন্দের পাতা শুকিয়ে নিয়ে তার ৩ গ্রাম, ছাতিম (Alstonia Scholaris) ছাল ৫ গ্রাম একসঙ্গে ৫০০ মিলিলিটার জলে বা আধ সের আন্দাজ সিদ্ধ করে ১২৫ মিলিলিটার অর্থাৎ চতুর্থাংশ থাকতে নামিয়ে মোটা কাপড় দিয়ে ছেকে নিয়ে দুধের সঙ্গে ১ দিন অন্তর খেতে হবে এবং দুধ মিশানো পানি দিয়ে ধুতে হবে। এর দ্বারা কিছুদিনের মধ্যে রোগমুক্তি হবে।
১০. বুকে সর্দি বসায়: হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বুকে পুরনো ঘি মালিশ করে, আকন্দ পাতা গরম করে, সেই পাতা দিয়ে সেক দিলে সর্দি উঠে যায়।
১১. হেড়ে মাথা: অনেক সময় দেখা যায় শিশুর মাথাটা অস্বাভাবিক বড়, সে ক্ষেত্রে আকন্দ তুলোর বালিশ করে শোয়ালে মাথাটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যায়। এটা সাধারণতঃ এক বছর বয়সের মধ্যে ব্যবহার করা উচিত।
১২. সান্নিপাতিক দোষে: কানে পুজ, মাথা ভার, কান দিয়ে পানি গড়ানো, এক্ষেত্রে প্রাচীন মত হ’লো উর্ধ্ব জত্রুতে শ্লেষ্মার আধিক্য আর সেখানকার অগ্নিবল কম থাকা, এখানে ঐ আকন্দের তুলোর বালিশে শোয়ালে ঐ দোষটা আস্তে আস্তে চলে যায়।
১৩. খোস ও একজিমায়: সরষের তেল আগুনে চড়িয়ে নিষ্ফেন হলে, আকন্দের আঠা তেলের সিকি ভাগ দিয়ে জ্বাল করতে হয়, তারপর নামাবার সময় একটু কাঁচা হলুদের রস দিয়ে নামাতে হবে। ঐ তেল লাগালে ঐ ধরনের রোগগুলি সেরে যায়।[২]
সতর্কীকরণ: আকন্দ গাছের সব অংশই বিষাক্ত। তাই ব্যবহারে সতর্ক হোন। অতিরিক্ত ব্যবহারে ক্ষতি হবে। ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্রঃ
১. এম আতিকুর রহমান (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ২৩৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২.আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি‘ খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা,৫-৯।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Anup Sadi
- আকন্দ গাছ-এর ১৩টি ঔষধি গুণাগুণ এবং উপকারিতা
- যূথিকাপর্ণী গুল্মের ভেষজ গুণাগুণের বিবরণ
- কুড় এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- পিছন্দি গুল্ম-এর ভেষজ গুণাগুণ
- পিছন্দি পূর্ব এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- জিট্টি পাহাড়ে জন্মানো উপকারী গুল্ম
- নোয়া মরিচা পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো গুল্ম
- দেশি সির্খী দক্ষিণ এশিয়ার গুল্ম
- ছোট বান্দা দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- ঢেঁড়সের পুষ্টিমান-এর বিবরণ
- চোরপাতা দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ গুল্ম
- ছোট কুকুরচিতা উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের গুল্ম
- বাউলাহরিনা উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের গুল্ম
- হিমালয়ান বনচালতা দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ গুল্ম
- কুরকুর জিউয়া ভেষজ গুণসম্পন্ন গুল্ম
- পাতি বনচালতা বাংলাদেশের পুর্বাঞ্চলে জন্মে
- দেশি বনচালতা বাংলাদেশের অরন্যে জন্মানো গুল্ম
- আরোহী জেসমিন সপুষ্পক আরোহী গুল্ম
- গুচ্ছ ল্যান্টানা ভেষজ গুল্ম
- সাদা ফুলি দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো গুল্ম
- জগতমদন দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ গুল্ম
- লাল ভেরেন্ডা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে জন্মানো গুল্ম
- জামাল গোটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের গুল্ম
- বিঝু ফুল পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো ভেষজ প্রজাতি
- দুধিয়ালতা দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- ভুটানি রঙ্গন বড় আকারের গুল্ম বিশেষ
- ঝুমকা জবা উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের আলঙ্কারিক গুল্ম
- জবা বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মানো ভেষজ গুল্ম
- পানিসরা বা পিচান্দি উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের উপকারী বৃক্ষ
- কুকুরবিছা বাংলাদেশের উপকারী গুল্ম
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।