বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি: হারিয়ে যাওয়ার পর আবার প্রত্যাবর্তন!

সুন্দরবন ব্যতীত বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি বা স্থায়ী আবাসস্থল ছিলো ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত সিংহারি গ্রাম। এ গ্রামে বিগত ২০০৭ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ১২ বছর নিয়মিত বাসা তৈরি ও ছানা তুলেছিলো বাংলাদেশের মহাবিপন্ন এবং সমগ্র পৃথিবীর সংকটাপন্ন পাখি ছোট মদনটাক বা Lesser Adjutant।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ২০২০ সাল থেকে মদনটাক পাখিগুলো সেই চেনা গ্রামের চিরচেনা কলোনিতে আর নতুন করে কোনো বাসা তৈরি করেনি। বিগত ২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী বছরগুলোতে সাধারণত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সেখানে পরিযায়ী বা স্থায়ী মদনটাকেরা এসে নির্দিষ্ট শিমুল গাছে বাসা তৈরি করতো এবং ডিম দিত। এরপর বৈশাখ বা এপ্রিল মাসের মধ্যেই ডিম ফুটে বের হওয়া ছানারা বেশ বড় হয়ে উঠতো এবং আকাশে উড়বার সম্পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করতো। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে কোনো নভেম্বর মাসেই পাখিরা তাদের সেই পুরোনো প্রিয় শিমুল গাছে ফিরে আসেনি এবং পুরোনো বাসাগুলো মেরামতের জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগও গ্রহণ করেনি।

তবে মাঝে মধ্যে দুই-একটি মদনটাক পাখিকে এখনও সেই পুরোনো শিমুল গাছে আসতে দেখা যায়। তারা সেখানে বসে কিছু সময় বিশ্রাম নেয় বলে জানিয়েছেন গাছের মালিক শামসুল হক।

এর আগে ২০১২ সালের ১০ নভেম্বর কথা হয়েছিল সেই শিমুল গাছের আরেক মালিক আয়নুল হকের সঙ্গে। ঠিক কী কারণে পাখিরা আর বাসা তৈরি করছে না, সেই বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান।

আয়নুল হক বলেন, ওই বছর পার্শ্ববর্তী নাগর নদী ও গ্রামের নিকটবর্তী সব এলাকায় ব্যাপকভাবে ধান চাষ করা হয়েছে। এর ফলে পাখিদের অবাধ বিচরণভূমি কমে গেছে এবং তীব্র প্রাকৃতিক খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। মূলত পর্যাপ্ত খাবারের অভাবের কারণেই পাখিরা এখানে আর বাসা তৈরি করছে না বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া নাগর নদীতে পানির পরিমাণ অনেক কমে যাওয়াও এর আরেকটি বড় কারণ।

পাখিরা মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের সেরকম কিছু জানা নেই।” অন্যত্র কোথাও তারা নতুন কোনো বাসা তৈরি করেছে কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

এ-ব্যাপারে পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সাধারণত এই পাখিরা সহজে নিজেদের বাসস্থান বা কলোনি ত্যাগ করে না। তবে মূলত তিনটি প্রধান কারণে পাখিরা তাদের কলোনি ছেড়ে চলে যেতে পারে।

প্রথমত, তারা কোনো কারণে আতঙ্কিত হলে; যেমন মানুষের দ্বারা, প্রাকৃতিকভাবে কিংবা বনবিড়াল ও ভোঁদড়ের মতো অন্য কোনো শিকারি প্রাণীর মাধ্যমে যদি তারা ভয়ের সম্মুখীন হয়। দ্বিতীয়ত, তাদের চারণভূমিতে তীব্র খাবারের সংকট দেখা দিলে বা অবাধ বিচরণভূমি সংকুচিত হয়ে পড়লে। তৃতীয়ত, অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে নতুন কলোনি বা আবাসস্থল স্থাপনের সুযোগ পেলে।

সাধারণত যাযাবর বা পরিযায়ী পাখিদের বৈশিষ্ট্যই হলো কয়েক বছর পরপর তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করা। তবে সিংহারি গ্রামের ক্ষেত্রে এই তৃতীয় কারণটি কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়; কারণ সেখানে পাখিরা মাত্র ৪-৫ বছর ধরে অবস্থান করছিল।

সাম্প্রতিক আশার আলো ও নতুন সন্ধান

বন্যপ্রাণী গবেষকদের একটি দীর্ঘমেয়াদী জরিপে দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের সিংহারি গ্রামের কলোনিটি পাখিরা একেবারে চিরতরে হারিয়ে ফেলেনি। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এক বিশেষ পর্যবেক্ষণে জানা যায়, ২০২৩ সালের প্রজনন মৌসুমে সিংহারি গ্রামের সেই চেনা শিমুল গাছে পুনরায় ৬টি সক্রিয় মদনটাকের বাসা সনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও পাখিদের এই ফিরে আসা স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশবাদীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

সিংহারি গ্রামের পাশাপাশি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মদনটাক পাখির আরও একটি নতুন প্রজননস্থলের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। ২০২৩ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকায় একটি বিশাল শিমুল গাছে প্রাপ্তবয়স্ক ছোট মদনটাক পাখির উপস্থিতি এবং বাসা তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। সুন্দরবনের বাইরে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় কোনো প্রজনন কলোনি গড়ে ওঠার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও বড় ইঙ্গিত।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) বিশ্বব্যাপী এই পাখির সুরক্ষায় কিছুটা অগ্রগতির কথা জানিয়ে একে ‘সংকটাপন্ন’ থেকে ‘কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় স্থান দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মহাবিপন্ন পাখিটির অস্তিত্ব রক্ষা করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশের একমাত্র সক্রিয় প্রজনন কলোনিটি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় শিমুল গাছের মালিকদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং তাদের অবাধ বিচরণভূমি রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।

আলোকচিত্রের ইতিহাস: ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি সিংহারি গ্রামের একটি শিমুল গাছের ডালে বসে থাকা ৬টি ছানার এই দুর্লভ ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী সৌরভ মাহমুদ।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. এই প্রতিবেদনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৫ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে। পরবর্তীতে, ১২ জুন বন্যপ্রাণী গবেষকদের নতুন গবেষণা ও সাম্প্রতিক আপডেটের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি পুনর্মূল্যায়ন ও পরিমার্জন করা হয়েছে।
২. সাদিক, এ. এস., খান, এম. এইচ., ও হাসান, কে. (২০২৪)। ব্রিডিং অ্যাকাউন্টস অব দ্য লেসার অ্যাডজুট্যান্ট (Leptoptilos javanicus) ইন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জার্নাল অব জুলোজি, ৫২(৩)। বাংলাদেশ জার্নালস অনলাইন (BanglaJOL)

Leave a Comment

error: Content is protected !!