ছাতিম গাছ (Alstonia scholaris): এর পরিচিতি, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ভেষজ ব্যবহার

ছাতিম গাছ

বৈজ্ঞানিক নাম: Alstonia scholaris. (L.) R. Br., Mem. Wern. Nat. Hist. Soc. 1: 76 (1811). সমনাম: Echites scholaris L. (1767), Nerium tinctorium Perr. (1824). সাধারণ নাম: blackboard tree, devil tree, ditabark, milkwood-pine, white cheesewood বাংলা নাম: বড় ছাতিম, ছাতিম, সংস্কৃত নাম : স্মুহী। হিন্দি নাম: সপ্তপর্ণ বা ‘সপ্তপর্ণা’
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত:Eudicots অবিন্যাসিত: Asterids বর্গ: Gentianales পরিবার: Apocynaceae গণ: Alstonia প্রজাতি: Alstonia scholaris.

ভূমিকা: বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য, লোকজ চিকিৎসা এবং আমাদের চারপাশের চেনা প্রকৃতির এক সুপরিচিত ও বিশালাকার উদ্ভিদের নাম ছাতিম গাছ। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় Alstonia scholaris নামে পরিচিত এই চিরসবুজ বৃক্ষটি কেবল তার সুউচ্চ গড়ন কিংবা শরৎকালের তীব্র সুবাস ছড়ানো ফুলের জন্যই বিখ্যাত নয়; বরং এর পাতা, ছাল, মূল ও আঠার মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবদেহের নানা জটিল রোগ নিরাময়ের এক অভাবনীয় ভেষজ শক্তি। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক উদ্ভিদবিজ্ঞান—সবখানেই এই গাছের বহুমুখী গুণের কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে একদিকে যেমন সামাজিক বনায়ন ও কাগজ শিল্পে এর অর্থনৈতিক অবদান বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন লোকজ চিকিৎসায় এর ছাল ও আঠার ব্যবহার মানুষের প্রাকৃতিক নিরাময়ের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা ছাতিম গাছের নিখুঁত গাঠনিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং বাতের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও পায়োরিয়ার মতো নানা শারীরিক চিকিৎসায় এর বিজ্ঞানসম্মত ও প্রথাগত ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

নামকরণ:

ছাতিম গাছের পাতার গঠন বেশ আকর্ষণীয় এবং এটি দেখতে অনেকটা মনসা পাতার মতো। সনাতন সংস্কৃত ভাষায় মনসা পাতাকে ‘স্মুহী’ বলা হয়। এই গাছের ডালপালার অগ্রভাগে পাতাগুলো গোল হয়ে ছাতার মতো সাজানো থাকে। সাধারণত প্রতিটি পাতার গুচ্ছে ৭টি করে পাতা থাকে, যার কারণে সংস্কৃতে এই গাছটিকে ‘সপ্তচ্ছদ’ বা ‘সাতপর্ণী’ বলা হয়। এখানে ‘চ্ছদ’ শব্দের অর্থ হলো পাতা। তবে মাঝেমধ্যে কোনো কোনো ডালে ৫টি বা ৮টি পাতাও দেখা যায়, যা বেশ বিরল। হিন্দি ভাষাভাষী অঞ্চলে মানুষ একে ‘ছাতিয়ান’ বা ‘ছাতিবন’ নামে চেনে, আর বাঙালিদের কাছে এর জনপ্রিয় নাম ‘ছাতিম’।

বিবরণ:

আমাদের চিরচেনা প্রকৃতির এক পরিচিত ও বিশাল উদ্ভিদের নাম ছাতিম। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে এটি Alstonia scholaris নামে পরিচিত এবং এটি মূলত ‘এপোসিনাসি’ (Apocynaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি উদ্ভিদ। এই চিরসবুজ বৃক্ষটি আকারে বেশ বড় হয় এবং সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের ডালপালা এবং পাতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক চমৎকার ছায়ার সৃষ্টি করে। এই গাছের কান্ড বা ছাল বেশ পুরু প্রকৃতির হয়ে থাকে। ছালের ওপরের অংশটি খসখসে হলেও এর ভেতরের অংশটি সাদা এবং দানাযুক্ত। ছাতিম গাছের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর যেকোনো অংশ কাটলে বা ভাঙলে সেখান থেকে ঘন সাদা দুধের মতো আঠা বের হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘ক্ষীরা’ বলা হয়ে থাকে। ছাতিম গাছের পাতাগুলোর বিন্যাস বেশ চমৎকার। এর পাতাগুলো ডালের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে গোল হয়ে চক্রাকারে বা এক আবর্তে ৫ থেকে ১০টি পর্যন্ত সাজানো থাকে।

  • মাপ ও আকৃতি: প্রতিটি পাতার বোঁটা বা পত্রবৃন্ত সর্বোচ্চ ১.৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর পাতার মূল অংশটি (পত্র ফলক) লম্বায় ৯.৫ থেকে ২৪.৫ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় প্রায় ৫.৬ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। পাতাগুলো দেখতে কিছুটা আয়তাকার, বল্লমের মতো কিংবা উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে।
  • পৃষ্ঠ ও শিরা: পাতার ওপরের অংশটি বেশ মসৃণ এবং চকচকে সবুজ দেখায়। তবে পাতার নিচের অংশটি (অঙ্কীয় পৃষ্ঠ) কিছুটা ফ্যাকাশে রঙের হয় এবং এতে অসংখ্য পার্শ্বশিরা দেখা যায়। পাতার মাঝখানের প্রধান শিরাটি নিচের দিকে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এই পার্শ্বশিরাগুলো পাতার উভয় পাশেই কিছুটা উঁচু হয়ে থাকে, তবে নিচের পিঠে এগুলো বেশি স্পষ্ট। পাতার গোড়ার দিকটি কীলকাকার বা ভোঁতা এবং অগ্রভাগটি সামান্য লম্বাটে ও সূক্ষ্ম হয়। পাতার কিনারা বা প্রান্তগুলো একদম নিখুঁত ও অখণ্ডিত থাকে।

ফুল ও পুষ্পবিন্যাসের বিবরণ: ছাতিম গাছের ফুল ফোটার প্রক্রিয়া এবং এর গঠন অত্যন্ত জটিল ও সুন্দর। এর পুষ্পবিন্যাসকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্ষুদ্র ছত্রমঞ্জরী সাইম’ বলা হয়।

  • মঞ্জরী ও দণ্ড: এই ফুলগুলো শাখাবিশিষ্ট এবং একটি থোকায় প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটে। ফুলের ডাঁটা বা মঞ্জরীদণ্ডগুলো রোমশ বা ঘন নরম ছোট ছোট লোমে ঢাকা থাকে। এর মূল পুষ্পদণ্ডটি সর্বোচ্চ ২.৫ সেন্টিমিটার এবং ছোট ফুলদানি বা পুষ্পবৃন্তিকা সর্বোচ্চ ৮ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলের গোড়ায় থাকা ছোট পাতা বা মঞ্জরীপত্রগুলো দেখতে আয়তাকার বা বল্লমের মতো এবং সামান্য রোমশ প্রকৃতির হয়।
  • ফুলের রঙ ও আকৃতি: ছাতিম ফুল সাধারণত সবুজাভ-সাদা রঙের হয়ে থাকে। সম্পূর্ণ ফুলটি লম্বায় ৬ থেকে ১২ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়। ফুলের বাইরের অংশ বা বৃতি ২ মিলিমিটার লম্বা এবং স্থায়ী হয়, যা দেখতে ডিম্বাকার বা আয়তাকার। এর পাপড়ি বা দলমণ্ডলটি দেখতে একটি নলের মতো বেলনাকার আকৃতির হয়, যা প্রায় ৬ মিলিমিটার লম্বা।

ফল, বীজ: ছাতিম গাছের ফলগুলো ডাল থেকে নিচের দিকে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ফলিক্যাল’ বলা হয়। এই ফলগুলো লম্বায় ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় মাত্র ৩ থেকে ৪ মিলিমিটারের মতো হয়ে থাকে। ফলের ভেতরে থাকা বীজগুলোর দুই প্রান্তই কিছুটা ভোঁতা বা স্থূলাগ্র প্রকৃতির হয়।

ক্রোমোজোম তথ্য: উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, বড় ছাতিম গাছের ক্রোমোজোম সংখ্যা হলো ২n = ৪০ অথবা ৪৪

চাষাবাদ ও আবাসস্থল:

রাস্তার ধারে, বাস্তুভিটার কুঞ্জে মাঝে মাঝে চিরহরিৎ, পর্ণমোচী বা মিশ্র বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৃক্ষ হিসেবে পাওয়া যায়। বংশ বিস্তার হয় বীজ দ্বারা। সাধারণত বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে ছাতিম গাছে ফুল ও ফল দেখা যায়। ছাতিম গাছ চাষ করার জন্য খুব বেশি বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয় না। এটি প্রাকৃতিকভাবেই নিজের বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। এই গাছের প্রধান বংশবিস্তার মাধ্যম হলো এর বীজ

  • ফল পেকে যাওয়ার পর যখন ফেটে যায়, তখন বাতাস বা পাখির মাধ্যমে বীজগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
  • অনুকূল মাটি এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পেলে সেই বীজ থেকে আপনাআপনি নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।
  • বর্তমানে সামাজিক বনায়ন ও রাস্তার সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য নার্সারিতে বীজ থেকে চারা তৈরি করে তা বাণিজ্যিকভাবেও রোপণ করা হচ্ছে।

ফুল ও ফল ধারণের নির্দিষ্ট সময়চক্র: গাছটির জীবনচক্রে ফুল ও ফল আসার একটি নির্দিষ্ট ঋতু বা সময়কাল রয়েছে, যা প্রকৃতির নিয়ম মেনে আবর্তিত হয়। ছাতিম গাছে সারা বছর ফুল দেখা যায় না। সাধারণত নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরের মে মাস পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে গাছটিতে ফুল ফোটার এবং ফল পাকার প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে। এই সময়ে ছাতিম তলা ফুলে ফুলে ভরে ওঠে এবং এর সুবাস চারদিকের বাতাসকে মোহিত করে তোলে।

বিস্তৃতি:

ছাতিম গাছ পরিবেশের সাথে খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে বলে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি বেশ বিশাল। এটি মূলত এশিয়া, আফ্রিকা এবং ওশেনিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। বিশ্ব মানচিত্রে এই গাছের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তিস্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে: দক্ষিণ এশিয়া: ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা। দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়া: চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া। অন্যান্য অঞ্চল: আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এবং ওশেনিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া।

এই বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের জলবায়ু ছাতিম গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। মাদের বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছাতিম গাছ একটি চিরচেনা নাম। দেশের জলবায়ু এবং মাটি এই গাছের অনুকূলে থাকায় বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই এই গাছটি কম-বেশি রোপণ বা আবাদ করা হয়ে থাকে। তবে কৃত্রিমভাবে আবাদ করা ছাড়াও বাংলাদেশের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই বনের বুক চিরে বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলীয় বনাঞ্চলগুলোতে (যেমন সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলে) কোনো মানুষের ছোঁয়া ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই এই বিশালাকার চিরসবুজ বৃক্ষটি যুগের পর যুগ ধরে জন্মে আসছে এবং বনের সৌন্দর্য বাড়িয়ে চলেছে।

সমগ্র বাংলা (বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ), দক্ষিণ ভারত এবং উত্তর ভারতের সমতল থেকে শুরু করে পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত ছাতিম গাছের শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই গাছটি মাটির সমতল থেকে শুরু করে পাহাড়ি এলাকার বেশ ওপর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ি এলাকাতেও ছাতিম গাছ অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে সক্ষম। উচ্চতা ও আবহাওয়ার এই বৈচিত্র্য ছাতিম গাছকে অনন্য এক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

ছাতিম গাছ কেবল একটি সাধারণ ছায়াদানকারী বৃক্ষই নয়, এর কাণ্ড থেকে শুরু করে কষ পর্যন্ত প্রতিটি অংশই মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পদ ও ভেষজ উপাদানে ভরপুর। বাণিজ্যিক দিক থেকে ছাতিম গাছের কাঠ অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। যদিও এর কাঠ তুলনামূলকভাবে নরম এবং হালকা, তবুও বিভিন্ন ধরনের হালকা ও জরুরি জিনিসপত্র তৈরিতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

  • প্যাকিং ও আসবাবপত্র: পণ্য পরিবহনের জন্য কাঠের তৈরি পেকিং বাক্স বা ক্যারেট তৈরিতে ছাতিম কাঠ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া সাধারণ গৃহস্থালি আসবাবপত্র ও কফিন তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে।
  • শিক্ষা উপকরণ ও কাগজ শিল্প: ইংরেজি পরিভাষায় ছাতিমকে ‘ব্ল্যাকবোর্ড ট্রি’ (Blackboard Tree) বলা হয়, কারণ এর কাঠ দিয়ে স্কুলের লেখার জন্য ব্ল্যাকবোর্ড এবং ছোটদের লেখার স্লেট তৈরি করা হতো। বর্তমানে কাগজ কলগুলোতে উচ্চমানের কাগজ ও কাগজের মণ্ড (Paper Pulp) প্রস্তুত করার জন্য এই গাছের কাঠকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ছাতিম গাছের বহুমুখী ওষুধি গুণাগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা: সনাতন চিকিৎসাশাস্ত্র এবং আধুনিক ভেষজ বিজ্ঞানে ছাতিম গাছের ছাল বা বাকলকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ঔষধি উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। এর বাকল থেকে তৈরি দ্রবণীয় আরক বা নির্যাস মানবদেহের নানা জটিল রোগ নিরাময়ে অভাবনীয় ভূমিকা রাখে।

  • চর্মরোগ ও যকৃতের সমস্যা: দীর্ঘদিন ধরে যারা বিভিন্ন ধরণের চর্মরোগ ও ত্বকের সংক্রমণে ভুগছেন, তাদের জন্য এর বাকলের নির্যাস দারুণ কাজ করে। পাশাপাশি এটি যকৃত বা লিভারের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে এবং লিভারের বিভিন্ন জটিলতা দূর করতে সাহায্য করে।
  • দীর্ঘস্থায়ী জ্বর ও হজমের সমস্যা: ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েডের মতো দীর্ঘদিন ধরে শরীরে বাসা বেঁধে থাকা পুরনো জ্বর উপশমে এর ছালের রস ধন্বন্তরি হিসেবে কাজ করে। এটি পেটের অজীর্ণ রোগ বা বদহজম দূর করে এবং শরীরের হারিয়ে যাওয়া শক্তি ও দুর্বলতা দ্রুত পুনরুদ্ধার করে।
  • পেটের পীড়া ও আলসার: আমাশয় ও উদরাময়ের (ডায়রিয়া) মতো মারাত্মক পেটের সমস্যায় ছাতিমের ছাল অত্যন্ত কার্যকরী। এ ছাড়া পাকস্থলী বা শরীরের ভেতরের দীর্ঘস্থায়ী আলসার নিরাময়েও এটি ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগ: হাঁপানী (Asthma), ফুসফুসের বায়ুনালীর ক্ষুদ্রাংশের প্রদাহ (Bronchitis) এবং শ্বাসকষ্টজনিত নানা সমস্যা উপশম করতে এই গাছের ওষুধি গুণ দারুণ ভূমিকা রাখে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেও চিকিৎসকেরা ছাতিমের আরক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

বিভিন্ন দেশের জাতিতাত্ত্বিক ও লোকজ ব্যবহার (Ethnomedicinal Uses): বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী এবং স্থানীয় চিকিৎসকেরা যুগের পর যুগ ধরে ছাতিম গাছের বিভিন্ন অংশ ঐতিহ্যগত উপায়ে ব্যবহার করে আসছেন:

  • বাংলা অঞ্চল (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ): এ অঞ্চলের লোকজ চিকিৎসায় শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র জ্বর নিরাময়ের জন্য স্থানীয়ভাবে ছাতিমের বাকলের নির্যাস খাওয়ানো হয়। দাঁতের ক্ষয়রোগ বা পোকা লাগা (Tooth Decay) এবং তীব্র দাঁত ব্যথা দূর করতে এর কষ বা তরুক্ষীর সরাসরি আক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া বাতের ব্যথায় গাঁট ফুলে গেলে এর কাণ্ডের বাকল বেটে পেস্ট বানিয়ে লাগানো হয় এবং শরীরের ভেতরের টিউমার উপশমে এর মূলের পেস্ট ব্যবহার করা হয়।
  • ভারত: ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে এই গাছের আঠা বা তরুক্ষীর ফোড়া, খোলা ক্ষত এবং তীব্র বাতজনিত ব্যথার জায়গায় ‘পুলটিশ’ (একধরণের ঔষধি প্রলেপ) হিসেবে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। আবার কানের ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা বা ইনফেকশন হলে ছাতিমের তরুক্ষীর এবং সরিষার তেল একসাথে মিশ্রিত করে প্রাকৃতিক কানের ড্রপ (Ear Drops) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
  • ফিলিপাইন: ফিলিপাইনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে ছাতিম গাছের কচি পাতা ফুটিয়ে তৈরি করা ক্বাথ বেরিবেরি (Beriberi) নামক ভিটামিনজনিত রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য রোগীদের সেবন করানো হয়।

চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহৃত মূল অংশসমূহ: সহজ কথায় বলতে গেলে, ছাতিম গাছের কোনো অংশই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রধানত এই গাছের ত্বক বা

রোগ প্রতিকারে ছাতিমের ব্যবহার:

বড় ছাতিম হচ্ছে রসবহ ও রক্তবহ স্রোতের রোগ সারাতে ব্যবহৃত। বড় ছাতিম হচ্ছে ঔষধার্থে ব্যবহৃত উদ্ভিদ। এর ত্বক (ছাল), পাতা, ফল ও ক্ষীর (আঠা)। ঔষধের ব্যবহার্য মাত্রা হচ্ছে ছালচূর্ণ দেড় থেকে দু’গ্রাম, ফুলচূর্ণ আধ গ্রাম থেকে দু’গ্রাম, ক্ষীর সিকি গ্রাম থেকে আধ গ্রাম।

১. জ্বরে: (পুরানো) – পুরনো বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর এবং এর সাথে সম্পর্কিত যকৃৎ-প্লীহার ব্যথা, মুখের অরুচি, পেট পরিষ্কার না হওয়া এবং শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ার মতো জটিল উপসর্গ উপশমে ছাতিম গাছের ছাল একটি প্রাচীন ও কার্যকর ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঐতিহ্যগত নিয়ম অনুযায়ী, ১০/১২ গ্রাম কাঁচা ছাতিম গাছের ছাল (শুকনো হলে ৫/৬ গ্রাম) ৩/৪ কাপ পানিতে ভালোভাবে ফুটিয়ে সিদ্ধ করতে হয় এবং পানি ছেঁকে নিয়ে সেই ক্বাথ দিনে দুই ভাগে বা দুই বেলা সেবন করলে সাধারণত দুই-এক দিনের মধ্যে জ্বরের তীব্রতা কমে আসে। এই ভেষজ চিকিৎসার কার্যকারিতা আরও বাড়াতে এবং শারীরিক দুর্বলতা দূর করতে এর সাথে নাটা করঞ্জ (Caesalpinia bonduc) বীজের ভেতরের শাঁস ১৫০-২০০ মিলিগ্রাম (২-৩ গ্রেন) মাত্রায় সেবন করার প্রচলন রয়েছে, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুরক্ষায় দারুণ সাহায্য করে। তবে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল জ্বরের ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সঠিক সেবনমাত্রা নিশ্চিত করতে একজন অভিজ্ঞ রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি

২. হিক্কাশ্বাসে: পিত্তানুগত হিক্কাশ্বাস বা তীব্র হেঁচকি এবং কফজনিত শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ছাতিম গাছের ছাল প্রাচীন চিকিৎসায় একটি প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ধরণের শারীরিক সমস্যায় সাধারণত কফের আধিক্যের পাশাপাশি পিত্তের প্রকোপ বা জ্বালাপোড়ার লক্ষণও দেখা দেয়। লোকজ এবং ভেষজ চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যা উপশমের জন্য কাঁচা ছাতিম গাছের ছালের রস দুধের সাথে মিশিয়ে সেবন করার প্রচলন রয়েছে। তবে যদি কোনো কারণে কাঁচা ছাল সংগ্রহ করা সম্ভব না হয়, তবে বিকল্প হিসেবে শুকনো ছাতিম ছালের গুঁড়ো বা চূর্ণ ব্যবহার করা যায়। সেক্ষেত্রে এই ছাল চূর্ণের সাথে পিপুল চূর্ণ এবং দুধ একসাথে মিশ্রিত করে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। যেহেতু তীব্র শ্বাসকষ্ট বা হিক্কা একটি সংবেদনশীল স্বাস্থ্যগত সমস্যা, তাই যেকোনো ভেষজ উপাদান নিয়মিত সেবনের পূর্বে একজন অভিজ্ঞ রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

৩. দন্ত পোকা: দাঁতের ক্ষয়রোগ বা তথাকথিত ‘দাঁতের পোকা’ এবং এর তীব্র যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ছাতিম গাছের আঠা বা তরুক্ষীরের (Latex) ব্যবহার একটি সুপরিচিত ও পরীক্ষিত ঘরোয়া প্রতিষেধক। বিশেষ করে প্রাচীন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা গ্রন্থ ‘অষ্টাঙ্গ হৃদয়ম’ বা ‘অষ্টাঙ্গ সংগ্রহ’-এর রচয়িতা মহর্ষি বাগভটের সূত্র অনুযায়ী, দাঁতে ক্যাভিটি বা গর্ত হয়ে তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হলে ছাতিম গাছের কান্ড বা পাতা থেকে নিঃসৃত ঘন সাদা দুধের মতো আঠা সরাসরি সেই আক্রান্ত দাঁতের ছিদ্রে তুলা বা কাঠির সাহায্যে সাবধানে প্রয়োগ করতে হয়। ছাতিম গাছের এই আঠাতে শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং প্রাকৃতিক বেদনানাশক (Analgesic) উপাদান থাকে, যা দাঁতের ভেতরের ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে এবং স্নায়ুর তীব্র যন্ত্রণাকে দ্রুত অবশ বা উপশম করতে সাহায্য করে। তবে এই প্রাকৃতিক আঠা প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন এটি কোনোভাবেই গিলে ফেলা না হয় এবং মুখের ভেতরের অন্যান্য নরম অংশে সরাসরি না লাগে। দাঁতের দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষায় এবং যেকোনো জটিল ইনফেকশন এড়াতে সাময়িক এই ঘরোয়া উপায়ের পাশাপাশি একজন রেজিস্টার্ড দন্ত্য চিকিৎসকের (Dentist) পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি।

৪. হাঁপানি: তীব্র সর্দির লক্ষণ ছাড়া যদি কারোর হাঁপানির টান বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়, তবে প্রথাগত উপায়ে ছাতিম গাছের ফুল ব্যবহার করে একটি ঘরোয়া টোটকা প্রস্তুত করা যায়। এই লোকজ চিকিৎসায় সাধারণত ১ থেকে ১.৫ গ্রাম পরিমাণের শুকনো ছাতিম ফুলের গুঁড়ো বা চূর্ণের সাথে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিগ্রাম (৩/৪ গ্রেন) পিপুল চূর্ণ বা পিপুল ফলের গুঁড়ো খুব ভালোভাবে মিশ্রিত করা হয়। পরবর্তীকালে এই মিশ্রণটি দইয়ের মাত অর্থাৎ টক দই থিতিয়ে যাওয়ার পর ওপরে ভেসে ওঠা পাতলা পরিষ্কার পানির সাথে মিলিয়ে রোগীকে সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয় তবে আধুনিক ভেষজ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো ধরণের তীব্র শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার টান উঠলে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং ছাতিম ফুলের তীব্র গন্ধ বা পরাগরেণু অনেকের ক্ষেত্রে উল্টো অ্যালার্জি সৃষ্টি করে হাঁপানির টান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে । তাই স্বাস্থ্যের পূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি এড়াতে এই ধরণের ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ইনহেলারসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

৫. স্তন্যদুগ্ধের স্বল্পতা: বুকের দুধ কমে গিয়েছে, অথবা ভাল হয়নি, সেক্ষেত্রে ৫/৬ গ্রাম ছাতিম ছাল থেতো করে, ২ কাপ জলে সিদ্ধ করে আধা কাপ থাকতে নামিয়ে, ছেকে, সেই জলের সঙ্গে আধা কাপ দুধ মিশিয়ে খেতে হবে। এর দ্বারা বুকের দুধ বেড়ে যায়। এভিন্ন স্তনের দুধ আঠার মত হ’লে এই ক্বাথে জল মিশিয়ে খেলে ঐ দোষটা নষ্ট হবে।

৬. গাঁটের ব্যথায়: গেঁটে বাতের সমস্যা এবং এর ফলে সৃষ্ট তীব্র গাঁটের ব্যথা বা জয়েন্ট পেইন দূর করতে লোকজ চিকিৎসায় ছাতিম গাছের ছালের ব্যবহার বেশ প্রাচীন ও সমাদৃত। প্রথাগত এই আয়ুর্বেদিক নিয়মানুযায়ী, প্রায় ৭ থেকে ৮ গ্রাম পরিমাণের পরিষ্কার ছাতিম গাছের কাঁচা বা শুকনো ছাল ভালোমতো থেঁতো করে ৩ কাপ পানিতে দিয়ে ফুটাতে হয়। পানি ফুটে যখন এক কাপে নেমে আসে, তখন পাত্রটি চুলা থেকে নামিয়ে ক্বাথ বা তরলটুকু ভালো করে ছেঁকে নিতে হয় এবং এই হালকা কুসুম গরম ক্বাথ দিনে একবার সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়, যা বাতের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও গাঁটের ফোলা ভাব কমাতে সাহায্য করে। আধুনিক ল্যাবরেটরি গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, ছাতিম গাছের পাতলা ছাল ও আঠায় উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (প্রদাহনাশক) এবং অ্যানালজেসিক (বেদনা উপশমকারী) উপাদান থাকে, যা শরীরের আর্থ্রাইটিস বা বাতের তীব্র কষ্ট উপশমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেহেতু বাতের ব্যথার পেছনে হাড়ের ক্ষয় বা ইউরিক অ্যাসিডের মতো ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে, তাই সম্পূর্ণ সুরক্ষার স্বার্থে এই ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর শতভাগ নির্ভর না করে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে মূল কারণ চিহ্নিত করা এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

৭. সর্দি বসায়: বুকের ভেতর পুরনো সর্দি বা শ্লেষ্মা জমে বসে গেলে তা তরল করে বের করে আনতে প্রাচীন লোকজ চিকিৎসায় ছাতিম গাছের ছাল (Alstonia scholaris) একটি প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ঘরোয়া প্রতিষেধকটি তৈরি করার ঐতিহ্যবাহী নিয়ম হলো—১ গ্রাম পরিমাণের শুকনো ছাতিম ছালের গুঁড়ো বা চূর্ণ নিতে হবে। এরপর সামান্য পানি মিশ্রিত দুধের মধ্যে এই ছাল চূর্ণ দিয়ে মিশ্রণটিকে চুলার হালকা আঁচে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিতে হয়। ফুটিয়ে নেওয়া এই গরম দুধ অথবা গরম পানি মেশানো দুধের সাথে ছাতিম ছালের গুঁড়ো সরাসরি মিশিয়ে রোগীকে সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। ভেষজ চিকিৎসকদের মতে, ছাতিমের ছালে থাকা বিশেষ প্রাকৃতিক উপাদান বুকের জমাটবদ্ধ কফ ও শ্লেষ্মাকে দ্রুত তরল বা পাতলা করে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ছাতিম গাছের ছালে উচ্চমাত্রার অ্যালকালয়েড থাকে, যা অতিরিক্ত বা ভুল মাত্রায় সেবন করলে লিভার বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বুকের সর্দি বা ফুসফুসের যেকোনো জটিল সংক্রমণে এই ধরণের ঘরোয়া টোটকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সঠিক নিয়মে চিকিৎসা গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ

৮. অগ্নিমান্দ্যে: বদহজম বা অগ্নিমান্দ্য এবং এর সাথে জড়িত তীব্র অম্লতা বা এসিডিটির সমস্যায় প্রাচীন লোকজ চিকিৎসায় ছাতিম গাছের ছাল ও ফুল (Alstonia scholaris) একটি প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রথাগত এই আয়ুর্বেদিক নিয়মানুযায়ী, অম্লপ্রধান অগ্নিমান্দ্যে যারা দীর্ঘ সময় ধরে ভুগছেন, তারা ছাতিমের শুকনো ছাল অথবা ফুলের চূর্ণ হালকা কুসুম গরম পানিতে ভালো করে মিশিয়ে সেবন করার নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। ভেষজ বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাতিমের এই চূর্ণ পাকস্থলীর পাচক রস বা অগ্নিকে উদ্দীপিত করে এবং ভেতরের জমে থাকা টক্সিন দূর করে দ্রুত হজম প্রক্রিয়া সচল করতে সাহায্য করতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ছাতিম গাছে উচ্চমাত্রার সক্রিয় অ্যালকালয়েড থাকে, যা ভুল মাত্রায় সেবন করলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমার বদলে উল্টো বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা পাকস্থলীর মারাত্মক ইরিটেশন তৈরি করতে পারে। এই কারণে স্বাস্থ্যের পূর্ণ সুরক্ষায় এসিডিটি বা অগ্নিমান্দ্যের মতো হজমজনিত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় এই ধরনের ঘরোয়া টোটকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে একজন অভিজ্ঞ রেজিস্টার্ড আয়ুর্বেদিক বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত।

১০. রক্তগুন্মে: নারীদের জরায়ু বা তলপেটের টিউমার সদৃশ শক্ত পিণ্ড (যা প্রাচীন চিকিৎসায় রক্তগুল্ম নামে পরিচিত) এবং গ্যাস্ট্রিক বা বায়ুর প্রকোপজনিত পেটের ব্যথা উপশমে প্রাচীন ভেষজ শাস্ত্রে ছাতিম ছালের (Alstonia scholaris) ব্যবহার উলেখযোগ্য। প্রচলিত লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, যদি কোনো নারীর শরীরে গর্ভধারণের প্রাথমিক বাহ্যিক লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায়, অথচ স্তনে দুধের সঞ্চার না হয়ে তলপেটে সার্বক্ষণিক কুনকুন করে মৃদু ব্যথা অনুভূত হয়, তবে তাকে আয়ুর্বেদের পরিভাষায় ‘গুল্ম রোগ’ বা জরায়ুজনিত রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই জাতীয় শারীরিক জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে প্রাচীন চিকিৎসকেরা কয়েকদিন নিয়মিত দুবেলা ২ থেকে ৩ গ্রাম মাত্রায় ছাতিম গাছের ছাল চূর্ণ বা গুঁড়ো সেবনের পরামর্শ দিতেন, যা কোনো প্রকার তীব্র যন্ত্রণা ছাড়াই জরায়ুর সেই রক্ত পিণ্ডকে গলিয়ে বা ভেঙে স্বাভাবিক স্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে বলে মনে করা হতো। একই সাথে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস বা বায়ুর প্রকোপজনিত কারণে সৃষ্ট গুল্মের ক্ষেত্রেও এই ছাল চূর্ণ কয়েকদিন সেবনের ফলে পেট ফাঁপা ও ফোলা ভাব দ্রুত চুপসে যায় এবং ব্যথা উপশম হয়। তবে আধুনিক গাইনি ও প্রসূতি চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এই ধরনের লক্ষণগুলো জরায়ুর টিউমার, সিস্ট, ফাইব্রয়েড কিংবা কোনো জটিল হরমোনজনিত বা স্ত্রীরোগের (Gynecological disorders) ইঙ্গিত হতে পারে। তাই এই ধরণের সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর শারীরিক পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার স্বকীয় ভেষজ বা ঘরোয়া টোটকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড গাইনোকোলজিস্ট (Gynecologist) বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে আধুনিক আল্ট্রাসনোগ্রাম (USG) ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়।

১১. দুষ্ট ব্রণে: দীর্ঘস্থায়ী বা দুষ্ট ব্রণ এবং শরীরের যেসব গভীর ক্ষত কিছুতেই সহজে শুকায় না বা ভালো হতে চায় না, তা নিরাময়ে প্রাচীন লোকজ চিকিৎসায় ছাতিম গাছের আঠা বা তরুক্ষীরের (Latex) ব্যবহার একটি চমৎকার প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসকদের মতে, এই ধরণের অনড় ও সংক্রমিত ক্ষত দূর করার জন্য প্রথমে ছাতিম গাছের কান্ড বা পাতা থেকে নিঃসৃত ঘন সাদা আঠা সংগ্রহ করে তা রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর সেই শুকনো আঠাকে মিহি গুঁড়ো বা চূর্ণ করে আক্রান্ত ব্রণের ক্ষতস্থানের ওপর নিয়ম করে ছিটিয়ে দিলে ক্ষতের ভেতরের পুঁজ ও তরল শুকিয়ে আসে এবং ত্বক দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। আধুনিক ল্যাবরেটরি গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, ছাতিম গাছের এই প্রাকৃতিক আঠাতে উচ্চমাত্রার অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এবং ক্ষত নিরাময়কারী (Wound-healing) উপাদান থাকে, যা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করে ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে।

  • [জরুরি সতর্কতা:
    তবে মনে রাখতে হবে যে, ছাতিম গাছের আঠা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সংবেদনশীল উপাদান। এটি সরাসরি মুখের ত্বকের ব্রণে ব্যবহারের আগে অবশ্যই অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যেন তা কোনোভাবেই চোখ, মুখ বা ভেতরের নরম ঝিল্লিতে প্রবেশ না করে। বিশেষ করে যাদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল (Sensitive Skin), তাদের ক্ষেত্রে এই আঠা ব্যবহারে ত্বকে তীব্র অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। তাই যেকোনো ধরণের দীর্ঘস্থায়ী বা সংক্রামক ব্রণের সমস্যায় এই ধরণের ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারের পূর্বে একজন রেজিস্টার্ড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ (Dermatologist) বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি।]

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ষ্ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বড় ছাতিম প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, প্রজাতিটির সংকটের কারণ হচ্ছে আবাসস্থল ধ্বংস ও অত্যধিক আহরণ। বাংলাদেশে এই প্রজাতিটি আশংকা মুক্ত (lc)। বাংলাদেশে বড় ছাতিম সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির সংরক্ষণের কোন আশু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন নেই।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা: ১৫-২০।

২. এম আতিকুর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৮৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Dolon Prova

1 thought on “ছাতিম গাছ (Alstonia scholaris): এর পরিচিতি, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ভেষজ ব্যবহার”

Leave a Comment

error: Content is protected !!