তেলেঙ্গামাই (Actephila excelsa): পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও এর বহুমুখী ব্যবহার

তেলেঙ্গামাই

বৈজ্ঞানিক নাম: Actephila excelse (Dalz.) Muell.-Arg., Linnaea 32: 78 (1863). সমনাম: Anomospermum excelsum Dalz. (1851), Anomospermum neilgherrensis Wight (1852). ইংরেজি নাম: জানা নেই। স্থানীয় নাম: তেলেঙ্গামাই (মিজোরাম)।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Tracheophytes. অবিন্যাসিত: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Eudicots. বর্গ: Malpighiales. পরিবার: Phyllanthaceae. গণ: Actephila, প্রজাতি: Actephila excelse.

ভূমিকা: দক্ষিণ এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ভেষজ বৃক্ষ হলো তেলেঙ্গামাই, উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে Actephila excelsa বলা হয়। মূলত ঘন বনাঞ্চলের আর্দ্র ও ছায়াঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে এই গাছটি সবচেয়ে ভালো জন্মে। মিজোরামের পাহাড়ি জনপদে এর আদি পরিচিতি থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশেও সবজি হিসেবে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনন্য স্বাদ এবং ঔষধি গুণাগুণের কারণে এটি এখন ভোজনরসিক ও স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে একটি পুষ্টিকর প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।

তেলেঙ্গামাই-এর বর্ণনা:

প্রকৃতিতে তেলেঙ্গামাই সাধারণত চিরহরিৎ গুল্ম বা ছোট আকৃতির বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত, যা উচ্চতায় প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পাতাগুলো বেশ শক্ত ও চর্মবৎ প্রকৃতির; যা শুকিয়ে গেলে কিছুটা সবুজাভ বা হলুদাভ আভা ধারণ করে। পাতার গঠন বিশ্লেষণে ৬ থেকে ১২ জোড়া বক্র শিরা দেখা যায়, যার উভয় পৃষ্ঠ প্রায় সমান। এই উদ্ভিদের পুষ্পবিন্যাস বেশ বৈচিত্র্যময়; এর পাপড়ি এবং ৫-৬টি বৃত্যংশের দৈর্ঘ্য পরিবর্তনশীল হতে পারে। একই ফুলগুচ্ছে পুং ও স্ত্রী পুষ্পের উপস্থিতি থাকলেও এদের গঠনে ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত পুং পুষ্প একাধিক এবং খাটো বৃন্তযুক্ত হয়, অন্যদিকে স্ত্রী পুষ্পগুলো একক বা গুচ্ছাকার এবং তুলনামূলক সরু বৃন্তবিশিষ্ট হয়ে থাকে। এর গোলাকার গর্ভাশয়টি তিন খন্ডে বিভক্ত এবং ফলগুলো গোলাকার ক্যাপসিউল আকৃতির। প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের এই ফলগুলো কিছুটা চাপা ও ত্রিকোণাকার হয়, যা একটি সরু দণ্ডের ওপর বিন্যস্ত থাকে।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

তেলেঙ্গামাই মূলত বুনো প্রকৃতির উদ্ভিদ হওয়ায় এটি সাধারণত পরিত্যক্ত বা পতিত জমি, ঘন অরণ্য এবং গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে ওঠে। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই গাছটি আর্দ্র ও ছায়াচ্ছন্ন স্থানে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর বংশবিস্তার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ ও প্রাকৃতিক; মূলত পরিপক্ক বীজের মাধ্যমেই এই প্রজাতির নতুন চারা জন্ম নেয়। বীজের মাধ্যমে সফল বংশবৃদ্ধির কারণে এটি বনাঞ্চল ও এর আশেপাশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিস্তৃতি:

ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় তেলেঙ্গামাই মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি উদ্ভিদ। ভারত, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রজাতির গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বিস্তৃতি মূলত উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে সিলেট ও চট্টগ্রাম জেলার বনাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় এই ভেষজ ও পুষ্টিকর উদ্ভিদটি প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশি দেখা যায়।

ব্যবহার:

আদিকাল থেকেই স্থানীয় ও পাহাড়ি জনপদে তেলেঙ্গামাইয়ের ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এর কচি পাতা চমৎকার পুষ্টিকর সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। তবে শুধু পাতাই নয়, এর বীজের ব্যবহারও বেশ কৌতুহলী; পরিপক্ক বীজ ভেজে খাওয়ার ঐতিহ্য অনেক এলাকায় বিদ্যমান। মূলত প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া এই অর্গানিক খাবারটি যেমন সুস্বাদু, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ৭ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) তেলেঙ্গামাই প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না। বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে তেলেঙ্গামাই সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। 

তথ্যসূত্র:

১. বুশরা খান (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৭ম, পৃষ্ঠা ৩৯১। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Yercaud-elango

Leave a Comment

error: Content is protected !!