শিলারস গাছের পরিচিতি, প্রজাতি এবং মানবদেহে এর অনন্য ঔষধি গুণাগুণ

ভারতীয় উপমহাদেশ ভেষজ উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক উপাদানে সমৃদ্ধ। এমনই এক অনন্য ঔষধি ও সুগন্ধি উপাদানের নাম শিলারস। এটি মূলত একটি বিশেষ গাছের বাকল বা ছাল থেকে তৈরি করা হয়। এই নিবন্ধে আমরা জানবো শিলারস উৎপাদনকারী গাছের শারীরিক গঠন এবং কীভাবে এই মূল্যবান উপাদানটি সংগ্রহ করা হয়।

শিলারস-এর পরিচয়

এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে মাঝারি আকারের হয়ে থাকে। এর প্রধান কাণ্ড থেকে অসংখ্য ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে একটি সুন্দর ছাতার মতো আকৃতি তৈরি করে। গাছটির পাতাগুলো দেখতে বেশ আকর্ষণীয়, যা মানুষের হাতের তালুর আকৃতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ (করতলাকৃতি)। এই গাছের কাণ্ড বা বাকলের রঙ সাধারণত কালচে বাদামী বর্ণের হয়ে থাকে। শিলারস গাছে যখন ফুল ফোটে, তখন চারপাশ এক চমৎকার দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এর ফুলগুলোর রঙ সাধারণত হালকা হলদেটে বা পীতবর্ণের হয়ে থাকে। ফুলগুলো ডালের মাথায় এককভাবে না ফুটে, গুচ্ছ আকারে বা থোকায় থোকায় ফুটতে দেখা যায়। ফুল শেষে যে ফল বা বীজ হয়, তা গোলাকার এবং এর উপরিভাগ বেশ খসখসে ও শক্ত প্রকৃতির। এই উদ্ভিদের বংশবিস্তার মূলত বীজের মাধ্যমেই ঘটে থাকে, অর্থাৎ বীজ থেকে নতুন চারা গজায়। সমগ্র ভারত ও এর আশেপাশের অঞ্চলে এই গণের (Genus) কেবল একটি মাত্র প্রজাতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই গাছের ভেতরের কাঠ অত্যন্ত মূল্যবান। এর কাঠের রঙ লালচে বাদামী কিংবা কালচে বাদামী আভাযুক্ত হয়। কাঠটি প্রাকৃতিকভাবেই মসৃণ, অনেক ভারী এবং অত্যন্ত মজবুত ও শক্ত গঠনের হয়ে থাকে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী কাজের জন্য এই কাঠ দারুণ উপযোগী।

অন্যান্য প্রজাতি

বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় “স্টোরাক্স” (Storax) নামে পরিচিত শিলারসের বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী প্রজাতি রয়েছে, যা উদ্ভিদের হামামেলিডাসি (Hamamelidaceae) পরিবারের অন্তর্গত। বাংলায় এটি শিলারস হলেও হিন্দিতে শিলারস এবং প্রাচীন সংস্কৃতে একে তুরষ্ক বা শিহলক নামে ডাকা হয়, যার আঠালো নির্যাসই মূলত বাজারে বাণিজ্যিক শিলারস হিসেবে বিক্রি হয়। ভারতবর্ষে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত প্রজাতিটি হলো আলটিঙ্গিয়া এক্সেলসা (Altingia excelsa), তবে এর বাইরে বিশ্বজুড়ে আরও দুটি প্রধান প্রজাতি রয়েছে— লিকুইডাম্বার অরিয়েন্টালিস (Liquidambar orientalis) এবং লিকুইডাম্বার স্টাইরাসিফ্লুয়া (Liquidambar styraciflua)। এই বিদেশী বৃক্ষ দুটি ভারতীয় অঞ্চলে জন্মায় না বলে এই উন্নত মানের শিলারস সাধারণত ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং আমেরিকা প্রভৃতি দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

গুণগত মানের দিক থেকে বিচার করলে বহির্বিশ্বে উৎপাদিত শিলারসের তুলনায় ভারতবর্ষে প্রাপ্ত দেশীয় আলটিঙ্গিয়া গাছের নির্যাস কিছুটা কম গুণসম্পন্ন হয়ে থাকে। একটি শিলারস গাছ রোপণের পর তা যখন অন্তত ৩ থেকে ৪ বছর পুরাতন হয়, তখনই আধুনিক ও উন্নত সব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে এটি থেকে আঠা নিষ্কাশন করা হয়। এই প্রাকৃতিক আঠার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, গাছ থেকে সদ্য সংগৃহীত একদম নতুন আঠা প্রাকৃতিকভাবে বেশ দুর্গন্ধযুক্ত হলেও, তা যত পুরনো হতে থাকে তার ভেতরের তীব্র দুর্গন্ধ তত দূর হয়ে যায় এবং এক সময়ে তা থেকে অত্যন্ত চমৎকার ও মন মাতানো সুগন্ধ বের হতে শুরু করে।

বিস্তৃতি (Altingia excelsa)

প্রাকৃতিক ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ শিলারস গাছটি মূলত অলটিঙ্গিয়েসি (Altingiaceae) পরিবারের একটি অন্যতম উদ্ভিদ সদস্য, যা এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে অল্প-বিস্তর জন্মায়। ভৌগোলিক বিস্তৃতির দিক থেকে বিচার করলে এই গাছটি ভারতবর্ষের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশ ছাড়াও প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ, ভুটান, মিয়ানমার (বর্মা), চীন এবং ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের বনাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে টিকে রয়েছে।

ভেষজ গুণাগুণ

চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং ভেষজ উপাদান হিসেবে ব্যবহারের জন্য এই উদ্ভিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর শরীর থেকে নিঃসৃত সুগন্ধি আঠা বা মূল্যবান বৃক্ষনিস। আয়ুর্বেদ ও প্রথাগত চিকিৎসায় এই বৃক্ষের নির্যাস বা আঠাকে কটু ও তিক্ত স্বাদযুক্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা মানবদেহের বায়ুনাশক ও কফঘ্ন উপাদান হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি দারুণ বলকারক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। অত্যন্ত উপকারী এই প্রাকৃতিক উপাদানটি মানুষের চোখের ছানি পড়া রোধে, তীব্র গলক্ষত বা গলার ইনফেকশনে, ফুসফুসের জটিলতা দূরীকরণে এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, প্লীহাবৃদ্ধিজনিত সমস্যা, কিডনি বা বৃক্কের নানাবিধ রোগ, কোমরের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা, নারীদের রক্তপ্রদর উপশম সহ বিভিন্ন চর্মরোগ যেমন— খোস-পাঁচড়া এবং শ্বেতীরোগের চিকিৎসায় এই আঠা অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখে। একই সাথে এটি মানুষের শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা বা জ্বরঘ্ন হিসেবে কাজ করে, পরিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করে হজমকারক হিসেবে ভূমিকা রাখে, মূত্রথলির পাথর দূর করতে অশ্মরীনাশক হিসেবে সাহায্য করে এবং এমনকি বিষাক্ত বিছার হুলের তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণা দ্রুত প্রশমিত করতেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োগ করা হয়। আঠার পাশাপাশি এই গাছের মূলের ছাল বা বাকল প্রাকৃতিকভাবে তীব্র সংকোচক (Astringent) গুণসম্পন্ন হওয়ায় এটি সিফিলিসের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

১. শুক্রমেহ রোগে: পুরুষের প্রস্রাবের সময় কখনো কখনো জ্বালা অনুভূত হওয়া, আবার কখনো জ্বালা না থাকা সত্ত্বেও প্রস্রাবের পূর্বে সামান্য কোঁত বা চাপ দিলে ডিমের লালার মতো পিচ্ছিল তরল পড়া এবং প্রস্রাবের সাথে শুক্র নির্গত হওয়া মূলত শুক্রমেহ রোগের প্রধান উপসর্গ; এই সমস্যা দূর করতে আয়ুর্বেদিক উপাদান শিলারস ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় প্রতিদিন সকালে ও বৈকালে আধ কাপ দুধসহ সেবন করলে সাধারণত মাসখানিকের মধ্যেই ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে যেক্ষেত্রে সামান্য উপকার হয়ে আর অগ্রগতি হয় না, সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও এক মাস এটি সেবন করা প্রয়োজন হতে পারে। মনে রাখা জরুরি, টানা ২ মাস এই নিয়ম মেনে চলার পরেও যদি কোনো প্রকার উন্নতি বা উপকার না মেলে, তবে সময় নষ্ট না করে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে শরীর ভালোভাবে পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ এটি অন্য কোনো জটিল রোগ বা ইনফেকশনের লক্ষণও হতে পারে।

২. খোস-পাঁচড়া-চুলকানিতে: ত্বক বা চর্মরোগের সমস্যা, যেমন খোস-পাঁচড়া এবং চুলকানি দূর করতে আয়ুর্বেদিক উপাদান শিলারস (শিলাজিৎ) ব্যবহৃত হতে পারে। চর্মরোগজনিত অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিলারস সেবন করা যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের বয়স ও শারীরিক গঠন অনুপাতে সেবনের মাত্রা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

বাহ্যিক উপশমের জন্য শিলারস বা শিলাজিৎ মিশ্রিত জল দিয়ে আক্রান্ত স্থানটি নিয়মিত পরিষ্কার করে ধুয়ে ফেলার অভ্যাস ত্বকের ইনফেকশন কমাতে সাহায্য করতে পারে। অভ্যন্তরীণ সেবন এবং বাহ্যিক ব্যবহারের এই পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়

৩. মূত্রকৃচ্ছতায়: আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে শরীরে অত্যধিক ঠাণ্ডা বা গরম লাগলে অনেকেরই প্রস্রাব কমে যাওয়ার (মূত্রাল্পতা) সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে প্রস্রাবের সময় তীব্র দাহ (জ্বালা) এবং অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হতে পারে। যদিও প্রস্রাবের এই ধরনের সমস্যা কিডনিতে পাথর (অশ্মরী) কিংবা প্রস্টেট গ্রন্থি বা পৌরুষগ্রন্থির বৃদ্ধির (Prostate Enlargement) কারণেও সৃষ্টি হতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে অন্যান্য আরও জটিল উপসর্গ প্রকাশ পায়; কিন্তু কোনো প্রকার ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু-সংক্রমণ (Infection) ছাড়াই যদি কেবল ঋতু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা হয়, তবে আয়ুর্বেদিক উপাদান শিলারস ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দিনে ২ বার হালকা গরম জল অথবা দুধের সাথে সেবন করলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। এই চিকিৎসার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর ঠাণ্ডা ও সতেজ রাখতে নিয়মিত শীতল ও লঘু (সহজপাচ্য) আহার এবং প্রচুর পরিমাণে তরল পানীয় গ্রহণ করা উচিত, এবং চটজলদি সুস্থতার জন্য কিছুদিন শারীরিক ও মানসিক পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া একান্তই প্রয়োজন।

৪. মূত্রাশ্মরীতে: মানবদেহের মূত্রবহ স্রোতে বা মূত্রনালীতে পাথর (Kidney/Urinary Stones) জমা হলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে তীব্র মূত্রকৃচ্ছতা বা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও যন্ত্রণাদায়ক প্রস্রাবের সমস্যা দেখা দেয়। এই ধরনের চর্বিহীন বা খনিজ উপাদানের জমাট বাঁধা পাথর যদি প্রাথমিক অবস্থায় সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং সমস্যাটি যদি খুব বেশি দীর্ঘদিনের বা জটিল না হয়, তবে আয়ুর্বেদিক ভেষজ উপাদান শিলারস (শিলাজিৎ) নিয়মিত সেবনে অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার সুফল পাওয়া যায়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এক থেকে দুই মাস শিলারস সেবন করলে এটি মূত্রনালীর প্রদাহ দূর করতে এবং ছোট আকারের পাথর গলিয়ে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দিতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখা জরুরি, পাথরের আকার বড় হলে কিংবা তীব্র যন্ত্রণার সাথে প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়ার মতো জটিল উপসর্গ দেখা দিলে ঘরোয়া উপায়ে সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে আধুনিক পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

৫. অন্ত্রবৃদ্ধিতে: আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় অন্ত্রবৃদ্ধি রোগটি সর্বাধিক যে নামে পরিচিত, তা হলো ‘হার্নিয়া’ (Hernia), যা মূলত একটি শস্ত্রসাধ্য বা অপারেশন-যোগ্য রোগ এবং অস্ত্রোপচার ছাড়া এটি পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব নয়। তবে প্রাচীনকালে যখন তাৎক্ষণিক আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ ছিল না, তখন রোগীকে আশু বা সাময়িক তীব্র যন্ত্রণা থেকে উপশম দিতে প্রাচীন চিকিৎসকগণ আয়ুর্বেদিক উপাদান শিলারসের প্রলেপ ব্যবহার করার পরামর্শ দিতেন; এক্ষেত্রে শিলারসকে সামান্য জলের সাথে মলমের মতো ঘন করে গুলে আক্রান্ত স্থানে প্রলেপ বা লেপ দেওয়া হতো। কার্যকারিতা আরও বাড়াতে কোনো কোনো প্রাচীন কবিরাজ বা চিকিৎসক এই প্রলেপ দেওয়ার পর তার ওপর ধুতুরা পাতা অথবা তামাক পাতা জড়িয়ে বা বেঁধে রাখার নির্দেশ দিতেন, যা সাময়িকভাবে ওই স্থানের পেশিকে শিথিল করতে এবং ব্যথা কমাতে সাহায্য করত। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নয় এবং হার্নিয়ার মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যায় ঘরোয়া উপায়ে সময় নষ্ট না করে জটিলতা এড়াতে অবিলম্বে একজন আধুনিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সঠিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

৬. লাবণ্য হানিতে: মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের মূল চাবিকাঠি হলো ত্বকের স্বাভাবিক জৌলুস, আর তা যদি হারিয়ে যায় তবে মানসিক কষ্ট নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানভাবে হয়ে থাকে; তবে সৌন্দর্য সচেতনতার কারণে নারীদের ক্ষেত্রে এই কষ্ট বা অস্বস্তি একটু বেশিই দেখা যায়। বয়স, মানসিক চাপ কিংবা অপুষ্টির কারণে ত্বকের এই লাবণ্যহানি ঘটলে আয়ুর্বেদিক উপাদান শিলারস (শিলাজিৎ) প্রতিদিন সকালে ও বিকেলে অল্প গরম দুধ অথবা জলসহ নিয়মিত সেবন করলে দেহের অভ্যন্তরীণ পুষ্টি নিশ্চিত হয় এবং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও লাবণ্য ফিরে আসে [সূত্র প্রয়োজন – শিলাজিৎ ঐতিহ্যগতভাবে ত্বকের স্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বাড়াতে ব্যবহৃত হয়]। তবে মনে রাখা জরুরি, এই লাবণ্যহানির পিছনে যদি কোনো অন্তর্নিহিত রোগের ইতিহাস থাকে, তবে অবশ্যই মূল রোগটির সঠিক চিকিৎসা আগে করতে হবে; বিশেষ করে ক্রনিক পেটের গোলমাল বা হজমের সমস্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্টের প্রধান কারণ হওয়ায়, সেক্ষেত্রে শিলারস ব্যবহারের পাশাপাশি রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে অগ্নিবৃদ্ধিকর (ক্ষুধামন্দা দূরকারী), হজমকারক, বায়ুনাশক, অম্লনাশক কিংবা কোষ্ঠ পরিষ্কারক কোনো আয়ুর্বেদিক বা আধুনিক ঔষধ ব্যবহার করা উচিত [সূত্র প্রয়োজন – আয়ুর্বেদিক নীতি অনুযায়ী পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য ত্বকের উজ্জ্বলতার সাথে সম্পর্কিত]। এছাড়া সন্তান প্রসবের পর মায়েদের যে প্রসবান্তিক শারীরিক দুর্বলতা এবং সেই সাথে ত্বকের লাবণ্যহানি ঘটে, তা দূর করতে এই উপাদানটি চমৎকার টনিক হিসেবে কাজ করে; তবে স্থায়ী সুফলের জন্য ঔষধ সেবনের পাশাপাশি পুষ্টিকর আহার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন লাইফস্টাইলের একটু-আধটু ক্ষতিকর অভ্যাস পরিবর্তন করা একান্ত প্রয়োজন।

৭. কামোত্তেজনা হ্রাসে: মন আছে, বয়সও এমন-কিছু বেশি নয়, শরীরও ভাল, অথচ সঙ্গসুখ ভোগের বাসনায় ব্যাঘাত। সেটা কি নারী আর কি পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। আমাদের শরীরের অন্তঃস্রাবীয় গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়াহ্রাসের ফলেই এই অবস্থা, আর ক্রিয়াহ্রাসের কারণগুলির মধ্যে এটাও একটি যে, ইতঃপূর্বে সংযমের কোন প্রকার বাধা না মেনে বল্গাহীন জীবন-যাপন। এই যে ক্ষেত্র, এক্ষেত্রে ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় শিলারস দিনে ২ বার অর্থাৎ সকালে একবার এবং বৈকালে অথবা সন্ধ্যায় একবার আধ কাপ দুধ সহ খেতে হবে। সব ক্ষেত্রেই গরম করা দুধ ঠাণ্ডা করে ব্যবহার করতে হবে। এই সঙ্গে ১-২ চা-চামচ চিনি মিশিয়েও খাওয়া চলে ।

৮. জীর্ণ কাসে: দীর্ঘদিনের পুরাতন কফ-কাশি বা জীর্ণ কাসের সমস্যায়, যেখানে বুকের ভেতর জমে থাকা কফ সহজে উঠতে চায় না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্গত কফ অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়, সেখানে ভেষজ উপাদান শিলারস (শিলাজিৎ) ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় দিনে ২ বার দুধের সাথে সেবন করলে ফুসফুসের অস্বস্তি ও কাশির তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে যাদের দুধ পানে হজমের সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক অসুবিধা হয়, তারা দুধের পরিবর্তে হালকা গরম জলের সাথে এটি সেবন করতে পারেন; এমনকি গলার খুসখুসে ভাব ও কফ দ্রুত দূর করতে সমপরিমাণ যষ্টিমধু চূর্ণ ও শিলারস একত্রে মিশিয়ে মুখে রেখে লজেন্সের মতো চুষে চুষে খাওয়ার ঐতিহ্যবাহী নিয়মও বেশ প্রচলিত। মনে রাখা জরুরি, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা কফে দুর্গন্ধ হওয়া যক্ষ্মা (TB) কিংবা ফুসফুসের গুরুতর ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে, তাই ঘরোয়া উপায়ে সময় নষ্ট না করে একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক রোগ নির্ণয় করা নিরাপদ।

৯. ব্রণে: ত্বকে ব্রণের সমস্যা দূর করতে প্রাচীন লোকজ চিকিৎসায় শক্তিশালী জীবাণুনাশক উপাদান শিলারস (শিলাজিৎ) জলের সাথে গুলে প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করার নিয়ম রয়েছে, যা ব্রণের ধরন অনুযায়ী দুইভাবে কাজ করে; কিছু ক্ষেত্রে ব্রণের প্রাথমিক অবস্থায় এই প্রলেপ দিলে এর প্রদাহরোধী গুণের কারণে ব্রণ চামড়ার নিচে বসে যায়, আবার যেক্ষেত্রে ইনফেকশন বেশি থাকে সেখানে এটি ব্রণটিকে দ্রুত পাকিয়ে ফোড়ার রূপ দেয় এবং পুঁজ ও দূষিত রক্ত বের করে দিয়ে ক্ষতস্থান শুকাতে সাহায্য করে। তবে আধুনিক চর্মবিজ্ঞানের মতে, সরাসরি অপরিশোধিত ভেষজ উপাদান মুখে লাগালে সংবেদনশীল ত্বকে তীব্র অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, তাই মুখে ব্যবহারের আগে অবশ্যই ত্বকের অন্য অংশে প্যাচ টেস্ট (Patch Test) করে নেওয়া উচিত। এছাড়া ব্রণের তীব্রতা বেশি হলে বা স্থায়ী দাগ এড়াতে ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আধুনিক ও নিরাপদ স্কিনকেয়ার গাইডলাইন অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়।

Altingia excelsa Noronha উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান ও বৈশিষ্ট্য:

আলটিঙ্গিয়া এক্সেলসা নোরোনহা (Altingia excelsa Noronha) নামক ঔষধি উদ্ভিদের সমগ্র অংশ এবং কান্ডে গুরুত্বপূর্ণ কিছু রাসায়নিক উপাদান বা কেমিক্যাল কম্পোজিশন পাওয়া যায়, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এই উদ্ভিদের সমগ্র অংশে (Whole plant) রয়েছে সুগন্ধি রজন বা অ্যারোমেটিক রেজিন (Aromatic resin), দুটি অ্যারোমেটিক বালসাম যা সিনামিক এস্টার (Cinnamic esters) সমৃদ্ধ, এবং অত্যন্ত কার্যকরী সিনামিক অ্যালডিহাইড (Cinnamicaldehyde) ও বেঞ্জালডিহাইড (Benzaldehyde) নামক উপাদান। এছাড়া উদ্ভিদটির কাণ্ড বা ডালপালায় (Stem) উচ্চ মাত্রায় প্রাকৃতিক রেজিন বা আঠা পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে গুগল অ্যাডসেন্স বা বিজ্ঞাপন-বান্ধব ওয়েবসাইটের নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের ভেষজ বা উদ্ভিদের রাসায়নিক উপাদান কোনো রোগের চিকিৎসায় সরাসরি প্রয়োগ করার পূর্বে অবশ্যই ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং একজন পেশাদার উদ্ভিদবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ অপরিশোধিত উপাদানের ভুল ব্যবহারে ত্বকে বা শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

আরো পড়ুন:

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র/ গ্রন্থপঞ্জি ও টিকা:

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ১০, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, চতুর্থ মুদ্রণ ১৪০৭, পৃষ্ঠা, ৭৬-৭৭।

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০১ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি floradirgantara.site থেকে নেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!