মাঝারি আকন্দ (বৈজ্ঞানিক নাম: Calotropis acia) আমাদের প্রকৃতিতে মূলত ‘পাহাড়ি আকন্দ’ নামে সুপরিচিত একটি অত্যন্ত মূল্যবান ওষধি উদ্ভিদ। এটি এপোসিনাসি (Apocynaceae) পরিবারের এবং ক্যালোট্রপিস (Calotropis) গণের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রজাতি। বড় বা ছোট পাতা আকন্দের তুলনায় এটি প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা কম দেখা যায়। এই উদ্ভিদটি সাধারণত ছোট থেকে মাঝারি আকৃতির এক প্রকার বহুবর্ষজীবী গুল্ম ও ঝোপজাতীয় গাছ, যা প্রাচীনকাল থেকেই লোকজ ও ভেষজ চিকিৎসায় বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
🧬 মাঝারি আকন্দের বৈজ্ঞানিক নাম ও শ্রেণীবিন্যাস
উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দের একটি সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে। ১৮২৪ সালে বিজ্ঞানী এফ. হ্যামিল্টন (F. Ham.) প্রথম এই উদ্ভিদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। নিচে এর বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক নাম এবং জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Biological Classification) তুলে ধরা হলো:
১. উদ্ভিদের বিভিন্ন নাম ও সমনাম (Plant Nomenclature)
- বৈজ্ঞানিক নাম: Calotropis acia F. Ham.
- সমনাম (Synonyms): উদ্ভিদবিজ্ঞানের গবেষণায় এই গাছটি আরও দুটি নামে পরিচিত—
১. Asclepias herbacea Roxb. (1832)
২. Calotropis herbacea (Roxb.) Wight (1834) - বাংলা নাম: মাঝারি আকন্দ, পাহাড়ি আকন্দ।
- ইংরেজি নাম: এই প্রজাতির সুনির্দিষ্ট কোনো প্রচলিত ইংরেজি নাম পাওয়া যায়নি।
২. জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস (Taxonomy)
| ট্যাক্সোনমিক ধাপ (Rank) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) | বাংলা নাম/পরিভাষা |
|---|---|---|
| জগৎ (Kingdom) | Plantae | উদ্ভিদ জগৎ |
| বিভাগ (Division) | Magnoliophyta | সপুষ্পক / আবৃতজীবী |
| শ্রেণি (Class) | Magnoliopsida | দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ |
| বর্গ (Order) | Gentianales | জেনশিয়ানালেস |
| পরিবার (Family) | Apocynaceae | এপোসিনাসি (আকন্দ পরিবার) |
| উপপরিবার (Subfamily) | Asclepiadoideae | অ্যাসক্লেপিয়াডোইডি |
| গণ (Genus) | Calotropis | ক্যালোট্রপিস |
| প্রজাতি (Species) | C. acia | মাঝারি আকন্দ |
🌿 মাঝারি আকন্দ গাছের বিস্তারিত বাহ্যিক বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য
মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ মূলত একটি খাড়া, বীরুৎ বা ছোট আকৃতির গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর কাণ্ডের গোড়ার দিক থেকেই অনেকগুলো শাখাপ্রশাখা চারদিকে বিন্যস্ত হয়ে এটি ঝোপালো রূপ নেয়। নিচে এই উদ্ভিদের পাতা, ফুল, ফল এবং অন্যান্য গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. পাতার গঠন ও বৈশিষ্ট্য (Leaf Morphology)
- আকৃতি ও পরিমাপ: মাঝারি আকন্দের পাতাগুলো ডিম্বাকার থেকে শুরু করে কিছুটা বল্লমাকার (Ovate-lanceolate) হয়ে থাকে। এর পত্রফলক সাধারণত ৯ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ৫ থেকে ৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়।
- স্পর্শ ও টেক্সচার: এই উদ্ভিদের পাতাগুলো বেশ পুরু ও মসৃণ প্রকৃতির। পাতার মধ্যশিরাটি বেশ স্থূলাকার বা মোটা হয় এবং এর পাতায় স্পষ্ট ৬ থেকে ৭ জোড়া পার্শ্বীয় শিরা লক্ষ্য করা যায়। পাতার শীর্ষভাগ বা ডগা ঈষৎ তীক্ষ্ণ এবং গোড়ার দিকটি ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে কীলকাকার রূপ নেয়।
- পত্রবৃন্ত ও রোমশ কচি অংশ: এর কচি ডালপালা এবং কচি পাতার নিচের দিকটি (অঙ্কীয় পৃষ্ঠ) পশমের মতো ঘন, নরম ও ছোট ছোট রোমে ঢাকা থাকে। এর পাতাগুলো বোঁটাযুক্ত বা সবৃন্তক হয়ে থাকে। পাতার বোঁটা বা পত্রবৃন্ত সাধারণত ০.৮ থেকে ১.৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং এটিও ঘন নরম রোমে আবৃত থাকে।
২. ফুলের গাঠনিক বিবরণ (Flower Anatomy)
- পুষ্পমঞ্জরীর বিন্যাস: এর ফুলগুলো রক্তিমাভ বা লালচে রঙের হয়ে থাকে, যা যৌগিক ছত্রমঞ্জরীতে (Compound Cyme) সুন্দরভাবে সজ্জিত থাকে। ফুলের প্রধান দণ্ডটি বা পুষ্পদণ্ড অনূর্ধ্ব ২ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ঈষৎ শাখাবিন্যাসযুক্ত হয়। ফুল ধারণকারী পুষ্পবৃন্তিকাগুলো ২.০ থেকে ২.৩ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর মঞ্জরীপত্র রৈখিক আকৃতির এবং ৫ থেকে ৭ মিলিমিটার লম্বা হয়, যার বাইরের অংশ ঘন কোমল রোমে ঢাকা থাকে।
- দলমণ্ডল ও কিরীট: ফুলের দলমণ্ডলের খণ্ডগুলো ডিম্বাকার-বল্লমাকার এবং এর শীর্ষভাগ সূক্ষ্ম থেকে দীর্ঘাগ্র হয়ে থাকে। পাপড়ির এই খণ্ডগুলো ১.০-১.৫ সেমি লম্বা এবং ০.৫-০.৭ সেমি চওড়া হয়। ফুলগুলো বেশ পুরু ও খাড়া প্রকৃতির হয়, যার উপরিভাগ রক্তিমাভ এবং পাপড়ির চারপাশের প্রান্তভাগ কিছুটা তরঙ্গিত বা ঢেউখেলানো থাকে।
- অভ্যন্তরীণ অংশ ও পরাগধানী: ফুলের ভেতরে পাঁচটি গ্রন্থিল কিরীটীয় শল্ক থাকে, যা পুংকেশরীয় স্তম্ভের সাথে যুক্ত। এই কিরীটগুলো পুংকেশরীয় স্তম্ভের চেয়ে আকারে ছোট হয়। এর শীর্ষভাগের উভয় পাশে দুটি ভোঁতা কানের মতো অভিক্ষেপ থাকে যা দ্বি-খণ্ডিত। পরাগধানী পাতলা ঝিল্লিসদৃশ শীর্ষ বিশিষ্ট এবং এর পলিনিয়া আয়তাকার-বল্লমাকার আকৃতির হয়ে থাকে। এর কপাস্কেল গাঢ় বাদামি রঙের এবং ২-কোষী বিশিষ্ট হয়।
৩. ফুল ফোটার সময় ও ফলের তথ্য (Blooming Season & Fruits)
- ফুল ও ফল ধারণের সময়: মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ গাছে সাধারণত এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস (গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল) জুড়ে ফুল ও ফল ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- ফলের সহজলভ্যতা: প্রাকৃতিকভাবে এই প্রজাতির উদ্ভিদের ফলিক্যাল বা ফল সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না বা এটি বেশ দুর্লভ।
🌾 মাঝারি আকন্দের চাষাবাদ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল
মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ গাছটি প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত সহনশীল একটি উদ্ভিদ। এর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং চাষাবাদের নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো:
- প্রাকৃতিক আবাসস্থল (Natural Habitat): এই প্রজাতির আকন্দ গাছ সাধারণত গ্রামীণ বা পাহাড়ি সড়কের কিনারা, বনের ধার এবং উন্মুক্ত চারণভূমি বা তৃণভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে।
- অনুকূল মাটি ও আবহাওয়া: সাধারণত কম উর্বর, শুষ্ক এবং রৌদ্রোজ্জ্বল স্থানে এই গাছটি খুব ভালোভাবে মানিয়ে নেয়।
- বংশবিস্তার পদ্ধতি (Propagation): মাঝারি আকন্দের প্রধান বংশবিস্তার মাধ্যম হলো এর বীজ। পরিপক্ক ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করে তা বপনের মাধ্যমে খুব সহজেই এই গাছের নতুন চারা তৈরি করা সম্ভব।
🌍 মাঝারি আকন্দের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও সহজলভ্যতা
মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ (Calotropis acia) অন্যান্য আকন্দ প্রজাতির মতো সর্বত্র অহরহ দেখা যায় না। এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি বেশ সীমিত। নিচে এর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিস্তৃতি তুলে ধরা হলো:
১. আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি (Global Distribution)
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মাঝারি আকন্দ মূলত দক্ষিণ এশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। এটি প্রধানত পূর্ব হিমালয় অঞ্চল, নেপাল এবং পূর্ব ভারতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে।
২. বাংলাদেশে উপস্থিতি ও দুর্লভতা (Presence in Bangladesh)
- কদাচ প্রাপ্তি: বাংলাদেশে মাঝারি আকন্দ একটি অত্যন্ত বিরল বা দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদ। বড় বা ছোট আকন্দের মতো এটি রাস্তার পাশে সচরাচর দেখা যায় না।
- নির্দিষ্ট আবাসস্থল: আমাদের দেশে এই প্রজাতিটি কদাচিৎ বা খুব কম পরিমানে কেবল চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর জেলায় এবং গাজীপুর-টাঙ্গাইল অঞ্চলের মধুপুরের শাল বনে প্রাকৃতিকভাবে টিকে রয়েছে।
💰 মাঝারি আকন্দের অর্থনৈতিক ব্যবহার ও চিকিৎসাগত গুরুত্ব
মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ (Calotropis acia) কেবল একটি বুনো বা দুর্লভ উদ্ভিদই নয়, বরং এর বাণিজ্যিক ও ভেষজ গুণাগুণ অত্যন্ত উচ্চমানের। নিচে এর প্রধান ব্যবহারগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Commercial Importance)
- উচ্চমানের সূক্ষ্ম তন্তু: মাঝারি আকন্দ গাছের কাণ্ড বা ডালপালা থেকে এক ধরনের বিশেষ সূক্ষ্ম আঁশ বা তন্তু (Fiber) পাওয়া যায়, যা সুতা বা দড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
- বালিশ তৈরিতে তুলোর বিকল্প: এর বীজ থেকে প্রাপ্ত নরম ও রেশমি আঁশ বা ফ্লস (Floss) ভারতীয় উপমহাদেশে বালিশ, তোশক ও কুশন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ‘সালমালিয়া কটন’ বা শিমুল তুলার একটি চমৎকার ও সাশ্রয়ী বিকল্প (Subsitute) হিসেবে কাজ করে।
২. স্বাস্থ্যগত ও চিকিৎসাগত উপকারিতা (Medicinal Benefits)
- মূলের বাকলের ভেষজ গুণ: এই উদ্ভিদের মূলের ছাল বা বাকল শরীরের মেটাবলিজম বা পরিপাক ক্রিয়া ঠিক রাখতে (পরিবর্তন সাধক), শারীরিক শক্তি ও বল বাড়াতে (বলকারক) এবং খিঁচুনি ও কফ নিঃসারক হিসেবে কাজ করে।
- কঠিন আমাশয় ও ব্রঙ্কাইটিস নিরাময়: মাঝারি আকন্দের মূলের বাকল দীর্ঘদিনের বা কঠিন আমাশয় দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়া এই গাছের জলীয় নির্যাস (জলজ শুরা জাতীয় দ্রবণ) এবং চূর্ণ ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও তীব্র পেটের অসুখ নিরাময়ে ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- দুগ্ধবৎ নির্যাস ও আঠার ব্যবহার: গাছ থেকে নির্গত দুধের মতো সাদা আঠা বা নির্যাস কুষ্ঠরোগের তীব্রতা ও ক্ষত উপশমে সাহায্য করে। এটি পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতেও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।
- নিয়ন্ত্রিত মাত্রার গুরুত্ব: চিকিৎসকদের মতে, অল্প ও সঠিক মাত্রায় সেবন করলে মাঝারি আকন্দ গাছের সমগ্র অংশেরই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শারীরিক ক্রিয়া পরিবর্তনের চমৎকার ভেষজ গুণাবলী রয়েছে।
⚠️ সতর্কতা: আকন্দ একটি অত্যন্ত তীব্র ওষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। এর কষ সরাসরি যোনিতে ধারণ করলে জরায়ুর মারাত্মক ক্ষতি ও গর্ভপাত ঘটতে পারে। তাই যেকোনো অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ভেষজ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
💡 টপিক রিলেটেড পোস্ট: আকন্দ গাছের ১৩টি ঔষধি গুণাগুণ এবং উপকারিতা সম্পর্কে জানুন 🩺
👥 মাঝারি আকন্দের জাতিতাত্ত্বিক (Ethnobotanical) ব্যবহার ও লোকজ ঐতিহ্য
বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মাঝে যুগ যুগ ধরে মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ গাছের কিছু প্রথাগত ও ঐতিহ্যগত ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে। নিচে এর প্রধান কিছু জাতিতাত্ত্বিক বিবরণ তুলে ধরা হলো:
- বাত ও শোথ বেদনায় (বাংলাদেশ): গবেষক রহমান এবং উইলকক (Rahman and Wilcock, 1995)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাঙালি এবং বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়—উভয়ই শরীরের যেকোনো অংশের ফোলা (শোথ) এবং বাতের তীব্র ব্যথা দূর করতে মাঝারি আকন্দের তাজা পাতাকে হালকা গরম বা শুষ্ক উষ্ণ সেঁক হিসেবে ব্যথার স্থানে প্রয়োগ করে থাকে।
- ক্ষত ও জীবাণুনাশক হিসেবে: লোকজ চিকিৎসায় এই আকন্দ গাছের পাতার তাজা রসকে সদ্য হওয়া বা টাটকা ক্ষতের ওপর প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক বা জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহার করার প্রাচীন রেওয়াজ রয়েছে।
- প্রমোদদায়ক পানীয় তৈরি (ভারত): প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী সান্তাপাউ এবং ইরানি (Santapau and Irani, 1962)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে এই গাছের পাতা থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় “বার” (Bar) নামক একটি ঐতিহ্যবাহী প্রমোদদায়ক বা উদ্দীপক পানীয় (শুরা) তৈরি করা হয়ে থাকে।
- দাঁত ব্যথা নিরাময় ও দাঁতন (ভারত): গবেষক ওয়াট (Watt, 1889)-এর বিবরণ অনুযায়ী, ভারতের পাঠান সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই গাছের মূল বা শিকড়কে মিসওয়াক বা দাঁতন হিসেবে ব্যবহার করে। কথিত আছে, এর ফলে দাঁতের নানাবিধ সংক্রমণ ও তীব্র দাঁত ব্যথা দ্রুত উপশম হয়।
📉 মাঝারি আকন্দের সংরক্ষণ অবস্থা ও পরিবেশগত তথ্য (Conservation Status)
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণায় মাঝারি বা পাহাড়ি আকন্দ উদ্ভিদের বর্তমান অবস্থা এবং এর অস্তিত্বের সংকট নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়:
- বর্তমান অবস্থা (IUCN Status): ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ষষ্ঠ খণ্ড (আগস্ট ২০১০) অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাঝারি আকন্দ গাছটির বর্তমান অবস্থা ‘তথ্য সংগৃহীত হয়নি’ (Not Evaluated – NE) হিসেবে বিবেচিত। তবে মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে এটি বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত বিরল (Rare) উদ্ভিদ হিসেবে মনে করা হয়।
- সংকটের কারণ: প্রাকৃতিকভাবে গাছটি কম জন্মানোর পাশাপাশি ক্রমাগত বনাঞ্চল নিধন ও এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল বিনষ্ট হওয়ার কারণে এই প্রজাতির উদ্ভিদ তীব্র অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
- সংরক্ষণ পদক্ষেপ ও প্রস্তাবনা: আমাদের দেশে বর্তমানে মাঝারি আকন্দ সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন যে, এই বিরল প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এর নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশেই ইন-সিটু (In-situ) পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আরো পড়ুন
- আকন্দ গাছের ১৩টি চমৎকার ভেষজ ও ঔষধি গুণাগুণ এবং উপকারিতা
- ছোটপাতা আকন্দ গাছের পরিচিতি, শ্রেণীবিন্যাস এবং এর চিকিৎসাগত গুরুত্ব
- মাঝারি আকন্দ গাছের পরিচিতি, শ্রেণীবিন্যাস এবং এর চমৎকার জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার
- বড় আকন্দ গাছ কি? জানুন এর বিস্তারিত বৈশিষ্ট্য, চাষ পদ্ধতি ও ভেষজ গুণ
- আকন্দ গাছ কি? জানুন আকন্দের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস ও ঔষধি গুণ
📚 তথ্যসূত্র ও টিকা (References & Notes)
১. বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (খণ্ড ৬): রহমান, এম আতিকুর (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”। সম্পাদক: আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা: ২৩৬-২৩৭। আইএসবিএন: 984-30000-0286-0।
২. চিত্রস্বত্ব (Image Credit): এই নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবিগুলো মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিমিডিয়া কমন্স (Wikimedia Commons) থেকে সংগৃহীত। আলোকচিত্রীর নাম: Anup Sadi।
৩. প্রকাশ ও পরিমার্জন সংক্রান্ত নোট: এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি সর্বপ্রথম ১৭ জুলাই ২০১৮ তারিখে জনপ্রিয় ওয়েব পোর্টাল ‘রোদ্দুরে.কম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। কন্টেন্টের গুণগত মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং আধুনিকতা বজায় রাখতে আজ ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ নিবন্ধটি নতুন তথ্যসহ পরিমার্জন, আধুনিকীকরণ এবং আপডেট করা হলো।
পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)
উত্তর: মাঝারি আকন্দ গাছের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Calotropis acia। ১৮২৪ সালে বিজ্ঞানী এফ. হ্যামিল্টন প্রথম এই উদ্ভিদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন।
উত্তর: মাঝারি আকন্দ বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত বিরল বা দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদ। এটি কদাচিৎ কেবল চট্টগ্রাম ও দিনাজপুর জেলায় এবং গাজীপুর-টাঙ্গাইল অঞ্চলের মধুপুরের শাল বনে প্রাকৃতিকভাবে টিকে রয়েছে।
উত্তর: মাঝারি আকন্দের ফুলগুলো রক্তিমাভ বা লালচে রঙের হয় এবং এর পুষ্পদণ্ড মাত্র ২ সেমি লম্বা হয়। অন্যদিকে, বড় আকন্দের ফুল সাদা বা বেগুনি হয় এবং এর পুষ্পদণ্ড প্রায় ১০ সেমি পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
উত্তর: মাঝারি আকন্দ গাছ থেকে নির্গত দুধের মতো সাদা আঠা বা নির্যাস কুষ্ঠরোগের তীব্রতা ও ক্ষত উপশমে সাহায্য করে। এছাড়া এটি পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে পাকান্ত্রিক উত্তেজক হিসেবে কাজ করে।
উত্তর: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ বিরল। তাই উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এর নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশেই ‘ইন-সিটু’ (In-situ) পদ্ধতিতে সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছেন।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।