ওল কচুর উপকারিতা, ঔষধি গুণাগুণ ও চাষ পদ্ধতি: বাতের ব্যথা ও পেটের পীড়ার মহৌষধ

ভূমিকা: ওল কচু (বৈজ্ঞানিক নাম: Amorphophallus paeoniifolius, ইংরেজি নাম: এলিফ্যান্ট-জাম) হচ্ছে Araceae পরিবারের কন্দ প্রজাতি। এতে নানা ভেষজ গুণ আছে।

বিষয়ের নামবিবরণ ও তথ্য
অফিসিয়াল বৈজ্ঞানিক নামAmorphophallus paeoniifolius (Dennst.) Nicolson var. campanulatus (Decne.) Sivadasan
প্রথম প্রকাশ ও সাইটেশনTaxon 32: 130 (১৯৮৩ সাল)
উদ্ভিদের সমনাম (Synonyms)• Arum campanulatum Roxb. (১৮২০)
• Amorphophallus campanulatus Decne. (১৮৩৪)
আন্তর্জাতিক ইংরেজি নামElephant foot yam (এলিফ্যান্ট-ফুট ইয়াম / এলিফ্যান্ট-জাম)
স্থানীয় বা প্রচলিত নামওল কচু / ওল

ওল কচু-এর বর্ণনা:

ওল কচু মূলত একটি ঋজু বা খাড়া প্রকৃতির বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এর মাটির নিচের মূল কন্দ বা গুঁড়িক অংশটি দেখতে কিছুটা অবদমিত গোলাকার আকৃতির হয়।

  • আকার ও পরিমাপ: এই কন্দটি লম্বায় প্রায় ৫.৫ থেকে ১৫.০ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ১৮ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর বাইরের আবরণটি ঘন পিঙ্গল বা কালচে বাদামী রঙের দেখায়।
  • ডাঁটা ও পাতার রূপ: এই গাছের পাতাগুলো এককভাবে বা একল উপায়ে জন্মায়। এর পাতা ধরে রাখার ডাঁটা বা বৃন্তটি বেশ শক্ত ও মজবুত হয়, যা আকারে প্রায় ৯০-১৪০ x ৪-৮ সেন্টিমিটার। হালকা সবুজ রঙের এই ডাঁটার গায়ে আকর্ষণীয় সাদা দাগ থাকে এবং ক্ষেত্রবিশেষে এর উপরিভাগ কিছুটা অমসৃণ হতে পারে।
  • ফলকের বিন্যাস: ওল কচুর পাতার মূল ফলকটি আড়াআড়িভাবে ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। পাতাটি মূলত ত্রিপক্ষীয় বিন্যাসে সাজানো থাকে, যার পার্শ্ববর্তী খণ্ডগুলো পুনরায় দুই ভাগে (দ্বৈভাগিক) বিভক্ত হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এগুলো ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে পর্বলগ্ন ও দীঘাগ্র খণ্ডকে রূপ নেয়।

পুষ্পবিন্যাস ও সুরক্ষাকারী ‘চমসা’

এই উদ্ভিদের ফুল ফোটার ধরণ বা পুষ্পবিন্যাসটি বেশ সংক্ষিপ্ত একটি মঞ্জরী দণ্ডের ওপর গড়ে ওঠে, যা আকারে প্রায় ৪.৫-৮.০ x ১-২ সেমি। এর অক্ষের গায়েও গাছের মূল ডাঁটার মতো দৃষ্টিনন্দন দাগ লক্ষ্য করা যায়।

  • ফুলটিকে ঘিরে থাকা প্রশস্ত ও ঘণ্টাকৃতির একটি বিশেষ পাতা বা আবরণ (চমসা) থাকে, যার পরিমাপ ১৫-২৮ x ১০-২২ সেন্টিমিটার।
  • এই চমসা বা আবরণের প্রান্তভাগ বেশ তরঙ্গায়িত এবং কুঞ্চিত বা কোঁকড়ানো প্রকৃতির হয়।
  • এর নিচের বা মূলীয় অংশটি কিছুটা গোটানো বা সংবর্ত থাকে এবং ওপরের দিকটা বেশ প্রসারিত হয়। এর বাইরের দিকটা সাদা দাগযুক্ত হালকা সবুজ হলেও ভেতরের অংশে হলুদাভ রঙের ছোঁয়াসহ ঘন রক্ত বেগুনি রঙের এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়।

স্পেডিক্স ও ফুলের অভ্যন্তরীণ গঠন

ওল কচুর ফুল ধারণকারী দণ্ড বা স্পেডিক্স অংশটি বেশ দৃঢ়, শক্ত এবং বোঁটাহীন (অবৃন্তক) হয়, যা প্রায় ১৮ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

  • স্ত্রী ও পুং ফুলের অবস্থান: স্পেডিক্সের একেবারে নিচের দিকে ৪-১১ সেন্টিমিটার অংশ জুড়ে থাকে অসংখ্য স্ত্রীপুষ্প। তার ঠিক ওপরে ৩-৬ সেন্টিমিটার অংশ জুড়ে অবস্থান করে পুংপুষ্প।
  • নগ্ন উপাঙ্গ: এর ওপরের বন্ধ্যা বা নগ্ন উপাঙ্গটি সবুজাভ রক্তবেগুনি রঙের হয়। এটি অনিয়মিতভাবে খণ্ডিত এবং ভেতরটা স্পঞ্জের মতো নরম ও সাদা হয়ে থাকে। এর শীর্ষভাগ শাঙ্কব, গোলাকার বা সূক্ষ্মাগ্র হতে পারে, যা আকারে প্রায় ৪-১৫ x ৩-৮ সেন্টিমিটার।

জনন অঙ্গের নিখুঁত বৈশিষ্ট্য

  • স্ত্রীপুষ্প: ওল কচুর স্ত্রীপুষ্পগুলো সংখ্যায় অসংখ্য থাকে। এর গর্ভাশয়টি অর্ধ-বর্তুলাকার থেকে ডিম্বাকার আকৃতির এবং এটি ২-৩টি প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে একটি করে অধোমুখী ডিম্বক থাকে। এর গর্ভদণ্ডটি গর্ভাশয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লম্বা হয় এবং হালকা হলুদাভ সাদা রঙের বৃক্কাকৃতির গর্ভমুণ্ডটি ২-৩টি খণ্ডে বিভক্ত থাকে।
  • পুংপুষ্প: পুংপুষ্পগুলো বেশ ঘন ও সুবিন্যস্তভাবে সাজানো থাকে, যা দেখতে উল্টো শাঙ্কব আকৃতির। এর বোঁটাহীন বা অবৃন্তক পরাগধানীটি দুই খণ্ডে বিভক্ত এবং হলুদাভ সাদা রঙের হয়, যার শীর্ষভাগ বিদারী বা উন্মুক্ত প্রকৃতির।

ফল, বীজ ও জিনগত তথ্য

ফুল ফোটার পর ওল কচু গাছে ডিম্বাকৃতির ফল বা বেরি (Berry) ধরে।

বীজ ও ক্রোমোসোম: প্রতিটি ফলের ভেতরে ২ থেকে ৩টি করে বীজ থাকে। জিনগত বা সাইটোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো 2n = ২৮।

ফলের রূপ: পাকা অবস্থায় এই ফলগুলো চমৎকার কমলা থেকে টকটকে লাল রঙ ধারণ করে।

চাষাবাদ:

প্রাকৃতিক পরিবেশে ওল কচু সাধারণত বনাঞ্চল বা বাগানের বড় বড় গাছের নিচে আংশিক বা পূর্ণ ছায়াযুক্ত এবং আর্দ্র বা স্যাঁতসেঁতে স্থানে খুব ভালো জন্মায়। তবে শুধু বন্য পরিবেশেই নয়, বর্তমানে লাভজনক হওয়ায় ব্যাপকভাবে এবং বাণিজ্যিকভাবে ওল কচুর চাষ করা হচ্ছে। কম পরিশ্রমে এবং ছায়াযুক্ত স্থানেও ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মাঝে এর বাণিজ্যিক চাষ বেশ জনপ্রিয়।

সহজ বংশবিস্তার ও প্রজনন পদ্ধতি

ওল কচুর বংশবৃদ্ধি বা নতুন চারা তৈরি করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও স্বল্পব্যয়ী। মূলত মাটির নিচে থাকা মূল কন্দের পাশে গজিয়ে ওঠা ছোট ছোট অপত্য গুঁড়িকন্দ বা সাইড টিউবারের (Side Tubers) মাধ্যমে খুব সহজেই এর প্রজনন ও বংশ বিস্তার করা সম্ভব। এই কন্দগুলো সংগ্রহ করে মাটিতে রোপণ করলেই দ্রুত নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

ফুল ও ফল ধারণের সময়কাল

এই উদ্ভিদের জীবনচক্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক ফুল-ফল উৎপাদন প্রক্রিয়া। ওল কচু গাছে সাধারণত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে। বিশেষ করে মে মাস থেকে শুরু করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত এই উদ্ভিদে ফুল ফোটা এবং ফল পরিপক্ব হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।

বিস্তৃতি:

ভৌগোলিক সীমানার দিক থেকে বিচার করলে, এই উদ্ভিদটি এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে প্রাকৃতিকভাবেই দারুণভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।

  • আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি: এটি মূলত শ্রীলঙ্কা, ভারত, মায়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর্দ্র ও ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় ও টিকে থাকে।
  • বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: আমাদের সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। দেশের নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধ অঞ্চলে নয়, বরং এটি পুরো বাংলাদেশে অত্যন্ত সহজলভ্য এবং দেশের প্রায় সব এলাকাতেই একে স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে উঠতে দেখা যায়।

ওল কচু-এর অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:

বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উপাদান হলো ওল কচু। পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু এই উপাদানটি সবজি হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে অত্যন্ত সমাদৃত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ওল কচুর জাদুকরী ঔষধি গুণাগুণ ও ভেষজ উপকারিতা

কেবল রসনা তৃপ্ত করতেই নয়, বরং মানবদেহের নানাবিধ রোগ প্রতিকারে ওল কচুর ভেষজ বৈশিষ্ট্য ও ঔষধি গুণাগুণ অনন্য। গাছের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা রোগ নিরাময়ে ভেষজ ঔষধ হিসেবে কাজ করে:

  • মূল কন্দের বা গুঁড়িকন্দের উপকারিতা:
    পেটের নানা রকম পীড়া বা গোলযোগ, চামড়ার নিচে হওয়া ক্ষতিকর ফোঁড়া, হাঁপানি বা অ্যাজমা, বমনোদ্রেককর অবস্থা (বমি বমি ভাব), গোদ রোগ (Elephantiasis), তীব্র বাত, রক্তের বিভিন্ন ব্যাধি এবং প্লীহার স্ফীতি (Enlarged Spleen) ও অর্শ (Piles) রোগ নিরাময়ে ওল কচুর মাটির নিচের কন্দ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
  • গাছের উপরিভাগের ভেষজ ব্যবহার:
    ওল কচুর কন্দ ছাড়াও এর মাটির ওপরের ডাঁটা ও পাতার অংশও ঔষধি গুণসম্পন্ন। এটি তীব্র কানের ব্যথা উপশমে, গলার ফোলা ভাব কমাতে, ত্বকের ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ দূর করতে এবং কলেরা ও উদরাময়ের (ডায়রিয়া) মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রাচীনকাল থেকেই ঘরোয়া প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ঐতিহ্যগত লোকজ ও জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহার

আমাদের বাংলাদেশের গ্রামীণ চিকিৎসা ও লোকজ ঐতিহ্যে ওল কচুর ব্যবহার বেশ বৈচিত্র্যময়:

  • বাতের চিকিৎসায়: তীব্র বাতের ব্যথা নিরাময়ের জন্য গ্রাম-বাংলায় ওল কচু সুন্দরভাবে ভেজে খাওয়ার এক চমৎকার ঐতিহ্যবাহী প্রচলন রয়েছে।
  • কীটপতঙ্গের কামড়ে: বিষাক্ত কোনো পোকামাকড় বা বিছা কামড়ালে তীব্র জ্বালাপোড়া ও বিষ দূর করার জন্য আক্রান্ত স্থানে ওল কচুর তাজা রস সরাসরি প্রয়োগ করা হয়।

ওল কচু-এর অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১১ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) ওল কচু প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে ওল কচু সংরক্ষণের জন্য কিছু গাছ বাংলাদেশ জাতীয় হার্বেরিয়াম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে লাগানো আছে। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। 

তথ্যসূত্র:

১. হোসনে আরা (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৯-৪০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Shijan Kaakkara

Leave a Comment

error: Content is protected !!