ক্ষেতরাঙ্গা উদ্ভিদের পরিচিতি, বিস্তৃতি ও ভেষজ গুণাগুণ

ক্ষেতরাঙ্গা

বৈজ্ঞানিক নাম: Alpinia conchigera Griff, in Notul, Pl. As. 3: 424, t. 354 (1851). সমনাম: Alpinia laosensis Gsgnep. (1906), Languas conchigera Burk. (1930). ইংরেজী নাম: Lesser alpinia. স্থানীয় নাম: ক্ষেতরাঙ্গা।
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae, বিভাগ: Tracheophytes. অবিন্যাসিত: Angiosperms. অবিন্যাসিত: Monocots. বর্গ: Zingiberales. পরিবার: Zingiberaceae. গণ: Alpinia, প্রজাতি: Alpinia conchigera.

ভূমিকা: ক্ষেতরাঙ্গা (বৈজ্ঞানিক নাম: Alpinia conchigera) হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ বিরুৎ। এটি বাগান বা টবে লাগানো যায়। তবে বনাঞ্চলের পরিবেশ এদের জন্য উপযুক্ত।

ক্ষেতরাঙ্গা-এর বর্ণনা:

এটি একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ বা বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ যা মাটির নিচের সরু রাইজোমের মাধ্যমে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে এবং সাধারণত ১.০ থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এই উদ্ভিদের পাতাগুলো বোঁটাসহ বেশ বড় আকৃতির হয়, যার বোঁটা ০.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার এবং মূল পাতাটি আয়ত-ডিম্বাকার হয়ে ১৫-৩৪ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৩.৫-৯.৫ সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে থাকে। পাতার উপরিভাগ স্থূল-সূক্ষ্ম আকৃতির, নিচের অংশ গোলাকার এবং পাতার নিচের পিঠের মধ্যশিরার উভয় পাশে নরম রোম থাকলেও বাকি অংশ পুরোপুরি মসৃণ ও কিনারাগুলো সূক্ষ্ম রোমযুক্ত বা সিলিয়াযুক্ত হয়। গাছটির পুষ্পবিন্যাস বা ফুলের ছড়াটি ১২-২৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং এর অক্ষটি রোমশ হয়, যার নিচের ডালগুলো ছড়ানো এবং ওপরের ডালগুলো খাটো ও ঊর্ধ্বমুখী থাকে এবং এর সর্বনিম্ন শাখার নিচে একটি ৮-১৩ সেন্টিমিটার লম্বা শুষ্ক ও রেখাকার আবরণ বা ইনভোলিউকার যুক্ত থাকে। এর ছোট, ডিম্বাকার ও শুষ্ক মঞ্জরীপত্রের পাশাপাশি পুষ্পগুচ্ছের বোঁটা ২-৩ মিলিমিটার লম্বা ও রোমশ হয় এবং এর উপ-মঞ্জরীপত্রটি প্রশস্ত, ফানেল আকৃতির ও তীর্যকভাবে কাটা থাকে। ফুলটির বৃতি কাপের মতো, মসৃণ, ৩-৪ মিলিমিটার লম্বা, ত্রিখণ্ডিত ও ফিকে সবুজ রঙের হয় এবং এর ভেতরের দলনলটি বৃতির সমান ও বাইরের দিকে রোমশ প্রকৃতির হয়ে থাকে। সাদা বা সবুজে-হলুদ রঙের এই ফুলে ৩টি অবতল পাপড়ি থাকে, যার মধ্যে পৃষ্ঠদেশের পাপড়িটি আকারে কিছুটা বড় এবং পার্শ্ববর্তী দুটি সামান্য ছোট হয়। ফুলের ভেতরের উপ-বৃত্তাকার ও অবতল লেবেলাম অংশটির প্রান্ত অসম ও খাঁজকাটা থাকে এবং এর উভয় পাশে ৪টি করে চমৎকার লাল দাগ এবং গোড়ার দিকে দুটি বড় গাঢ় বেগুনি গ্রন্থির মতো বস্তু দেখা যায়। লেবেলামের গোড়ার দুই পাশে দাঁতের মতো দুটি স্টেমিনোড থাকে এবং এর পরাগদণ্ডটি কৃশ বা চিকন, বাঁকানো ও নিচের অর্ধেক বেগুনি-গোলাপী রঙের হয়ে থাকে, যেখানে গর্ভাশয়টি ২-৩ মিলিমিটার লম্বা, মসৃণ ও চকচকে সবুজ রঙের হয়। ফুল শেষে গাছটিতে প্রায় ৮ মিলিমিটার ব্যাসের গোলাকার ও মসৃণ ফল ধরে যা পাকা অবস্থায় চমৎকার লাল রঙ ধারণ করে এবং প্রতিটি ফলের ভেতরে ৩ থেকে ৫টি অপেক্ষাকৃত বড় ও কোণাকার বীজ থাকে যা অত্যন্ত তীব্র ও সুমিষ্ট সুগন্ধযুক্ত হয়।

আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:

প্রাকৃতিক পরিবেশে এই উদ্ভিদটি সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশের ঢাল এবং কিনারার আংশিক ছায়াযুক্ত আর্দ্র স্থানে চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে এই গাছে ফুল ফোটা এবং ফল ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। মাটির নিচের রাইজোম বা কন্দ কিংবা ফলের ভেতরে থাকা তীব্র সুগন্ধী বীজ ব্যবহার করে খুব সহজেই এবং অত্যন্ত কার্যকর উপায়ে এই গাছের বংশ বিস্তার করা সম্ভব।

বিস্তৃতি:

ভৌগোলিক বিস্তৃতির দিক থেকে এই উদ্ভিদটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিকভাবেই ছড়িয়ে রয়েছে, যার মধ্যে কম্বোডিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ড অন্যতম। আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভিদের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, যেখানে প্রধানত চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন ও দুর্গম পাহাড়ী বনাঞ্চলে এটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় ও টিকে থাকে। পাহাড়ের আর্দ্র জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ এই উদ্ভিদের বিস্তৃতির জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

গুণাগুণ:

বাতের চিকিৎসায়: চিকিৎসার দিক থেকে এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে, এর মাটির নিচের রাইজোম বা কন্দের নির্যাস বাতের ব্যথা এবং এই জাতীয় শারীরিক জটিলতার চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।

স্ত্রী রোগের চিকিৎসায়: বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের মাঝে এই উদ্ভিদের সনাতন বা জাতিতাত্ত্বিক ব্যবহারের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার মারমা আদিবাসীরা এই উদ্ভিদের মাটির নিচের রাইজোম বা কন্দ বেটে তৈরি করা মণ্ড বিভিন্ন জটিল স্ত্রী রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করে থাকে।

সক্ষমতা বাড়ানো: মারমা সম্প্রদায়ের মানুষেরা শরীরকে ভেতর থেকে শক্তিশালী রাখতেও এই ভেষজ উপাদানটি ব্যবহার করে। তারা এই উদ্ভিদের রাইজোমের মণ্ডকে প্রাকৃতিকভাবে যৌন উত্তেজক বা শক্তি বর্ধক ঔষধ হিসেবে অত্যন্ত কার্যকরী মনে করে।

গ্যাস্ট্রিক রোগে: শুধু মারমা আদিবাসীরাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মাঝেও এর ব্যবহার দেখা যায়। তারা পেটের নানা সমস্যা, বিশেষ করে তীব্র গ্যাস্ট্রিক রোগের উপশম ও প্রতিকারের জন্য অত্যন্ত ভরসাযোগ্য উপাদান হিসেবে এই উদ্ভিদের অংশ ব্যবহার করে থাকে।

অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের  ১২ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) ক্ষেতরাঙ্গা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে ক্ষেতরাঙ্গা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। 

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্র:

১. মোহাম্মদ ইউসুফ (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৪৬-৪৪৭। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি flickr থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Ahmad Fuad Morad

Leave a Comment

error: Content is protected !!