ভূমিকা: রান্নায় সুগন্ধ ছড়ানো এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে আমরা সবাই ছোট এলাচ ব্যবহার করি। কিন্তু আপনি কি জানেন এই দেশী ছোট এলাচ গাছ দেখতে কেমন এবং এর বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী? আমাদের পরিচিত এই মসলার গাছের রয়েছে অত্যন্ত নিখুঁত ও জটিল একটি শারীরিক গঠন ও ঔষধি গুণাগুণ। আজ আমরা দেশী ছোট এলাচ গাছের পাতা, ফুল এবং এর ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের বৈজ্ঞানিক গঠন সম্পর্কে সহজ ভাষায় বিস্তারিত জানবো।
| শ্রেণীবিন্যাসের ধাপ (Taxon) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) | বাংলা বিবরণ (Description) |
|---|---|---|
| জগৎ / রাজ্য (Kingdom) | Plantae | উদ্ভিদ জগত |
| বিভাগ (Division) | Tracheophytes | ভাস্কুলার বা সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ |
| অবিন্যাসিত (Clade) | Angiosperms | সপুষ্পক বা গুপ্তজীবী উদ্ভিদ |
| অবিন্যাসিত (Clade) | Monocots | একবীজপত্রী উদ্ভিদ শ্রেণী |
| বর্গ (Order) | Zingiberales | জিংজিবেরালিস বর্গ |
| পরিবার (Family) | Zingiberaceae | আদা ও এলাচ পরিবার |
| গণ (Genus) | Alpinia | অ্যালপিনিয়া গণ |
| প্রজাতি (Species) | A. calcarata | অ্যালপিনিয়া ক্যালকারাটা প্রজাতি |
দেশী ছোট এলাচ-এর বর্ণনা:
দেশী ছোট এলাচ মূলত একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ বা বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। এর শিকড় বা রাইজোম (Rhizomatous) মাটির নিচে চমৎকারভাবে ছড়িয়ে থাকে এবং গাছটি সাধারণত বেশ সরু আকৃতির হয়। এই সুগন্ধি গাছগুলো খুব বেশি প্রকাণ্ড হয় না; লম্বায় এগুলো সাধারণত ১.০ থেকে ১.৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
পাতা ও ডালের বৈশিষ্ট্য
গাছটির পাতাগুলোর গঠন বেশ চমৎকার এবং এগুলো প্রায় বোঁটা বা বৃন্ত ছাড়াই (অবৃত্তঙ্ক) সরাসরি ডালের সাথে যুক্ত থাকে। তবে কোনো কোনো পাতার গোড়ায় সর্বোচ্চ ৬ মিলিমিটার পর্যন্ত ছোট বোঁটা দেখা যায়।
- পাতার আকার: এর পাতাগুলো দেখতে রেখ-ল্যান্সাকার (Linear-lanceolate) বা বর্শার ফলার মতো। লম্বায় এগুলো প্রায় ৩৭ থেকে ৪৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
- গঠন: পাতার উপরিভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ ও চকচকে হলেও এর কিনারে বা প্রান্তে অতি ক্ষুদ্র লোম থাকে। পাতার শেষ প্রান্ত বা অগ্রভাগ বেশ সুতীক্ষ্ণ। এছাড়া পাতার গোড়ার দিকে প্রায় ২ সেন্টিমিটার লম্বা একটি পাতলা ঝিল্লির মতো রোমশ অংশ (লিগিউল) দেখা যায়।
পুষ্পবিন্যাস এবং কুঁড়ির সুরক্ষা
দেশী এলাচ গাছের মঞ্জরীঅক্ষ বা মূল কাণ্ডটি ছোট ছোট নরম লোমে ঢাকা থাকে। এর পুষ্পবিন্যাসটি তৈরি হয় গাছের ঠিক অগ্রভাগে, যা আকারে কিছুটা ছোট অর্থাৎ প্রায় ১৩.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফুলগুলো যখন একদম কচি বা কুঁড়ি অবস্থায় থাকে, তখন দুটি নৌকার মতো দেখতে বিশেষ আবরণী (ইনভোলিউকার) এদের নিরাপদে ঢেকে রাখে।
এলাচ ফুলের মোহনীয় রূপ
এই গাছের ফুলগুলো সবসময় জোড়ায় জোড়ায় ফুটে থাকে এবং এদের বোঁটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়। প্রতিটি ফুলের গোড়াতেই ১.১ সেন্টিমিটার লম্বা একটি রোমশ ও নৌকাকৃতির সাদাটে উপ-মঞ্জরীপত্র থাকে।
- বৃতি ও পাপড়ি: ফুলের ঘণ্টার মতো আকৃতির বৃতিটি প্রায় ৯ মিলিমিটার লম্বা হয়, যা তিন ভাগে বিভক্ত। এর দলনলটিও বেশ রোমশ। ফুলে মোট ৩টি লম্বাটে পাপড়ি থাকে। মাঝের পাপড়িটি প্রায় ৫-৮ মিলিমিটার চওড়া হলেও দুপাশের পাপড়ি দুটি বেশ সরু হয়।
- আকর্ষণীয় ‘লেবেলাম’: এলাচ ফুলের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন অংশ হলো এর ডিম্বাকৃতির অবতল ‘লেবেলাম’, যার সাইজ প্রায় ৩ X ২ সেন্টিমিটার। এর রঙের জাদু সত্যিই চমৎকার:
- এর নিচের প্রায় ৭৫% অংশ জুড়ে থাকে ধবধবে সাদা রঙ।
- ঠিক মাঝখানটাতে গোলাপি-বেগুনী রঙের চমৎকার ছোপ ছোপ দাগ ও ফোঁটা দেখা যায়।
- এর চারপাশের বর্ডারে থাকে লাল ও হলুদের এক অপূর্ব রঙের মেলা।
- ওপরের বাকি ২৫% অংশে হালকা গোলাপির ওপর লালচে রঙের সূক্ষ্ম রেখা আঁকা থাকে।
অভ্যন্তরীণ ও জিনগত তথ্য
ফুলের লেবেলামের গোড়া থেকে স্ক্রু বা তুরপুনের মতো একজোড়া বিশেষ অঙ্গ বের হয়, যাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় স্টেমিনোড বলা হয়। এর বেগুনী গোড়াযুক্ত পরাগদণ্ডটি ১.৬ সেন্টিমিটার এবং পরাগধানীটি ৯ মিলিমিটার লম্বা হয়। ফুলটির গর্ভাশয়টি সিল্ক বা রেশমের মতো অত্যন্ত কোমল লোমে (সেরিসিয়াস) আবৃত থাকে। জিনগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে, দেশী ছোট এলাচ উদ্ভিদের ডিপ্লয়েড ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো 2n = ৪৮।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
দেশী ছোট এলাচ কেবল একটি দামী মসলাই নয়, বরং এর ওষুধি গুণ এবং সুগন্ধের কারণে এটি আমাদের দেশের গৃহস্থালিতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের পাশাপাশি অনেকেই শখের বশে বাড়ির আঙিনায় এই গাছের চাষ করে থাকেন। নিচে দেশী ছোট এলাচ গাছের উপযুক্ত আবাসস্থল, ফুল ফোটার সঠিক সময় এবং এর বংশ বৃদ্ধির সহজ উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
উপযুক্ত আবাসস্থল ও পরিবেশ: দেশী ছোট এলাচ গাছ বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরণের পরিবেশের প্রয়োজন হয়। এটি মূলত আর্দ্র এবং ঠান্ডা পরিবেশ পছন্দ করে:
- ছায়াযুক্ত স্থান: এই গাছ সরাসরি তীব্র রোদ বা অতিরিক্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। এই কারণে গ্রামীণ বা শহুরে অঞ্চলের বাড়ির আশেপাশে, যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকে অথচ সরাসরি কড়া রোদ পড়ে না, এমন ছায়াযুক্ত বা আধা-ছায়াযুক্ত স্থান এই গাছ লাগানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
- মাটির আর্দ্রতা: গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে, আবার মাটি যেন একেবারে শুকিয়েও না যায়—এমন সুনিষ্কাশিত এবং জৈব উপাদান সমৃদ্ধ দোআঁশ মাটিতে এই গাছ সবচেয়ে ভালো বেড়ে ওঠে। বড় বড় গাছের নিচে বা বাগানের এক কোণে যেখানে হালকা ছায়া থাকে, সেখানে দেশী ছোট এলাচ চমৎকারভাবে টিকে থাকে।
ফুল ধারণ ও ফলনের সময়কাল: ছোট এলাচ গাছের ফুল ফোটার একটি নির্দিষ্ট মৌসুম থাকলেও সঠিক যত্ন নিলে এটি প্রায় সারা বছরই ফলন দিতে পারে:
- প্রধান মরশুম: সাধারণত চৈত্র থেকে আষাঢ় মাস, অর্থাৎ ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে এই গাছে প্রচুর পরিমাণে ফুল আসতে শুরু করে। এই সময়েই মূলত এলাচের প্রধান ফলন বা ফুল ধারণের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়।
- ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য: আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং গাছের নিয়মিত সঠিক পরিচর্যা করা হলে এই গাছে কোনো নির্দিষ্ট ঋতু ছাড়াই কখনো কখনো সারা বছরই কম-বেশি ফুল ফুটতে এবং ফল ধরতে দেখা যায়। এটি এই গাছের একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং ইতিবাচক দিক।
বংশ বিস্তার ও চারা তৈরি পদ্ধতি: দেশী ছোট এলাচ গাছের বংশ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত সহজ এবং সাশ্রয়ী। এর জন্য জটিল কোনো গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতির প্রয়োজন হয় না:
- রাইজোম বা কন্দ দ্বারা বংশ বিস্তার: এই উদ্ভিদের প্রধান বংশ বিস্তার পদ্ধতি হলো এর মাটির নিচের রূপান্তরিত কাণ্ড বা রাইজোম (Rhizome)। মাটির নিচে থাকা এই কন্দ বা রাইজোমগুলো যখন পূর্ণতা পায়, তখন মূল গাছ থেকে সেগুলোকে সাবধানে আলাদা করে নেওয়া হয়।
- সহজ রোপণ প্রক্রিয়া: আলাদা করা এই রাইজোম বা কন্দগুলো সরাসরি নতুন মাটিতে রোপণ করলেই খুব সহজেই তা থেকে নতুন চারা গজিয়ে ওঠে। এই পদ্ধতিতে চারার মৃত্যুর হার অত্যন্ত কম থাকে এবং খুব দ্রুত নতুন গাছটি বংশ বৃদ্ধি করে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে নতুন বাগানি বা কৃষকরা কোনো বাড়তি ঝামেলা ছাড়াই খুব সহজে এর চারা তৈরি করতে পারেন।
বিস্তৃতি:
দেশী ছোট এলাচ তার চমৎকার সুগন্ধ এবং ওষুধি গুণের কারণে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত সমাদৃত। ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে এই মসলা জাতীয় উদ্ভিদটি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাব বেড়ে ওঠে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। নিচে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি এবং বাংলাদেশে এর চাষাবাদের বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
বৈশ্বিক বিস্তৃতি ও আদি বাসস্থান: জলবায়ুর দিক থেকে দেশী ছোট এলাচ মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় (Tropical) অঞ্চলের উদ্ভিদ। এশিয়ার বেশ কয়েকটি প্রধান দেশে এর ব্যাপক উপস্থিতি এবং বিস্তৃতি রয়েছে:
- দক্ষিণ এশিয়া: এই অঞ্চলের প্রধান দেশ যেমন ভারত এবং শ্রীলংকা-তে প্রাচীনকাল থেকেই ছোট এলাচের ব্যাপক চাষাবাদ হয়ে আসছে। এখানকার পাহাড়ি এবং আর্দ্র জলবায়ু এলাচ চাষের জন্য একদম নিখুঁত। এছাড়া হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত দেশ ভুটান-এর কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলেও এটি পাওয়া যায়।
- পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: দূরপ্রাচ্যের দেশ চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত দেশ মালয়েশিয়া-র বনাঞ্চল ও পাহাড়ি ছায়াযুক্ত এলাকাগুলোতে এই উদ্ভিদটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মে এবং অত্যন্ত যত্ন সহকারে চাষ করা হয়।
বাংলাদেশে দেশী ছোট এলাচের চাষাবাদ পরিস্থিতি: বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এখানকার মাটি ও জলবায়ু বিভিন্ন ধরণের মসলা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সেই ধারাবাহিকতায় দেশী ছোট এলাচ নিয়েও এদেশের কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে:
- স্থানীয় পরিচিতি: বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এবং মসলার বাজারে এই উদ্ভিদটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। এটি মূলত ‘এলাচি’ নামেই সর্বত্র ডাকা ও চেনা হয়।
- বৈজ্ঞানিক নাম ও চাষ পদ্ধতি: উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে এর বৈশ্বিক পরিচয় হলো Elettaria cardamomum। বাংলাদেশের অনেক জেলাতেই এখন পারিবারিক বাগানে কিংবা বাণিজ্যিকভাবে এই এলাচ চাষের সফল চেষ্টা করা হচ্ছে।
- আবহাওয়ার উপযোগিতা: বাংলাদেশের যেসব এলাকায় ছায়াযুক্ত স্থান ও আর্দ্র মাটি রয়েছে, সেসব অঞ্চলের কৃষকরা বাড়ির আঙিনায় বা বাগানের বড় গাছের নিচে এই মূল্যবান মসলাটি চাষ করছেন। দেশীয় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এই চাষাবাদ দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও অন্যান্য:
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ছোট এলাচ গাছের কচি কাণ্ড (Young Shoots) বেশ জনপ্রিয়। সেখানে এই নরম কাণ্ডগুলো সবজি হিসেবে অত্যন্ত সুস্বাদু উপায়ে রান্না করে খাওয়া হয়। এটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনই এর একটি নিজস্ব সুগন্ধ রয়েছে যা খাবারের স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রাইজোম বা কন্দের জাদুকরী ঔষধি গুণ: মাটির নিচে থাকা এলাচ গাছের রূপান্তরিত কাণ্ড বা রাইজোম (Rhizome) স্বাস্থ্যের জন্য একটি মহাঔষধ। এর প্রধান উপকারিতাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- শারীরিক শক্তি ও টনিক: ছোট এলাচের রাইজোম শরীরে প্রাকৃতিক টনিক হিসেবে কাজ করে, যা ক্লান্তি দূর করে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
- হজম ও পাকস্থলীর কার্যকারিতা: এটি পাকস্থলীকে শক্তিশালী করে এবং পরিপাক প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।
- যৌনশক্তি ও মূত্র বর্ধক: এটি শরীরের স্বাভাবিক যৌনশক্তি বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি এটি একটি প্রাকৃতিক মূত্র বর্ধক (Diuretic) হিসেবে কাজ করে, যা কিডনি ও মূত্রথলি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
- কফ ও বায়ু নির্গমক: বুকে জমে থাকা পুরনো কফ সহজে বের করে দিতে এবং পেটের ভেতরের গ্যাস বা বায়ু দূর করতে (Carminative) এটি দারুণ ভূমিকা রাখে।
- শারীরিক উত্তেজনা ও উদ্দীপনা: এটি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে শরীরে এক ধরণের সতেজ অনুভূতি বা উত্তেজনা তৈরি করে।
বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে রাইজোমের ব্যবহার: নিয়মিত সঠিক নিয়মে ছোট এলাচের রাইজোম ব্যবহার করলে বেশ কিছু জটিল শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়:
- বাত ও মাথা ব্যথা: বাতের তীব্র ব্যথা, জয়েন্টের কষ্ট এবং যেকোনো ধরণের মাথা ব্যথা উপশমে এটি দারুণ কাজ করে।
- জ্বর ও সর্দি-কাশি: ঋতু পরিবর্তনের কারণে হওয়া জ্বর, সর্দি এবং ঠাণ্ডা লাগার চিকিৎসায় এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
- বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস রোগীদের সুস্থতায় এটি সাহায্য করে।
- তলপেটের যন্ত্রণা: নারীদের মাসিক বা অন্যান্য কারণে তলপেটে তীব্র ব্যথা হলে এর নির্যাস দ্রুত আরাম দেয়।
এলাচ বীজের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা: এলাচ ফলের ভেতরে থাকা ছোট ছোট কালো বীজগুলো পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। এটি আমাদের শরীরের জন্য যেভাবে কাজ করে:
- পাকস্থলীর শক্তি বৃদ্ধি: রাইজোমের মতো এর বীজও পাকস্থলীকে ভেতর থেকে মজবুত করে, ফলে বদহজমের সমস্যা দূর হয়।
- পেট ব্যথা ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ: পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া বা হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিলে এলাচের বীজ চিবিয়ে খেলে বা এর পানি পান করলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়।
- বমি বমি ভাব দূর: অনেকেরই গাড়িতে উঠলে বা সকালে ঘুম থেকে উঠলে বমি বমি ভাব হয়। এলাচের বীজ মুখে রাখলে এই বমি ভাব এবং মুখের দুর্গন্ধ নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
- মেটাবলিজম বা পরিবর্তক: এটি শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে এবং শরীর থেকে টক্সিন বের করতে সাহায্য করে।
অন্যান্য তথ্য: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ১২ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) দেশী ছোট এলাচি প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে দেশী ছোট এলাচি সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
আরো পড়ুন:
- দেশী ছোট এলাচ চাষ পদ্ধতি এবং এর চমৎকার স্বাস্থ্য উপকারিতা
- বড় এলাচ-এর ভেষজ গুণাগুণের বিবরণ
- সটি বা ফইল্লা দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বিরুৎ
- হলুদ বাংলাদেশে জন্মানো জনপ্রিয় ও ভেষজ গুণসম্পন্ন মসলা
- পানমৌরি এশিয়া জন্মানো জনপ্রিয় ভেষজ গুণসম্পন্ন মশলা
- গোলমরিচ এর ৩০টি কার্যকরী ভেষজ গুণাগুণ
- পিপুল ফলে আছে শরীরের সাধারণ রোগ সারানোর ভেষজ গুণ
- জাফরান সপুষ্পক উদ্ভিদে আছে নানা ভেষজ গুণ
- জয়ত্রী, জয়িত্রি বা জৈত্রীর খাওয়ার নানা ভেষজ গুণাগুণ
- আয়ুর্বেদ ও আধুনিক চিকিৎসায় জয়ত্রি ও জায়ফলের ভেষজ উপকারিতা
- দারুচিনি বা দারচিনি খাওয়ার নানা ভেষজ উপকারিতা
- এলাচ বা ছোট এলাচে আছে খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিসহ নানা ভেষজ গুণ
- লবঙ্গ খাওয়ার ১৫টি উপকারিতা বা ভেষজ গুণ
- তেজপাতা রান্নাসহ রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়
- রাই দানার নানাবিধ উপকারিতা ও ভেষজ গুণাগুণ
- শুঁঠ বা শুকনা আদায় আছে নানাবিধ উপকারিতা
- মেথি খাওয়ার উপকারিতা ও ১০টি ভেষজ প্রয়োগ
- জোয়ান বা যোয়ানের ২০টি ব্যবহার বা ভেষজ গুণাগুণ
- মৌরি দানার ১০টি ভেষজ গুণ ও অন্যান্য ব্যবহার
- হিং খাওয়ার উপকারিতা ও রোগ সারাতে ১১টি ভেষজ প্রয়োগ
- শাহজিরা বা শাজিরা বা শাহিজিরা ১০টি ভেষজ গুণ
- কালোজিরা প্রয়োগের ১০টি রোগের ভেষজ চিকিৎসা
- জিরা খাওয়ার উপকারিতা ও ১২টি রোগের ভেষজ চিকিৎসা
- কাঁচা মরিচ বা কাঁচা লঙ্কার খাওয়ার গুণাগুণ ও অপকারিতা
- দেশি পিপুল বা পিপলা দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভেষজ বীরুত
- হলুদের ২২টি ভেষজ গুণাগুণ, উপকারিতা ও ব্যবহার পদ্ধতি
- আদা হচ্ছে জিঞ্জিবার গণের ছোট কন্দজ ঔষধি বীরুৎ
- আদার বহুবিধ উপকারিতা, গুণাগুণ ও ব্যবহার
- ধনে বা ধনিয়া এশিয়ার একটি সুগন্ধি ঔষধি উদ্ভিদ
- ধনিয়া বা ধনে পাতার দশটি কার্যকরী ঔষধি ব্যবহার
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. মোহাম্মদ ইউসুফ (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ৪৪৫-৪৪৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ৭ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ১১ জুন ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Forest and Kim Starr
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।