আয়ুর্বেদ ও আধুনিক চিকিৎসায় জয়ত্রি ও জায়ফলের ভেষজ উপকারিতা

জৈত্রী বা জয়ত্রি (বৈজ্ঞানিক নাম: Myristica fragrans) মূলত জায়ফল ফলের ওপরের পাতলা লালচে আবরণ, যা রান্নার স্বাদ ও বিবিধ বিলাসবহুল খাবারে শাহী সুগন্ধ বৃদ্ধিতে এক অনন্য উপাদান; এটি রূপচর্চায় ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এবং কপালে ঘষলে আধকপালে মাথাব্যথা বা মৃগী রোগের উপশমেও বেশ কার্যকর। Myristicaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই সুগন্ধি উদ্ভিদটি প্রধানত পূর্ব এশিয়া, মালয় ও আমেরিকার উষ্ণপ্রধান অঞ্চলে জন্মে এবং বিশ্বজুড়ে এই গণের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫টি প্রজাতি পাওয়া যায়। সংস্কৃততে ‘জাতিফল’ নামে পরিচিত। তার মধ্যে ৩০টি প্রজাতির সন্ধান মেলে ভারত, মালয়, আমেরিকা প্রভৃতি অঞ্চলে। এই মশলাটি বর্তমানে মালয়, শ্রীলঙ্কা, জাভা ও সুমাত্রা ছাড়াও ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালায় ব্যবসায়িক ভিত্তিতে চাষ করা হচ্ছে।

জয়ত্রি গাছের বিবরণ:

জৈত্রী বা জয়ত্রী (বৈজ্ঞানিক নাম: Myristica fragrans) মূলত Myristicaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত জায়ফল গাছের ফলের ওপরের পাতলা, তৈলাক্ত ও লালচে জালের মতো আবরণ, যা রান্নার সুগন্ধ বৃদ্ধিতে এবং রূপচর্চায় ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে এক অনন্য শাহী উপাদান। এই চিরসবুজ বৃক্ষটি সাধারণত ৩০-৪০ ফুট উঁচু হয়, যার পাতা অনেকটা কাঁঠাল পাতার মতো পুরু; যা লম্বা ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি ও চওড়া দেড়-দুই ইঞ্চির মতো; এবং ফলগুলো দেখতে ছোট নাসপাতির মতো হরিদ্রাভ বর্ণের। ফল ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা যায়, গায়ে ডোরা ডোরা দাগ।

বর্ষার আগে ফুল ও পরে ফল হয়। স্ত্রী-পুরুষ ভেদে দুই প্রকারের গাছ জন্মালেও স্ত্রীগাছ সংখ্যায় বেশী হয়ে থাকে। ফল পাকলে আপনা আপনি ফেটে যায়, ফলের মধ্যস্থিত বীজের চারিদিকে বিভিন্ন আকারের পাতলা লালচে হ’লদে দেখতে জালের মতো বহিরাবরণ থাকে— সেটা তৈলাক্ত ও ক্ষণভঙ্গর; সেইটাকেই আমরা জৈত্রী বা জাতিপত্রী বলি আর যেটাকে বলি জায়ফল সেটার মধ্যে থাকে এর বীজের শাঁস আর এই বীজের বাইরেটা মসৃণ এবং শক্ত, গায়ে ডোরা দাগ।

ফুলের ভেতর থেকে সুগন্ধি জৈত্রী ও শক্ত বীজের শাঁস বা জায়ফল বেরিয়ে আসে, যা থেকে মূল্যবান ‘নাটমেগ অয়েল’ (Nutmeg oil) নিষ্কাশন করা হয়। আধকপালে মাথাব্যথা বা মৃগী রোগের উপশমে কার্যকর। এই ঔষধি মশলাটি মূলত মালয়, শ্রীলঙ্কা ও সুমাত্রা অঞ্চলে জন্মে; তবে বাজারে অনেক সময় ‘রামপত্রী’ নামক অপেক্ষাকৃত মোটা ও কম সুগন্ধি একটি প্রজাতি (Myristica malabarica) এর সাথে ভেজাল হিসেবে মেশানো হয়।

জায়ফল-এর গুণাগুণ:

জায়ফল অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত একটি প্রাকৃতিক উপাদান যা সাধারণত গরম মশলার অন্যতম প্রধান উপকরণ হিসেবে বিভিন্ন সুস্বাদু রান্নায় ও হরেক রকমের মিষ্টি তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে কেবল রান্নার স্বাদ ও সুবাস বাড়াতেই নয়, ঘরোয়া ওষধি বা ভেষজ চিকিৎসাতেও জায়ফলের বহুল ব্যবহার রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসক ও আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞদের মতে, জায়ফল অত্যন্ত চমৎকার একটি সুগন্ধি, পাচক (খাবার হজমে সাহায্যকারী), উষ্ণ গুণসম্পন্ন ও বায়ুনাশক উপাদান এবং এটি শরীরের বিভিন্ন রকমের খিঁচুনি বন্ধ করতে দারুণ কার্যকরী। সামান্য বা অল্প মাত্রায় জায়ফল সেবন করলে মুখের অরুচি দূর হয়ে দ্রুত খিদে পায় এবং গ্রহণ করা খাবার খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়। এর পাশাপাশি পেটফাঁপা, পেটের নানাবিধ গোলযোগ, পেটে তীব্র শূল বেদনা এবং প্রস্রাব কম হওয়া বা মূত্রকৃচ্ছ্রতার মতো বিভিন্ন শারীরিক অস্বস্তি ও অসুখ উপশম করতেও এটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

যেহেতু জায়ফল খাবার খুব দ্রুত হজম করায় এবং অতিসার বা পাতলা পায়খানা নিয়ন্ত্রণ করে মলরোধে সাহায্য করে, তাই সাধারণ পেটের অসুখ, রক্ত আমাশা যুক্ত মারাত্মক পেটের অসুখ (রক্তাতিসার), গা বমি বমি ভাব কিংবা সরাসরি বমি হওয়ার মতো সমস্যাগুলোতে জায়ফলের চূর্ণ বা গুঁড়ো পরিমাণ মতো রোগীকে খাওয়ালে খুব দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যায়। শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ সেবনেই নয়, শরীরের বাহ্যিক বিভিন্ন রোগ নিরাময়েও এর ব্যবহার অপরিসীম। তীব্র মাথা ব্যথা, বাতের তীব্র ব্যথা কিংবা হাত-পা অকস্মাৎ আঁকড়ে যাওয়া বা ক্র্যাম্প ধরার মতো কষ্টদায়ক অসুখে আক্রান্ত স্থানে জায়ফলের প্রলেপ লাগালে খুব দ্রুত আরাম ও উপকার পাওয়া যায়। এমনকি অনেক দিনের পুরোনো বাতের ব্যথা কিংবা পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিসের মতো জটিল রোগের ক্ষেত্রে খাঁটি সরিষার তেলের সঙ্গে ভালো করে জায়ফল ফুটিয়ে নিয়ে নিয়মিত মালিশ করলে অত্যন্ত আশাতীত সুফল পাওয়া যায়।

শাস্ত্র মতে:

আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, জায়ফল হলো তিক্ত ও কটুরসযুক্ত এবং এটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও শরীর উষ্ণকারী একটি মশলা। এটি রুচিকর, বলবর্ধক, কফ-বাত-পিত্ত অর্থাৎ ত্রিদোষনাশক এবং খিদে বাড়াতে (অগ্নিউদ্দীপক) দারুণ সাহায্য করে। খাওয়ার পরিমাপ ১ থেকে ২ গ্রাম হলে এটি মুখের অরুচি, মলের দুর্গন্ধ, কৃমি ও বমি ভাব দূর করে। শুধু তাই নয়, শ্বাসকষ্ট, সাইনাস, সর্দি ও হার্টের অসুখেও জায়ফল বিশেষ সুফল দেয়। এছাড়াও পেটফাঁপা, খিঁচুনি ও দাঁতের ব্যথায় এটি দারুণ আরামদায়ক।

প্রাচীন গ্রন্থ ‘ভাবপ্রকাশ’ মতে, মুখের মেচেতা বা কালচে দাগ দূর করতে জায়ফল ঘষে তার প্রলেপ দিলে দ্রুত উপকার পাওয়া যায়। আবার সেন-এর চিকিৎসাবিদ্যা অনুযায়ী, কুষ্ঠরোগের ক্ষত বা ঘা উপশমেও এটি ব্যবহার করা যায়। তবে হাকিমি বা ইউনানি মতে, যাদের শরীর উষ্ণ প্রকৃতির বা পিত্তের ধাত রয়েছে, তাদের ফুসফুস ও যকৃতের জন্য জায়ফল কিছুটা ক্ষতিকর হতে পারে এবং অতিরিক্ত সেবনে মাথা ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, যাদের শরীর শীতল প্রকৃতির, তারা জায়ফল খেলে ঠান্ডাজনিত রোগ থেকে মুক্তি পাবেন, তাদের রতিশক্তি বাড়বে এবং মন প্রফুল্ল হবে। পরিমিত মাত্রায় (১-২ গ্রাম) জায়ফল খেলে তা খাবার হজম করায় এবং পাকস্থলী ও প্লীহাকে সবল করে ফোলা ভাব কমিয়ে দেয়।[২]

সুস্থ থাকতে জায়ফলের ব্যবহার বা প্রয়োগ:

১. বাত ও ব্যথায়: গেঁটে বাতে জায়ফলের তেল মালিশ করলে উপকার পাওয়া যায়। জায়ফলের তেল সর্ষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে সন্ধি বা গাঁঠের পুরনো ব্যথায় বা ফোলায় মালিশ করলে সেই জায়গাটা গরম হয়ে যায়, অসাড় অঙ্গে সাড় আসে, ঘাম বেরোয়, সন্ধিবাতের জন্যে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া সন্ধিস্থল আবার সচল হয় এবং সন্ধিবাতের (গেঁটেবাত) উপশম হয়।

২. মূত্র সংক্রামণ: সঠিক পরিমাণে খেলে বহুমূত্র (ডায়াবেটিস) রোগ সারে। মূত্রকৃচ্ছ্রে রোগের উপসর্গ কি হয় সে সম্বন্ধে অনেকে জানা আছে। এক্ষেত্রে জায়ফল চূর্ণ ১০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় গোক্ষুর ভিজানো জলসহ খেলে কয়েকদিনের মধ্যে ওটার উপশম হবে। গোক্ষুরের জল প্রস্তুত করতে গেলে ৫ গ্রাম গোক্ষুর (বীজ) একটু থেতো করে নিয়ে রাত্রে ১ গ্লাস গরমজলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরের দিন সকালের দিকে তাকে ছেকে নিয়ে ওই জলটা নিতে হবে।

৩. চোখের রোগে:  চোখের চুলকুনিতে জায়ফলের প্রলেপ লাগালে উপকার হয়। জায়ফলের সুর্মা পরলে চোখের রোগে উপকার হয়।

৪. পেটের অসুখে:  জায়ফল শুকনো খোলায় ভেজে খেলে পায়খানা বন্ধ হয়। জায়ফল ও শুঠ (শুকনা আদা) গাওয়া ঘিয়ে ঘষে চাটালে বাচ্চাদের সর্দির জন্যে যদি পেটের অসুখ করে তা সারবে।  জায়ফলের চূর্ণ গুড়ে মিশিয়ে ছোট ছোট গুলি পাকিয়ে নিতে হবে । এই গুলি আধ ঘন্টা অন্তর খাওয়ালে এবং তার সঙ্গে একটু গরম জল খাওয়ালে কলেরার বা আন্ত্রিক রোগের পায়খানা (মল নিষ্কাশন) বন্ধ হয়।  জায়ফলের এক দু ফোঁটা তেল বাতাসার বা চিনির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে পেট ব্যথা ও গ্যাস সারে।

৫. কানের অসুখে:  তেলের সঙ্গে মিশিয়ে কানে দিলে কানের বধিরতা (কান কালা)। হওয়া সারে।

৬. বমি ও হেঁচকি বন্ধ করে: জায়ফল ভাতের ফ্যানে ঘষে খাওয়ালে হেঁচকি ও বমিভাব সেরে যায়। বিবমিষায় বা বমি এটা কিন্তু রসবহ স্রোতের বিকারে হয় এবং এটা আমাশয়জাত ব্যাধি, অতিসার হলেই যে বমি হবে তা নয়, আমদোষ হলে এই বিবমিষা এসে থাকে। এক্ষেত্রে জায়ফল জলে ঘষে ১০/১৫ ফোঁটা নিয়ে ৭/৮ চা-চামচ জল মিশিয়ে খেলে. ওই বমনেচ্ছাটা চলে যাবে।

৭. পাতলা পায়খানা বন্ধ:  জায়ফল, খারিক (কবিরাজি দোকানে পাওয়া যায়) আফিম সমপরিমাণ নিয়ে এবং পানের রসে বেটে ছোলার দানার আকারে গুলি তৈরি করতে হবে। এই হল আয়ুর্বেদের বিখ্যাত ‘জাতিফলাদি গুটিকা’। ঘোলের সঙ্গে এই গুলি খাওয়ালে সব রকমের দাস্ত (পায়খানা) বন্ধ হয়।

৮. অনিদ্রা দূর করে: একটা জায়ফলের এক চতুর্থাংশ গুঁড়া জলে মিশিয়ে খেলে ঘুম ভাল হয়। জায়ফল ঘষে তার প্রলেপ কপালে লাগালে ঘুম ভাল হয়।

৯. দাঁতের সমস্যায়: জায়ফলের তেলে ভেজানো তুলে দাঁতে রাখলে দাঁতের পোকা মরে যায় এবং দাঁতের ব্যথা কমে এবং পাইয়োরিয়া সেরে যায়।

১০. ব্রণ সারাতে: জায়ফলের তেল দিয়ে তৈরি করা মলম লাগালে ব্রণ ঘা ইত্যাদি তাড়াতাড়ি সেরে যায়।

১১. রক্তাতিসারে: যেসব দ্রব্য স্বভাবতই পিত্তবন্ধিকর, যেমন কোন রুক্ষ দ্রব্য, অল্পদ্রব্য, গুরুপাকদ্রব্য—এগুলি প্রধানভাবে খেলে প্রথমে হয় অতিসার, তারপরে ঐ অভ্যাস না ছাড়লে হয় রক্তাতিসার। এক্ষেত্রে এই জায়ফল চূর্ণ মাত্রামত নিয়ে একট ছাগল দুধ মিশিয়ে দু’বেলা খেলে ২/৩ দিনের মধ্যেই রসবহ স্রোতে বায়ুবিকারজনিত যে অতিসার সেটা সেরে যাবে। তবে প্রধানভাবে এর মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম।

১২. অপাক রোগে: যাকে বলে হজম বলতে আর কিছু নেই, যা খাচ্ছেন সেটা কচা-কচা অবস্থায় পরের দিন বেরিয়ে যাচ্ছে, সে মলটাও দুর্গন্ধযুক্ত, দাস্ত হয়ে যাওয়ার পর যেন আধমরা, সুতরাং শরীরের পোষণ তো হয় না। এর কারণটা হলো, আমাশয়ের ও পক্কাশয়ের মধ্যবর্তী যে অন্নবহা নালী, এখানেই থাকে আমাদের প্যান ক্লিয়াস (Pancreas), সেই স্থানটিতে থাকে আমাদের জঠরাগ্নি; এই অগ্নিদ্বারাই আমাদের আহার্য অংশ পরিপাকের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেয়। রসবহ স্রোত দোষযুক্ত হ’লে এই অগ্নির মান্দ্য হয়, তখন জায়ফল জল দিয়ে ঘষে (চন্দনের মত) ১০/১৫ ফোঁটা আর একটু জল মিশিয়ে খেতে হবে, এর দ্বারা পরিপাক শক্তি বৃদ্ধি হবে এবং অপাকটা কমে যাবে।

১৩. মন্দাগ্নিতে: যাঁরা মাঝে মাঝে পেটের দোষে ভোগেন, কথাটা এই যে, অগ্নির বল যাতে বাড়ে সেসব খাদ্য না খেয়ে প্রায়ই শীতবীর্য দ্রব্য খেয়ে থাকেন, তাঁদের পাচকাগ্নিটা দুর্বল হয়ে যায়, এই যেমন কাঁচা পোস্তবাটা, পুইশাক, ঝিঙে, লাউ, কড়াইডাল (বিউলিডাল) প্রভৃতি খেয়ে খেয়ে এমন হয় যে, কোন জিনিস আর তাড়াতাড়ি পরিপাক হতে চায় না। এই ধরনের পেটের দোষে জায়ফল চূর্ণ সামান্য গরমজল (ঈষদুষ্ণ) সহ ১০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় কয়েকদিন খেলে ও অসুবিধেটা চলে যায়।

১৪. অন্যান্য: জায়ফল খেলে মুখ সুগন্ধিত হয়।  ঘামের দুর্গন্ধ নষ্ট হয়, বায়ু নিঃসারিত হয়ে যাওয়ার জন্যে বায়ুর আধিক্য কমে যায়। বমি বা গা বমি ভাব সারে, শৈত্যের জন্য মল ত্যাগ হতে থাকলে তা নিবারিত হয়।

হাকিমি মতে, জায়ফল মায়েদের স্তনের দুধ বাড়িয়ে দেয় অর্থাৎ শুন্যবর্ধক। কিন্তু বেশি মাত্রায় জায়ফল কখনোই খাওয়া উচিত নয়। বেশি জায়ফল খেলে লাভের বদলে ক্ষতিই হবে। জ্বর হলে, শরীরে দাহ থাকলে (শরীর জ্বালা করলে) এবং ব্লাডপ্রেসার (উচ্চ রক্তচাপ বেশি থাকলে জায়ফল খাওয়া বা ব্যবহার করা উচিত নয়।[১][২]

জায়ফল-এর বাহ্য ব্যবহার

১৫. হাতে পায়ে খিল ধরা রোগে: যাঁদের হাতে-পায়ে মাঝে মাঝে খিল ধরে তাঁরা যদি জায়ফল দিয়ে তৈরী তেল মালিশ করেন তাহলে ওটা আর হবে না। এই তেল তৈরী করতে জায়ফলকে গুড়া করে নিতে হবে অথবা বেটে নিতে হবে, তারপর কড়ায় ৫০ গ্রাম তেল চড়িয়ে গরম হলে ওই তেল নামিয়ে ৫ থেকে ৬ গ্রাম জায়ফলের গুড়া অথবা বাটা ওই গরম তেলে দিয়ে নেড়ে কোন পাত্র দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। তারপর ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বাদে ওটাকে ছে’কেও নেওয়া যায় অথবা ঐ গুড়া সমেত থাকলেও ক্ষতি নেই, তবে মালিশের সময় ঐ গুড়া ছে’কে নিতেই হবে।

১৬. শিরঃপীড়ায়: যে মাথা ধরাটা বিকালের দিকে হয়, অথবা কপালের এক দিকটায় যন্ত্রণা হয়, যাকে আমরা “আধকপালে” বলি, এক্ষেত্রে জায়ফল চন্দনের মতো ঘষে সেখানে লাগিয়ে দিলে ওটা কমে যাবে।

১৭. মেচেতায়: এ রোগের নাম সকলেই জানেন এবং কোথায় হয় সেটাও সকলের জানা আছে, তবুও বলি এটা নাকে মুখেই হয়, আবছা হালকা কালো দাগ কারর বা আন্দামান দ্বীপের আকার আবার কারও বা উত্তমাশা অন্তরীপের আকারে দাগগুলো হয়। এটা ঊধর্বগত পিত্ত শ্লেষ্মজ ব্যাধি। এই রোগে জায়ফল ঘষা কয়েক দিন লাগালে নিশ্চয়ই সেরে যাবে।

জায়ফলের রাসায়নিক উপাদান (Chemical Composition):

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, জায়ফলের বীজে প্রচুর পরিমাণে উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড ও উদ্বায়ী তেল (Volatile oil) থাকে। এর মধ্যে ফ্যাটি অ্যাসিডগুলোর প্রধান হলো— মাইরিস্টিক অ্যাসিড (৭১.৮%), লরিক অ্যাসিড (৪%), স্টিয়ারিক অ্যাসিড (১.২%) এবং লিনোলিক অ্যাসিড (১.৫%)।

এছাড়া এর অন্যান্য কার্যকরী উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিটা-পিনিন, পি-সাইমিন, ডি-লিলানল, ডাইটারপিন, জেরানিওল এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ ক্যারোটিন। খাবার হজমে সাহায্য করার জন্য এতে স্টার্চ, ফারফিউরাল, অ্যামিনোডেক্সট্রিন এবং রিডিউসিং সুগার বিদ্যমান। অন্যদিকে, জায়ফলের পাতা, বাকল ও ফুলে হালকা বাদামী রঙের এক ধরণের বিশেষ উদ্বায়ী তেল বা এসেনশিয়াল অয়েল পাওয়া যায় এবং এর কাণ্ডে রয়েছে ট্যানিন ও মিউসিলেজের এক শক্তিশালী মিশ্রণ (Tannin mucilage complex)।[১]

জয়ত্রীর গুণাগুণ:

জৈত্রী বা জয়ত্রী (বৈজ্ঞানিক নাম: Myristica fragrans) মূলত জায়ফল ফলের ওপরের পাতলা লালচে আবরণ, যা রান্নার স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধিতে এক অনন্য উপাদান। গরম মশলার অন্যতম এই অংশটি বিরিয়ানি, পোলাও, মাংসের কালিয়া ও বিবিধ বিলাসবহুল রান্নায় শাহী আভিজাত্য যোগ করে; এমনকি পায়েস বা মিষ্টি জাতীয় খাবারেও এটি চমৎকার সুবাস নিয়ে আসে। রান্নার পাশাপাশি রূপচর্চাতেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষ করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ও রং ফর্সা করতে জৈত্রী অত্যন্ত কার্যকর।

টমেটো সসের স্বাভাবিক বুনো গন্ধ দূর করে চমৎকার সুগন্ধ যোগ করতে জৈত্রীর ব্যবহার অতুলনীয়। স্বাদের পাশাপাশি এর রয়েছে অসাধারণ ঔষধি গুণ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, এটি রুচি ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে এবং কফ, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও কৃমিনাশক হিসেবে কাজ করে। মুখশুদ্ধি হিসেবেও পানের মশলায় এর ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে, হাকিমি মতে জৈত্রী মন প্রফুল্ল রাখে, হজম শক্তি বাড়ায় এবং পাকস্থলী ও জরায়ুর বিভিন্ন সমস্যা দূর করে শরীরকে সুস্থ রাখে। মাত্র ১-২ গ্রাম জৈত্রী নিয়মিত সেবনে এটি শরীরের দূষিত পদার্থ পরিষ্কার ও দুর্গন্ধ দূর করতে দারুণ কার্যকর।

মাথাব্যথা সারাতে: মাথা ব্যথার উপশমে কপালে জৈত্রী ঘষলে দ্রুত স্বস্তি মেলে; বিশেষ করে আধকপালে বা মাইগ্রেনের ব্যথা এবং মৃগী রোগের লক্ষণ কমাতে এটি বেশ কার্যকর।

২. জরায়ুর সমস্যা সারাতে: জরায়ুর সমস্যা দূর করতে জাফরানের সাথে জৈত্রীর ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর; এটি জরায়ু পরিষ্কার রাখতে এবং এর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

৩. পাথরি সারাতে:  জৈত্রী সেবনে মূত্রাশয়ের পাথরি ভেঙে যায় অথবা শরীর থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে, যা পাথরকুচি বা পাথরি জনিত সমস্যা সারাতে অত্যন্ত কার্যকর।

৪. গর্ভধারণ করার:  মাসিক পরবর্তী সময়ে জরায়ুতে জৈত্রী বাটা ব্যবহার করলে নারীদের গর্ভধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রজননতন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত হয়।

৫. বহুমুত্রে উপশম করতে:  শরীরের অতিরিক্ত শীতলতার কারণে সৃষ্ট বহুমূত্র বা ঘনঘন প্রস্রাবের সমস্যা দূর করতে জৈত্রী অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

৬. পেটের অসুখে:  পেটের বিভিন্ন সমস্যায় জৈত্রী অত্যন্ত কার্যকরী; এটি মুখ দিয়ে রক্ত ওঠা বন্ধ করে এবং গ্যাস্ট্রিক আলসার বা আন্ত্রিক ক্ষত ও পুরনো পেটের অসুখ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

৭. ডায়বেটিসে উপশম: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নাভি ও তলপেটের নিচের অংশে জৈত্রী মালিশ করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়।

৮. ব্যথা কমাতে:  মধুর সাথে জৈত্রী বেটে প্রলেপ দিলে পিঠের ব্যথা দ্রুত সেরে যায় এবং প্রসব পরবর্তী ব্যথা উপশমেও এটি অত্যন্ত কার্যকর।

হাকিমি মতে,  জয়ত্রী বেশি খেলে লিভারের ক্ষতি হয় এবং মাথার যন্ত্রণাও প্রায়ই হতে থাকে। [২]

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

আরো পড়ুন:

তথ্যসূত্রঃ

১. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ৪, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৩, পৃষ্ঠা, ২২-২৪।

২. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, ২৫১-২৫৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!