পাখিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং দৃষ্টিনন্দন এক পাখির নাম মানিকজোড় (Stork)। বিশ্বজুড়ে ডানা মেলে থাকা প্রায় ১০,০০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে মানিকজোড় পরিবারটি তার বিশাল আকৃতির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
এই অনন্য পাখি পরিবারের মূল কিছু বৈচিত্র্য নিচে তুলে ধরা হলো:
- শ্রেণিবিন্যাস ও প্রজাতি: বিজ্ঞানীদের মতে, মানিকজোড় বা কিকোনিডি (Ciconiidae) পরিবারে পৃথিবীতে মোট ৬টি গণ (Genus) রয়েছে, যার অধীনে সর্বমোট ১৯টি প্রজাতির পাখি আছে।
- বর্গ ও পরিবার: পাখি বিজ্ঞানে ‘কিকোনিডি’ পরিবারটি ‘কিকোনিফর্মিস’ (Ciconiiformes) বর্গের অন্তর্ভুক্ত একমাত্র এবং প্রধান পরিবার।
- শারীরিক বৈশিষ্ট্য: মানিকজোড় মূলত একদল বিশালাকায় এবং লম্বা পাযুক্ত পানিকাটা (Wading bird) পাখি। এদের প্রধান আকর্ষণ হলো এদের অত্যন্ত ভারী, শক্ত, লম্বা এবং মোটা ঠোঁট, যা দিয়ে এরা খুব সহজে কাদা বা পানি থেকে শিকার ধরতে পারে।
- ভৌগোলিক চারণভূমি: বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশের জলাভূমি ও বনাঞ্চলেই এই মানিকজোড় পাখিদের কম-বেশি দেখা মেলে।
বাংলাদেশে মানিকজোড় বা স্টোর্ক পরিবারের বর্তমান অবস্থা (Storks in Bangladesh)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশে পাখির প্রজাতি বৈচিত্র্য সত্যি অতুলনীয়। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট পাখির প্রজাতির আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৭৫০টি। তবে কালের বিবর্তনে আমাদের এই সমৃদ্ধ পাখি তালিকার অনেক চেনা অতিথি আজ হারিয়ে গেছে।
গত ২০০ বছরের পাখি পর্যবেক্ষণের ইতিহাস থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বাংলাদেশে একসময় মানিকজোড় (Ciconiidae) পরিবারের ৫টি গণের সর্বমোট ৮টি প্রজাতির পাখি নিয়মিত দেখা যেত।
বর্তমানে টিকে থাকা মাত্র দুটি প্রজাতি
অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ৮টি প্রজাতির মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুটি প্রজাতি স্থায়ীভাবে এ দেশে কোনোমতে টিকে আছে:
১. এশীয় শামখোল (Asian Openbill): এদের এখনও দেশের বিভিন্ন বড় বিল বা হাওরাঞ্চলে দলবদ্ধভাবে দেখা যায়।
২. ছোট মদনটাক (Lesser Adjutant): এরা মূলত সুন্দরবন এবং সুন্দরবনের আশেপাশের উপকূলীয় জলাভূমিতে বাস করে।
হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ: শিকারিদের নৃশংসতা
এক সময়ের চেনা বাকি ৬টি প্রজাতির মানিকজোড় আজ আমাদের প্রকৃতি থেকে প্রায় অদৃশ্য। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো:
- নির্বিচার শিকার: বিল, হাওর ও চরাঞ্চলে শিকারিদের পাতা ফাঁদ এবং এয়ারগান দিয়ে নির্বিচারে মানিকজোড় পাখি শিকার করা হয়েছে।
- বাসস্থান ধ্বংস: বড় বড় গাছ কেটে ফেলা এবং জলাভূমি ভরাট করার কারণে এরা নিরাপদ আশ্রয় হারিয়েছে।
- দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া: মূলত শিকারিদের চরম নৃশংসতা এবং অনিরাপদ পরিবেশের কারণেই বাদবাকি মানিকজোড় প্রজাতিগুলো বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে এবং এ দেশে এখন বিলুপ্তির তালিকায় স্থান নিয়েছে।[১]
বাংলাদেশে দেখা যাওয়া মানিকজোড় পরিবারের ৮টি প্রজাতি
গত ২০০ বছরের ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের বুকে মানিকজোড় পরিবারের যে ৮টি প্রজাতির পাখি বিচরণ করেছে, তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | পাখির বাংলা নাম | ইংরেজি নাম (Common Name) | বর্তমান অবস্থা (সংক্ষেপে) |
|---|---|---|---|
| ১ | এশীয় শামখোল | Asian Openbill | বাংলাদেশে এখনও টিকে আছে |
| ২ | ছোট মদনটাক | Lesser Adjutant | বাংলাদেশে এখনও টিকে আছে |
| ৩ | রাঙা মানিকজোড় (সোনাজঙ্ঘা) | Painted Stork | মহাবিপন্ন / অনিয়মিত পরিযায়ী |
| ৪ | বড় মদনটাক (হাড়গিলা) | Greater Adjutant | বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত |
| ৫ | ধলা মানিকজোড় | White Stork | বিরল পরিযায়ী পাখি |
| ৬ | ধলাগলা মানিকজোড় | Woolly-necked Stork | বিরল পরিযায়ী পাখি |
| ৭ | কালা মানিকজোড় | Black Stork | বিরল পরিযায়ী পাখি |
| ৮ | কালাগলা মানিকজোড় | Black-necked Stork | বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত |
বিশ্বজুড়ে টিকে থাকা মানিকজোড় (Ciconiidae) পরিবারের ৬টি গণ এবং এদের অধীনস্থ ১৯টি প্রজাতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| গণের নাম (Genus) | ক্রমিক | পাখির বাংলা নাম | ইংরেজি নাম (Common Name) | বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name) |
|---|---|---|---|---|
| ১. গণ: মাইক্টেরিয়া (Mycteria) | ১ ২ ৩ ৪ | দুধসাদা মানিকজোড় হলদেঠুঁটি মানিকজোড় রাঙা মানিকজোড় কেঠো মানিকজোড় | Milky Stork Yellow-billed Stork Painted Stork Wood Stork | Mycteria cinerea Mycteria ibis Mycteria leucocephala Mycteria americana |
| ২. গণ: অ্যানাস্টোমাস (Anastomus) | ৫ ৬ | এশীয় শামখোল আফ্রিকান শামখোল | Asian Openbill African Openbill | Anastomus oscitans Anastomus lamelligerus |
| ৩. গণ: কিকোনিয়া (Ciconia) | ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১২ ১৩ | আব্দিমের মানিকজোড় ধলাগলা মানিকজোড় স্টর্মের মানিকজোড় মাগুয়ারি মানিকজোড় উদয়ী মানিকজোড় ধলা মানিকজোড় কালো মানিকজোড় | Abdim’s Stork Woolly-necked Stork Storm’s Stork Maguari Stork Oriental Stork White Stork Black Stork | Ciconia abdimii Ciconia episcopus Ciconia stormi Ciconia maguari Ciconia boyciana Ciconia ciconia Ciconia nigra |
| ৪. গণ: ইফিপিয়োরিনকুশ (Ephippiorhynchus) | ১৪ ১৫ | কালাগলা মানিকজোড় গোদাঠুঁটি মানিকজোড় | Black-necked Stork Saddle-billed Stork | Ephippiorhynchus asiaticus Ephippiorhynchus senegalensis |
| ৫. গণ: জাবিরু (Jabiru) | ১৬ | জ্যাবিরু | Jabiru | Jabiru mycteria |
| ৬. গণ: লেপ্টোপ্টিলস (Leptoptilos) | ১৭ ১৮ ১৯ | ছোট মদনটাক বড় মদনটাক (হাড়গিলা) ম্যারাবু মদনটাক | Lesser Adjutant Greater Adjutant Marabou Stork | Leptoptilos javanicus Leptoptilos dubius Leptoptilos crumeniferus |
উত্তর: মানিকজোড় পাখি মূলত কিকোনিডি (Ciconiidae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারটি কিকোনিফর্মিস (Ciconiiformes) বর্গের একমাত্র এবং প্রধান পাখি পরিবার।
উত্তর: সারা পৃথিবীতে সর্বমোট ৬টি গণের (Genus) অধীনে ১৯টি প্রজাতির জীবিত মানিকজোড় পাখি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্রই এদের দেখা মেলে।
উত্তর: গত ২০০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে ৮টি প্রজাতির মানিকজোড় দেখার রেকর্ড থাকলেও, বর্তমানে মাত্র দুটি প্রজাতি স্থায়ীভাবে টিকে আছে। প্রজাতি দুটি হলো— এশীয় শামখোল (Asian Openbill) ও ছোট মদনটাক (Lesser Adjutant)।
উত্তর: নির্বিচার শিকার ও শিকারিদের চরম নৃশংসতাই এর প্রধান কারণ। এছাড়া বড় বড় গাছ কেটে ফেলা এবং জলাভূমি ভরাট হওয়ার কারণে এরা নিরাপদ আবাসন হারিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে।
উত্তর: মানিকজোড় মূলত বিশালাকায় এবং লম্বা পাযুক্ত একদল পানিকাটা পাখি। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এদের অত্যন্ত ভারী, শক্ত এবং মোটা ঠোঁট, যা দিয়ে এরা সহজে কাদা বা পানি থেকে শিকার ধরতে পারে।
তথ্যসূত্র
১. প্রতিবেদন: “কালাগলা মানিকজোড় দেহসৌন্দর্যই ওদের বড় শত্রু”, দৈনিক কালের কণ্ঠ, প্রকাশকাল: ১৯ নভেম্বর, ২০১৩; ইউআরএল: http://www.kalerkantho.com/home/printnews/22645/2013-11-19
নিবন্ধের ইতিহাস ও আপডেট নোট (Article History)
পাঠকদের কাছে সবসময় সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছে দিতে আমরা এই নিবন্ধটি নিয়মিত পরিমার্জন করি:
- সর্বপ্রথম প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০১৮ (রোদ্দুরে.কম)
- সর্বশেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ (নতুন বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও আইইউসিএন ডেটাসহ সম্পূর্ণ পরিমার্জিত)
আরো পড়ুন:
- বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি: হারিয়ে যাওয়ার পর আবার প্রত্যাবর্তন!
- ছোট মদনটাক পাখি: সুন্দরবনের বিরল বাসিন্দা ও এর জীবনবৃত্তান্ত
- মানিকজোড় (Stork) পাখি পরিবার: পরিচিতি, প্রজাতি তালিকা ও বর্তমান অবস্থা
- রাঙা মানিকজোড় বা সোনাজঙ্ঘা পাখি: জীবনবৃত্তান্ত ও বাংলাদেশে দেখার ইতিহাস
- বড় মদনটাক বা হাড়গিলা পাখি: বিলুপ্তির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
- কালাগলা মানিকজোড় বিশ্বে প্রায়-বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন পরিযায়ী পাখি
- ক্রোয়েশিয়ায় এক জোড়া ধলা মানিকজোড়ের অবিশ্বাস্য প্রেমকাহিনী
- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টার তিন বছরের অভিজ্ঞতা
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।