বাংলাদেশের হাওর-বিল আর জলাভূমির এক অপরূপ ও দৃষ্টিনন্দন পাখির নাম ‘রাঙা মানিকজোড়’, যা দেশের অনেক অঞ্চলে ‘সোনাজংগা’ নামেও পরিচিত। এর চমৎকার গায়ের রঙ সহজেই যে কোনো পাখিপ্রেমীর নজর কাড়ে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এটি ‘মাইক্টেরিয়া’ (Mycteria) গণের অন্তর্ভুক্ত একটি পাখি। বিশ্বজুড়ে এই গণে মাত্র ৪টি প্রজাতি পাওয়া গেলেও, আমাদের বাংলাদেশের পাখির তালিকায় এর মধ্যে কেবল ১টি প্রজাতিরই দেখা মেলে। আজ আমরা আলোচনা করব আমাদের প্রকৃতির এই অনন্য ও দৃষ্টিনন্দন পাখি ‘রাঙা মানিকজোড়’-এর জীবনবৃত্তান্ত এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে।
সোনাজঙ্ঘা পাখির বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস
রাঙা মানিকজোড় বা সোনাজঙ্ঘা পাখির বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস নিচে টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো:
| পাখির পরিচিতি | বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শ্রেণিবিন্যাস |
|---|---|
| বাংলা নাম | রাঙা মানিকজোড়, সোনাজঙ্ঘা |
| ইংরেজি নাম (Common Name) | Painted Stork |
| দ্বিপদ নাম (Scientific Name) | Mycteria leucocephala (Pennant, 1769) |
| সমনাম (Synonyms) | Tantalus leucocephalus |
| জগৎ (Kingdom) | Animalia (প্রাণী) |
| পর্ব (Phylum) | Chordata (কর্ডাটা) |
| শ্রেণী (Class) | Aves (পাখি) |
| পরিবার (Family) | Ciconiidae (মানিকজোড়) |
| গণ (Genus) | Mycteria (Linnaeus, 1758) |
| প্রজাতি (Species) | Mycteria leucocephala |
শারীরিক গঠন ও পরিমাপ (Physical Appearance)
রাঙা মানিকজোড় মূলত লালচে ঠোঁট ও সাদা দেহের এক বিশাল আকৃতির জলচর পাখি। এদের সুঠাম শরীরের নিখুঁত পরিমাপ নিচে দেওয়া হলো:
- দেহের মোট দৈর্ঘ্য: প্রায় ৯৩ সেন্টিমিটার
- গড় ওজন: ৩ কেজি
- শক্তিশালী ডানার দৈর্ঘ্য: ৫০ সেন্টিমিটার
- লম্বা ঠোঁটের দৈর্ঘ্য: ২৬.৫ সেন্টিমিটার
- পা ও লেজের দৈর্ঘ্য: যথাক্রমে ২৪.৫ সেন্টিমিটার এবং ১৬ সেন্টিমিটার
প্রাপ্তবয়স্ক পাখির গায়ের রঙ ও রূপ
- মুখ ও ঘাড়: প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মুখের চামড়া পালকহীন এবং কমলা-হলুদ রঙের হয়। তবে প্রজনন ঋতুতে এই চামড়া উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। এদের ঘাড় ও পিঠের অংশ ধবধবে সাদা।
- বুক ও ডানা: এদের দেহের নিচের অংশ সাদা হলেও বুকে আড়াআড়ি একটি আকর্ষণীয় কালো ডোরা বা বেল্ট থাকে। ডানার প্রান্ত ও মাঝের পালকগুলো কালো এবং ডানার কালো ঢাকনিতে সুন্দর সাদা ডোরা কাটা থাকে।
- লেজ ও চোখ: এদের লেজের কালচে পালকে পাটকিলে রঙের দাগ দেখা যায় এবং চোখগুলো উজ্জ্বল খড়-হলুদ রঙের হয়।
- ঠোঁট ও পা: এদের লম্বা ও নিচের দিকে সামান্য বাঁকানো ঠোঁটের গোড়া কমলা-হলুদ এবং আগার দিকটা হালকা খয়েরি হয়। লম্বা পা ও পায়ের পাতা মেটে-বাদামি থেকে শুরু করে প্রায় লালচে রঙের হয়ে থাকে।
লিঙ্গভেদ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির চেহারা
- পুরুষ ও স্ত্রী পাখি: ছেলে ও মেয়ে রাঙা মানিকজোড় পাখির বাহ্যিক চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই, এরা দেখতে হুবহু একই রকম।
- অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি: ছোট বা অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিদের গায়ের রঙ প্রাপ্তবয়স্কদের মতো উজ্জ্বল হয় না। এরা দেখতে কিছুটা মলিন সাদা রঙের হয় এবং এদের মাথা, ঘাড় ও ডানার ভেতরের পালক-ঢাকনি বাদামি রঙের হয়ে থাকে।
রাঙা মানিকজোড়ের স্বভাব ও বাসস্থান (Behavior and Habitat)
রাঙা মানিকজোড় বা সোনাজঙ্ঘা সাধারণত নদীর পাড়, জলমগ্ন মাঠ, হ্রদ, বিল, জোয়ার-ভাটার কাদাচর এবং উপকূলীয় লবণ চাষের জমিতে বিচরণ করে। এরা খুব বেশি সামাজিক পাখি নয়; সচরাচর জোড়ায় (স্ত্রী-পুরুষ একসাথে) কিংবা ছোট ছোট দলে দলবদ্ধ হয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এদের প্রায়শই জলাশয়ের ধারে এক পায়ে ভর দিয়ে শান্ত হয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়।
শিকারের কৌশল ও খাদ্যতালিকা (Diet and Hunting)
এরা অগভীর পানিতে ধীরে ধীরে হেঁটে শিকার খোঁজে। শিকার ধরার জন্য এরা এদের লম্বা ঠোঁটটি সামান্য খোলা রেখে পানির নিচে কাদায় ডুবিয়ে দেয় এবং স্পর্শের মাধ্যমে খাবার অনুভব করলেই তা ধরে ফেলে। এদের প্রধান খাদ্য তালিকায় রয়েছে:
- বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ।
- ব্যাঙ এবং জলজ উভচর প্রাণী।
- চিংড়ি ও কাঁকড়া জাতীয় ক্রাস্টাসিয়ান।
- পানির বিভিন্ন ধরনের বড় পোকা ও লার্ভা।
ডাক ও শব্দ (Vocalization)
এই পাখিরা স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত শান্ত। প্রজনন ঋতু ছাড়া এরা সাধারণত সম্পূর্ণ নীরব বা বাকহীন থাকে। তবে প্রজনন মৌসুমের শুরুতে (পূর্ব রাগে বা মিলনের আগে) এরা একে অপরকে আকৃষ্ট করতে নিচুস্বরে এক ধরণের গোঙানোর মতো শব্দ করে ডাকে।
প্রজনন ও বংশবিস্তার (Breeding)
- প্রজনন সময়: এদের প্রধান প্রজনন মৌসুম হলো জুলাই থেকে অক্টোবর মাস।
- বাসা তৈরি: এই পাখিরা মূলত ভারতের বিভিন্ন জলাশয়ে পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছে বাসা বাঁধে। গাছের মগডালে ডালপালা, পাতা, খড় ও নলখাগড়া দিয়ে এরা মাচার মতো বড় আকৃতির বাসা তৈরি করে।
- ডিম ও ছানা: এরা সাধারণত ২ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো দেখতে অনুজ্জ্বল সাদা রঙের হয়, যার ওপর বাদামি রঙের লম্বা দাগ থাকে। এদের প্রতিটি ডিমের পরিমাপ প্রায় ৭.০ × ৪.৯ সেন্টিমিটার।
- বাসা ত্যাগ: ডিম ফুটে ছানা বের হওয়ার পর, প্রায় ২৮ দিনের মাথায় বাচ্চারা উড়তে শেখে এবং বাসা ছেড়ে চলে যায়।
রাঙা মানিকজোড়ের বর্তমান অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা (Conservation Status)
প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে রাঙা মানিকজোড় বা সোনাজঙ্ঘা পাখিটি বর্তমানে তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার লাল তালিকায় এদের বর্তমান অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:
- বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের মূল্যায়ন: এই বিখ্যাত জ্ঞানকোষে রাঙা মানিকজোড়কে বাংলাদেশের ‘অনিয়মিত পাখি’ (Vagrant) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হলেও পরিযায়ী বা অনিয়মিত পরিদর্শক হিসেবে দেশের জলাভূমিগুলোতে আসে।
- আইইউসিএন লাল তালিকা (IUCN Red List): আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী রাঙা মানিকজোড় বিশ্বব্যাপী ‘প্রায়-বিপদগ্রস্ত’ (Near Threatened)。 তবে আমাদের দেশের জলবায়ু ও আবাসের প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশে ‘মহাবিপন্ন’ (Critically Endangered) প্রজাতির তালিকায় রয়েছে।
- বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইন: এই দৃষ্টিনন্দন জলচর পাখিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার কঠোর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন এবং পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করা ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী এই প্রজাতিটিকে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এই পাখি শিকার, হত্যা, কেনাবেচা বা এদের বাসা ধ্বংস করা আইনত দণ্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রাঙা মানিকজোড়ের ভৌগোলিক বিস্তৃতি (Geographical Distribution)
এক সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে রাঙা মানিকজোড় বা সোনাজঙ্ঘা পাখির অবাধ বিচরণ ছিল। তবে শিকার এবং আবাসভূমি সংকুচিত হওয়ার কারণে এদের বিস্তৃতি এখন অনেকটাই সীমিত।
- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে এই পাখিটি এখন বেশ বিরল। বিভিন্ন নথি ও তথ্য অনুযায়ী, দেশের বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন বড় জলাভূমি ও হাওর-বিলে এদের দেখা পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এছাড়া, উনিশ শতকের প্রাচীন ঐতিহাসিক তথ্যে সিলেট বিভাগেও এই পাখির উপস্থিতির কথা জানা যায়।
- ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক: বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে এই পাখিটি এখন দেখা না গেলেও, কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে ২০১৫-১৬ সালের দিকে একটি রাঙা মানিকজোড় পাখি ছিল, যা দর্শনার্থীরা দেখতে পারতেন।
- বৈশ্বিক বিস্তৃতি: বিশ্বজুড়ে মূলত দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই পাখিটি প্রজনন ও বিচরণ করে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোচীন উপদ্বীপের (Indochina) বিভিন্ন দেশ জুড়ে এদের বৈশ্বিক চারণভূমি বিস্তৃত রয়েছে।
বৈশ্বিক আবাসস্থলের আয়তন
- বিশাল ভৌগোলিক এলাকা: বিশ্বজুড়ে রাঙা মানিকজোড়ের মোট আবাসস্থলের বা চারণভূমির আয়তন প্রায় ১৯,৩০,০০০ বর্গ কিলোমিটার।
আইইউসিএন (IUCN) ঘোষণা ও বৈশ্বিক সংখ্যা
- ঘোষণার সাল: আইইউসিএন (IUCN) মূলত ২০০৪ সালে প্রথম এই পাখিকে বৈশ্বিকভাবে ‘প্রায়-বিপদগ্রস্ত’ (Near Threatened) হিসেবে ঘোষণা করে।
- প্রাপ্তবয়স্ক পাখির সংখ্যা: বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রজননক্ষম বা প্রাপ্তবয়স্ক রাঙা মানিকজোড়ের মোট সংখ্যা আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১৭,০০০০টি।
- কোনো উপপ্রজাতি নেই: এই পাখির কোনো আলাদা উপপ্রজাতি (Subspecies) নেই।
বিভিন্ন দেশে এদের বর্তমান নিখুঁত পরিস্থিতি
- পাকিস্তান: পাকিস্তানে এদের সংখ্যা এখন খুবই নগণ্য এবং এদের বিচরণ কেবল সিন্ধু উপত্যকায় (Indus Valley) সীমাবদ্ধ।
- নেপাল: নেপালের তরাই অঞ্চলে (Terai Region) কেবল গ্রীষ্মকালে এই পাখিদের দেখা মেলে।
- শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কায় এদের দেখা মিললেও শুষ্ক মৌসুমে (Dry Season) এরা সেখানে থাকে না বা দেখা যায় না।
- মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও লাওস: একসময় এসব দেশে এদের দারুণ প্রজনন পরিবেশ থাকলেও, বর্তমানে খুব কদাচিৎ কেবল ছোট একটি দলকে মাঝে মাঝে দেখা যায়।
- কম্বোডিয়া: কম্বোডিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ জোড়া রাঙা মানিকজোড় বাস করে।
- মালয়েশিয়া ও চীন: মালয়েশিয়ায় এদের উপস্থিতি অত্যন্ত অনিয়মিত এবং ধারণা করা হয় চীন থেকে এরা ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সিঙ্গাপুরে কৃত্রিম অবমুক্তি
- সিঙ্গাপুর: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে এই পাখিকে সিঙ্গাপুরে অবমুক্ত (Released) করা হয়েছে এবং সেখানে এরা বাস করছে।
রাঙা মানিকজোড়ের নামকরণের মজার ইতিহাস (Scientific Name Meaning)
রাঙা মানিকজোড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Mycteria leucocephala-র পেছনে একটি দারুণ অর্থ লুকিয়ে আছে। গ্রিক ভাষা থেকে উদ্ভূত এই বৈজ্ঞানিক নামটির বিশ্লেষণ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘ধলামাথা-পেটরা পাখি’।
এর মূল শব্দার্থ নিচে দেওয়া হলো:
- মাইক্টেরিয়া (গ্রিক: mukter): এই শব্দের অর্থ ‘পেটরা’ বা বড় থলে, যা পাখির শিকার ধরার বিশেষ ঠোঁট ও থলিকে নির্দেশ করে।
- লিউকোসেফালা (গ্রিক: leucocephalos): এই শব্দের অর্থ ‘ধলামাথা’ বা সাদা মাথা, যা পাখির সাদা রঙের ঘাড় ও মাথার অংশকে বোঝায়।
বাংলাদেশে রাঙা মানিকজোড় দেখার ইতিহাস
যদিও অনেক নথিতে রাঙা মানিকজোড়কে বাংলাদেশে অনিয়মিত বা বিলুপ্তপ্রায় বলা হয়েছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন জলাভূমিতে এদের দলবদ্ধ উপস্থিতি প্রকৃতিবিদদের দারুণভাবে আশাবাদী করে তুলেছে। বাংলাদেশে এই পাখিটি দেখার গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- হাকালুকি হাওর (২০১৪): ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশের বিখ্যাত হাকালুকি হাওরে এক জোড়া দৃষ্টিনন্দন রাঙা মানিকজোড় দেখা গিয়েছিল। প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিবিদ তানিয়া khan সেই বিরল মুহূর্তের ছবি ধারণ করেন এবং তা ফেসবুকে শেয়ার করার পর প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
- চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল (২০১৪): ২০১৪ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের বিএফআরআই (BFRI) আবাসিক এলাকার পাশে একটি পাহাড়ের ঢালে সম্পূর্ণ একা এবং অসুস্থ অবস্থায় একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক রাঙা মানিকজোড় উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় রাঙা মানিকজোড় পাখি দেখার রেকর্ড। পরবর্তীতে চিকিৎসার পর একে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হয়।
- পদ্মা নদী (২০১৭): বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী গবেষক আ ন ম আমিনুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে পদ্মা নদীর চরে প্রায় ১৪০টি রাঙা মানিকজোড়ের একটি বিশাল ঝাঁক একসাথে দেখা গিয়েছিল।
- পদ্মার চরে জুভেনাইল বা ছানা পাখি (২০২০): ২০২০ সালের মে মাসে রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মা নদীর চরে এক জোড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক বা জুভেনাইল (Juvenile) রাঙা মানিকজোড় একসঙ্গে বিচরণ করতে দেখা যায়।
- রাজশাহী পদ্মার চর (২০২৩): ২০২৩ সালের জুন মাসে রাজশাহীর পদ্মার চরে আবারও একটি তরুণ রাঙা মানিকজোড় পাখির দেখা মেলে, যা স্থানীয় পাখি আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় বন্দি হয়। বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, পদ্মার এই বিস্তীর্ণ বালুচর ও চরাঞ্চল এখন এই পাখিদের জন্য অন্যতম নিরাপদ অস্থায়ী চারণভূমি।
- ঝিনাইদহ (২০২৫): সাম্প্রতিক এক বড় চমক হিসেবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঝিনাইদহ অঞ্চলের একটি স্থানীয় জলাভূমিতে রাঙা মানিকজোড়ের সফল দেখা মেলে। স্থানীয় বার্ড ওয়াচাররা এই বিরল পাখির ছবি সোশ্যাল মিডিয়ার বার্ড ওয়াচিং গ্রুপগুলোতে শেয়ার করলে তা বেশ সাড়া ফেলে।
- বর্তমান আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি: আ ন ম আমিনুর রহমানের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ থেকে আরও জানা যায়, ২০১৪ সালের পর থেকে এই পাখিটি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি বছরই কম-বেশি নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। ধারণা করা হয়, শীতকালে এরা পরিযায়ী পাখি হিসেবে দল বেঁধে আমাদের দেশের নদী ও হাওরগুলোতে আশ্রয় নেয়।
আরো পড়ুন:
- বাংলাদেশের একমাত্র মদনটাক পাখির কলোনি: হারিয়ে যাওয়ার পর আবার প্রত্যাবর্তন!
- ছোট মদনটাক পাখি: সুন্দরবনের বিরল বাসিন্দা ও এর জীবনবৃত্তান্ত
- বড় মদনটাক বা হাড়গিলা পাখি: বিলুপ্তির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
- এশীয় শামখোল বা শামুকখোল পাখি: বৈশিষ্ট্য, স্বভাব ও প্রজনন কলোনি
- বাংলাদেশের তিতির পাখি: তিন প্রজাতির তিতিরের বিস্তারিত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
- চামচঠুঁটো বাটান বিশ্বে মহাবিপন্ন ও বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি
- মেটে তিতির: এক হারিয়ে যাওয়া পাখির বৈশিষ্ট্য ও জীবনকথা | Grey Francolin
- বাদা তিতির: বাংলাদেশের জলার তিতির ও এর জীবন বৈশিষ্ট্য | Swamp Francolin
- কালা তিতির বা শেখ ফরিদ: বাংলাদেশের এক মহাবিপন্ন পাখি | Black Francolin
- এক দিনে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ে এগারটি হিমালয়ী শকুন উদ্ধার
- বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টার তিন বছরের অভিজ্ঞতা
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার (References & Acknowledgments)
এই তথ্যবহুল নিবন্ধটি তৈরিতে নিচের নির্ভরযোগ্য উৎস ও গবেষণাপত্রের সাহায্য নেওয়া হয়েছে:
- প্রধান উৎস:বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (খণ্ড ২৬): পাখি, পৃষ্ঠা: ৩০১-৩০২।
- ভুক্তি রচয়িতা: এম ফরিদ আহসান
- সম্পাদক মণ্ডলী: ড. এম ফরিদ আহসান, ড. মোনাওয়ার আহমাদ, ড. সৈয়দ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, এবং ড. আবু তৈয়ব আবু আহমদ।
- প্রকাশক: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি (১ম সংস্করণ, আগস্ট ২০০৯)।
- আইএসবিএন (ISBN): 984-30000-0286-0
নিবন্ধের ইতিহাস ও আপডেট নোট (Article History)
পাঠকদের কাছে সবসময় সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছে দিতে আমরা এই নিবন্ধটি নিয়মিত পরিমার্জন করি:
- সর্বপ্রথম প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
- দ্বিতীয় সংস্করণ: ২৮ এপ্রিল ২০১৮
- সর্বশেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ (নতুন পরিসংখ্যান ও আইইউসিএন ডেটাসহ সম্পূর্ণ পরিমার্জিত)
উত্তর: রাঙা মানিকজোড় পাখিকে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে ‘সোনাজঙ্ঘা’ নামে ডাকা হয়। ইংরেজিতে একে ‘Painted Stork’ এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Mycteria leucocephala।
উত্তর: গ্রিক ভাষা থেকে উদ্ভূত এই বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ হলো ‘ধলামাথা-পেটরা পাখি’। এখানে ‘মাইক্টেরিয়া’ শব্দের অর্থ পেটরা বা বড় থলে এবং ‘লিউকোসেফালা’ শব্দের অর্থ ধলামাথা বা সাদা মাথা।
উত্তর: হ্যাঁ, তবে এরা অত্যন্ত বিরল। যদিও একে বাংলাদেশের লাল তালিকায় ‘মহাবিপন্ন’ এবং ‘অনিয়মিত পাখি’ বলা হয়েছে, কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে হাকালুকি হাওর, পদ্মা নদী ও ঝিনাইদহের জলাভূমিতে প্রতি বছরই এদের নিয়মিত দেখা মিলছে।
উত্তর: এই জলচর পাখিরা অগভীর পানিতে লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে স্পর্শের মাধ্যমে শিকার ধরে। এদের প্রধান খাদ্য তালিকায় রয়েছে ছোট-বড় মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকা, চিংড়ি ও কাঁকড়া জাতীয় প্রাণী।
উত্তর: হ্যাঁ, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইন এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী রাঙা মানিকজোড় সম্পূর্ণ সংরক্ষিত একটি পাখি। এদের শিকার বা ক্ষতি করলে আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রথম কবিতার বই পৃথিবীর রাষ্ট্রনীতি আর তোমাদের বংশবাতি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। তাঁর মোট প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ গ্রন্থ দুটি পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। ২০১০ সালে সম্পাদনা করেন বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা নামের একটি প্রবন্ধগ্রন্থ। তিনি ১৬ জুন, ১৯৭৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস করেন এবং পোখরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।