মধুপুর জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যানগুলির মধ্যে একটি

মধুপুর জাতীয় উদ্যান (বাংলা: Madhupur National Park) বাংলাদেশের একটি প্রধান এবং প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যানগুলির মধ্যে একটি। এটি ৮,৪৩৬ হেক্টর বা ২০,৮৫০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার এই বনকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) সংশোধনী আইন ১৯৪৭ অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উদ্যানটি দেশের উত্তরাঞ্চলের টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় অবস্থিত। এটি ঢাকা থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার বা ৭৮ মাইল দূরে অবস্থিত। স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি মূলত সমতল শীর্ষবিন্দু (চালা) দ্বারা গঠিত যা অসংখ্য ঢালু (বাইদ) দ্বারা বিভক্ত করা হয়েছে।

ঢাকার খুব কাছেই অবস্থিত বাংলাদেশের ভাওয়াল ও মধুপুরের বনাঞ্চল, যা স্থানীয়ভাবে ভাওয়াল-মধুপুর ‘শালবন’ নামে পরিচিত। বর্তমানে শিল্পপতি ও পুঁজিপতিদের আগ্রাসনে এই বনভূমি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বনের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য কল-কারখানা, যা বর্তমানে পুরোদমে সচল। এসব শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিপুল সংখ্যক মানুষের পদচারণা ও কর্মকাণ্ড বনকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। ফলে এর মধ্যেই এই বন থেকে বাঘ, ভালুক, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের এক বিশাল এলাকা জুড়ে শালবন (Shorea robusta) বিস্তৃত ছিল। এই বনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই শাল গাছ, তবে এর পাশাপাশি এখানে উলুখড়সহ (sungrass) আরও অনেক মূল্যবান বৃক্ষ ও ভেষজ উদ্ভিদ পাওয়া যায়। শালবনের এই জীববৈচিত্র্য সত্যিই অনন্য। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এই বনগুলোকে ‘কম উৎপাদনশীল’ বিবেচনা করে এর ধ্বংসপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। তারা শালবনের পরিবর্তে ইউক্যালিপটাস ও রাবারের মতো একক প্রজাতির বৃক্ষরোপণ (Monoculture) প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করেছে। বর্তমানে মধুপুর ছাড়া আর কোথাও বড় কোনো শালবনের অস্তিত্ব নেই। বনের অধিকাংশ জমি এখন বৃক্ষহীন ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পড়েছে, যা হয় বিভিন্ন বনজ কোম্পানি দখল করে নিয়েছে অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষ বসতি স্থাপন করেছে।

বর্তমানে বনের অধিকাংশ জমি বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের দখলে। গত দুই দশকে এই রাজনৈতিক নেতাদের হাতে প্রায় ২,০০০ একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে। বাংলাদেশ বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, শালবনের মোট জমির পরিমাণ ছিল ৬০,০০০ একর। অথচ বর্তমানে প্রকৃত বনভূমির অস্তিত্ব টিকে আছে মাত্র ৬,৯০০ একরে। অর্থাৎ, গত অর্ধশতাব্দীতে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নেতারা অবশিষ্ট ৫৩,০০০ একর বনভূমি উজাড় করে ফেলেছে। ২০১২ সালের ২ মার্চ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে এই বনাঞ্চলের চরম বিপন্ন অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাস্তবে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান নীতিগুলো বন সংরক্ষণের পরিপন্থী। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা বনের জমি জবরদখল করছে, নির্বিচারে গাছ কাটছে এবং বন্যপ্রাণী নিধন করছে। ২০০৮ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ৯৩ জন অবৈধ দখলদার বনের অভ্যন্তরেই বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপন করেছে। এছাড়া বনের ভেতর অসংখ্য অবৈধ করাতকল (saw-mill) সচল রয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত বনের গাছ কাটা হচ্ছে। বনের মধ্য দিয়ে নির্মিত রাস্তা ও মহাসড়কগুলোও বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ভাওয়াল-মধুপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শালবন রক্ষা করতে হলে বনদখলকারী ও ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।[১]

বাংলাদেশের শালবন

বাংলাদেশের মধুপুর শালবন গ্রীষ্মমন্ডলীয় বা উষ্ণমণ্ডলীয় আর্দ্র পাতাঝরা বনাঞ্চলের অংশ ধরা হয়। গারো পাহাড়ের পাদদেশে কিছু চিরসবুজ খাচ অংশ ছাড়া শালবনের অধিকাংশ এলাকা পত্রঝরা। বনে প্রধান প্রজাতি শাল (Shorea robusta) যা বনের উপরের ৭৬% থেকে ১০০% চাউনি অধিকার করে থাকে যদিও স্থানে স্থানে বেশ বড় কিছু খাচ দেখা যায় যা সম্পূর্ণ বৃক্ষহীন। শাল গাছ অন্যান্য পত্রঝরা প্রজাতির সঙ্গে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে, তবে এলাকাভেদে মিশ্রণ ভিন্ন হতে পারে। 

মধুপুর শালবন, দিনাজপুর ও রাজেন্দ্রপুর এলাকায় সংশ্লিষ্ট প্রজাতিসমূহ- Adina cordifolia, Albizia procera. Bombax ceiba, Butea monosperma, Lagerstroemia parviflora, Dillenia pentagyna, Garuga pinnata, Hymenodictyon orixensis, Semecarpus anacardium, Miliusa velutina. Schleichera oleosa 3 Terminlia bellerica। বনের নিম্নস্তরে নির্দিষ্ট কিছু পত্রঝরা প্রজাতি থাকে, যেমন- Careya orborea, Holarrhena pubescence ও Bauhinia। আরোহী প্রজাতি সাধারণত বড় ও মোটা হয়ে থাকে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- Entada rhedii, Spatholobus roxburghii, এবং Smilax ও Dioscora গণের প্রজাতি আর Vitaceae গোত্রের অন্যান্য প্রজাতি, Mucuna pruriens, Ichnocarpus frutescens ও Asparagus sp.। মাটি লেভেলে Curcuma গণের প্রজাতি এবং Eupatorium odoratum, Clerodendrum viscosum, Glycosmis arborea, Flacourtia গণ প্রজাতি, Imperata cylindrica এবং অন্যান্য ঘাস সমৃদ্ধ। বনের কিনারা দিয়ে গুল্ম জাতীয় গাছ যেমন Syzygium nervosum, Glochidion ও Flacourtia এসব দেখা যায়। 

পাম জাতীয় গাছের মধ্যে Calamus viminalis var fasciculatus, মধুপুর ও রাজেন্দ্রপুর বনের শুষ্ক বহির্ভাগে পাওয়া যায়। গজনী অঞ্চলের অর্ধ চিরহরিৎ বন ছাড়া শালবনে বাঁশের দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরে Melocanna baccifera ও Giganochloa andamanica প্রজাতির গাছ বিদ্যমান। কুমিল্লা, ডামাইরহাট, পাইকবান্ধা, পথনিতোল্লা ও মধ্যপাড়া বনে Shorea robusta প্রায় ৯০% উঁচু স্তর অধিকার করে আছে, কিন্তু সেখানে সঙ্গী গাছ সংখ্যায় ও বৈচিত্র্যে কম।[২]

উদ্যান ধ্বংস করে বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়নের বানোয়াট গল্প

“এই বন যতদূর ঠিক ততদূর আমার বাড়ি
এই মাটিতেই পোতা আছে আমার নাড়ি”

মধুপুর শালবন কোনো নিছক বনভূমি নয়—এটি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের শিকড়, আমাদের ইতিহাস। গারো, কোচ, বর্মণসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শতাব্দীপ্রাচীন জীবন ও সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সঙ্গে এই বন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্মরণাতীতকাল থেকে এই শালবন আদিবাসীদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি, জীবন-জীবিকার ভিত্তি এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মধুপুর শালবন রক্ষার সংগ্রাম— আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।

কিন্তু কথিত উন্নয়নের নামে প্রাণবৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে বারবার এই শালবনের বুক চিরে চালানো হচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ। বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক বন উজাড় করে সামাজিক বনায়ন, রাবার বাগান, ইকোপার্ক, পর্যটন ও তথাকথিত কৃত্রিম ‘লেক সংস্কার’ প্রকল্পের আড়ালে আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি দখল ও উচ্ছেদের অপচেষ্টা স্পষ্ট। বন ধ্বংস করে, কৃষিজমি নষ্ট করে এবং স্থানীয় জনগণকে উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়ন কখনোই মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।

আদিবাসীদের সঙ্গে অর্থপূর্ণ আলোচনা ছাড়া মধুপুর শালবনে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। কৃত্রিম ‘লেক সংস্কার’সহ আদিবাসী স্বার্থবিরোধী সকল কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও প্রথাগত ভূমির প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং আদিবাসীদের ভূমি ও বনাধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অতীতের সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

আদিবাসীরা উন্নয়নবিরোধী নয় কিন্তু আদীবাসীদের অস্তিত্ব তথা প্রাকৃতিক বন বিনাশের বিনিময়ে কোনো উন্নয়ন মেনে নেয়া হবে না। আদিবাসীদের আন্দোলন ন্যায়, অধিকার ও মর্যাদার আন্দোলন। আদিবাসীদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না, তাঁদের ভূমি কেড়ে নেওয়া যাবে না। মধুপুর শালবন বাঁচাতে আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। জনগণের বন, আদিবাসীদের বন, বন জনগণের অধিকার। বনবাসীদের প্রাকৃতিক জীবনে কৃত্রিম সংকট চাপানো চলবে না। অস্তিত্বের লড়াই চলবেই।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৭ জানুয়ারি ২০১২, প্রাণকাকলি, “The Vaol-Modhupur Shal forest of Bangladesh is going to extinct.” ইউআরএল: https://anupsadi.blogspot.com/2012/01/vaol-modhupur-shal-forest-of-bangladesh.html
২. এম খায়রুল আলম, বাংলাদেশের বন ও বন ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খন্ড ১, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!