বাংলাদেশের বনাঞ্চল বা বনভূমি ঘন বৃক্ষলতাদি দ্বারা আচ্ছাদিত অঞ্চল

বাংলাদেশের বনাঞ্চল বা বনভূমি (ইংরেজি: Forests of Bangladesh) বলতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন বৃক্ষলতাদি দ্বারা আচ্ছাদিত অঞ্চলকে বোঝানো হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে অতি ঘনভাবে বৃক্ষ ও লতা জন্মে বনভূমির সৃষ্টি হয়। এ বনভূমিই আদিম মানুষের প্রধান, প্রথম আশ্রয় এবং খাদ্য ভান্ডার ছিল। তাই অতীত কাল থেকেই বনভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। বনভূমির বৃক্ষলতা, গুল্ম, প্রাণী, ফলমূল সবকিছুকেই বনজ সম্পদ বলা হয়।

একটি দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং বনজসম্পদ আহরনের জন্য ন্যূনপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষ পুঞ্জিতে ১৯৮৫-৮৬ সালে দেশের মোট বনভূমির পরিমান ১৩.৪১ শতাংশ দেখানো হয়েছে। একই সময়ে পরিচালিত অর্থনৈতিক জরিপে বনাঞ্চলের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯.৩ শতাংশ; দি টাস্ক ফোর্স রিপোর্ট, ১৯৯১-তে বনের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৯.৮৭ শতাংশ। অনেকের মতে, বর্তমানে বনভূমির প্রকৃত পরিমাণ আরও কম। অবশ্য চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রির্পোট ও বন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদত্ত উপাত্ত অনুসারে বর্তমানে দেশের মোট বনভূমির পরিমান ১৭ শতাংশ। বনভূমি পরিমাণ সংক্রান্ত উপাত্তের বিভিন্নতা থাকলেও অনেকেই এ ব্যাপারে একমত যে বাস্তবে বর্তমানে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

বর্তমানে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমান হলো প্রায় ২৫,০০০ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ৬২ লক্ষ একর বনভূমি রয়েছে বাংলাদেশে যা দেশের মোট আয়তনের শতকরা প্রায় ১৭ ভাগ। দেশের মোট জনশক্তির শতকরা প্রায় ২ ভাগ এই খাতে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশের বনভূমি প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপ্রতুল। জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত কারনে গৃহনির্মাণ সামগ্রী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে গাছপালার অধিক ব্যবহারের ফলে বনভূমির পরিমান দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। 

বাংলাদেশের বনাঞ্চলের অবস্থান

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বনভূমির ৯০ শতাংশেরও বেশি দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাত্র ১২টি জেলায় পুঞ্জীভূত। মাত্র ৯ শতাংশ রাজশাহী এবং ঢাকা বিভাগে অবস্থিত। ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৮টিতে কোনো রাষ্ট্রীয় বনভূমি নেই। জেলা ভিত্তিক কেবলমাত্র খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটি—এ ৬টি জেলায় পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করার মত প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিমাণ বনভূমি আছে।

বাংলাদেশের বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভাগ

জলবায়ু ও মৃত্তিকার তারতম্যের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন বনাঞ্চল পর্যালোচনার সাপেক্ষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের বনভূমি ক্রান্তীয় চিরহরিৎ পর্ণমোচী বৃক্ষের অন্তর্গত। তবে এদেশে সরল বর্গীয় বৃক্ষের বনভূমিও পরিলক্ষিত হয়। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। যার ফলে এদেশের বনভূমির বন্টন অনেকটা হয় ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। যার ফলে এদেশের বনভূমির বন্টন অনেকটা ক্রান্তীয় জলবায়ু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। সামান্য উচ্চভূমি ব্যতিত সমগ্র দেশ এক বিস্তীর্ন বৈচিত্রহীন সমভূমি। উচ্চভূমির পরিমান সীমিত হলেও দেশের অধিকাংশ বনভূমি এ উচ্চ ভূমিতেই অবস্থিত।

পরিবেশগতভাবে উদ্ভিজ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বনসমূহকে সাতভাবে ভাগ করা হয়েছে।

১. ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন;
২. ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন;
৩. ক্রান্তীয় পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি বা শালবন;
৪. বাদাবন বা প্যারাবন বা স্রোতজ বনভূমি ও সুন্দরবন;
৪. মিঠাপানির জলাভূমি বন;
৫. অশ্রেণীভূক্ত সরকারী মালিকানাধীন ছন জাতীয় মিশ্র জঙ্গলাকীর্ণ বনভূমি;[১]
৬. সৃজিত বন;
৭. বসতবাড়ির বনভূমি।

ক্রান্তীয় আর্দ্র চিরহরিৎ বন

সিলেটের পাহাড়ি বন এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ছোট বনভূমি।

ক্রান্তীয় প্রায়-চিরহরিৎ বন

প্রায় সমগ্র পার্বত্য পাবত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু অংশ জুড়ে এ বনভূমি অবস্থিত। এ সকল অঞ্চলে অতি বৃষ্টিপাতের জন্য চিরহরিৎ অরণ্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ জাতীয় বৃক্ষের বনভূমির আয়তন ১০,৩০০ বর্গ কি.মি.। দীর্ঘকায় চির সবুজ বৃক্ষ সমূহের মধ্যে গর্জন, চাপালিশ, তেলসুর গামার, বইলাম, চান্দুল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মাঝারি উচ্চতার বৃক্ষ সমূহের মধ্যে অর্জুন, জারুল, কুসুম, হরগজ, বহেরা প্রভৃতি প্রধান। চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেগুন এবং রাবার বৃক্ষের বন সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া এসব অরন্যে বেত ও বিভিন্ন জাতের বাঁশ ঝোপ জন্মে। চিতাবাঘ, হাতি, হরিণ, বানর, বনবিড়াল, সজারু খরগোস, সাপ বেজী প্রভৃতি প্রাণী এখানকার বনে দেখা যায়।

মিঠাপানির জলাভূমি বন

বর্ষাকালে এই স্থানগুলি প্লাবিত এবং/অথবা প্লাবিত হয়। সিলেট হাওর এলাকার খাগড়া জমি এবং হিজল-করোজ বন।

ক্রান্তীয় পতনশীল পত্রযুক্ত বৃক্ষের বনভূমি বা শালবন

প্লাইস্টোসিন কালের সোপান সমুহে শালবন দেখতে পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল ও ঢাকা অঞ্চলের প্রায় ১১৬৪ বর্গ কিলোমিটার এবং দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের ৩৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় এ শালবন বিস্তৃত। এই বনভূমির ৯৫% ভাগ বৃক্ষই শাল। এই গুলোর উচ্চতা ১৫ থেকে ২১ মিটার। এই বনভূমির অন্যন্য বৃক্ষের মধ্যে কড়ই, হালডু, বাজনা, কুম্বি, শেওড়া, হারগোজা, জলপাই, আমলকি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এ বনভূমির ভিতর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপকভাবে বসতি গড়ে উঠেছে। বনভূমির সীমানায়, এমনকি ভিতরের নিম্ন অঞ্চলের চাষাবাদ চলছে। এসব বনভূমির গজারী ও অন্যান্য গাজ কাঠ, খুটি ও জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এ বনভূমির বিভিন্ন জায়গায় সরকারীভাবে বিদেশী প্রজাতির গাছ বিশেষতঃ দ্রুত বর্ধক গাছ, যেমন- অ্যাকাসিয়া, আকাশমনি এবং রাবার গাছের উড লট সৃষ্টি করা হয়েছে।

বাদাবন বা প্যারাবন বা গরান বন বা স্রোতজ বনভূমি বা সুন্দরবন:

সুন্দর বনের আয়তন প্রায় ৬,০৬০ বর্গ কি.মি.। ইহা বিশ্বের বৃহত্তম একক গরান বন। দক্ষিণ-পশ্চিম পটুয়াখালীর প্রায় ৬২ বর্গ কিলোমিটার ব্যতীত সুন্দর বনের অবশিষ্ট অংশ দক্ষিণ খুলনা অঞ্চলে অবস্থিত। সুন্দরী ও গরান সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ। অন্যান্য বৃক্ষের মধ্যে গেওয়া, পশুর, ধুন্দল, কেওড়া, বায়েন প্রধান। এছাড়া সুন্দরবনে প্রচুর, গোলপাতা জন্মে। সমুদ্রের জোয়ার ভাটার কারণে নদী মোহনায় কর্দমাক্ত পলিমাটি জমে ম্যানগ্রোভ জাতীয় বনাঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে। এ বনভূমি থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমানে মধূ আহরিত হয়। অতিসম্প্রতি এ বনভূমিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই বনভূমির প্রধান আকর্ষন। এছাড়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বানর, ভোঁদড়, কুমীর, সাপ, বনমোরগ, বনবিড়াল, বাঘডাসা, শৃগাল প্রভৃতি।

অশ্রেণীভূক্ত সরকারি বনভূমি

এ বনভূমি মূলত মিশ্র প্রকৃতির। এসব ভূমির প্রধান গাছা-পালা বহু পূর্বেই চাষাবাদ, বসতি বা চোরাইভাবে কাটা হয়েছে। ফলে বর্তমানে পূর্বোপূরি বড় বৃক্ষ শূন্য। এ ধরনের ভূমিতে ব্যাপকভাবে ছন জাতীয় ঘাস হয় যা এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ঘরের ছাউনি প্রধান উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া, এ সব সরকারী ভূমি স্থানীয় অধিবাসীগণ ঝুম চাষের জন্য ব্যবহার করে থাকে। এ সব ভূমি বনবিভাগের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রাধীন।

সৃজিত বন

বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ও উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে কিছু কিছু বাগান নার্সারী রয়েছে। পাউবি নিয়ন্ত্রাধীন এ সব বনভূমি মূলতঃ উপকূলীয় এলাকার ভেড়ি বাঁধে সৃজন করা হয়েছে যার পরিমান (১৯৯৩-৯৪ এর হিসাব অনুযায়ী) ২৯৪ বর্গ কিলোমিটার। তবে উপকূলে নতুন জেগে উঠা চরে বন বিভাগ ও মাটি স্থায়ী করণে কার্যকর হতে পারে এ ধরনের বৃক্ষ রোপন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ফলে, গত এক দশকে উপকূলের বেশ কিছু নবীন দ্বীপে বনভূমি গড়ে উঠেছে।

বসতবাড়ির বন

বসতবাড়ির বন সারা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. এস আর বিশ্বাস ও জে কে চৌধুরী, Forests and forest management practices in Bangladesh: the question of sustainability,’ International Forestry Review, ২০০৯, ভলিউম ৯, সংখ্যা ২, পৃষ্ঠা ৬৩০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!