টক আতা বা সাওয়ারসপ: ক্যানসার প্রতিরোধী এক জাদুকরী ফলের গল্প

ভূমিকা: টক আতা  হচ্ছে এনোনাসি পরিবারের এনোনা গণের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই প্রজাতিটি ফল গাছ হিসাবে লাগানো হয়ে থাকে।

স্তর (Rank)বৈজ্ঞানিক নাম (Scientific Name)বাংলা নাম / পরিচয়
জগৎ / রাজ্যPlantaeউদ্ভিদ জগৎ
বিভাগAngiospermsসপুষ্পক উদ্ভিদ
অবিন্যাসিতMagnoliidsম্যাগনোলিডস
বর্গMagnolialesম্যাগনোলিয়ালস
পরিবারAnnonaceaeঅ্যানোনেসি
গণAnnonaঅ্যানোনা
প্রজাতিA. muricataঅ্যানোনা মিউরিকাটা

বর্ণনা:

টক আতা মূলত একটি ছোট আকৃতির গুল্ম বা বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। এই গাছের মূল কাণ্ডটি বেশ মসৃণ হলেও এর কচি শাখা বা ডালগুলো বেশ রোমশ (ছোট ছোট চুলে আবৃত) হয়ে থাকে। এর পাতাগুলোর গোড়ায় ৪ থেকে ১৩ মিলিমিটার লম্বা বোঁটা থাকে। পাতাগুলো দেখতে আয়তাকার ও ডিম্বাকার (Obovate) মিশ্রিত আকৃতির হয়, যার দৈর্ঘ্য ৪.৮ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ১.৩ থেকে ৬.৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতার অগ্রভাগ বেশ সূক্ষ্ম ও কিছুটা টানা লম্বাটে। পাতার ওপরের পিঠ উজ্জ্বল গাঢ় সবুজ ও মসৃণ হলেও, নিচের পিঠটি অনুজ্জ্বল এবং সামান্য রোমশ থেকে মসৃণ প্রকৃতির হয়ে থাকে।

ফুলের বৈশিষ্ট্য:
এর পুষ্পবিন্যাস বা ফুল ফোটার ধরনটি হলো পত্রপ্রতিমুখ (পাতার ঠিক বিপরীতে) অথবা এক্সট্রা-এ্যাক্সিলারি (কান্ডের বিশেষ অংশ থেকে বের হওয়া)। প্রতিটি থোকায় সাধারণত ১ থেকে ২ টি ফুল থাকে। ফুলের মূল দণ্ডটি ২ থেকে ৫ মিলিমিটার লম্বা এবং এর কাষ্ঠল বোঁটাটি ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ফুলের গোড়ার পাতা বা মঞ্জরীপত্রিকাটি দেখতে ব-দ্বীপের মতো এবং ঘন রোমশ। ফুলের পাপড়িগুলো বেশ পুরু বা স্থুল হয়। বাইরের পাপড়িগুলো আকারে ২.৮-৩.৩ × ২.১-২.৫ সেন্টিমিটার, যা স্পষ্ট ডিম্বাকার এবং সুঁচালো প্রান্তযুক্ত হয়। ভেতরের পাপড়িগুলো কিছুটা ছোট (২.৫-২.৮ × ১.৮-২.০ সেমি) এবং ডিম্বাকার হয়ে থাকে। ফুলের পুংকেশর ৪ থেকে ৫ মিলিমিটার লম্বা এবং এর পরাগধানীগুলো অসম আকৃতির হয়। এর গর্ভাশয়টি লালচে বাদামি রঙের এবং রোমাবৃত থাকে।

ফলের বিবরণ ও স্বাদ:
টক আতা গাছের মূল আকর্ষণ হলো এর ফল। ডিম্বাকৃতির এই ফলগুলো আকারে বেশ বড়- প্রায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। ফলের গায়ের ত্বক গাঢ় সবুজ রঙের এবং এর ওপর বাঁকা বাঁকা নরম কাঁটা থাকে। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সবুজ থাকলেও, পাকলে এটি চমৎকার সোনালি হলুদ রঙ ধারণ করে। ফলের ভেতরের মাংসল ও আঁশালো অংশটি ধবধবে সাদা, অত্যন্ত রসালো এবং সুগন্ধযুক্ত। স্বাদের দিক থেকে এটি বেশ টক প্রকৃতির হয়, তবে ফলটি যখন খুব ভালোমতো পেকে যায়, তখন এর মিষ্টির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা হলো ২n = ১৪, ১৬।

আবাসস্থল ও চাষাবাদ:

উপযুক্ত পরিবেশ ও চাষের অঞ্চল:
টক আতা গাছটি অত্যন্ত সহনশীল প্রকৃতির। এটি যেমন সমতল ভূমিতে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে, ঠিক তেমনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাহাড়ি বা উঁচু অঞ্চলেও সফলভাবে জন্মাতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু এই ফল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। দেশের মাটি ও পরিবেশ অনুকূলে থাকায় বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ করে লাভবান হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বংশবিস্তার ও চারা উৎপাদন:

এই গাছের বংশবিস্তার মূলত তিনভাবে করা সম্ভব। প্রথমত, প্রাকৃতিকভাবে এর বীজ থেকে চারা (মুকুলোদগম) তৈরি করা যায়। দ্বিতীয়ত, দ্রুত ফলন ও মাতৃগাছের হুবহু গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য আধুনিক জোড় কলম (Grafting) বা ক্লোনাল পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। এছাড়া, সম্পূর্ণ রোগমুক্ত এবং উন্নত জাতের চারা একসাথে বিপুল পরিমাণে পাওয়ার জন্য ল্যাবরেটরিতে টিস্যুকালচার (Tissue Culture) প্রযুক্তির মাধ্যমেও এর চারা উৎপাদন করা সম্ভব।

ফুল ও ফল ধারণের সময়:
টক আতা গাছে সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল ধারণ প্রক্রিয়া চলে। এই দীর্ঘ সময়ে গাছে নিয়মিত ফুল আসে এবং ধাপে ধাপে ফল পরিপক্ব হয়ে ওঠে।

বিস্তৃতি:

আদি উৎপত্তিস্থল ও বৈশ্বিক অবস্থান:
টক আতা মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমেরিকার (Tropical America) একটি আদি বা দেশজ উদ্ভিদ। অর্থাৎ, আমেরিকার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলেই এই গাছের প্রথম উৎপত্তি হয়েছিল। তবে চমৎকার অভিযোজন ক্ষমতার কারণে বর্তমানে এটি বিশ্বের প্রায় সব গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং সফলভাবে জন্মাচ্ছে।

বাংলাদেশে টক আতার অবস্থান:
আমাদের দেশে টক আতা এখনো ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক বাগান আকারে খুব বেশি দেখা না গেলেও, এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের বসতবাড়ির বাগান বা ছাদবাগানে শৌখিন ফল হিসেবে এই গাছটি বেশ যত্ন সহকারে লাগানো হচ্ছে। দেশের আবহাওয়া অনুকূল হওয়ায় বাড়ির আঙিনায় খুব সামান্য পরিচর্যাতেই এই গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্বের দিক:

খাবার হিসেবে চমৎকার ব্যবহার ও ডেসার্ট:
সম্পূর্ণ পরিপক্ক ও পাকা টক আতা সরাসরি তাজা ফল হিসেবে যেমন খাওয়া যায়, তেমনি এর রয়েছে দারুণ সব রন্ধনশিল্পে ব্যবহার। এই ফলের ভেতরের সুগন্ধযুক্ত সাদা অংশটি (পাল্প) দিয়ে জুস, জেলি, ক্যান্ডি এবং আইসক্রিমের প্রিমিয়াম ফ্লেভার বা সুগন্ধি তৈরি করা হয়। এছাড়া, পাকা টক আতার রস আইসক্রিম কিংবা ঘন দুধের সাথে মিশিয়ে অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর পানীয় বা ডেসার্ট (Dessert) তৈরি করে পরিবেশন করা যায়। এই ফলটি প্রাকৃতিক চিনিরও একটি চমৎকার উৎস। ফল থেকে সুস্বাদু জেলি, জুস, নেকটার এবং সিরাপ বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা সম্ভব।

অসামান্য ঔষধি গুণাগুণ ও ক্যানসার প্রতিরোধ:
টক আতা কেবল একটি সুস্বাদু ফলই নয়, এটি অত্যন্ত কার্যকরী একটি ঔষধি বৃক্ষ। বিশ্বের অনেক দেশেই প্রাচীনকাল থেকে একে ওষুধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ফলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অ্যান্টি-ক্যান্সার (Anti-cancer) উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, টক আতা গাছের বিশেষ নির্যাস শরীরে টিউমারের বৃদ্ধি ধীর বা শ্লথ করে দিতে সাহায্য করে। ক্যানসারের চিকিৎসায় ইতিবাচক ভূমিকার কারণে এটি বিশ্বজুড়ে ক্যানসার প্রতিরোধী ফল হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। এছাড়া, এটি একটি চমৎকার বলবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং নিয়মিত খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

পুষ্টি উপাদান (প্রতি ১০০ গ্রাম পাল্পে):
টক আতা পুষ্টির দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর পুষ্টির প্রধান উপাদানগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • প্রাকৃতিক চিনি: সম্পূর্ণ ফলের প্রায় ৬৮% অংশই হলো চিনি বা শর্করা, যা তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়।
  • ভিটামিন বি (Vitamin B): প্রতি ১০০ গ্রাম ফলের পাল্পে প্রায় ০.০৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি থাকে।
  • ভিটামিন সি (Vitamin C): প্রতি ১০০ গ্রাম পাল্পে প্রায় ২০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, যা ত্বকের যত্ন ও রোগ প্রতিরোধে দারুণ কার্যকরী।

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৬ঠ খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) টক আতা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে টক আতা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে বাগানে ও বাসা বাড়িতে অধিক আবাদের উৎসাহ করা যেতে পারে।[১]

আরো পড়ুন:

 তথ্যসূত্র:

১. এম এ হাসান  (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৬ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৫। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

বি. দ্র: ব্যবহৃত ছবি উইকিপিডিয়া কমন্স থেকে নেওয়া হয়েছে। আলোকচিত্রীর নাম: Judgefloro

Leave a Comment

error: Content is protected !!