ভূমিকা: দেশি গোবুরা (বৈজ্ঞানিক নাম: Anisomeles indica) হচ্ছে এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের ভেষজ উদ্ভিদ। এর পাতা, মূলে নানা ভেষজ গুণ আছে। বাংলাদেশের রাজশাহীর বাসিন্দা মুখের ঘা সারাতে ব্যবহার করে।
| বৈশিষ্ট্য / ক্যাটাগরি | বিস্তারিত বিবরণ |
|---|---|
| স্থানীয় নাম | দেশি গোবুরা বা গোলাপি গোবুরা |
| বৈজ্ঞানিক নাম | Anisomeles indica (L.) O. Kuntze, Rev. Gen.: 512 (1891) |
| সমার্থক নাম (Synonyms) | Nepeta indica L. (1753), Anisomeles ovata R. Br. (1811) |
| ইংরেজি নাম | Indian Catmint / Malabar Catmint |
| জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস | জগৎ: Plantae | বিভাগ: Tracheophytes | বর্গ: Lamiales | পরিবার: Lamiaceae (মিন্ট/পুদিনা) | গণ: Anisomeles | প্রজাতি: A. indica |
দেশি গোবুরা-এর বর্ণনা:
আমাদের প্রকৃতির আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঔষধি উদ্ভিদ, যার মধ্যে দেশি গোবুরা অন্যতম। বৈজ্ঞানিক মহলে এটি Anisomeles indica নামে পরিচিত। এটি মূলত পুদিনা বা মিন্ট (Lamiaceae) পরিবারের একটি বর্ষজীবী বীরুৎ জাতীয় সুগন্ধি গাছ। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এই গাছের শারীরিক গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে।
গাছের আকার ও কাণ্ড
- উচ্চতা ও গঠন: দেশি গোবুরা গাছটি খাড়া প্রকৃতির এবং এটি সর্বোচ্চ ২ মিটার (প্রায় সাড়ে ৬ ফুট) পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর নিচের অংশ কিছুটা শক্ত বা কাষ্ঠল হলেও ওপরের অংশ প্রচুর শাখায় ভরপুর থাকে।
- কাণ্ডের বৈশিষ্ট্য: এর কাণ্ড বা ডালগুলো চারকোণা আকৃতির (চতুষ্কোণাকৃতি)। কাণ্ডের গায়ে সূক্ষ্ম খাঁজ থাকে এবং পুরো ডালটি নরম ছোট ছোট রোম বা চুলে ঢাকা থাকে। এর এক একটি পর্বের মধ্যবর্তী দূরত্ব বা পর্বমধ্য প্রায় ৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
পাতার গঠন
- আকার ও আকৃতি: গাছটির পাতাগুলো বোঁটাসহ প্রায় ৩ সেন্টিমিটার লম্বা এবং দেখতে ডিম্বাকার। পাতার অগ্রভাগ সুচালো হলেও এর কিনারাগুলো খাঁজকাটা থাকে।
- রোমশ পাতা: পাতাগুলো বেশ চর্মবৎ বা চামড়ার মতো। পাতার ওপরের ভাগের চেয়ে ভেতরের বা নিচের অংশটি অনেক বেশি ঘন লোমে আবৃত থাকে।
ফুল ও পুষ্পবিন্যাস
- ফুলের রঙ ও আকৃতি: দেশি গোবুরার ফুলগুলো দেখতে নলাকার এবং ওষ্ঠাকৃতির (ঠোঁটের মতো), যা মূলত গোলাপী বা বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। ফুলের বাইরের অংশ মসৃণ হলেও ভেতরের দিকটা বেশ রোমশ।
- পুষ্পবিন্যাস: এর ফুলগুলো কাণ্ডের শীর্ষে বা পাতার গোড়া থেকে চক্রাকারে ঘন স্পাইক বা মঞ্জরি আকারে ফোটে। এর পুংকেশর থাকে ৪টি এবং পরাগরেণুগুলো ধবধবে সাদা রঙের হয়।
ফল ও বীজ (নাটলেট)
- ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পর এর ভেতরে ছোট ছোট বীজ বা ফল তৈরি হয়, বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে নাটলেট (Nutlet) বলা হয়।
- এই নাটলেটগুলো আকারে মাত্র ০.২ x ০.১ সেন্টিমিটারের মতো ছোট হয়। এর গোড়ার দিকে একটি ত্রিকোণাকার সাদা চিহ্ন থাকে এবং পিঠের দিকে হালকা শিরা দেখা যায়।
ক্রোমোসোম সংখ্যা
- জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশি গোবুরা উদ্ভিদের ক্রোমোসোম সংখ্যা সাধারণত ২n = ৩৪ অথবা ৪০ হয়ে থাকে।
আবাসস্থল ও বংশ বিস্তার:
আবাসস্থল ও প্রাপ্তিস্থান
- পছন্দসই পরিবেশ: দেশি গোবুরা গাছটি সাধারণত শুষ্ক বা শুকনো জায়গায় বেশি জন্মে।
- যেখানে বেশি দেখা যায়: বনের কিনারায়, ঝোপঝাড়ের পাশে এবং রাস্তার ধারে অবহেলায় এই উদ্ভিদটি বেড়ে উঠতে দেখা যায়।
ফুল ও ফল ধারণের সময়
- এই উদ্ভিদে সাধারণত অক্টোবর থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ফুল ও ফল দেখা যায়। বছরের প্রায় দীর্ঘ একটা সময় জুড়ে এটি প্রকৃতিতে তার সৌন্দর্য ছড়ায়।
বংশ বিস্তার প্রক্রিয়া
- প্রাকৃতিক নিয়ম: দেশি গোবুরার বংশবিস্তার মূলত দুইভাবে হয়। এটি যেমন বীজের মাধ্যমে নতুন চারা উৎপাদন করতে পারে, তেমনি এর ডাল বা কান্ডের মতো অঙ্গজ উপায়ের (Vegetative propagation) মাধ্যমেও খুব সহজে নতুন গাছের জন্ম দিতে পারে।
দেশি গোবুরা-এর বিস্তৃতি:
- বিশ্বজুড়ে উপস্থিতি: দেশি গোবুরা মূলত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় (Sub-tropical) অঞ্চলের উদ্ভিদ। এটি ভারত, শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে মালয় উপদ্বীপ (Malay Peninsula), চীন এবং ফিলিপাইনে প্রচুর পরিমাণে জন্মায়।
- বাংলাদেশে অবস্থান: আমাদের বাংলাদেশের প্রায় বেশিরভাগ জেলাতেই এই উদ্ভিদটি সর্বজনীনভাবে অর্থাৎ সব জায়গায় প্রাকৃতিকভাবেই দেখা যায়।
অর্থনৈতিক ব্যবহার ও গুরুত্ব:
- প্রয়োজনীয় তেল ও অ্যালকালয়েড: দেশি গোবুরা উদ্ভিদে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে এসেন্সিয়াল অয়েল বা প্রয়োজনীয় তেল এবং প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড (Alkaloids), যা বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- সংকোচক ও টনিক উপাদান: এই উদ্ভিদের নির্যাস চমৎকার সংকোচক (Astringent) এবং বডি টনিক (Tonic) হিসেবে কাজ করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং টিস্যু বা ত্বক সংকুচিত করে ক্ষত নিরাময় ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে।
জাতিতাত্বিক ব্যবহার:
- মুখ ও গলার ক্ষত নিরাময়: বাংলাদেশের রাজশাহী জেলায় শিশুদের মুখের ভেতরের ঘা এবং গলার ক্ষত বা ইনফেকশন দূর করতে এই উদ্ভিদের কাণ্ড ও মূল (শিকড়) অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
- অ্যালার্জি দূর করতে: শিশুদের ত্বকের অ্যালার্জি বা চুলকানিজনিত সমস্যা দূর করতেও এই উদ্ভিদের রস ব্যবহার করা হয়।
- ব্যবহারের নিয়ম: দেশি গোবুরার কাণ্ড এবং মূল থেকে তৈরি তাজা রস দুধের সাথে একসাথে ফুটিয়ে শিশুদের ঔষধ হিসেবে খাওয়ানো হয়।
অন্যান্য তথ্য:
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৮ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) দেশি গোবুরা প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে দেশি গোবুরা সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।
আরো পড়ুন:
- লটকন (Burmese Grape) ফলের উপকারিতা, ভেষজ গুণাগুণ ও চাষ পদ্ধতি
- নিম গাছের উপকারিতা, ঔষধি গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য ও বহুমুখী ব্যবহার
- কেচুয়ান গাছ: সাপের বিষের প্রতিষেধক ও কটু স্বাদের এক বিরল পাহাড়ি বৃক্ষ
- শিয়াল বুকা: চিরহরিৎ অরণ্যের এক অনন্য বন্য ফল ও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়
- ক্ষুদিজাম বা ব্ল্যাক কারেন্ট ট্রি: নবজাতকের সুরক্ষায় ও আদিবাসী চিকিৎসায় এক অনন্য ভেষজ বৃক্ষ
- পাহাড়ি শিয়াল বুকা অরণ্যে জন্মানো ফলজ ও ভেষজ গুনসম্পন্ন বৃক্ষ
- চাকোয়া গাছ: চিরহরিৎ বনের এক অনন্য বৃক্ষের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও ব্যবহার
- ছাতিম গাছ (Alstonia scholaris): এর পরিচিতি, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ভেষজ ব্যবহার
- কাইনজাল গাছ (Bischofia javanica) এর পরিচিতি ও ভেষজ উপকারিতা
- খয়ের গাছের ঔষধি গুণাগুণ ও উপকারিতা: পানের লাল আভা থেকে মহৌষধ
- তেলেঙ্গামাই (Actephila excelsa): পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও এর বহুমুখী ব্যবহার
- দিয়েন্দ লাকরাও (Actinodaphne obovata): এই বিরল বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য ও বিস্তৃতি
- চাকুয়া কড়ই গাছের পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও এর নানাবিধ ব্যবহার
- শিল কড়ই বা মটর কড়ই গাছের পরিচিতি: বৈশিষ্ট্য, চাষাবাদ ও এর বহুমুখী গুরুত্ব
- সাদা কড়ই বা লোহা শিরিষ গাছের বৈশিষ্ট্য ও বহুমুখী ব্যবহার: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
- ওষধি উদ্ভিদ ভোলাটুকি বা ভেলা (Semecarpus anacardium) এর পরিচিতি ও গুণাগুণ
- বাবলা গাছ (Vachellia nilotica): পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- শিলারস গাছের পরিচিতি, প্রজাতি এবং মানবদেহে এর অনন্য ঔষধি গুণাগুণ
- পানি কেশুরী বাংলাদেশের বনাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড়কুচ পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ময়নাকাঁটা বাংলাদেশে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- নাগেশ্বর পার্বত্য অঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- কুমারি বুড়া দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো উপকারি বৃক্ষ
- সিন্দুরি গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মে
- শাল গাছ দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ছোট জাগরা বাংলাদেশের পাহাড়ীঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- দেশি জাগরা দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ বৃক্ষ
- ভল্লা পাতা জাগরা এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড় কুকুরচিতা চিরহরিৎ ভেষজ বৃক্ষ
- বড়হরিনা ভেষজ গুণসম্পন্ন ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ
তথ্যসূত্র:
১. মাহবুবা খানম (আগস্ট ২০১০) “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। খন্ড ৮ম, পৃষ্ঠা ৪১৯-৪২০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0
২. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২১ মার্চ ২০২১ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ০৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।