আতা বা নোনা আতা (যার বৈজ্ঞানিক নাম: Annona reticulata এবং ইংরেজি নাম: Bullock’s Heart) হলো অ্যানোনেসি (Annonaceae) পরিবারের একটি সুপরিচিত সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই গাছটি সাধারণত মাঝারি উচ্চতাবিশিষ্ট হয়ে থাকে। তবে আবহাওয়া, মাটি ও পরিবেশের ভিন্নতার কারণে এর উচ্চতা কোথাও ২০ ফুট, আবার কোথাও ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। নোনা আতার পাতাগুলো বেশ লম্বাটে ধরনের হয়। এগুলো লম্বায় সাধারণত ৫ থেকে ৮ ইঞ্চি এবং চওড়ায় প্রায় ১.৫ থেকে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে।
ফুল ও পাপড়ির বৈশিষ্ট্য:
এই গাছের ফুলগুলো এককভাবে না ফুটে সাধারণত গুচ্ছ আকারে ফোটে। ডালের এক একটি অংশে ২ থেকে ৩টি ফুল একসাথে ফুটে থাকতে দেখা যায়। নোনা আতা ফুলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি ফুলে ৩টি করে পাপড়ি থাকে।
ফলের আকৃতি ও মৌসুম:
নোনা আতার ফল দেখতে মূলত গোলাকার, তবে কিছুটা লম্বাটে ধরনের হয়ে থাকে। কাঁচা অবস্থায় ফলটি সবুজ থাকলেও, পাকার পর ফলের রঙে পরিবর্তন আসে। পাকা অবস্থায় ফলের গায়ের রঙ পীতের আভাযুক্ত (হলদেটে) বা হালকা লালচে বর্ণ ধারণ করে। এই উদ্ভিদের ফুল ও ফল আসার একটি নির্দিষ্ট ঋতুচক্র রয়েছে; গাছে সাধারণত গরমকালে ফুল ফোটে এবং শরৎকাল আসতে আসতে ফল পরিপক্ব হতে বা ধরতে শুরু করে।
বিভিন্ন অসুখে ব্যবহার:
আতা বা নোনা আতা বিভিন্ন অসুখে ব্যবহার করা হয়। এটি উকুন হলে, ফোঁড়া বা বিষফোঁড়া হলে, ক্রিমি হলে, রক্ত আমাশয় হলে এবং গর্ভপাতে এবং পশুদের ক্ষতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হয়। নোনা আতার বীজ, পাতা, শুকনো ফল ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উকুন হলে: নোনা ফলের শুকনা বীজ ভালোভাবে গুড়া করে ১০ গ্রাম (মেয়েদের ক্ষেত্রে ২০ গ্রাম) পানির সাথে গুলে (পানির পরিমাণ হবে এক কাপ) মাথায় দিতে হবে গোসল করতে যাবার তিন ঘণ্টা আগে; তাহলে উকুন দূর হবে। তবে মনে রাখতে হবে, নোনা বীজের শাঁস খুবই বিষাক্ত। কাজেই মাথায় প্রয়োগ করার সময় যথেষ্ট সাবধান হতে হবে।
ফোড়া ও বিষ ফেঁড়ায়: উভয় ক্ষেত্রেই নোনা গাছের কচি টাটকা পাতা (২০ থেকে ৩০টি বেটে তা বিষ ফোঁড়ায় প্রলেপ দিলে খুব তাড়াতাড়ি ফেটে যায়।
পেট খারাপে: কাঁচা এবং শুনা নোনা ফল ৩০ গ্রাম গুড়া করে ঠাণ্ডা পানির সাথে দিনে দু’বার খেলেই উপকার হয়।
জ্বর ও শ্বাসকাশে: নোনা গাছের শুকনো ছাল ভালোভাবে গুড়া করে বয়স অনুপাতে ৫০০ মিলিগ্রাম বা একগ্রাম এক কাপ ঠাণ্ডা পানির সাথে মিশিয়ে মোট দু’বার খেলেই জ্বর ছেড়ে যায় এবং শ্বাসকাশ কমে।
ক্রিমি রোগে: নোনা গাছের কচি পাতার টাটকা রস ১০ মিলিলিটার এক কাপ ঠাণ্ডা পানিতে মিশিয়ে সকালে একবার খেলে মলের সাথে ক্রিমি মৃত বা জীবন্ত অবস্থায় বের হয়ে আসে। একবার খেলে যদি উপকার না হয় তবে, দ্বিতীয় দিন একইভাবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে হবে।
রক্ত আমাশয়ে: কাঁচা অবস্থায় শুকিয়ে রাখা নোনা ফলের গুঁড়া ২০ গ্রাম এবং ছাগলের দুধ আধা কাপ, এ দুটি একসাথে মিশিয়ে রোজ সকালে ও সন্ধ্যায় খেলে উপকার হবে।
গর্ভপাতে: নোনা ফলের শুকনা বীজের গুঁড়া যোনির দ্বিতীয় আবর্তে প্রয়োগ করলে গর্ভপাত ঘটে। তবে গর্ভে শিশু দু’মাসের বেশি হলে সে রকম ঝুঁকি নেয়া উচিত নয়। কারণ এতে গর্ভবতীর মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।
পশুদের ক্ষতে: অনেক সময় দেখা যায়, গৃহপালিত পশুসহ গবাদি পশুদের ঘা, বিষাক্ত হয়ে তাতে ছোট পোকার সৃষ্টি হয়। অনেক সময় পোকার আকার এত ছোট থাকে যে খালিচোখে দেখা যায় না। এ ধরনের ক্ষতে নোনা গাছের কচি পাতা আট থেকে দশটি এবং তামা পাতা মাঝারি আকারের একটি, উভয়কে একসাথে বেটে প্রয়োগ করলে পোকা মরে। মাত্র দু’দিন একবার করে প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট।
আরো পড়ুন:
- কেচুয়ান গাছ: সাপের বিষের প্রতিষেধক ও কটু স্বাদের এক বিরল পাহাড়ি বৃক্ষ
- শিয়াল বুকা: চিরহরিৎ অরণ্যের এক অনন্য বন্য ফল ও এর বৈজ্ঞানিক পরিচয়
- ক্ষুদিজাম বা ব্ল্যাক কারেন্ট ট্রি: নবজাতকের সুরক্ষায় ও আদিবাসী চিকিৎসায় এক অনন্য ভেষজ বৃক্ষ
- পাহাড়ি শিয়াল বুকা অরণ্যে জন্মানো ফলজ ও ভেষজ গুনসম্পন্ন বৃক্ষ
- চাকোয়া গাছ: চিরহরিৎ বনের এক অনন্য বৃক্ষের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও ব্যবহার
- ছাতিম গাছ (Alstonia scholaris): এর পরিচিতি, বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ভেষজ ব্যবহার
- কাইনজাল গাছ (Bischofia javanica) এর পরিচিতি ও ভেষজ উপকারিতা
- খয়ের গাছের ঔষধি গুণাগুণ ও উপকারিতা: পানের লাল আভা থেকে মহৌষধ
- তেলেঙ্গামাই (Actephila excelsa): পরিচিতি, পুষ্টিগুণ ও এর বহুমুখী ব্যবহার
- দিয়েন্দ লাকরাও (Actinodaphne obovata): এই বিরল বৃক্ষের বৈশিষ্ট্য ও বিস্তৃতি
- চাকুয়া কড়ই গাছের পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও এর নানাবিধ ব্যবহার
- শিল কড়ই বা মটর কড়ই গাছের পরিচিতি: বৈশিষ্ট্য, চাষাবাদ ও এর বহুমুখী গুরুত্ব
- সাদা কড়ই বা লোহা শিরিষ গাছের বৈশিষ্ট্য ও বহুমুখী ব্যবহার: একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
- ওষধি উদ্ভিদ ভোলাটুকি বা ভেলা (Semecarpus anacardium) এর পরিচিতি ও গুণাগুণ
- বাবলা গাছ (Vachellia nilotica): পরিচিতি, বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- শিলারস গাছের পরিচিতি, প্রজাতি এবং মানবদেহে এর অনন্য ঔষধি গুণাগুণ
- পানি কেশুরী বাংলাদেশের বনাঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড়কুচ পার্বত্যঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ময়নাকাঁটা বাংলাদেশে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- নাগেশ্বর পার্বত্য অঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- কুমারি বুড়া দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো উপকারি বৃক্ষ
- সিন্দুরি গাছ বাংলাদেশের সর্বত্রে জন্মে
- শাল গাছ দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- ছোট জাগরা বাংলাদেশের পাহাড়ীঞ্চলে জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- দেশি জাগরা দক্ষিণ এশিয়ার ভেষজ বৃক্ষ
- ভল্লা পাতা জাগরা এশিয়ায় জন্মানো ভেষজ বৃক্ষ
- বড় কুকুরচিতা চিরহরিৎ ভেষজ বৃক্ষ
- বড়হরিনা ভেষজ গুণসম্পন্ন ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ
- পুবদেশি বনচালতা বাংলাদেশের ভেষজ উদ্ভিদ
- পলক জুঁই সুগন্ধি আলংকারিক বৃক্ষ
সতর্কীকরণ:
ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
তথ্যসূত্র:
১. আঃ খালেক মোল্লা সম্পাদিত;লোকমান হেকিমের কবিরাজী চিকিৎসা; মণিহার বুক ডিপো, ঢাকা, অক্টোবর ২০০৯; পৃষ্ঠা ১৩৯-১৪০।
৩. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১ আগস্ট ২০১৯ তারিখে এবং সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে রোদ্দুরে ডট কমের সম্পাদক।