বেলী ফুল এশিয়া ও ইউরোপের জনপ্রিয় ভেষজ গুণ সম্পন্ন আলংকারিক উদ্ভিদ

ভূমিকা: বেলী, বন মল্লিকা, মোগরা ( বৈজ্ঞানিক নাম: Jasminum sambac, ইংরেজি নাম: Arabian Jasmine) হচ্ছে অলিয়াসি পরিবারের জ্যাসমিনাম  গণের একটি সপুষ্পক গুল্ম। এটি ছোট আকারের ঝোপাল গুল্ম। বেলীর কচি রোমশ ডালে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ফুল ফোটে। কয়েকটি ফুল মিলে একটি থোকায় হয় বেলীর। শীতকালে গাছ ছেঁটে দিতে হয়। টবেও বেলী গাছ ভালো থাকে। এটিকে বাংলাদেশে আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে বা গৃহে চাষাবাদ করা হয়। বাড়ির টবে বা বাগানের শোভাবর্ধন করে। তবে এটি আকারে বেশি বড় হয় না।[১]

বৈজ্ঞানিক নাম: Jasminum sambac (L.) Ait., Hort. Kew. 1: 8 (1789). সমনাম: Nyctanthes sambac L. (1753). ইংরেজি নাম: Arabian Jasmine. স্থানীয় নাম: বেলী, বন মল্লিকা, মোগরা। জীববৈজ্ঞানিকশ্রেণীবিন্যাসজগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Angiosperms অবিন্যাসিত: Edicots অবিন্যাসিত: Asterids  বর্গ: Lamiales   পরিবার: Oleaceae  গণ: Jasminum প্রজাতি: Jasminum sambac.

 বর্ণনা:

বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বেলী ফুল খুব পরিচিত একটি নাম। বেলী গাছ দেখতে খাটো, সাধারণত ৬০-১০০ সেমি ও ঝোপালো। এদের কাণ্ড সরু ও দুর্বল, লম্বা হয়ে গেলে গাছের আশেপাশে দিকে হেলে পড়ে। কোনো কোনো বেলীর জাত লতানো স্বভাব প্রদর্শন করে। বর্ষাকালে গাছে বেশি ফুল ফোটে।[২]

এই গুল্মটি অপরিপাটী বা হামাগুড়ি দেওয়া আরোহী বা লতান। কচি অবস্থায় পর্ব থেকে মূল গজায় এবং সেসময় অর্ধারোহী বা উর্ধ্বগ ও ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা। গাছের পাতা একক ফলকবিশিষ্ট, ডিম্বাকার হয়। পাতার দৈর্ঘ্য আড়াই থেকে নয় সেমি ও প্রস্থ দুই থেকে সাড়ে ছয় সেমি পর্যন্ত। ক্ষীণ, পাদদেশ অর্ধহৃৎপিণ্ডাকার থেকে ঢেউখেলানো, মসৃণ বা প্রধান শিরা বরাবর সুক্ষ্ম রোমাবৃত।

পুষ্পমঞ্জরী ৩টি থাকে। পুষ্পবিশিষ্ট স্তবক অথবা অসংখ্য পুষ্পবিশিষ্ট একটি গুচ্ছ হয়ে ফোটে। ফুল একক বা দ্বৈত অর্থাৎ আবাদী উপজাতে। বৃতি ৭-১০ খন্ডিত, আকার ২.৫-৭.০ মিমি লম্বা, সুক্ষ্ম রোমাবৃত। দলনল ৭-১৫ মিমি লম্বা, ৫ থেকে অনেক খন্ডকবিশিষ্ট, ডিম্বাকার বা দীর্ঘায়ত, ৮-১৫ মিমি লম্বা। ফুলের রং প্রধানত সাদা ও অতি সুগন্ধিময়।[৩]

ক্রোমোসোম সংখ্যা :

2n = ২৬, ৩৯[৪] (Kumar and Subramaniam, 1986).

বংশ বিস্তার ও চাষাবাদ:

অর্লিয়ান্সের রাণী, বেলী ফুল, আলোকচিত্র: Jun’s World

সুগন্ধি ফুলের মধ্যে বেলী জাতীয় ফুলগুলি অন্যতম। কারণ এদের মৃদুমন্দ সুমিষ্ট গন্ধের জন্য এই জাতীয় ফুলের কদর বেশি। সাধারণতঃ জুলাই মাসে বেলীর চারা রোপণ করা হয়। কাটিং বা শাখা-কলম, দাবা-কলম দুটি অথবা মাতৃ উদ্ভিদ থেকে শিকড়সহ পৃথক চারা বংশ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়। এদের ফল কালো বর্ণের বেরীর মতো। বৃতি কর্তৃক বেষ্টিত। বেলী গাছে বর্ষাকালে জলসেচনের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। শুধু মাঝে মাঝে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে মাটি আলগা করে দিতে হবে এবং আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে নিয়মিত সেচ দিতে হবে।

গাছ ছাঁটাইয়ের উপর ফুল উৎপাদন নির্ভর করে। জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি গাছের শাখা-প্রশাখা ছাঁটায় করতে হবে। ছাঁইয়ের ১৫ দিন আগে হতে জমিতে জলসেচ বন্ধ করতে হবে। বেলী গাছের বর্ধনশীল নরম কান্ড ও শাখায় পুষ্প মুকুল আসে বলিয়া ইহাদের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট সার প্রয়োগ করা দরকার । গাছ ছাঁটাইয়ের পর জানুয়ারী মাসে একবার ও জুলাই মাসে আর একবার সার প্রয়োগ করতে হয়।[৫]

বিস্তৃতি:

বেলীর উৎপত্তি সম্ভবত ভারত থেকে এবং তৃতীয় শতকের দিকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াতে নিয়ে আসা হয়; তারপর থেকেই এই গাছে অধিক সুগন্ধিযুক্ত ফুলের জন্য সমগ্র মালয়েশিয়ান অঞ্চলে ব্যাপক চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশে ইহা বাগানে চাষ করা হয়।[৩]

অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও ভেষজ গুণ:

বেলী পাতার ক্বাথ অভ্যন্তরীনভাবে জ্বরে ব্যবহৃত হয়। অনেকে মনে করেন শিকড় থেকে প্রস্তুত টিংচারে অতি শক্তিশালী বেদনা নাশক, চেতনা নাশক এবং ক্ষত নিরাময়ক গুণাবলী বিদ্যমান। শিকড় মচকানো এবং হাড় ভাঙ্গায় পট্টি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শিকড় ফুটানো ক্বাথ বা পুষ্প থেতলানো ক্বাথ ফুসফুসীয় সর্দিরোগে, ব্রংকাইটিস এবং এ্যাজমাতে ব্যবহৃত হয়। পুষ্পের সুগন্ধ এবং শীতলীকারক প্রভাবের জন্য সরাসরি অথবা সুগন্ধি হিসেবে ইহার পুষ্প ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়। ইহার অত্যাবশকীয় তৈলের জন্য ভারতে উদ্ভিদটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। (de Padua and Bunyapraphatsara, 1999). মালা তৈরীতে এ ফুলের ব্যবহার ব্যাপক। থাইল্যাণ্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে প্রচুর পরিমাণ বেলী ফুলের মালা বাজারে বিক্রি হয়।

জাতিতাত্বিক ব্যবহার:

মালয়েশিয়াতে চর্মরোগে এবং ক্ষত নিরাময়ে ইহার পাতা পট্টি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইনের মহিলাগণ ইহার পাতা বা ফুল শুকিয়ে চূর্ণ করে দুগ্ধবর্ধক হিসেবে স্তনে ব্যবহার করে থাকে। ফুল থেতলানো ক্বাথ কুঁচকানো প্রতিরোধক হিসেবে নেত্রপল্লবে ব্যবহৃত হয়। থাইল্যান্ডে ইহার পাতা কোষ্ঠবদ্ধতাকারী এবং এ্যামিবা প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইহার সজীব শিকড় মালয়েশিয়াতে রতিজ চিকিৎসায় এবং ইন্দোনেশিয়াতে জ্বরের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। চীন এবং ইন্দোনেশিয়াতে ‘জেসমিন চা’ সুগন্ধি করতে ইহার gout 7990 91 (de Padua and Bunyapraphatsara, 1999).

অন্যান্য তথ্য:

বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ৯ম খণ্ডে (আগস্ট ২০১০) বেলী প্রজাতিটির সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এদের শীঘ্র কোনো সংকটের কারণ দেখা যায় না এবং বাংলাদেশে এটি আশঙ্কামুক্ত হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে বেলী সংরক্ষণের জন্য কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। প্রজাতিটি সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে যে এই প্রজাতিটির বর্তমানে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই।[৩]

তথ্যসূত্র:

১. দ্বিজেন শর্মা লেখক; বাংলা একাডেমী ; ফুলগুলি যেন কথা; মে ১৯৮৮; পৃষ্ঠা- ৫৮, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৪১২-৭

২. ড. মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ ফুলের চাষ প্রথম সংস্করণ ২০০৩ ঢাকা, দিব্যপ্রকাশ, পৃষ্ঠা ১০৭। আইএসবিএন 984-483-108-3

৩. এম আহসান হাবীব (আগস্ট ২০১০)। অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস”  আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩৫০। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

৪. Kumar, V. and Subramaniam,, B. 1986 Chromosome Atlas of Flowering Plants of the Indian Subcontinent. Vol.1. Dicotyledons Botanical Survey of India, Calcutta. 464 pp.  

৫. সিরাজুল করিম আধুনিক পদ্ধতিতে ফুলের চাষ প্রথম প্রকাশ ২০০১ ঢাকা, গতিধারা, পৃষ্ঠা ১৩৩-১৩৪। আইএসবিএন 984-461-128-7

আরো পড়ুন:  জলার সুখদর্শন বাংলাদেশে জন্মানো বাহারি বিরুৎ

Leave a Comment

error: Content is protected !!