সুমাত্রার গণ্ডার পৃথিবীর মহাবিপন্ন গণ্ডার

সুমাত্রার গণ্ডার পৃথিবীর মহাবিপন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের বৈজ্ঞানিক নাম (Dicerorhinus sumatrensis) এবং সাধারণ নাম হচ্ছে Sumatran rhinoceros.

পৃথিবীতে যে তিন প্রজাতির গণ্ডার পাওয়া যায় তার ভেতর এটি সবচেয়ে ছোট এবং এটির বিলুপ্তির ঝুঁকিও সবচেয়ে বেশি। এই প্রজাতির গণ্ডার এখন শুধু ইন্দোনেশিয়াতে পাওয়া যায়। যদিও অতীতে এরা ভুটানের হিমালয় অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ভারত, চীনের উত্তরাঞ্চল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও মালয় উপদ্বীপেও বসবাস করত। এদের ব্যাপারে একটি মজার তথ্য হলো, বিভিন্ন ধরনের গন্ডারের মধ্যে এরাই সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করে।

বর্তমান অবস্থা: প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (আইইউসিএন) সুমাত্রার গণ্ডারকে বিশ্বে মহাবিপন্ন প্রজাতির প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত ২০ বছরে সুমাত্রীয় গণ্ডারের সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গণ্ডার অবৈধ শিকারিদের হাতে প্রাণ হারায়। গণ্ডারের শিংসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ  শক্তিবর্ধক নানা কবিরাজি চিনা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া, অবৈধভাবে বন-জঙ্গল উজাড় করায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে গণ্ডারের আবাসস্থল।[১]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষকের মতে, সর্বশেষ বরফ যুগ থেকে সুমাত্রার গণ্ডার বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে আরম্ভ করে। সেই সময় থেকে এদের বসতি ছোট হয়ে আসছিল। এরপর মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে এবং এই বাড়তি মানুষের চাপ গিয়ে পড়ছে গণ্ডারের আবাসে। এখন মাত্র আড়াইশ’র কাছাকাছি এই জাতীয় গণ্ডার বিভিন্ন বনাঞ্চলে বেঁচে রয়েছে।[২]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের মহাবিপন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা করছেন টেরি রথ। তিনি বলেন, অনেক বছর আগ থেকেই বিলুপ্তির দিকে গেছে এই সুমাত্রার গণ্ডার প্রাণীটি। সেটা অন্তত পঁচিশ লাখ ৮৮ বছর আগ থেকেই হবে। সিনসিনাটি চিড়িয়াখানার ইফুহ নামের একটি পুরুষ গণ্ডারের ডিএনএ’র ওপর গবেষণাটি চালানো হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সুমাত্রা গণ্ডারের পুরো জেনমের পরম্পরা বিশ্লেষণ করেছেন। ইফুহ নব্বইয়ের দশক থেকে ওই চিড়িয়াখানায় বসবাস করছিল। কিন্তু চার বছর আগে তেত্রিশ বছরে তার মৃত্যু হয়। তখন জিন ভাণ্ডারে তার বংশগতি সম্পর্কিত তথ্য উপাত্ত রেখে দেয়া হয়েছিলো। ডিএনএ বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা সুমাত্রার গণ্ডারের আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণে সক্ষম হন। প্রায় সাড়ে নয় লাখ বছর আগে পৃথিবীতে ষাট হাজার সুমাত্রা গণ্ডার ছিল। কিন্তু বারো হাজার বছর আগে সুমাত্রা গণ্ডার তাদের অধিকাংশ বসবাসযোগ্য স্থান হারিয়ে ফেলে।[৩]

আরো পড়ুন:  ভারতে ২০১২ সালের প্রথম ৯ মাসে ৬৯ বাঘ ও ৩৯ গণ্ডারের মৃত্যু

বাংলাদেশে অবস্থা: বাংলাদেশে সর্বশেষ এই গণ্ডার ধরা পড়েছে চট্টগ্রামের কাছাকাছি সাঙ্গু নদীতে ১৮৬৭ সালের নভেম্বর কিংবা ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে।[৪] এই প্রজাতির গণ্ডার বাংলাদেশসহ গোটা দুনিয়ায় মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। ১৮৭২ সালে লন্ডন চিড়িয়াখানায় একটি পুরুষ এবং মেয়ে সুমাত্রার গণ্ডার নেয়া হয় যেগুলো চট্টগ্রামে ধরা পড়ে। ‘বেগম’ নামের উক্ত মেয়ে গণ্ডারটি ১৯০০ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিল , যা একটি বন্দি গণ্ডারের রেকর্ড জীবনকাল।[৫]

সুমাত্রার গণ্ডার সংরক্ষণ প্রোগ্রামের আওতায় বুকিত বরিসন সেলেতান জাতীয় উদ্যান এবং ওয়ে কাম্বাস জাতীয় উদ্যানে এই প্রজাতির গণ্ডারকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়াও কাম্বাস জাতীয় উদ্যানের স্যাঞ্চুয়ারিতে বন্দি অবস্থায় প্রজননের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রথম সাফল্য আসে ২৩ জুন, ২০১২ তে।[৬]

৯ আগস্ট, ২০১২ তে রেডিও তেহরানের এক খবরে জানা যায় ইন্দোনেশিয়ার একটি জাতীয় পার্কে গোপন ক্যামেরা দিয়ে বিরল প্রজাতির সাতটি সুমাত্রার গণ্ডারের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। সুমাত্রা দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত মাউন্ট লিউসার জাতীয় উদ্যানে গত ২৬ বছরে এ প্রজাতির কোনো গণ্ডার  দেখা যায়নি এবং এ  সব গণ্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়েছিল। লিউসার ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন পরিচালিত প্রকল্পের দলনেতা তারমিজি এ কথা জানান।[৭]

গত ২০১১ সালের বছরের জুন থেকে এবং ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  এ পার্কে ২৮টি ইনফ্রারেড ক্যামেরা বসানো হয়। এসব ক্যামেরায় তোলা  ১০০০টি ছবিতে ছয়টি মাদী এবং একটি মর্দা সুমাত্রীয় গণ্ডার দেখা গেছে। তারমিজি বলেন, লিউসার জাতীয় উদ্যানে যে সুমাত্রার গণ্ডার আছে তা নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটাবে এই সব ছবি। আর এ কারণে বিরল প্রজাতির এ গণ্ডার প্রজাতি সংরক্ষণের  প্রচেষ্টা আরো জোরদার হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।[৮]

তথ্যসূত্র:

১. রেডিও তেহরান, “বিরল প্রজাতির গণ্ডারের খোঁজ পাওয়া গেল ইন্দোনেশিয়ার পার্কে”, ৯ আগস্ট, ২০১২, ইউআরএল: http://bangla.irib.ir/2010-04-21-08-29-09/2010-07-19-06-59-02/item/39507.

আরো পড়ুন:  বাংলাদেশে চিতাবাঘের বর্তমান অবস্থা

২ দৈনিক জনকণ্ঠ, “সুমাত্রা গণ্ডারের জেনম উদ্ঘাটন” ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭, অনলাইন ভার্সন, ইউআরএল: http://web.dailyjanakantha.com/details/article/314655/সুমাত্রা-গণ্ডারের-জেনম-উদ্ঘাটন/

৩ পূর্বোক্ত।

জিয়া উদ্দিন আহমেদ (সম্পা.), বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ: স্তন্যপায়ী, খণ্ড: ২৭ (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০০৯), পৃ. ১৫৯-১৬১।

৫ Lydekker, Richard (1900). The great and small game of India, Burma, and Tibet. Asian Educational Services. ISBN 978-81-206-1162-7.

৬. van Strien, N.J., Manullang, B., Sectionov, Isnan, W., Khan, M.K.M, Sumardja, E., Ellis, S., Han, K.H., Boeadi, Payne, J. & Bradley Martin, E. 2008. Dicerorhinus sumatrensis. In: IUCN 2011. Url: http://www.iucnredlist.org/details/6553/0; IUCN Red List of Threatened Species. Version 2011.2.

৭. রেডিও তেহরান, পূর্বোক্ত।

৮. রেডিও তেহরান, পূর্বোক্ত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!