সুন্দরবনের ডলফিন ও তিমি অভয়ারণ্য: বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য দলিল

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এর জলসীমা জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য লীলাভূমি। বিশেষ করে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগরের অববাহিকা বহু বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এরা ‘সিটাসিয়া’ (Cetacea) বর্গের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই জলজ প্রাণীদের ভূমিকা অপরিসীম। ২০০৯ সালের একটি ঐতিহাসিক গবেষণা এবং পরবর্তী বিভিন্ন সমীক্ষায় সুন্দরবনের এই জলজ সম্পদের এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাংলাদেশে ডলফিন, তিমি ও পরপয়েসের বৈচিত্র্য

বাংলাদেশের জলসীমায় সিটাসিয়া বর্গের অন্তর্গত প্রায় ১০ প্রজাতির তিমি, ডলফিন এবং পরপয়েস (Porpoise) পাওয়া যায়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের দেশের নদী ও সাগরে মিঠাপানি ও নোনাপানির প্রাণীদের এক অপূর্ব সহাবস্থান দেখা যায়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ১০ প্রজাতির সামুদ্রিক ডলফিন এবং ৬ প্রজাতির মিঠাপানির ডলফিনের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। এই বিপুল প্রজাতির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, আমাদের সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ইকোসিস্টেম জলজ প্রাণীদের টিকে থাকার জন্য কতটা অনুকূল।

জলজ প্রাণীদের বর্তমান অস্তিত্ব সংকট ও রেড লিস্টের শ্রেণিবিভাগ

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে বর্তমানে এই জলজ স্তন্যপায়ীরা চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এবং বাংলাদেশের বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এদের বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ:

  • মিঠাপানির ডলফিন: আমাদের দেশের একমাত্র নদী বা মিঠাপানির ডলফিন প্রজাতি হলো শুশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিন (Platanista gangetica)। নদী দূষণ, নাব্যতা সংকট এবং জালের ব্যবহারের কারণে এই প্রজাতিটি বর্তমানে বাংলাদেশে ‘বিপন্ন’ (Endangered) হিসেবে চিহ্নিত।
  • সামুদ্রিক ডলফিন: বাংলাদেশের জলসীমায় প্রাপ্ত ৪টি প্রধান সামুদ্রিক ডলফিন প্রজাতির মধ্যে ২টি প্রজাতি চরমভাবে বিলুপ্তপ্রায় (Critically Endangered)। অন্য ২টি প্রজাতির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব (Data Deficient) রয়েছে, যার কারণে এদের সঠিক অবস্থা মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি।
  • তিমি: একসময় বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে নীল তিমি ও ফিন তিমির (Fin Whale) নিয়মিত দেখা মিলত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, ফিন তিমি এখন আমাদের জলসীমা থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সুন্দরবনের ৩১ কিলোমিটার ডলফিন অভয়ারণ্য (Safety Zone)

ডলফিন এবং অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবাহিত নদী ও খালের প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলকে ‘ডলফিন সেফটি জোন’ বা নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এই বিশেষ অভয়ারণ্যটিতে মূলত ৬ প্রজাতির ডলফিন, ১ প্রজাতির পরপয়েস এবং ৩ প্রজাতির তিমির অবাধ বিচরণ ও বংশবৃদ্ধির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এই জোনে সব ধরনের বাণিজ্যিক মাছ ধরা এবং ভারী নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের জলজ প্রাণীর পরিসংখ্যান (গবেষণা প্রতিবেদন)

২০০৯ সালের জুন মাসে সুন্দরবন এবং এর সংলগ্ন গভীর সমুদ্রের ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ (Swatch of No Ground) এলাকায় একটি ব্যাপকভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়। এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, কারণ এতে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক ডলফিনের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে। সেই ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের প্রধান পরিসংখ্যানগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ইরাবতী ডলফিন (Irrawaddy Dolphin)

বৈজ্ঞানিক নাম Orcaella brevirostris। বিশ্বজুড়ে এই ডলফিনটি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। যদিও আইইউসিএন-এর বৈশ্বিক রেড লিস্টে একে অনেক সময় ‘তথ্য-অপ্রতুল’ বলা হয়, তবে ফিলিপাইনের মালামপায়া সাউন্ড, থাইল্যান্ডের সংখলা লেক, মায়ানমারের আইয়ারওয়াদি এবং কম্বোডিয়ার মেকং নদীতে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় আলাদাভাবে ‘গুরুতরভাবে বিলুপ্তপ্রায়’ (Critically Endangered) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ২০০৯ সালের গবেষণায় সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে এদের মোট সংখ্যা রেকর্ড করা হয়েছিল প্রায় ৫,৪০০টি, যা বিশ্বব্যাপী এই প্রজাতির বৃহত্তম জনসংখ্যার একটি।

২. ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন বা গোলাপী ডলফিন

স্থানীয়ভাবে এটি ‘গোলাপী ডলফিন’ নামে পরিচিত, যার বৈজ্ঞানিক নাম Sousa chinensis। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এটি অত্যন্ত বিপন্ন ও বিরল একটি প্রজাতি। সুন্দরবনের ১৩টি সুনির্দিষ্ট স্পটে এই সুন্দর গোলাপী ডলফিনের প্রায় ৪০টি সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

৩. ইন্দো-প্যাসিফিক ফিনলেস পরপয়েস (Finless Porpoise)

ডলফিনের মতো দেখতে হলেও এদের পিঠে কোনো পাখনা বা ফিন থাকে না। সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৪টি ভিন্ন স্পটে এই বিশেষ প্রজাতির প্রায় ১,৩৮২টি পরপয়েসের সন্ধান পাওয়া যায়।

৪. ইন্দো-প্যাসিফিক বোতলনাক ডলফিন (Bottlenose Dolphin)

বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে পরিচিত বোতলনাক ডলফিনও সুন্দরবনে বেশ ভালো সংখ্যায় রয়েছে। সুন্দরবনের ভেতরের নদীপথের ১১ মাইলের কাছাকাছি ১৪টি স্পটে মোট ১,০০০টি বোতলনাক ডলফিন রেকর্ড করা হয়েছিল।

৫. প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিন (Spotted Dolphin)

এই ডলফিনগুলোর গায়ে ছিটছিটে দাগ বা স্পট থাকে। সুন্দরবনের সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ৮টি ভিন্ন স্পটে প্রায় ৮০০টি স্পটেড ডলফিনের দেখা মিলেছিল।

৬. গাঙ্গেয় ডলফিন বা নদীপারের শুশুক

সুন্দরবনের মিঠা ও আধা-লোনা পানির বিভিন্ন নদী ও খালের ১৩টি স্পটে মোট ২২৫টি গাঙ্গেয় ডলফিন গণনা করা হয়েছিল।

৭. ব্রাইডস তিমি (Bryde’s Whale) ও স্পার্ম তিমি (Sperm Whale)

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের গভীর নদী ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে বিশালাকার ব্রাইডস তিমি এবং স্পার্ম তিমির দেখাও মেলে। ২০০৯ সালের সেই গবেষণায় এই অঞ্চলে প্রায় ৫০টি ব্রাইডস তিমির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছিল।

উপসংহার: আমাদের করণীয়

২০০৯ সালের গবেষণার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক দূষণ এবং চোরা শিকারিদের কারণে এই জলজ প্রাণীরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সুন্দরবনের এই ৩১ কিলোমিটারের অভয়ারণ্য রক্ষা করা কেবল ডলফিন বাঁচানোর জন্য নয়, বরং আমাদের পুরো সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। পর্যটক ও স্থানীয় জেলেদের সচেতনতা এবং সরকারি আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে বাংলাদেশের এই অনন্য জলজ সম্পদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে।[১]

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: সুন্দরবনের ডলফিন অভয়ারণ্য বা সেফটি জোনের দৈর্ঘ্য কত?
উত্তর: সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিপন্ন জলজ প্রাণীদের নিরাপদ আবাসের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী ও খালের চ্যানেলকে বিশেষ ডলফিন সেফটি জোন বা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।

প্রশ্ন ২: বাংলাদেশে কোন কোন প্রজাতির ডলফিন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে?
উত্তর: বাংলাদেশে মিঠাপানির ডলফিন বা গাঙ্গেয় শুশুক বর্তমানে ‘বিপন্ন’ (Endangered) অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ৪টি সামুদ্রিক ডলফিন প্রজাতির মধ্যে ২টি প্রজাতি ‘গুরুতরভাবে বিলুপ্তপ্রায়’ (Critically Endangered) হিসেবে চিহ্নিত।

প্রশ্ন ৩: গোলাপি ডলফিনের বৈজ্ঞানিক নাম কী এবং এটি কেন বিশেষ?
উত্তর: গোলাপি ডলফিনের বৈজ্ঞানিক নাম Sousa chinensis (ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্পব্যাক ডলফিন)। এটি বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত বিরল এবং গুরুতরভাবে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি। এর হালকা গোলাপি রঙের শরীর এবং অনন্য গঠনের কারণে এটি সবার নজর কাড়ে।

প্রশ্ন ৪: সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড (Swatch of No Ground) কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ হলো বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত একটি বিশাল ও গভীর সামুদ্রিক গিরিখাত (Submarine Canyon)। এই অঞ্চলটি পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ইরাবতী ডলফিন, বোতলনাক ডলফিন এবং ব্রাইডস তিমিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের প্রধান চারণভূমি ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

প্রশ্ন ৫: বাংলাদেশ থেকে কোন প্রজাতির তিমি বিলুপ্ত হয়ে গেছে?
উত্তর: আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN) এবং গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, একসময় বঙ্গোপসাগরে দেখা মেলা ফিন তিমি (Fin Whale) প্রজাতিটি এখন বাংলাদেশের জলসীমা থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

আরো পড়ুন:

টিকা

১. এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ তথ্যসহ এটি ৩১ মে ২০২৬ তারিখে আপডেট করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!